রোহিঙ্গা সংকট: ‘শুমার করিয়া দেখি চৌদ্দ হাজার’

রাজীব নূর:‘লাখে লাখে সৈন্য মরে কাতারে কাতার,/ শুমার করিয়া দেখি চল্লিশ হাজার।’ পুঁথি সাহিত্যের লাগামহীনতা নিয়ে প্রচলিত একটি প্রবাদতুল্য রসিকতা এটি। এই রসিকতাটা একটু অন্যভাবে মনে এল এই সেদিন ২২ অক্টোবর রাতে, টেলিফোনে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক রাহমান নাসির উদ্দিনের সঙ্গে আলাপের সময়। রোহিঙ্গা বিষয়ে গবেষণার জন্য দেশবিদেশে প্রশংসিত এই অধ্যাপক আমাকে বুঝিয়ে দিচ্ছিলেন, কেমন করে সম্প্রতি আসা লাখ ছয়েকসহ বিভিন্ন সময়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া ১১ লাখ রোহিঙ্গার মধ্যে মাত্র ১৪ হাজারকে ফেরত নেওয়ার ফন্দি আঁটছে মিয়ানমার। এ নিয়ে ২৫ অক্টোবরের সমকালে ‘দীর্ঘমেয়াদি হবে প্রত্যাবাসন’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন ছাপা হয়েছে। অধ্যাপক নাসিরের সঙ্গে আলাপের সময়ই পুঁথির নামে প্রচলিত রসাত্মক প্রবাদটি মনে এলে ভাবলাম, ‘লাখে লাখে রোহিঙ্গা আসে কাতারে কাতার/ শুমার করিয়া দেখি চৌদ্দ হাজার।’

১৪ হাজার ফেরত নেওয়ার ফন্দি সম্পর্কে অধ্যাপক নাসিরের যুক্তিটি পুনরাবৃত্ত করার আগে লাখ লাখ সৈন্য গণনার পর চল্লিশ হাজার পাওয়ার রসিকতাটি নিয়ে একটু বলেই ফেলি। বহুকাল ধরেই সংখ্যা নিয়ে উদ্ভট গরমিল দেখলে লাইন দুটি আমার মনে আসে। কিন্তু এটা আদৌ কোনো পুঁথিতে আছে কিনা, তা নিয়ে সংশয় ছিল। তাই নিশ্চিত হওয়ার জন্য ফোন করি বন্ধু সাইমন জাকারিয়াকে। কবি ও নাট্যকার সাইমনের লোকসাহিত্য নিয়েও রয়েছে উল্লেখযোগ্য গবেষণাকর্ম। সাইমন জানালেন, এটি ‘জঙ্গনামা’ পুঁথির। কারবালার যুদ্ধ নিয়ে বাংলাভাষায় শাহ গরীবুল্লাহ থেকে শুরু করে উত্তরকালের অনেক কবি ‘জঙ্গনামা’ রচনা করেছেন। তাদের কেউ রবীন্দ্রনাথের ‘খাপছাড়া’ ছড়ার ভোলানাথের মতো ঢের বেশি লিখে খুশি হননি, বরং লাখ লাখ শুমার করে কেউ চল্লিশ হাজার এবং কেউ আবার মাত্র তিন-চার হাজারও পেয়েছেন।

তবু আমাদের এই আলোচনায় ভোলানাথ প্রাসঙ্গিক—”ভোলানাথ লিখেছিল,/ তিন-চারে নব্বই/ গণিতের মার্কায়/ কাটা গেল সর্বই।/ তিন চারে বারো হয়,/ মাস্টার তারে কয়;/ ‘লিখেছিনু ঢের বেশি’/ এই তার গর্বই।” আমরা রোহিঙ্গাদের চাইনি, তবু যে সংখ্যক রোহিঙ্গা বাংলাদেশে এসেছে, বলতেই হবে পেয়েছি ঢের বেশি। পাহাড়বেষ্টিত ও সমুদ্রবিধৌত কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফ উপজেলার মোট চার লাখ ৭১ হাজার ৭৬৮ বাসিন্দা এখন সংখ্যালঘুতে পরিণত হয়েছে। জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থার সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, গত দু’মাসে ছয় লাখ তিন হাজার রোহিঙ্গা বাস্তুচ্যুত হয়ে এসে আশ্রয় নিয়েছে। ফলে আগের চার লাখসহ বর্তমানে বাংলাদেশে আশ্রিত রোহিঙ্গার সংখ্যা ১০ লাখ ছাড়িয়ে গেছে। অবশ্য অনেকের ধারণা, বাংলাদেশে এখন ১১ লাখের মতো রোহিঙ্গা রয়েছে এবং তাদের প্রায় সবাই এখনও উখিয়া ও টেকনাফে বাস করছে।

