তিন ব্লগার-লেখক হত্যায় অংশ নেয় সোহেল

নিউজ ডেস্ক: নারীর ভুয়া নাম-পরিচয় দিয়ে ফেসবুক আইডি খুলে টার্গেট ব্যক্তির সংস্পর্শে থাকা এবং তথ্য নেওয়াও জঙ্গিদের অন্যতম কৌশল। বিশেষত আনসার আল ইসলামের (সাবেক আনসারুল্লাহ বাংলা টিম-এবিটি) সদস্যরা এ কৌশলে তাদের তালিকাভুক্ত ব্যক্তিদের এভাবে রেকি করে হত্যার ছক এঁটে থাকে। এবিটির মোস্ট ওয়ান্টেড জঙ্গি আবু সিদ্দিক সোহেলকে গত রোববার রাতে মোহাম্মদপুর থেকে গ্রেফতারের পর এমন তথ্য পেয়েছে পুলিশের কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিট (সিটিটিসি)। পুলিশ জানাচ্ছে, ব্লগার ও বিজ্ঞানমনস্ক লেখক অভিজিৎ রায়, জাগৃতি প্রকাশনীর কর্ণধার ফয়সাল আরেফিন দীপন ও ব্লগার নীলাদ্রি শেখর চ্যাটার্জি নিলয় হত্যাকাণ্ডে সরাসরি অংশ নিয়েছিল এই সোহেল।

তিন লেখক-ব্লগারকে হত্যার কথা স্বীকার করে গতকাল সোমবারই আদালতে জবানবন্দি দিয়েছে জঙ্গি সোহেল। তাকে গ্রেফতারের ফলে অভিজিৎ, দীপন ও নীলাদ্রি হত্যা রহস্যের জট শিগগিরই খুলবে বলে মনে করছেন তদন্ত-সংশ্নিষ্টরা। এর সূত্র ধরে অল্প সময়ের মধ্যেই অভিজিৎ হত্যা মামলার চার্জশিট দেওয়ার ব্যাপারে আশাবাদী তারা। অভিজিৎ হত্যার তদন্ত করছে সিটিটিসি। দীপন এবং নীলাদ্রি হত্যার তদন্ত করছে ডিবি।

মূলত এবিটির ইন্টেলিজেন্স উইংয়ে যুক্ত সোহেল ওই সংগঠনের শীর্ষ নেতা মেজর (বরখাস্ত) জিয়াউল হক জিয়ার খুবই ঘনিষ্ঠ। তিতুমীর কলেজ থেকে বিবিএ শেষ করে একটি প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে এমবিএ করছিল সে।

এ ব্যাপারে অভিজিতের বাবা অধ্যাপক অজয় রায় গতকাল সমকালকে বলেন, দ্রুত এ মামলার চার্জশিট দেওয়া হোক- এটা আমাদের চাওয়া, যাতে অপরাধীরা দৃষ্টান্তমূলক সাজা পায়।

দীপনের বাবা অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক বলেন, এখন বিশ্বাস রাখছি, পুলিশ যথাযথভাবে তদন্ত করছে। যত দ্রুত তদন্ত শেষ হবে, ততই মঙ্গল।

সাকিব ওরফে শাকিবই এই সোহেল : ডিবির সহকারী পুলিশ সুপার ফজলুর রহমান সমকালকে বলেন, ডিবির কাছে অভিজিৎ হত্যার তদন্ত থাকার সময় জঙ্গি সাকিবের নাম এসেছিল। তবে সেটি ছিল সোহেলের সাংগঠনিক নাম। এছাড়া দীপন হত্যায় এখন পর্যন্ত মাঈনুল ইসলাম শামীম ওরফে সিফাত, আবদুস সামাদ ওরফে আবদুস সবুর ও খায়রুল ইসলাম- এই তিনজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে।

২০১৫ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি এলাকায় অভিজিৎ, ৭ আগস্ট দীপন ও ৩১ অক্টোবর নীলাদ্রিকে হত্যার ঘটনায় দেশ-বিদেশে ব্যাপক চাঞ্চল্য দেখা দেয়। অভিজিৎ হত্যার পরপরই ঘটনাস্থলের সিসিটিভি ফুটেজ থেকে সন্দেহভাজন ছয়জনের ছবি ফেসবুকে প্রকাশ করে তাদের ধরিয়ে দিতে অনুরোধ করে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি)। দুই বছরের বেশি সময় পর আলোচিত এ তিনটি হত্যায় সরাসরি জড়িত সোহেলকে জীবিত ধরা সম্ভব হলো। এর আগে অভিজিৎ হত্যায় জড়িত সন্দেহভাজন মুকুল রানা ওরফে শরিফুল পুলিশের সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হয়।

সম্প্রতি এবিটির তিন জঙ্গি খায়রুল, সবুর ও রিফাত আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয়। এ থেকে তথ্য পাওয়া যায়, ‘সাকিব’ নামে এক সদস্য অভিজিৎ, দীপন ও নীলাদ্রি হত্যায় জড়িত ছিল। পরে পুলিশ নিশ্চিত হয় সাকিবের প্রকৃত নাম আবু সিদ্দিক সোহেল।

