চাইর শ ট্যাহায়ও পোষায় না

নিউজ ডেস্ক: ষাইট ট্যাহায় দালান বাড়ির জোগালি কাম কইরেছি পোষাইছে। অহন চাইর শ ট্যাহায়ও পোষায় না।’ মিরপুরের পল্লবীর ফুটপাতের শ্রমিক হাটে বসে বলছিলেন সাতক্ষীরার দিপালী দাস। চোখে চোখ পড়তেই পাশে বসে থাকা মিতালী, আরতি, জুলেখা, হাজেরা বিবি ঝাঁজের সঙ্গে হরহর করে উঠলেন, ‘কী আর কমু, এক নলা লালশাক, আঁটি ২০ টাকা। কচুঘেচুর সের ৪০। কালশি বস্তির কোনাকাঞ্চিতে কোনো রকমে সাত-আটজন একসাথে গাদাগাদি কইরে থাকি। তার ভাড়া মাসত ৩ হাজার। বছরখান শ্যাষ হইলে নাকি আরও বাইরবে।’

এই শ্রমজীবী নারীদের সম্মিলিত কথার মাঝেই যোগ দিলেন উপস্থিত রবিউল, মিন্টু, হাসেম আলী, মতলুব পাইকার। কেউ পেশায় রাজমিস্ত্রি, কেউ করেন রঙের কাজ। কথা শুরু করলেন হাসেম আলী, ‘দিনে ৫০০ টাকা থাকি ৭০০ টাকাও কামাই করা যায়…। তা দিনোত যা কামাই করি রাইত পোয়াইতে পোয়াইতে শ্যাষ। আর যেদিনকা কাজ থাকে না, সেদিন কোনো একবেলা উপাস থাকির নাগে।’

মিরপুরের পূরবী সিনেমা হলের উল্টোদিকের ফুটপাতে কোদাল, টুকরি, হাতুড়ি, শাবল সম্বল করে প্রায় শ তিনেক নারী-পুরুষ বসে ছিলেন শুক্রবার সকালে। মুখগুলো শুকনো। চকচকে চেহারার কেউ কাছে আসতেই ধরছেন তাঁকে, ‘লোক নাকব নাকি, স্যার? মাটি কাটা, পাইলিং, প্লাস্টার, ইট ভাঙ্গা, ইট গাতা, মইলা ফেলা—সবই করির পাই।’

কল্যাণপুর থেকে নির্মাণশ্রমিক নিতে এসেছেন ঠিকাদার আবদুস সামাদ। তিনি জনপ্রতি সাড়ে ৫০০ টাকা মজুরি দিতে চান। হাশেম আলীরা চাইছেন সাড়ে ৬০০ টাকা। রীতিমতো দরাদরি! পণ্য মানুষের শ্রম।

শেষে ৬০০ টাকায় রফা হলো। মতলুব পাইকারের নেতৃত্বে থাকা দলটি দিনের কাজ পেয়ে গেল।

বেলা বাড়ছে, রাস্তার মাঝ বরাবর রাত-দিন চলছে মেট্রোরেলের কাজ। এ জন্য বেশ কিছু গর্ত খোঁড়া হয়েছে। গর্তের মাটি তাৎক্ষণিকভাবে সরিয়ে নেওয়ার কথা থাকলেও রাখা হচ্ছে রাস্তার ওপর। কার্তিকের মৃদু হাওয়ায় সেগুলো ধুলো হয়ে ছড়িয়ে পড়ছে চারদিকে। পথের ধুলোতে রা নেই মজুরদের। তবে কপালে চিন্তার ভাঁজ গাঢ় হচ্ছে। এখনো যে কাজ জোটেনি অনেকের। সেই দলের দুজন হারুন আর মুসা। থাকেন দুয়ারিপাড়া বস্তিতে। আগে বাড়ি ছিল ভোলা সদরের পশ্চিম ইলিশা গ্রামে। পেশায় ছিলেন জেলে। নদীতে ইলিশ মাছ ধরতেন। ঋণের দায়ে ভিটেমাটি হারিয়ে সাত বছর আগে সব পাওয়ার শহর ঢাকায় এসেছেন।

এখন তো নদীতে প্রচুর ইলিশ! মনে করিয়ে দিতেই মুসা বললেন, ‘সরকার থাকনের জায়গা দিক গ্রামে ফিরা যামু, মাছ ধরনই তো আমাগো কাম।’

ঘড়িতে সাড়ে নটা বাজতে চলল। মিরপুর-কালশি রোডে বাসের জটলা। স্টপেজ না মেনে বাসগুলো থামছে মাঝ রাস্তায়। যাত্রী ওঠানো হচ্ছে অনেকটা টেনেহিঁচড়ে, নামানো হচ্ছে ধাক্কা দিয়ে।

এখনো কাজ পায়নি নারী শ্রমিকদের দলটি। বারবার দুই হাত দিয়ে মুখ ঢাকছেন কুড়িগ্রামের মিতালী। অসুস্থ নাকি? বলতেই ক্ষীণ কণ্ঠে বললেন, ‘তেরো মাসি মাই ছাওয়াকোনার তিন দিন থাকি জ্বর। শাশুড়ির কাছোত থুইয়া আচছি। ছাওয়াকোনার চিন্তাতে…।’ শেষ করতে পারলেন না তিনি। মুখ থেকে কথা কেড়ে নিয়ে লালমনিরহাটের হাজেরা বিবি বলতে থাকেন, ‘বাহে, হামার ঘরদোর, জমি-জিরাত, গাই-বাছুর সবে আছিল। তিস্তায় সব খেয়া ফেলাইছে। অ্যালা হামার গরিবেরও গরিব। অসুখ-বিসুখের ধার ধারলে তো হামার প্যাট চলবে না।’

পাশেই কিছুটা খোশ মেজাজে বসে থাকা আরতি দাস পানে চুন ঘষছেন আর আপন মনে কিছুটা সুর করেই বলছেন, ‘এই হাত দুইখান চইল্যে পেট চইলবে, নচেৎ …।’ কথা শেষ না করেই পান পুরে দিলেন মুখে। উদাস দৃষ্টিতে দেখতে থাকলেন শহুরে মানুষের আসা-যাওয়া।

ফুটপাত ঘেঁষা দোকানগুলো খুলতে শুরু করেছে। এরই মধ্যে একজন এসে দোকানের সামনে থেকে সরে যাওয়ার তাড়া দিলেন। ১০টা বাজতে চলল। পল্লবীর দৈনিক শ্রমের বাজারে ভাঙনের সুর। কাজ না পাওয়া দিপালীরাও মলিন মুখে ফুটপাত ছাড়তে শুরু করেন।