রোহিঙ্গা কূটনীতিতে ‘ভারত-চীন’ সমীকরণ

রাশেদ মেহেদী: ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের বন্ধুত্বের সম্পর্ক নিয়ে নতুন করে আলোচনার কিছু নেই। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে প্রতিবেশী হিসেবে ভারত যেভাবে বাংলাদেশের পাশে দাঁড়িয়েছিল, তা নিশ্চিতভাবেই দেশের মানুষ ভোলেনি। এর বাইরে প্রাকৃতিক দুর্যোগসহ নানা সংকটে ভারতকেই সবার আগে সাহায্যের হাত বাড়াতে দেখা যায়। বর্তমান সরকারের আমলে দু’দেশের সম্পর্ক অনন্য মাত্রায় পৌঁছে গেছে দীর্ঘদিন ঝুলে থাকা স্থল সীমান্ত চুক্তি বাস্তবায়ন এবং সমুদ্র সীমা নির্ধারণ সংকট সমাধানের মধ্য দিয়ে। ভারত এখন বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়ন অংশীদারও। কিন্তু তারপরও বাংলাদেশ-ভারত দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে টানাপড়েন নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা রেওয়াজে পরিণত হয়েছে।

ট্রানজিট থেকে শুরু করে তিস্তা চুক্তি নিয়ে সমালোচনার ভাষা মাঝে মধ্যেই কঠোর হয়েছে। একটা সময়ে ‘জান দেব,তবু ট্রানজিট দেব না’ এমন রাজনৈতিক বক্তব্যে মাঠ গরম করা হয়েছে। কিন্তু যখন শুধু দেশে নয়, মহাদেশ থেকে মহাদেশে ট্রানজিট ও ট্রানশিপমেন্ট বাস্তবতায় পরিণত হয়েছে, তখন সেই সমালোচনাও ম্লান হয়ে গেছে। তিস্তার পানি বণ্টন চুক্তি দীর্ঘায়িত হওয়ায় সমালোচনা এখনও প্রবল। তিস্তার পানি বণ্টন চুক্তির বাস্তবতায় কতটা রূপান্তর এসেছে, এক্ষেত্রে ভারতের অভ্যন্তরীণ এবং আঞ্চলিক প্রেক্ষাপট কতটা প্রভাব ফেলছে, তা অবশ্য খুব একটা আলোচনায় আসে না।

সর্বশেষ রোহিঙ্গা সংকটে ভারতের অবস্থান নিয়ে বেশ শোরগোল দেখা যাচ্ছে। এই আলোচনায় বড় কাঁপন তুলেছে ভারতের কূটনৈতিক চিন্তাবিদদের অন্যতম পিনাক রঞ্জন চক্রবর্তীর কিছু বক্তব্য, যিনি ঢাকায় হাইকমিশনারের দায়িত্বও পালন করে গেছেন। চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক নিয়ে তিনি বেশ তির্যক মন্তব্য করেছেন রোহিঙ্গা ইস্যুর আলোচনায় এবং সংকট সমাধানে চীনের কাছে যাওয়ারও পরামর্শ দিয়েছেন তিনি। প্রায় এক বছর আগে দিল্লিতে ‘অবজারভার রিসার্চ ফাউন্ডেশন’ অফিসে পিনাক রঞ্জন চক্রবর্তীর সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনার সুযোগ হয়েছিল। সে সময় তিনি বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক নিয়ে বেশ উৎসাহব্যাঞ্জক মন্তব্য করেন। বিশেষ করে বিমসটেকের ভেতরে এই দুই বন্ধু প্রতিবেশী রাষ্ট্রই চালিকা শক্তি হতে পারে বলে উচ্ছ্বাসের সঙ্গে মন্তব্য করেন তিনি। তার কাছ থেকে রোহিঙ্গা ইস্যুতে তির্যক মন্তব্য একটু অবাক করে দেয় বৈকি।

এ অঞ্চলে বাণিজ্যিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব বিস্তারের জন্য ভারত, চীন, জাপান, রাশিয়া, যুক্তরাষ্ট্র এমনকি ইউরোপের প্রভাবশালী রাষ্ট্রগুলোর আগ্রহ প্রবল। তবে শেষ বিচারে একই অঞ্চলে অবস্থানের কারণে ভারত-চীনের প্রভাব বিস্তারের বিষয়টি শুধু স্নায়ুবিক টানাপড়েনে থাকে না; তার একটা আক্ষরিক অবয়বও দেখা যায়। এই প্রেক্ষাপট বিবেচনা করলে চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের মাখামাখিটা বেশি হলে ভারতের স্নায়ুচাপ বাড়ে। আবার ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক জোরালো হতে থাকলে চীনের আঁতে ঘা লাগে!

