কিশোরগঞ্জের মৌ

কিশোরগঞ্জের মৌ
এম এস প্রিন্স
জীবনের তরে প্রতিজ্ঞা বৃথাই আজিকে
ছাড়িয়া গিয়াছে কিশোরগঞ্জের মৌ জীবন বিপাকে।
যা হবার নয় কথাও ছিল না
হায়রে হায় যন্ত্রনারে যন্ত্রনা
বলিব মুখে অমন কথা কিভাবেই বা কাহাকে?
বুকে ব্যথা লয়ে একা খুঁজিতে যাইয়া দেখি চার্ট
নরসুন্দার পাড় শুধু নহে খালি গুরুদয়ালেরও মাঠ।
বুনোহাঁসের দলে মিশিয়া জলে ভাসিয়াছে না কি সেই
দূর মেঘদূত বলিয়া দিল কোথাও যে নেই।
মন মানিয়া লইতে নারাজ-
কারণ
আঁখির যে কাজল কুকিলা কণ্ঠে আমার নরীহার লোর
জীবনের গান গাহিতে জানি সে জীবনে এমনি এক নূর।
আশ যত ঘিরিয়া ছিল মহিমাময় ধ্বজা আজিকে আমার মহীরে
ত সে জৈন দৃশ্যের জন্যে থাকিব কেমনে ভুলিয়া তাহারে?
তিষ্ট হাওয়ায় ঘুমায়ে কোথা কাটে সময় বলিয়া দাও মহাজানতা
এক পলক হইলেও তাহাকে দেখিবার আমার যত আকুলতা।
মিছি-মিছি আরাধি করিতে বলিও না কখখনো আর
তাহার শূন্যতায় কলিজা আমার হইয়া গিয়াছে অঙ্গার।
শৈবাল নীড় আর শিশিরে ভিজা আভা হ’তে নিয়া যত সুখ
খানায় খানায় এমনি করিয়া ভরিয়া দিত সে আমারি বুক।
কমল কানন সূর্য কন্যা আর আগ তাহার ফাগ
কতই না যতনে কাজে লাগাইত কাটিতে আমার মাঘ।
এখন কি দোষে কেনই বা বুঝিয়া ভুল ধরিল অন্য ক’ল
জানা নাই থাকিতে মনে আমার কলঙ্ক এক চুল।
যদি তাহাই ভাবিয়া থাকে মানিয়া লইলাম তবু সব
আউল-বাউল তোরা গানে আরাজি নাজির কর তা’কে কাছে আনিতে রব।
ধুঁকুনি প্রাণ আমার থাকিবে সে ভর বহু দূর
কারণ তাহার স্মৃত বিস্মৃত মালা করিছে বুকে ধুঁধুর।
তবু সোনার রথে চড়িয়া খুঁজিয়াছি কত
গাড়ি পাল্কিতে লোক-লস্করও খুঁজিল পরিচিত যত।
কোনো সন্ধান না পাইয়া আসিল সবাজক ফিরিয়া
আমার মাঝে নাই-রে আমি বলিব কি করিয়া?
এক মাত্র রাজ্জাক থাকিল শেষ ভরসায়
যদি তিনি দয়া করে-
আমার পূজারী মৌ আসিবে ঠিকই ফিরিয়া ঘরে।
সর্ব তিনি বিশ্বাসে রতন পাঠি বিছায়ে বসিয়াছি ডাকিতে
অমনি এক চড়াই আসিয়া চিঠিতে বলিল বটতলে যাইতে।
তরিগরি সেথা যাইয়া দেখি বসা এক বেটা
সম্মুখে বসিবা মাত্রই চাহিল দিতে পূর্ণ জলের এক লোটা।
লোটা লইয়া ফিরিবার কালে আবারো চিঠি
চিঠিতে বলিল সঙ্গে নিতে দু’খানা রুটি।
অজু করিয়া এক খানা রুটি খাইল আর খানা চড়াইকে দিল
খাইতে খাইতে বেটা যাহা জিজ্ঞাসিল-
‘তোমার লালাটে কি লিখিয়াছে খোদা আমি না জানি
সাহায্য করিতে তবু বাড়াইয়া দিতে পারি পাণি।
বিশ্বাস করিয়া কহ কোনো উৎকোচ নিব না আমি
জীব যুঝিতে কি পতনে কাঁদে তোমার অন্তর্যামী?’