উত্তরার বাসায় প্রশিক্ষণ নেয় সোহেল : পুলিশের উচ্চপদস্থ একাধিক দায়িত্বশীল কর্মকর্তা গতকাল সমকালকে জানান, এবিটির জঙ্গি আবু সিদ্দিক সোহেল ওরফে শাকিব ওরফে সাকিব ওরফে শাহাবের গ্রামের বাড়ি লালমনিরহাটের আদিতমারীর কুমড়ীরহাটের ভেটেশ্বর গ্রামে। ঢাকায় অধিকাংশ সময় সে তুরাগের বাউনিয়াবাদ এলাকায় থাকত। তার বাবা আবু তাহের, মা সালেহা বেগম। ১৯৯৯ সালে রাজশাহী বোর্ডের অধীনে কুমড়ীরহাট উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি ও ২০০১ সালে আদিতমারী ডিগ্রি কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করে সে। তিতুমীর কলেজ থেকে ২০০৮ সালে বিবিএ শেষ করে সে একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় এমবিএ পড়ছিল। ২০১৪ সালে এবিটিতে যোগ দেয় সোহেল। এরপর উত্তরার একটি বাসায় তার জঙ্গি ট্রেনিং হয়েছিল। এবিটির দুই নেতা মেজর জিয়া ও সেলিম ট্রেনিং নিয়েছিল।

ভিজিৎকে বাসায় খুন করতে চেয়েছিল জঙ্গিরা :মামলার তদন্তের সঙ্গে যুক্ত এক কর্মকর্তা সমকালকে জানান, এবিটি মূলত দুটি গ্রুপে বিভক্ত হয়ে কাজ করে। একটি অপারেশন উইং ও আরেকটি ইন্টেলিজেন্স উইং। জিজ্ঞাসাবাদে সোহেল জানায়, ইন্টেলিজেন্স উইংয়ের সদস্য হিসেবে তার দায়িত্ব ছিল টার্গেট ব্যক্তির বিস্তারিত প্রোফাইল ও রেকি করে তা মেজর জিয়াকে জানানো। জিয়া চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে বিষয়টি এবিটির সূরা বোর্ডে পাঠাত। সেখান থেকে অনুমতি মিললেই হত্যার ছক চূড়ান্ত করা হতো। ২০১৫ সালের ২২ ও ২৪ ফেব্রুয়ারি অভিজিৎকে অনুসরণ করতে বইমেলায় যায় সোহেল ও তার সাঙ্গোপাঙ্গরা। এর আগে তার ইন্দিরা রোডের বাসায় রেকি করে তারা। প্রথমে জিয়ার নির্দেশ ছিল, অভিজিৎকে বাসাতেই খুন করার। তবে বাসা সঠিকভাবে রেকি করতে ব্যর্থ হওয়ায় পরে টিএসএসি এলাকায় তাকে হত্যা করা হয়। এবিটির ইন্টেলিজেন্স ও অপারেশন গ্রুপের ১০-১১ জন সদস্য হত্যা মিশনে অংশ নিয়েছিল। জিয়ার নির্দেশে অভিজিৎকে রেকি করতে করতে ধানমণ্ডির একটি হোস্টেল পর্যন্ত যায় সোহেল।

ছবি দেখে সন্দেহ করেছিল সোহেলের মা : দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, অভিজিৎ হত্যার পর গণমাধ্যমে সন্দেহভাজনদের ছবি দেখে জঙ্গি সোহেলের মায়ের সন্দেহ হয়েছিল। তিনি ছেলেকে এ ব্যাপারে জিজ্ঞেস করেছিলেন; কিন্তু সোহেল তার কাছে দাবি করেছিল, ওই ছবি তার নয়। অভিজিৎ হত্যার পরও মেজর জিয়ার সঙ্গে যোগাযোগ ছিল সোহেলের।

অভিজিৎ হত্যার পর সন্দেহভাজন হিসেবে ফারাবিসহ আটজনকে আটক করা হয়েছিল। তবে তদন্তে ওই হত্যার সঙ্গে এখনও তাদের সন্দেহাতীত সম্পৃক্ততা মেলেনি। তাদের মধ্যে কেউ আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিও দেয়নি। হত্যাকাণ্ডের পর ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার করা বেশ কিছু আলামত ও সন্দেহভাজনদের আলামত পরীক্ষার জন্য যুক্তরাষ্ট্রে এফবিআইর ডিএনএ ল্যাবে পাঠানো হয়। এরই মধ্যে আলামত পরীক্ষার প্রতিবেদন হাতে পেয়েছে পুলিশ। তবে এখনও সন্দেহভাজনদের ডিএনএ পরীক্ষার প্রতিবেদন পাওয়া যায়নি। অভিজিৎ হত্যার মামলার তদন্তভার সম্প্রতি ডিবির কাছ থেকে সিটিটিসিকে দেওয়া হয়। অভিজিৎ হত্যায় অংশগ্রহণকারীদের কয়েকজন প্রকাশক ফয়সল আরেফিন দীপন ও আহমেদুর রশীদ টুটুল হত্যায়ও সম্পৃক্ত।

২০১৫ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি রাতে অভিজিৎ তার স্ত্রী রাফিদা আহমেদ বন্যাকে নিয়ে একুশে বইমেলা থেকে বের হওয়ার পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি এলাকায় তার ওপর হামলা চালানো হয়। পরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান তিনি। এ হত্যার ঘটনায় বাংলাদেশে আসে এফবিআইর একটি প্রতিনিধি দল। তারা মামলার তদন্ত সংস্থা ডিবির সঙ্গে বৈঠক করেছিল। অভিজিৎ হত্যার ঘটনায় যুক্তরাষ্ট্রেও একটি মামলা হয়েছিল।