রোহিঙ্গা সংকটের কূটনীতিটাও এই আঞ্চলিক বাণিজ্যিক কূটনীতির বেড়াজালে পড়ে গেছে। মিয়ানমারের সঙ্গে ভারত-চীন উভয়েরই সীমান্ত রয়েছে। ভারতের নাগাল্যান্ড, মিজোরাম ও মনিপুর রাজ্যের বেশ লম্বা সীমান্ত রয়েছে মিয়ানমারের সঙ্গে। এই সীমান্তে বিদ্রোহী সংকটের অস্তিত্বের কথাও শোনা যায়। ফলে মিয়ানমারকে কিছুটা সমীহ করে চলতেই হয় ভারতের। অন্যদিকে রাখাইন রাজ্য ও বঙ্গোপসাগরীয় উপকূল ঘিরে চীনের যে বিশাল বাণিজ্যিক কর্ম পরিকল্পনা সেটাও আমলের বাইরে রাখার সুযোগ নেই ভারতের। ভূ-রাজনৈতিক অবস্থান এবং আঞ্চলিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে মিয়ানমার এই মুহূর্তে ভারতের কাছে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। অতএব বাংলাদেশের খুব কাছের বন্ধু হলেও ভারতকে রোহিঙ্গা সংকটে খুব হিসেব করে পা ফেলতে হচ্ছে, সন্দেহ নেই।

কিন্তু তারপরও ভারত তার অবস্থান গোপন রাখেনি। জাতিসংঘের মানবাধিকার কাউন্সিলে দেওয়া বিবৃতিতে ভারত বেশ স্পষ্ট করেই বলে দিয়েছে, রোহিঙ্গা সংকটের দ্রুত সমাধান করতে হবে এবং তা কফি আনান কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়নের মধ্য দিয়েই। ঢাকায় এসে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজ দৃঢ়তার সঙ্গেই বলেছেন, রাখাইন থেকে বল প্রয়োগে পালিয়ে আসা নাগরিকদের মিয়ানমারকে ফেরত নিতেই হবে। অনেকে মনে করেন, জাতিসংঘ রাখাইনে নির্যাতন বন্ধের আহ্বানে যতটা সোচ্চার,রোহিঙ্গাদের দ্রুত প্রত্যাবাসনের ব্যাপারে ততটা উচ্চকণ্ঠ এখন পর্যন্ত নয়।

এবার আসি চীনের প্রসঙ্গে। চীন সবাইকে হটিয়ে মিয়ানমারে তার একক আধিপত্য অনেকটাই বিস্তার করে রেখেছে। প্রকৃত অর্থে বলতে গেলে চীনই মিয়ানমার সেনাবাহিনীর ক্ষমতা দখল ও দীর্ঘদীন ক্ষমতা কুক্ষিগত করে রাখার নেপথ্যের শক্তি। মিয়ানমারে বিলাস, ব্যাসন ও বাণিজ্যে সুবিধাজনক অবস্থানে আছে চীন। ফলে বিপুল সম্পদের অধিকারী হয়েও মিয়ানমার অর্থনৈতিক অগ্রগতিতে অনেক পিছেয়ে। রাখাইনে আজকের যে সংকট তার পেছনেও করুণ ওবং দুর্বল আর্থ-সামাজিক অবস্থা অনেকটাই দায়ী। সে যাই হোক, চীন যদি ইতিবাচক হয় তাহলে রোহিঙ্গা সংকট নিরসনে আঞ্চলিক ও আর্ন্তজাতিক কূটনৈতিক প্রেক্ষাপট রাতারাতিই বদলে যাবে।