বৈদেশিক লেনদেনে ঘাটতি ভালো না খারাপ?

জাকির হোসেন: ১৬ বছর পর গত জুলাই মাসে বিদেশের সঙ্গে লেনদেনের সামগ্রিক ভারসাম্যে ঘাটতিতে পড়েছে বাংলাদেশ। সর্বশেষ হিসাবে আগস্ট মাসেও ঘাটতি রয়েছে এবং তা বেড়েছে। অবশ্য চলতি হিসাবে ঘাটতি বছর খানেক ধরে রয়েছে। ২০১৬-১৭ অর্থবছরটা চলতি হিসাবে ঘাটতি রেখে শেষ হয়। এর আগের চারটি অর্থবছরে এ হিসাবেও উদ্বৃত্ত ছিল। চলতি হিসাবে ঘাটতি তৈরি হলেও সামগ্রিক লেনদেনে গত জুন পর্যন্ত উদ্বৃত্তাবস্থায় ছিল বাংলাদেশ।

চলতি বা সামগ্রিক লেনদেন ভারসাম্যে ঘাটতি অর্থনীতির জন্য খারাপ না ভলো? এক কথায় এর কোনো উত্তর নেই। এটি নির্ভর করে উদ্বৃত্ত বা ঘাটতির প্রকৃতির ওপর। সাধারণত কোনো দেশের রফতানির তুলনায় আমদানি অনেক বেশি হলে বাণিজ্য ঘাটতি থেকে চলতি হিসাবে ঘাটতি তৈরি হয়। রেমিট্যান্সও এ হিসাবের একটা উপাদান। রফতানি ও রেমিট্যান্স বেশি হলে উদ্বৃত্ত থাকে। সামগ্রিক লেনদেনের ক্ষেত্রে বিদেশি বিনিয়োগ ও ঋণের বিষয়টি সম্পৃক্ত।

বাংলাদেশের লেনদেনের ঘাটতি মূলত আমদানি অনেক বেড়ে যাওয়ার কারণেই হচ্ছে। রেমিট্যান্স কমে যাওয়াও একটা কারণ। চলতি অর্থবছরের মাত্র দুই মাসে (জুলাই-আগস্ট) ১৮১ কোটি ডলার বা সাড়ে ১৪ হাজার কোটি টাকার বাণিজ্য ঘাটতি হয়েছে। গত অর্থবছরে পণ্য বাণিজ্যে সামগ্রিক ঘাটতির পরিমাণ ৯৪৭ কোটি ডলার, যা গত সাত বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। গত অর্থবছরে চলতি হিসাবে ১৪৮ কোটি ডলারের ঘাটতি হয়। তবে সামগ্রিক লেনদেনে ৩১৭ কোটি ডলার উদ্বৃত্ত ছিল। চলতি ২০১৭-১৮ অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে সামগ্রিক লেনদেনে প্রায় ২১ কোটি ডলারে ঘাটতি হয়েছে। আর চলতি হিসাবে ঘাটতির পরিমাণ ