স্বপ্নের দিনগুলো

এম এস প্রিন্স
রায়গঞ্জ গ্রামের একেবারে মধ্যবর্তি স্থানে মিয়া বাড়ির পাশেই ছোট একটি কুঠির। বাপ-দাদার পৈত্রিক সূত্রে পাওয়া এই বাটীই শুধু সম্বল। জীবিকা নির্বাহ করতে কাজের মৌসুমে মিয়া বাড়িতে আর সময়ে বিল থেকে মাছ ধরে বিক্রি, কখনো বা আবার স্কুল ঘরের পাশে দাঁড়িয়ে আইসক্রিম বিক্রি করে অরুন তার সংসারের খরচ যোগার করে থাকে।

নামে-গুণে মিয়া বাড়ি মহৎ হলেও ভেতরে প্রবেশ করতে হলে অরুনের আঙ্গিনায় পাদাচরণ ব্যতিত এক আকাশ পথ। অন্য পাশগুলো জঙ্গল আর জঙ্গল। রাস্থার পাশ খোলা হলেও সম্মুখে অরুনের বাড়ি। তাই এই জায়গাটুকু দিয়ে দেবার জন্যে মিয়া সাহেব অরুনকে নানান লোভ লালসা দেখালেও শেষ পর্যন্ত কোনোকাজে আসেনি। জমিতে যেহেতু কাজের মৌসুমে অরুনকে কাজ করতে হয়। তাই মিয়া সাহেব সোজা ভাবে কোনো কিছূ না করে আর পথ খোঁজতে গিয়ে তার মাঝে যত গুঞ্জন। যেন সাপ মরে লাঠি ঠিক রয়।

আজ বাদেই রতমেলা। মেলায় যত প্রজাতির পাখি আছে প্রায় সবই পাওয়া যায়। এ জীবনে মেলায় গিয়েছে বলে সন্দেহ। তাই মেলার প্রকৃত বিবরণ বাস্তবতায় দেখা ব্যতিত বর্ণনা করা গুজামিল ছাড়া কিছু হবে না। তাই মিয়া সাহেব ঠিক করল মেলায় যাবে। আপন চোখে দেখে মেলার বিবরণ ডায়রি লিখবে।

মেলা থেকে শিক্ষনীয় বিষয়াদী জানা যত প্রয়োজন। তার চেয়েও বেশি দরকার হাকিমী বনলতা জাতীয় বা আর কোনো প্রকারের ঔষধ সম্পর্কে জানা। যার গুণাবলীতে কাজে আসবে। অরুনের বাড়ি হবে তার। চোখ-মুখের এই স্বপ্ন বাস্তবতায় রূপদান করতে মিয়া সাহেব মেলায় গেল। কাজ-কর্ম এবং বাড়ি দেখা-শুনা করতে অনুমান যোগ্য দু’দিনের জন্যে মিয়া সাহেব অরুনকে বাড়িতে রেখে গেল।

ভর দুপুর, সেই সকালে কি খেয়ে বা না খেয়ে বেরিয়েছে; আর বাটী আসেনি। সর্বক্ষণ কী কাজেই লেগে আছে না মাঝে মধ্যে আপন দেহের প্রতিও নজর দিয়েছে? তার খরব নিতে নুরি রান্না-বান্না করে দুপুরের খাবার সঙ্গে লয়ে অরুনের কাছে এল। অতি আদরে পোষা কুকুরটিও সাথে। বাড়িতে লোক-লস্কর বলতে এক মাত্র নুরি আর অরুন। সর্বক্ষণ-ত অরুন বাড়িতে থাকে না। অন্যের কাজ কর্ম করতে; কখনো কখনো বাজারে বা আর। যার জন্যে অরুনকে বাইরেই থাকতে হয়। এজন্যে নুরির একমাত্র সঙ্গী কুকুরটি। রান্না-বান্নার সময় পাশে পাশে শুয়ে বসে; নুরির ঘুমের ঘরেও তাই। আর পুকুর ঘাটে গোসল করতে যাবার কালেও একই কাহিনী। প্রভু ভক্ত কুকুটি যে শুধু নুরির তা না বাড়ির গার্ডও বটে। তাই অরুন- ‘তুই যে আমার হিরে-মানিক, তুই আমার সন্তান। বাঁচার ক্ষণে তুই সবুজ প্রাণ।’ এ কথা বলে অরুন কুকুরটির নাম রাখল রতন। এর পর থেকে বাড়িতে রতন নামটি কারো মুখে উচ্চারিত হলে কুকুরটি সহজে বোঝে নিতে পারে তাকেই ডাকছে।

গা-গোসল দিয়ে অরুন খেতে বসল। খাবার পাত্র থেকে ভাত মুখে পুরা মুহূর্তে অরুন নুরির নয়ন পানে চেয়ে- ‘তোমাকে না দিয়ে আমি কেমন করে খাই।’ এ কথা বলে নুরিকে দু’লুকমা তুলে দিয়ে অতপর রতনকে পাশেই মাটিতে অল্প কিছু দিয়ে নিজে খেল।

নুরি ফিরে আসার ক্ষণে- ‘শুধু কাজ-ই করো-নে একটু নিজের প্রতিও খেয়াল রেখো।’ অরুনকে এ কথা বলে চলে এল। আসার সময়- ‘তাসের খেলা ঘরে ভগবান আমার রিজিক… ও কথা থাক; তুমি আমাকে নিয়ে কিছু ভেবও না। তোমার গার প্রতি নরজ দিয়ো।’ অরুনের এ কথার জবাবে নুরি-‘ তোমার নজর বাড়ির সীমানায় আর কর্তৃ হিসেবে আমার সীমানার মধ্যে থাকা মানুষের ওপর। তাছাড়া তুমি-ই আমার সব, যদি কিছু হয়ে যায় তাহলে আমি যে…।’ বললে তার জবাবে অরুন-‘ ওকথা কখনো মুখে এনোনা; তুমি বাটী যাও।’ বলে নুরিকে বিদায় দিল। নুরি বাড়ি চলে গেল। অরুন কাজে মন দিল।

মিয়া বাটীর পূর্ব পাশের পুকুরটা বেশ বড়-সর। এক পাড় থেকে আর পাড়ে হেঁটে যেতে প্রায় পনের-বিশ মিনিট সময় ব্যয় হয়। পুকুর পাড়ে কলার চাষ আর মাঝে মাঝে সেগুন, অর্জুন, আম্র কাঁঠালও মাথা ঝাড় দিয়ে ওঠেছে। পুকুরের চারপাশে মৈলচা এবং শৈবাল যে হারে আর কিছু দিন পর পুকুর যে না ভরবে এতে কোনো সন্দেহ নেই। তাই অরুন জলে নেমে সাফ করতে শুরু করল। এ সময় নন্দু জেলে তার দু’জন সহকারী সাথে করে এল মাছ ধরার আশে। যদিও নন্দ এবং মিয়া সাহেবের সম্পর্ক বেশ কাছে পিঠের। তথাপি তাদের মাঝে অর্থে কারণে বিরুধ। মিয়া সাহেবের মেয়ে রনির অসুস্থতায় চিকিৎসা বাবৎ দু’কাটা জমি বন্ধক রেখে চাচত ভাই নন্দুর কাছ থেকে টাকা নিয়েছিল। বন্ধকী স্টাম্পে যদিও কোনো কর্তনের কথা উল্লেখ্য ছিল না, তবু টাকা ফেরত দেবার কালে কিছু কম দিয়েছিল। সেই সূএ ধরে নন্দু পুকুরের মাছ ধরে বিক্রি করে শোধ করবে। সময় ভালো, সুযোগে সৎ ব্যবহার করবে; এবং তাই করল।

মালিকের অনুপস্থিতে যেহেতু দায় ভার আমার ওপর সুতারাং এই মুহূর্তে সব কিছুর মালিক আমি নিজে। মাছ ধরতে দেয়া যাবে না। এ কথায় অরুন বাঁধা দিতে গেলে- ‘তোকে মেরে ফেলব।’ বলে ভয় দেখালে অসহায় অরুন আর কি করবে। শেষ পর্যন্ত মাছ ধরে নিয়ে গেল। তবে এই মাছ অরুনকে দিয়েই বাজারে নেওয়াল এবং তার মাধ্যমেই বিক্রি করাল। যদিও কিছু টাকা ভাগ দিল।

টাকা নিতে প্রথমে নারাজ থাকলেও শেষ পর্যন্ত গ্রহণ করার কারণ বাজারে কিছু দেনা। যা পরিশোধ করা তার পক্ষে অনেকটা কঠিন ছিল। যেহেতু নন্দুর মাধ্যমে এমনটা হল, তাতে তার দায় শোধ করা সহজ হয়ে গেল। আর নন্দুরও দুশ্চিন্তার পতন ঘটল। কারণ এতে অরুন নিজেও ভাগ নিয়েছে। মুখ বন্ধ রাখবে।