কেমনে করি বিশ্বাস নাই চিনা পরিচয়
চাটুবাক্য বলি তুষিছ বুঝি আমারে নিশ্চয়।
কভু যদি চাহি কিছু চাহিব করুণা এক আল্লার
আছে থাক মনে আমার যত হাহাকার
স্নেহ সঞ্চার হইলে শয্যা বিস্তার করিতে পার গৃহে
আগন্তুক তুমি মেহমান বসুন্ধরায় এর বেশি কিছু নহে।
ভূপাতে দেখি নাই এমন কোনো ঋষি
নিমন্ত্রণে বেটা হইল যত খুশি।
খুশিতে একখানা অণ্ড দিয়া কহিল ফিরিয়া চল বাটী
করিও দেখা পাইলে আবারো চিঠি।
ফিরিতে না ফিরিতেই কী মধুর বাক্ করিলাম বিলোকন
চড়াইর কণ্ঠে আজ্ঞা সর্বার্থ সিদ্ধি আমার নূতন জীবন।
‘তোমার মৌ রয়েছে সাগর কুলে
চলিয়া যাও তাহারে দেখিবার চাহিলে।’
যাহা বলি নাই তাহা বলে চড়াই কেমনে স্বরে
প্রত্যয়, বটতলে প্রভু হেরিয়াছি যাহারে।
তরিগরি বটতলে ফিরি, গভীর যাতনায় অধোমুখ
শূন্য বটতল প্রভু নাই কেমনে কাহাকে বলি এ শোক?
হায়, চক্ষু থাকিয়াও অন্ধ, দৃষ্টি মহাঘোর
সম্মুখে প্রভু পাইয়াও দেখিতে পাই নাই তাহার নূর।
পিতা মাথার পরিচর্যা না কি কাহারো কোনো ক্ষয়ের দুর্মতি
তাহা হেতু বুঝি আর দুঃখ তাই অতি।
সত্য করিয়া বলিয়াছি থাকে মৌ কোথা
দেরি কেন না আছে কোনো দিদ্ধা যাইতে সেথা?
দেরি নাই দেরি নাই চড়াই, যাইব চলি এখনি
তবে একা চলিব কেমনে পন্থ নাহি চিনি?
প্রজ্ঞপ্তি যাহা, তোমাতে রয়েছে জগৎ স্বামী
ত- শ্রেষ্টতর থাকিতে কেন হুতাশ কর তুমি?