বাংলাদেশে ধেয়ে আসা রোহিঙ্গা ঢল, চাইলে সীমান্তেই থামিয়ে দেওয়া যেত। তবে এটা অমানবিকতার উদাহরণ হতো বিশ্বজুড়ে। নতুন আসা রোহিঙ্গাদের গ্রহণ করে শরণার্থী আশ্রয়দাতা দ্বিতীয় বৃহত্তম দেশের একটি এখন বাংলাদেশ এবং এই রোহিঙ্গারাই বাংলাদেশের জন্য বড় মাথাব্যথার কারণ হতে যাচ্ছে। মিয়ানমার সরকার রাখাইন রাজ্যে দীর্ঘদিন ধরে যে ‘মগের মুল্লুক’ কায়েম করেছে, এর পরিণতিতে পৃথিবীর সবচেয়ে বঞ্চিত, নিপীড়িত জাতিগোষ্ঠীতে পরিণত হয়েছে রোহিঙ্গারা। জন্মই তাদের কাছে আজন্ম পাপের মতো। বিগত শতাব্দীর ষাটের দশকের মাঝামাঝি থেকে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করেই জন্ম নেয় রোহিঙ্গা শিশুরা। ফলে যে বঞ্চনার মধ্যে তারা বড় হয়, তাদের মধ্যে প্রতিশোধ স্পৃহা থাকাটাই স্বাভাবিক। এ বছর ২৫ আগস্ট থেকে আবারও রোহিঙ্গারা বাংলাদেশ অভিমুখী হওয়ার পর সরেজমিনে উখিয়া ও টেকনাফের বিভিন্ন আশ্রয়শিবির ঘুরে দেখার অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি, তাদের চোখেমুখে আমি ক্রোধ দেখেছি। দেখেছি ধর্মীয় রীতিনীতির প্রতি তাদের উপেক্ষা এবং ধর্মান্ধতাও। স্বামী কয়েক বছর ধরে জেলে থাকার পরও সন্তানসম্ভবা নারীটি অবলীলায় জানিয়ে দিতে পারেন গর্ভের সন্তানটি তার দেবরের। তার পাশের তাঁবুর যে বৃদ্ধা একমাত্র সম্বল হিসেবে মিয়ানমার থেকে একটি কোরান শরিফ বইয়ে এনেছেন, তিনি নির্দ্বিধায় শুনছেন ওই নারীর অকপট সত্যকথন। সহজেই রোহিঙ্গাদের মধ্যে ধর্মোন্মাদনা জাগানোও সম্ভব। ইতোপূর্বে জঙ্গিবিরোধী অভিযানে রোহিঙ্গাদের অন্তত দুজনের নিহত হওয়ার ঘটনা আমরা জানি। এবারও নতুন আসা রোহিঙ্গাদের নিয়ে দেশীয় জঙ্গিরা ষড়যন্ত্র শুরু করতে পারে বলেই আমাদের ধারণা। অন্তত শিবিরগুলোতে নগদ অর্থ বিলিয়ে অনেকেই আমাদের সন্দেহের উদ্রেক করেছে। রোহিঙ্গাদের আহার, বাসস্থান নিশ্চিত করা নিশ্চয়ই একটি বড় সমস্যা, কিন্তু তার চেয়েও বড় দেশের নিরাপত্তা নিশ্ছিদ্র রাখা। অথচ রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে না নেওয়ার তালবাহানার পালে হাওয়া দিচ্ছি আমরা কেউ কেউ।