পুকুরের মৈলচা এবং শৈবালের অধিকাংশ সাফ হয়ে গেছে। বেলাও প্রায় পরন্ত। অরুন বাড়ি ফিরে যাবে এমন সময় মিয়া সাহেব মেলা থেকে চলে এল। সঙ্গে যা আনল তা অরুনের চোখান্তরালে। পারিশ্রমিক বাবৎ যা, তা দিয়ে আগামী কাল সকাল সকাল কাজে আসার কথা বলে বিদায় দিল।

অরুন নুরিকে পূজারী পূজারী বলে ডাকতে ডাকতে বাড়ির ভেতরে প্রবেশ করল। নুরিও গাল ভরা হাসিতে দৌড়ে এসে হাঁপাতে হাঁপাতে- ‘তুমি আসচ।’ বলে সালাম করতে শুরু করল। কিন্তু অরুন এই ভাবে সালাম করতে বারণ করলে তার জবাবে নুরি বলল- ‘ভগবানের পরে যিনি জগতে তুমিই তিনি। তোমাকে সালাম করব না তো আর কাকে করব।’

অরুনের শ্বশুর মশাই এখনো জীবিত। অরুন যে একেবারে কাছে পিঠের কাউকে বিয়ে করেছে এমন না। সম্পর্ক বেশ দূরের। খালাত বোনের মামাত ননদ। যিনি বর্তমানে অরুনের ঘরণী। যা হোক মাগরিব পর পর এমন সময় অরুনের শ্বশুর মশাই এল। মেয়ে, জামাইকে দীর্ঘ দিন যাবৎ না দেখার কারণ। তারচেয়েও বড় কথা অরুন কর্তৃক লালন-পালনের আশে দেয়া গরু চুরি হয়ে গেছে। কথা ছিল চোখে চোখে রাখবে। কিন্তু রাখতে পারেনি অরুনের শ্বশুর মশাই। হার অনুসারে খাবার কম; রাত্রে ভাঙ্গা ঘরে। চোর নিয়ে গিয়েও নরক বাস থেকে মুক্তি দিল। এই চুরির কথা ব্যক্ত করতে গিয়ে শ্বশুর মশাই অরুনকে যে বলল তা এই- ‘কপলে যদি না ঘি থাল চাটলে হবে কী?’

শ্বশুর মশাইকে কিছু বলতে না পারলেও ভেতরে ভেতরে কি যে কষ্ট তা অরুনের দীর্ঘশ্বাস থেকে বোঝা যায়। কারণ এটি ছিল তার ভবিষৎতের সম্বল। ভাগ্য চাকা ঘুরতে কিছু হলেও সহায়ক হত। মাঝে মাঝে আবার এও চিন্তে করে মিয়া সাহেবের মাছের ফল।

রজনী শেষে সোনালি সকাল। কথানুসারে অরুন কাজে যাবে। কিন্তু যাবে যে বাড়িতে মেহমান। তাছাড়া রতন যেভাবে সামনে এসে দাঁড়াল কেটে আসা আজকে তার পক্ষে বুঝি সম্ভব হবেনা। তবুও গেল। গেল যে সে অনেক ইতিহাস। এক বাজার করে, দুই রতনকে খাবার দিয়ে বুঝিয়ে-সুঝিয়ে। তারপর কাজে গেল। না হলে সংসার চলবে না।

শ্রম বিক্রেতার নজর ধানের গুছায় আর মালিকের নজর গগনে। বড় হতে চাই হতে হবে। আর ও খেয়ে দেয়ে দয়ায় বাঁচি। পৃথিবীর নিয়মে মানুষ জাতি শ্রেণী ভাগে বিভক্ত পূর্বে না জানলেও এখন আর তা বোঝর বাকি নেই। কেন-ই বা বিভক্ত! সংস্কৃতির মানে কী সমাজে চোখ না রাখলে কখনো বোঝা? ভাগ্য চক্রের উত্তর পত্রে না কথাটাই বেশির ভাগ ক্ষেত্রে পাওয়া যাবে। কাজের লোক জনম ভর কার্য-ই করে যায়। নজর কখনো ধানের চারা ত্যাগ করতে পারে না। আর মালিক পক্ষ আকাশ।