বড়ো আশ্চর্য বিষয় যে অণ্ড করিয়া গেল দান
তাহাই সেথা যাইবে লয়ে করিয়া সম্মান।
প্রফুল্ল অন্তর শুনিয়া চড়াইর যত বচন
চলিব তাই কাশি জাত বস্ত্র পড়ি মৌ দেখিবে সে কারণ।
অণ্ড লইতে গিয়া দেখি অষ্টাপদ হইল
কেন হইল জিজ্ঞাসিলে মৌ বলিবে উত্তর আসিল।
রোমাঞ্জিত চিত্ত সুভাষিত সম্মুখের গল্প কি বিশ্ময়
প্রণাম প্রভু অদৃষ্ট কপাল ফিরায়ে দিয়াছ ঝুড়ি করদ্বয়।
যত বিপদ উপরে ফেলি দিয়াছ মুক্ত করি
নইলে কি যে দশা হইত নাহি বলিবার জরি।
চলিতে চলিতে সম্মখে নদী
কেমনে পাড়ি দিব তরী না আসে যদি।
দিবস গিয়া রজনী দ্বি-প্রহর নাই নাওয়া খাওয়া
ক্ষুধায় পেঠ জ্বলে হইবে না সম্ভব সাতার দিয়া ওপারে যাওয়া।
একাকী কেমনেই-বা নদী গর্ভে বসি আঁধারে বাঁশঝাড়ের তল
তরী আসিবে যখন করিবে তপন ঝলমল।
ত-এখন বাড়ি ফিরি; ফিরিবার কালে শুনি
চড়াইর যত বাণি-
‘ওই শুন, কি রূপে করিতে চাচ্ছ পলায়ন
মৌকে দেখিবার লাগি তুমি করিয়াছ পণ।
বস গিয়া জলে বিছানো পাটিতে
পাটিই যাইব নিয়া তোমারে ওপারেতে।’
গভীর দুশ্চিন্তা; কি করিয়া বসি যদি পাটি হইয়া যায় তল
অমনি কাঁধে বসি চড়াই বলিল রয়েছে প্রভু হ’বে না কিচ্ছু চল।
বিদ্যুৎগতিতে পাটি পাড় করিল
ওপারে যাইবা মাত্রই দু’খানা রুটি ভাগ্যে জুটিল।
রুটি খানা যে আমারি চিনিতে নাই বাকি
জিজ্ঞাসিলে চড়াই বলিল প্রভু না খাইয়া দিল তোমার জন্যে রাখি।
পাতকী আমি বুঝি লাগে সন্দেহ ভঞ্জন
তাই নিবেদন চড়াই সত্য করিয়া বল
কি কারণে রুটি খানা আসিল ফিরে
নইলে শোক র’বে জিগরে হইবে চিত্ত সমুজ্জ্বল।
ভূপাতে জলে স্থলে শূন্যে রয়েছে মানুষেতে প্রভু
সর্ব মহাত্ম্য মানু, কাউকে ক্ষীণ চিন্তিয় না কভু।
মানুষ্য সেবায় প্রভু খুশি আর কি করিব বর্ণন ওরে নর
আপনা না, বান্ধারে ভোজন করানোই প্রভুর স্বর্গ সুখকর।
হৃদি শান্ত হইল খাইয়াছি মিলে
আর বাদে চলি সাগর কুলে।
চলিতে চলিতে ভানু উদিবার কালে
আসিয়াছি যথা স্থানে তা’কে দেখিতে হিয়া চটুলে।
হায় প্রভু আমার পূজারী মৌকে দেখিবার আশে
সাগর কুলে আসিয়াও অষ্টনরক কাল সূত্র প্রশ্বাসে ।
মহাঘোর অন্তজ্বালা, কি ভয়ঙ্কর অতীব ভিষণ
যে জ্বালায় জ্বলি কেমনে করিব তাহা বর্ণন?
এক খানা তরী আর বলিতে আমি
হায় প্রভু তুমি জগৎস্বামী
জীবন ধারাবাহী কাহিনীতে আমার কল্যাণী
কিশোরগঞ্জের মৌ বলিয়া দাও রয়েছে কই?
আর কিছু তোমাতে চাহি এমন ত নই।
জবাবে অষ্টাপদ বলিল- জলে ভাসাও তরী
বালিয়ারি হইতে আসিয়া উঠিবে তোমার পূজারী।

তুমিহীনা এত কাল একা যেন ছিন্ন ভিন্ন দেহ
মরার মতো শকুনে খাইয়া গেল দ্যাখেনি কেহ।
কথা দাও হারাবে না আর কোথাও কখখনো?
একবার যে য়ায় দূর দিগন্তে চলে
সে নাহি আসে ফিরে আর কোন কালে
তুমি সঞ্চীব আমার সজীবতা
হউক না প্রতিচ্ছবি তোমাতে দিব দেখা দিলাম কথা
যখনি ইচ্ছে আসিও তুমি এই সাগর কূলে।।