প্রধান বিচারপতি স্বপদে ফিরবেন কি-না তা নিয়ে যত প্রশ্ন

নিউজ ডেস্ক: প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা স্বপদে ফিরবেন কি-না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। ছুটির আবেদনপত্রে অসুস্থতার কারণ লিখলেও অস্ট্রেলিয়া যাওয়ার আগে গত ১৩ অক্টোবর গণমাধ্যমে এক লিখিত বক্তব্যে প্রধান বিচারপতি জানিয়েছেন, তিনি সুস্থ আছেন। অথচ আজ শুক্রবার ছুটির মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও তিনি দেশে ফেরেননি; আবার নতুন করে ছুটিরও কোনো আবেদন করেননি। ফলে ছুটি,

না পদত্যাগ- কোন পথে প্রধান বিচারপতি যাচ্ছেন, তা নিয়েও ধূম্রজাল সৃষ্টি হয়েছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে গতকাল বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় সুপ্রিম কোর্টের দায়িত্বপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার জেনারেল মো. জাকির হোসেন বলেন, ‘প্রধান বিচারপতির কোনো চিঠি তারা এখনও পাননি।’ উদ্ভূত পরিস্থিতিতে প্রধান বিচারপতি পদ নিয়ে সাংবিধানিক শূন্যতা সৃষ্টি হয়েছে কি-না এমন প্রশ্নে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বলেন, ‘সংবিধানের ৯৭ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, প্রধান বিচারপতি অনুপস্থিত থাকলে আপিল বিভাগের জ্যেষ্ঠতম বিচারপতি দায়িত্ব পালন করবেন। তাই আপিল বিভাগের জ্যেষ্ঠ বিচারপতি (মো. আবদুল ওয়াহ্‌হাব মিঞা) দায়িত্ব পালন করছেন। প্রধান বিচারপতি দেশে ফিরলে তখন দায়িত্ব গ্রহণ করবেন। সাংবিধানিক কোনো শূন্যতা সৃষ্টি হয়নি। যা হচ্ছে, সংবিধান অনুসারেই হচ্ছে।’

অপর আরেক প্রশ্নের জবাবে আইনমন্ত্রী বলেন, ‘প্রধান বিচারপতি পদত্যাগ করলে তখন একটি পরিস্থিতি তৈরি হবে। আবার ৩১ জানুয়ারির মধ্যে যদি তিনি দেশে না ফেরেন, তাহলে আরেক পরিস্থিতি তৈরি হবে। কারণ, তখন প্রধান বিচারপতির পদ শূন্য হবে। এ রকম পরিস্থিতি হলে সরকার সংবিধান অনুযায়ী প্রধান বিচারপতি নিয়োগের উদ্যোগ নেবে।’ এর আগে আইনমন্ত্রী বলেছিলেন, প্রধান বিচারপতির বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগের সুরাহা না হলে তিনি প্রধান বিচারপতির দায়িত্ব নিতে পারবেন না।

অবশ্য সুপ্রিম কোর্টের একাধিক সূত্রে খোঁজ নিয়ে প্রধান বিচারপতির স্বপদে ফেরা-না ফেরা নিয়ে বিভিন্ন ধরনের বক্তব্য পাওয়া গেছে। তবে তাদের কেউ স্পর্শকাতর এই ইস্যুতে গণমাধ্যমে পরিচয় প্রকাশে রাজি হননি।

প্রধান বিচারপতির ঘনিষ্ঠজনদের একাধিক সূত্র বলছে, প্রধান বিচারপতি দেশে ফিরতে চান। ১৩ নভেম্বর দেশে ফিরতে কিছু প্রস্তুতিও তিনি নিয়েছেন। তবে এর আগে তার বিরুদ্ধে আনা দুর্নীতি-অনিয়মসহ ১১টি অভিযোগের বিষয়ে সুষ্ঠু তদন্ত না হওয়া পর্যন্ত যাতে হয়রানি করা না হয়, সেই নিশ্চয়তা চেয়েছেন। নয়তো দেশে ফিরলে তাকে গ্রেফতার বা হয়রানি করা হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন তিনি। এ জন্য সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসনের হস্তক্ষেপও প্রত্যাশা করেছেন প্রধান বিচারপতি। কিন্তু দুর্নীতির অভিযোগ ওঠার পর প্রধান বিচারপতি বিদেশ যাওয়ার আগে আপিল বিভাগের অন্য বিচারপতিদের কাছে সুনির্দিষ্ট কোনো ব্যাখ্যা না দিতে পারায় তাকে সহযোগিতা করতে সুপ্রিম কোর্টের প্রশাসনের পক্ষ থেকে অপারগতা প্রকাশ করতে হয়েছে। তবে তিনি চাইলে আইনগত প্রক্রিয়ায় দেশে ফিরে অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত দাবি করতে পারেন।

সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসনের সংশ্নিষ্টরা জানান, বিষয়টি পুরোপুরি ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতিসহ আপিল বিভাগের বিচারপতিদের ওপর নির্ভর করছে। দুর্নীতির অভিযোগ ওঠার পর নৈতিক কারণেই প্রধান বিচারপতির সঙ্গে আপিল বিভাগের বিচারপতিরা বসতে চান না। ১৪ অক্টোবর সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসনের দেওয়া বিবৃতিতেই বিষয়টি উল্লেখ রয়েছে। এ পরিস্থিতিতে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত ছাড়া কোনো ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করা সম্ভব নয়। এমনকি প্রধান বিচারপতি দেশে ফিরলে তাকে সুপ্রিম কোর্টের নির্ধারিত প্রটোকল দেওয়া হবে কি-না, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।

এদিকে, প্রধান বিচারপতি দায়িত্ব গ্রহণ না করায় সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসন ও বিচার ব্যবস্থায় সাংবিধানিক পদে শূন্যতা সৃষ্টি হয়েছে কি-না এমন প্রশ্নও দেখা দিয়েছে। অবশ্য আইনজ্ঞরা বলছেন, সাংবিধানিক পদে শূন্যতা সৃষ্টি হওয়ার পরিস্থিতি এখনও তৈরি হয়নি। কারণ, বিচারপতি মো. আবদুল ওয়াহ্‌হাব মিঞাকে গত ২ অক্টোবর প্রধান বিচারপতি পদে দায়িত্বভার অর্পণের চিঠিতেই বলা হয়েছে, প্রধান বিচারপতি ছুটিতে থাকা পর্যন্ত অথবা দায়িত্ব গ্রহণ না করা পর্যন্ত বিচারপতি মো. আবদুল ওয়াহ্‌হাব মিঞা দায়িত্ব পালন করবেন। তা ছাড়া প্রধান বিচারপতিও এখনও পদত্যাগ করেননি। তাই সাংবিধানিকভাবে পদটি শূন্য হয়েছে, এটা বলা সমীচীন হবে না। এ বিষয়ে জানতে চাইলে অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম বলেন, ছুটিতে থাকা প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা স্বপদে না ফিরলে বা পদত্যাগ করলে কোনো সাংবিধানিক শূন্যতা সৃষ্টি হবে না। এ ক্ষেত্রে সংবিধান মেনেই রাষ্ট্রপতি পরবর্তী ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন।

অ্যাটর্নি জেনারেল আরও বলেন, গত ১৪ অক্টোবর সুপ্রিম কোর্ট এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, নৈতিক স্খলন, দুর্নীতি, অসদাচরণসহ ১১টি সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ওঠায় প্রধান বিচারপতির সঙ্গে আপিল বিভাগের অপর পাঁচজন বিচারপতি বসতে চাননি। এমন বাস্তবতায় বিচারপতি ফের আদালতে বসতে চাইলে বা নতুন করে দায়িত্ব নেওয়ার চেষ্টা করলে তা হবে আদালত অবমাননার শামিল।

সুপ্রিম কোর্টে নতুন বিচারপতি নিয়োগ দেওয়া হলে ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি কি নবনিযুক্তদের শপথ পড়াতে পারবেন- এমন প্রশ্নের জবাবে অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, ‘অবশ্যই পারবেন, এ ক্ষেত্রে আইনগত কোনো সমস্যা নেই। কারণ, বাস্তবতা বিবেচনা করতে হবে। একজনের জন্য তো আর সব কাজ বন্ধ থাকতে পারে না।’

প্রেক্ষাপট :সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের রায়সহ বিভিন্ন ইস্যুতে আলোচনা-সমালোচনার মধ্যে গত ২ অক্টোবর অসুস্থতাজনিত কারণে ছুটিতে যান প্রধান বিচারপতি। পরে তিনি অস্ট্রেলিয়ার উদ্দেশে ১৩ অক্টোবর ঢাকা ছাড়েন। যাওয়ার আগে প্রধান বিচারপতি লিখিত বক্তব্যে সাংবাদিকদের বলেন, তিনি অসুস্থ নন। পালিয়েও যাচ্ছেন না। সাময়িকভাবে যাচ্ছেন। আবার ফিরে আসবেন। পরদিন এ ঘটনায় সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসন এক বিবৃতিতে জানায়, প্রধান বিচারপতির বিরুদ্ধে ১১টি দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। এ বিষয়ে তার কাছ থেকে কোনো সদুত্তর পাওয়া যায়নি।