সেই সকালে অরুন কাজে মন দিল। দিল যে দিলই। বেলা প্রায় বারোটা নাস্তা করবে এদিকে চিত্ত শূন্যের কোটায়। কিন্তু মিয়া সাহেবের স্বীয় গভীরে একটি বিষয় বারবার ঘুরপাক খাচ্চে। শেষ কোথা কে জানে? ডাক পড়ল খাবার জন্যে। কাজের মন ভেঙ্গে গেল। ক্ষুধার মানিক অরুনকে ভর করল। না খেয়ে আর সম্ভব না। তাই খাবার জন্যে অরুন বাড়ি গেল।

হাকিমী বনলতায় এবার বুঝি কাজে আসবে। বাড়ির সম্মুখের জায়গা হবে আমার। এই প্রত্যয়ে মিয়া সাহেব অরুনকে ভাত দিল। কিন্তু এর সাথে মেশানো অল্প গুড়া ঔষধ এবং ঈগল পাখির গোস্তের তরকারি। এক খণ্ড গোস্ত মুখে দিতেই সপ্ত-সহস্র রসহরণীর স্নায়ুতে স্পন্দন এবং সর্ব শরীরে অদ্ভূত ভাবের সঞ্চার হলো। খানা বেশ, এ জীবনে কখনো খেয়েছি বলে সন্দেহ। এ-ই বলে অরুন মুখে পুরা শুরু করল। শেষ পর্যন্ত পাতিল শূন্য, তবু তার আরো প্রয়োজন। কিন্তু পাবে কেমন করে? যদি আবার রান্না করা হয় তাহলে হয়ত। হাত ধুয়ে অরুন ফিশারীর পাড়ে আম্র তলে গিয়ে বসল। চোখে ঘুম ঘুম ভাব। শেষ পর্যন্ত এক ঘুমে তিন দিন।

কে জানে কোথায় আছে আমার নাকের নূলক! শক্তি আমার আমার ভগবান, নয়ন তারা। আছগো কে? দাওনা খবর এনে। আনি ফিরে তারে পূজার ঢালায় করে। অমন কথায় নুরির কাঁদন কে দেখে? নাওয়া-খাওয়া ছাড়া, ঘুম হারাম। অরুনকে নিয়ে ভাবতে ভাবতে তার অন্য। শুধু নুরি একাই চোখের জলে ভাসছে তা না। রতন কথা বলতে না পারলেও ফোটা ফোটা অশ্রু বৃষ্টিই তার যত যাতনার প্রকাশ। তিন দিন ধরে কোনো কথা নেই, না আছে চোখের দেখা। যদি বাড়িতে ফিরে আসত তাহলে অবশ্যই কিছু না কিছু খেতে দিত। বলত মোহ-নীড়ের কথা। রতন বাড়ির এ পাশ থেকে ও পাশ ঘুরে ঘুরে ফিরে আসে। কোথাও নেই। নেই কোথাও তার মালিক মশাই। মজার খাবার কে দেবে এনে? প্রশ্নই শুধু তার। নুরিও প্রায় পাগল। মহল্লার সবার কাছে আশ্চর্যের বিষয়। হঠাৎ কোথায় গেল? কারো কারো ধারনা নিশ্চই কোনো না কোনো মেয়ে নিয়ে দূর কোথাও পলায়ন করেছে। না হলে কী এই!

এদিকে মিয়া বাড়িতে আনন্দ মেলা। যত সব কাজে লেগেছে। এবার বাড়ি বিক্রি করেই তার চিকিৎসা করতে হবে। নয়ত ঔষধ-ত দূর; অনাহারে মরতে হবে। তিন দিন পর অরুন ঘুম থেকে ওঠে- ‘ ভাত চাই, আমি ভাত খাব। গোস্ত দিয়ে আমি ভাত খাব।’ আর যত পাগল পাগল। অরুনের এ অবস্থা দেখে নুরি অরুনের কাছে এসে- ‘তোমার কি হয়েছে, ছিলে কোথা।’ বলে কাঁদতে কাঁদতে ঘরে নিয়ে গেল।

যা হয়েছে হয়েছেই। আজও যেমন কালও তেমন। অমন করে দিন মাস বছর। গাঁয়ের যত লোক-লস্করের মুখে মুখে অরুন পাগল হয়ে গেছে। কিন্তু কেন এ দশা কারণ খোঁজতে কেউ এক পা এগিয়ে আসেনি। মিয়া সাহেব দেখতে এসে রুটি কলা খেতে দিয়ে- ‘আহ্ বেচেরা কত ভালো ছিল, আর আজ তার এই হাল। হায় ভগবান কি অপরাধ ছিল? যার কারণে তুমি এমন সাজা দিচ্চ।’ করুণ নয়নে অরুনের মুখ পানে চেয়ে কাতর কণ্ঠে অমন কথা বলল। মিয়া সাহেবের এ কথায় নুরির মনে ধারণা জাগল চিকিৎসা বাবৎ কিছু না কিছু হলেও সাহায্য করবে। কিন্তু না, কল্পনাই বৃথা। মুখে মুখে যত খানি, ভিতর ভিন্ন।