অধ্যাপক রাহমান নাসির উদ্দিন ২২ অক্টোবর রাতে দীর্ঘ আলাপে বিষয়টি বেশ ভালো করেই বুঝিয়ে দিয়েছেন। তার যুক্তি, ১১ লাখের মধ্যে ১৪ হাজারকে ফিরিয়ে নেওয়ার ফন্দি করছে মিয়ানমার। কূটনীতির নামে সেই ফাঁদ পাতা হচ্ছে বাংলাদেশের জন্য। ইতোমধ্যে মিয়ানমারের স্টেট কাউন্সেলর অং সান সু চির দপ্তরের মন্ত্রী টিন্ট সোয়ে বাংলাদেশ ঘুরে যাওয়ার পর সু চির দপ্তরের অফিসিয়াল ওয়েব পেইজে বাংলাদেশ থেকে কিভাবে রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেওয়া হবে তার যে ফর্মুলা প্রকাশ করা হয়েছে, তা অত্যন্ত হতাশাব্যঞ্জক। অধ্যাপক রাহমান নাসির উদ্দিন বলেন, ‘আমার কাছে মনে হয়েছে, সু চি তার দপ্তরের মন্ত্রীকে প্রতিনিধি করে পাঠিয়েছিলেন নিজের খসে-পড়া চামড়া বাঁচানোর জন্য। তার প্রমাণ পেতে চব্বিশ ঘণ্টা সময় লাগেনি। ২ অক্টোবর দাপ্তরিক মন্ত্রী ফিরে গেলেন আর ৩ অক্টোবর সকাল ৯টা ৫৯ মিনিটেই অফিসিয়াল ওয়েব পেইজে প্রকাশিত ফর্মুলায় বলা হলো, রাখাইনের অধিবাসীদের (residents from the Rakhine State) ফিরিয়ে নেওয়া হবে ১৯৯২ সালের যৌথ ঘোষণা এবং যাচাই-বাছাইয়ের ফর্মুলা (verification and repatriation) অনুযায়ী।’

রাহমান নাসির বলেন, ‘বাংলাদেশের অধিকাংশ মিডিয়া স্টেট কাউন্সেলর দপ্তরের ওই মন্ত্রীর সফরটিকে উপস্থাপন করেছে মিয়ানমার সরকারের প্রতিনিধিদলের সফর হিসেবে। প্রকৃতপক্ষে ওই ভদ্রলোক হলেন অং সান সু চির দপ্তরের মন্ত্রী—মিয়ানমারের রাষ্ট্র এবং ক্ষমতাকাঠামোয় তার অবস্থান বাংলাদেশের যে কোনো প্রতিমন্ত্রীর নিচে হওয়ার কথা। কেননা সু চি নিজে স্টেট কাউন্সেলের উপদেষ্টা এবং মিয়ানমারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী। সুতরাং বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী এবং পররাষ্ট্র সচিব পর্যায়ের লোকজন মিয়ানমারের স্টেট কাউন্সেলর দপ্তরের মন্ত্রী টিন্ট সোয়েকে এটেন্ড করতে পারতেন। তাকে যে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে, তিনি যে তা প্রাপ্য নন, সেটা তার নির্বাক প্রস্থানই প্রমাণ করে।’ সু চির দাপ্তরিক ওই মন্ত্রী মিয়ানমার সরকারের বার্তা নিয়ে এসেছিলেন কি-না, তা নিয়েও সন্দেহ প্রকাশ করেন রাহমান নাসির। কেননা টিন্ট সোয়ে শুধুই সু চির দাপ্তরিক মন্ত্রী এবং মিয়ানমারে যেখানে সু চির কথাই খুব একটা ধর্তব্যের মধ্যে রাখা হয় না, যেখানে পার্লামেন্টের ২৫ শতাংশ সিট বরাদ্দ থাকে সেনাবাহিনীর জন্য, সেখানে সেনাবাহিনীর নিয়ন্ত্রণাধীন সরকারের কোনো প্রতিনিধি এলে বাংলাদেশে বৈঠক চলাকালে অক্টোবরের ২ তারিখেও মংডুতে আগুন দেওয়ার মতো ঘটনা ঘটত না। টিন্ট সোয়ে ফিরে যাওয়ার পর ১৯৯২ সালের ফর্মুলায় রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেওয়ার ঘোষণার মধ্য দিয়েও বিষয়টি স্পষ্ট হয়েছে। অথচ ১৯৭৮ সালে বাংলাদেশের সঙ্গে মিয়ানমারের যে সমঝোতা হয়েছিল, সে অনুযায়ী রোহিঙ্গাদের সেদেশের নাগরিক হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। ফলে, মিয়ানমার অনেক হিসাব-নিকাশ করেই ১৯৭৮ সালের ফর্মুলা না এনে, ১৯৯২ সালের ফর্মুলার কথা বলছে।

১৯৯২ সালে মিয়ানমার ও বাংলাদেশ যে যৌথ ঘোষণা প্রণয়ন করেছিল তার মাধ্যমে ১৯৯২ সালের ২২ সেপ্টেম্বর থেকে ২০০৫ সালের ২৮ জুলাই পর্যন্ত দুই লাখ ৩৬ হাজার ৫৯৯ জন রোহিঙ্গাকে মিয়ানমারে ফেরত পাঠানো গিয়েছিল। কিন্তু ২০০৫ সালের পর কেটে গেছে বহুদিন। ২০০৫ সালের মিয়ানমার আর ২০১৭ সালের মিয়ানমারের মধ্যে অনেক ফারাক রয়েছে। যদি ১৯৯২ সালের ফর্মুলা দিয়ে যাচাই-বাছাইয়ের যে কাঠামো দাঁড় করানো হয়েছিল, এবারও তা অনুসৃত হয় তাহলে সর্বোচ্চ ১৪ হাজার রোহিঙ্গা মিয়ানমারে ফিরে যেতে পারবে। ২০১৪ সালে মিয়ানমারে পুনরায় নাগরিকত্ব যাচাই-বাছাইয়ের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল এবং সে প্রক্রিয়ায় রোহিঙ্গাদের মধ্যে যাদের অস্থায়ী অধিবাসী হিসেবে কার্ড ছিল, তাদেরকে নাগরিকত্বের জন্য আবেদন করার সুযোগ দেওয়া হয়। তবে শর্ত জুড়ে দেওয়া হয় যে, তারা আদমশুমারিতে নিজেদের ‘বাঙালি’ বলে তালিকাভুক্ত করবে। তখন এই শর্তে মাত্র চার হাজার রোহিঙ্গা হিসেবে তালিকাভুক্ত হতে রাজি হয়েছিল। পরে ২০১৫ সালের জাতীয় নির্বাচনের আগে রোহিঙ্গাদের কাছে যে অস্থায়ী অধিবাসী কার্ড ছিল সেটাও বাতিল করে তাদের ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়া হয়। সু চি ক্ষমতায় আসার পর ২০১৫ সালের জুন মাসে আবারও যাচাই-বাছাইয়ের মাধ্যমে নাগরিকত্ব দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়। কিন্তু এবারও রোহিঙ্গাদের মাত্র ১০ হাজার ‘বাঙালি’ পরিচয়ে নাগরিকত্ব প্রদান প্রক্রিয়ায় স্বীকৃতি পায়। আগের চার হাজার ও পরের ১০ হাজার মিলিয়ে নাগরিকত্বের প্রমাণ দিতে পারার মতো রোহিঙ্গার সংখ্যা দাঁড়ায় ১৪ হাজার।

রোহিঙ্গাদের ফেরত নেওয়ার ব্যাপারে তালবাহানার মধ্যেই মিয়ানমার থেকে নিমন্ত্রিত হলেন আমাদের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এবং এরই মধ্যে তিনি সফর সমাপ্ত করে দেশে ফিরে এসেছেন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর মিয়ানমার সফর নিয়ে ঢালাও কুতর্কে যুক্ত হওয়া অনুচিত। নিশ্চয়ই আন্তর্জাতিক চাপ তৈরির সমান্তরালে দ্বিপাক্ষিক আলোচনাও অব্যাহত রাখতে হবে। তবে আমাদের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল যেদিন মিয়ানমার সফরে গেলেন, সেদিনই ফেসবুকে লিখেছিলাম, ‘কেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে আমন্ত্রণ জানাল মিয়ানমার? বিজ্ঞজনেরা বলছেন, আরসাবিরোধী যৌথ অভিযানের আহ্বান জানানো হবে বাংলাদেশকে। এই আহ্বান আসলে একটা ফাঁদ। মিয়ানমারের পাতা ফাঁদে বাংলাদেশ পা দিলেই গণহত্যার অভিযোগ থেকে রেহাই পেয়ে যাবে মগের মুল্লুকের সেনাবাহিনী এবং সেনাপুষ্ট অং সান সু চি। সেনা অভিযানের নামে রাখাইন রাজ্যে পরিচালিত রোহিঙ্গাদের হত্যা, নারী ধর্ষণ ও অগ্নিকাণ্ডের মতো ভয়াবহ অপরাধকে আইন-শৃঙ্খলাসংক্রান্ত বিষয় বলে দাবি করার সুযোগ পাবে।’