আপনার মাঝে নিজের দোষের স্বীকর- ‘এ কাজ করলাম বাড়ির সম্মুুখের জায়গাটুকুর জন্যে। আমার অনেক থাকা সত্তে¡ও এইটুকু ছাড়া পরিবেশ সুন্দর করা যাচ্ছে না।’ তাই এ সম্পত্তি যদি আমার হয়, তাহলে এমন ভাবে বাড়ির পরিবেশ সাজিয়ে-গুছিয়ে নিব যে কখনো আর কেউ অপছন্দ করতে পাবেনা। এমন ধারণায় মিয়া সাহেব নুরিকে বলল- ‘কেউ কাউকে এমনি ভাবে-তো কিছু দান করেনা। তাছাড়া যদি ধার দিতে যাই তাহলে পরিশোধ করার কি অবলম্বন আছে।’ মিয়া সাহেবের কথা শুনে নুরি- কী যে বলবে সে ভাষা হারিয়ে ফেলেছে। জবাবে বলার মত কিছু নেই। তবে আছে, শেষ সম্বলটুকু বাড়ি; যদি কখনো বিক্রি করে।

কোনো কর্ম নেই। খরচ-ত আছেই পূর্ব তুলনায় বৃদ্ধি পেল বটে। অরুন অসুস্থ এ ডাক্তার ও ডাক্তার। তার ফি আবার অষুদ। কিন্তু রোগ আর ভালো হয় না। এমন পরিবেশে অরুনকে রেখে নুরি কাজ করতে যাবেই বা কোথা? তাছাড়া কাজ করবেই বা পারে কী? পূর্বে শুধু বাড়ির কাজ যেমন রান্না-বান্না, ঘর বাড়ি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা শুধু এইটুকু। অন্যের বেলা কখনো এরকম না। কিছু হলেও ভিন্ন। এই ভাবনায় নুরির দু’চোখে জমানো দু’ফোটা জল শুধু সম্বল। অন্ধকার কাহিনীতে আর কত? অবশেষে বাবার বাড়িতে খবর দিল।

পারস্পরিক লোক-মুখে শোনে নন্দু অরুনকে দেখতে এসে উঠানে দাঁড়াল মাত্র অমনি অরুন ‘আমি ভাত খাব; গোস্ত দিয়ে ভাত খাব। ভাত দে, আমারে গোস্ত দিয়ে ভাত দে।’ আর যত পাগল পাগল অভিনয়। অরুনের কথানুসারে নন্দু গোস্তের তরকারি দিয়ে ভাত এনে খাইতে দিল। কিন্তু অরুন আনন্দের সাথে ভাত খেতে বসেও ফেলে দিল। হয়ত এক রকম গোস্তের তরকারি দিয়ে খেতে চেয়েছিল কিন্তু সে-রকম আর হয়নি। তাছাড়া নন্দুরও বুঝি বোধ-গম্যের বাইরে। যাহোক রতন দীর্ঘ দিন পরে পেল। তাই বলতে আর জরি নেই। রতনের খাবার খাওয়া দেখে অরুন মাথায় হাত বুলিয়ে খাচ্ছ খাও, মজা করে খাও। অতপর হাসতে হাসতে নন্দুর কাছে এসে রতনকে দেখিয়ে আবার বলল- ‘এ বুঝি পেল হাজার বছর পর।’

অরুনের সমস্ত কিছু অবলোকন করে নন্দু নুরিকে বলল- ‘সব রোগ ডাক্তারি চিকিৎসায় ভালো হয় না। এমন কিছু আছে কবিরাজের ধারস্থ হতে হয়। এভাবে বসে না থেকে অরুনকে নিয়ে কবিরাজ বাবুর কাছে যান।’ কথাগুলো যদিও নুরি মনে দাগ কাটল, যথাযথ মূল্যায়ণ করতে একটু আর কাহিনীতে পড়ে গেল। কারণ অর্থ ভাণ্ডার শূন্যের কোঠায়। কারো কাছে ধার চাইবে এমন ব্যবস্থাও নেই। পূর্বে যাদের কাছ থেকে ধার নিয়েছিল সেগুলো পরিশোধ করতে মাথায় যত চাপ। আর দিকে স্বামীর এই, এবং ঘরে খাবার বলতে শুধু জল ছাড়া কিছু নেই। এখন খাবেই বা কী! তাছাড়া অরুনকে কবিরাজ বাবুর কাছে নেবেই বা কেমনে? অসুস্থ অরুনের কথা না ধরলেও, দীর্ঘদিন নাওয়া-খাওয়া ছাড়া এবং চিন্তা ভাবনায় নুরির যে অবস্থা! তা বলা দায়।

খেয়ে বাঁচা ঋণ পরিশোধ এবং স্বামীকে সুস্থ করে তুলতে গিয়ে শেষ সম্বলটুকুও হাত ছাড়া করতে সিদ্ধান্ত নেবার কালে নুরি অরুনের গা ধরে করুণ নয়নে চোখে চোখ রেখে ভাঙ্গা কণ্ঠে যে কয়টি কথা বলল তা এই- ‘ কেউ রয় পাঁচ তলাতে; কেউ বা নিচ তলায়
বাসযোগ্য হয় না হয় হলো তোমার আমার বেলায়
বৃক্ষ ছায়া তল;
তবু আমরা মানুষ
জগৎ জীবনে বুকে আছে শক্তি বল।।’
দীর্ঘ সময়ের পোষা স্বপ্ন পূরণ হয়েছে। তাই আনন্দের ঝোড়োহাওয়াতে এক নতুন পৃথিবী। মিয়া সাহেবের মিষ্টি বিতরণ কার্যক্রম আর নুরির বুকে প্রশান্তের ঢেউ। স্বামীর শেষ সম্বলটুকু হাত ছাড়া হয়ে গেল। কথানুসারে নুরি আজ বাদেই কবিরাজ বাবুকে দেখিয়ে অরুনকে নিয়ে পাড়ি দিবে শহরে। চির দিনের জন্যে ত্যাগ করবে এই ভিটে মাটি। কিন্তু ত্যাগ করবে যে মিয়া সাহেবের কাছে বাড়ি বিক্রি করে যা পেল তার অধিকাংশই ব্যয় হয়ে গেছে ঋণ পরিশোধে। এখন চিন্তা যত চিকিৎসা শেষে কত রয়? যা হোক তবু স্বামী ভালো হোক অর্থ সবও যদি যায় যাক।

অরুনের হাল অবস্থা জেনে নুরির বাবা খরচ বাবৎ কিছু টাকা সঙ্গে করে মেয়ে জামাইকে দেখতে এল। কবিরাজের কাছে যাবে। কিন্তু যাবে যে কবিরাজের বাড়ি নুরি বা তার বাবা কারো চেনা-জানা নেই। তাই শেষ পর্যন্ত নন্দুকে সঙ্গে করে পথ যাত্রা শুরু কলল।

দূরের পথ; কিন্তু গাড়ি করে যাবার উপযোগি কোনো পথ ঘাট নেই। হেঁটে যাত্রা শুরু করল। যেহেতু প্রথম সাক্ষাৎ আর হেঁটে যাওয়া ছাড়া উপায় নেই। এজন্যে অরুনকে না নিয়ে নুরি তার বাবা এবং নন্দু গেল। কবিরাজ বাবু যদি বলে পর দিন না হয় অরুনকে নিয়ে আবার যাবে। পথের দু’ধারে জঙ্গল আর জঙ্গল। কিছু সবুজ বৃক্ষ ডালা হাতে সরিয়ে তার পর সামনে এগুতে হয়। জোঁকের কথা আর বলতে হয় না। ধরাতে যত সব বুঝি এখানে। মানুষের রুধির গন্ধ পেলে লাফ দিয়ে ধরে।

জীব জানোয়ারের ভয় থাকলেও তিন জন থাকায় নির্ভয়ে আর যত সয়ে নিয়ে জঙ্গল পেরিয়ে বিলের ধারে কবিরাজ বাবুর বাড়ির কাছাকাছি এল মাত্র। আকাশের দক্ষিণ পশ্চিম কোণে হঠাৎ ইট কালার রং ধারণ করল। এদিকে ‘যুগ যুগ ধরে ক্ষুধার্ত, আজকে ভাত খাব, আমি গোস্ত দিয়ে ভাত খাব।’ এই স্লোগানে অরুন রতনকে সঙ্গে করে বাড়ির বাইরে বেরুল। কখনো কখনো আবার রতনের মাথায় ধরে হাসতে হাসতে ‘তুইও খাবি; আমি তোরে খাইতে দিমু; কোনো চিন্তা ভাবনা করিস না।’ এমন কথা বলে আর এক সাথে পথ চলে।
প্রায় বিকেল।