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সফরের প্রথমদিনেই সরকারি বার্তাসংস্থা বাসস জানায়, রাখাইন রাজ্য থেকে সহিংসতার কারণে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের ফেরত নিতে সম্মত হয়েছে মিয়ানমার। পাশাপাশি জাতিসংঘের সাবেক মহাসচিব কফি আনানের নেতৃত্বে গঠিত আনান কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়নেও সম্মত হয়েছে। এ ব্যাপারে মিয়ানমার ও বাংলাদেশ ৩০ নভেম্বরের মধ্যে একটি জয়েন্ট ওয়ার্কিং গ্রুপ গঠন করবে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সফরের অর্জন যে এতটা নয়, তা কিন্তু বার্মিজ ভাষার সংবাদপত্র ‘ইরাবতী’ প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে এরই মধ্যে সবার জানা হয়ে গেছে। মিয়ানমারের সীমান্তবর্তী অপরাধ বিভাগের কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল অং তে মিয়ান্টকে উদ্ধৃত করে ‘ইরাবতী’ জানিয়েছে, ‘দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে শরণার্থীদের ফিরিয়ে আনার বিষয়ে কোনো কথা হয়নি। যা হয়েছে, তা হলো সহিংসতার পর মিয়ানমার থেকে যারা বাংলাদেশে পালিয়ে গেছে তাদের চিহ্নিত করে কিভাবে ফেরত আনা যায়। এছাড়া দু’দেশের মধ্যে বৈঠকে নিরাপত্তা ও সীমান্তে সহযোগিতা বিষয়ে দুটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। এছাড়াও বৈঠকে লিঁয়াজো অফিস খোলা, সন্ত্রাসদমনে সহযোগিতা, মাদকপাচার রোধ, তথ্যের আদান-প্রদান, নিয়মিত বৈঠক করা এবং সীমান্তে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বিষয়ে আলোচনা হয়েছে।’

ঢের বেশি লিখে ‘খাপছাড়া’র ভোলানাথ গর্বিত হতেই পারে, আমরা যেন কূটনীতির ভুলচালে পা দিয়ে ঢের বেশি বলতে পারায় গর্বিত না হই। কথা ও কাজের মধ্যে দুস্তর ফারাক থাকলে চলবে না। দ্বিপাক্ষিক আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের চেষ্টা চালাতে হবে, চীন-রাশিয়া জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে বাগড়া দেবেই, তবু আন্তর্জাতিক চাপ সৃষ্টির চেষ্টা করতে হবে। ভারত ও জাপানকে যতটা পক্ষে আনা সম্ভব, সে চেষ্টাও চালিয়ে যেতে হবে। জাতিসংঘকে দিয়ে রাখাইন রাজ্যকে রোহিঙ্গাদের জন্য নিরাপদ এলাকা হিসেবে গড়ে তোলা, আন্তর্জাতিক আইনে মিয়ানমারকে শাস্তি দেওয়ার চেষ্টা সবকিছুই করতে হবে। কিন্তু আমাদের কূটনীতির হালহকিকত দেখে মনে হচ্ছে, আমরা রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গাদের ওপর পরিচালিত গণহত্যাকে আরসাবিরোধী সেনা অভিযানে রূপান্তরের প্রেক্ষাপট তৈরি করে দিচ্ছি। বলে রাখা ভালো, আরসা একটা জুজুবুড়ি, ‘আরসার ভেতরে কলকাঠি নাড়ছে কারা, রোহিঙ্গা বিদ্রোহেও হাত মিয়ানমার সেনাদের’ লিখেছিলাম কয়েকদিন আগে, যা গত ২১ সেপ্টেম্বরের সমকালে ছাপা হয়েছিল।

লেখক: সাংবাদিক