এমন সময় মিয়া সাহেবের মেয়ে রনি আহ্লাদে একগাল হাসি দিয়ে পুকুর পাড়ে গিয়ে আম্রতলে আস্থনা গড়ল। মনোরম পরিবেশে বুঝি কোনো কাননের গান। যদিও একা তবু আপনার মাঝে না। আর মানুষ হিসেবেও সে অত্যান্ত শৌকিন। যা হোক, যে কারণেই আসুক; হঠাৎ তার গা শিওরে ওঠল। মনে প্রশ্ন; যা কখনো বা কোনো দিন দেখিনি আর আজ…! এই দুশ্চিন্তার কারণ- ‘একটি শক’ন তার মাথার ওপর দিয়ে এসে শৈবালের থোপের ওপর বসল।’ রনির পেছন দিক দিয়ে অরুন রতনকে সঙ্গে করে এসে- ‘কত যুগ আমি খাইনি; আজ গোস্ত দিয়ে ভাত খাব।’ আম-তলটাও অরুনের চিনতে ভুল হয়নি। এখানেই এক ঘুমে তার তিন দিন কেটেছিল। অরুনের কথা রনি ঠিক বোঝতে পারেনি। কারণ পাগলে কত কথাই বলে থাকে। এমন ভাবনায় সব উড়িয়ে দিল। খালি হাতেই অরুন ঘাড়ে আঘাত করলে রনি মাটিতে পড়ে গেল; আর সাথে সাথেই রতন গলাতে কামড় দিয়ে হেছড়াতে শুরু করলে কতক্ষণের মধ্যেই রনি চলে গেল না ফেরার দেশে। ওঠে আর দাঁড়াতে পারল না। অরুন ‘আজকে ভাত খাব গোস্ত দিয়ে।’ খুশিতে এমন কথা বলতে বলতে রনির উরু থেকে কত খানি গোস্ত তোলে নিয়ে বাড়ির পথে যাত্রা শুরু করলে মাঝ রাস্তায় মিয়া সাহেবের সঙ্গে দেখা। গোস্ত হাতে অরুনকে দেখে ‘আমার কাছে দাও আমি রান্না করে দিই মজা করে খাইতে পারবা।’ অমন কথা বলে মিয়া সাহেব অরুনের কাছ থেকে নিয়ে রান্না করতে শুরু করে দিল।

ভাঙ্গা একটি মাটির ঘর। বৃষ্টির দিনে বিছানাতে জল তারচেয়েও করুন ইতিহাস বউ, পুত্র বলতে কেউ নেই। খোদার জগতে বড় একা; তাও আবার আপন চোখে পৃথিবীর আলো দেখা আর সম্ভব হয়ে ওঠেনা। খাবার প্রস্তুত ও আর যত পড়শী বাড়ির এবং তার খরচ যোগানোর পন্থা কবিরাজি করা। নুরি তার বাবা এবং নন্দুকে সঙ্গে করে বাড়ির সামনে এসে কাসন দিয়ে যখন জিজ্ঞেস করল- ‘বাবুজি আসব?’ একথার প্রতিউত্তরে- ‘জীবন বেলায় একশ লোকের কলিজা খেয়েছি; ফলরূপ আজ আমার কিছু নেই।’ এখন তোমরা আসছ কি জন্যে এসো শুনি ঘরে।’ বাড়ি-ঘরের অবস্থা যেমন; কথা শোনেও নুরির কবিরাজের প্রতি কোনো প্রকার ভক্তি আসেনি। তবু আসছি যখন পরামর্শ করতে সমস্যা কোথায়? অমন ভাবনায় অরুন সম্পর্কে সমস্ত কিছু বোঝিয়ে বলা শেষে কবিরাজ বাবু যে কয়টি কথা বলল তা এই- ‘অরুন এমনিতে পাগল হয়নি; করা হয়েছে। মিয়ার বাড়ির সামনেই তার বাড়ি। অনেক অর্থ সম্পদের মালিক থাকা সত্তে¡ও এই জায়গাটুকুর জন্যে তার পরিবেশ আর। তাই এই জায়গাটুকুর জন্যে প্রথমে পাগল এবং অতপর মৃত্যু মেয়াদ দেয়া হয়েছে; যার তারিখ আজকে।’ কবিরাজ বাবুর কথা শোনে নুরির গা শিওরে উঠল। মানুষের সঙ্গায় কখনো কি এই? তার মনে প্রশ্ন। যেহেতু শেষ বেলা তবু চেষ্টা করে দেখব। কবিরাজ বাবুর একথায় ভর সঞ্চয় করে নুরি সঙ্গিগণকে নিয়ে বাড়ির পথে যাত্রা শুরু করল। যত সম্ভব অরুনকে নিয়ে কবিরাজ বাবুর কাছে যেতে হবে। ভালো করে নতুন পৃথিবী সাজাবার আশে।

এদিকে মিয়া সাহেব আপন হাতে রান্না বান্না করে রতনকে এবং অরুনকে খাওয়ায়ে অল্প পরিমাণ তরকারি রেখে দিল নিজেও খাওয়ার জন্য। অরুনকে বাড়িতে পৌঁছে দিয়ে এসে খাবে। এমন ভাবনায় গৃহ ত্যাগ করল মাত্র এ সময় আকাশ পথে ওড়ে যাবার কালে শকুনের মুখ থেকে এক টুকরা গোস্ত সামনে পড়ল। অরুন এটি তোলে হাতে নিলেও মিয়ার মনে প্রশ্ন হয়ত কিছু আর! সব ভাবনার পতন ঘটে সিদ্ধান্ত বাক্যে উপনীত হতে অরুনকে সঙ্গে করে মিয়া গগনে উড়ন্ত শকুন লক্ষ্য করতে করতে পুকুর পাড়ে রনির লাশের কাছে এসে পৌঁছল। মিয়ার মাথায় ভাঙ্গা আকাশ। যে ছিল বুকের বল। সেই আজ এই! মিয়ার ভাঙ্গা কণ্ঠে চোখের জল। কিন্তু অরুন আরো একটু নিয়ে নিই মজা করে খাবনে। এ কথা বলে যখন গোস্ত লইতে গেল। মিয়ার বোঝতে কিছু বাকি থাকল না যে তার দ্বারাই।

আমার বাড়ির পরিবেশ সুন্দর করতে গিয়ে আপন হাতে পাগল করেছি। আর তোর দ্বারাই এই! সহজ কথায় দিলে না তোর বাড়ির জায়গাটুকু। অনেক চিন্তা ভাবনা করে এই পথ বেচে নিয়েছি কারণ চিকিৎসা করতে হলেও তোর বাড়ি বিক্রি করতে হবে। আর আমাকে ছাড়া কেউ রাখতেও সাহস করবে না। কিন্তু প্রতিদান এমন হবে কখনো ভাবিনি। আমি তোকেও বাঁচতে দেব না। চোখের জলে ভেসে এমন কথা বলে মিয়া সাহেব যখন অরুনের মাথায় আঘাত করলে অরুন- ‘নুরি।’ বলে চিৎকার দিয়ে মাটিতে লুটে পড়ল। দীর্ঘদিন পর সুস্থ মস্তিষ্কেও কথা যখন নুরি কান-গলায় ঢুকল তখন নুরি তার বাবা নন্দুকে সঙ্গে করে এবং রতন মিয়া থেকে পুকুর পাড়ে এসে দেখে এই ইতিহাস। জীবনের মোড় ঘুরে এমন হবে কখনো ভাবিনি।

যে কারণে এত কিছু করলাম সেই করবে ক্ষতবিক্ষত। যদি কখনো এমন হুশিয়ারি বার্তা পেত মন তাহলে অন্ধকার কাহিনীর জাল বোনার কোনো প্রয়োজন ছিল না। মিয়া সাহেবের এমন কথা গুলো যখন শোনতে পেল তখন নুরি জবাবে আমার স্বপ্নের দিনগুলো ভাঙ্গা কাচের মত ভেঙে চূর্ণ বিচূর্ণ করে দিলে। তোরও বেঁচে থাকার কোনো অধিকার নেই। একথা বলে আঘাত করতে যাবার পূর্বেই রতন ভবপাড় থেকে চির বিদায় করে দিল মিয়াকে।

রতন অরুনের সমাধির পাশে শোয়ে শোয়ে চোখের জল ফেলছে। নুরি বাবার সাথে তার পিতৃালয়ের আশে পথ চললেও বারবার পিছন ফিরে অরুনের কবরটাই লক্ষ করছে। আর আপনার গভীরে ভাবছে- আমার স্বপ্নের দিন গুলো স্বপ্নেই রয়ে গেল। শুধু দীর্ঘশ্বাস শেষ সম্বল।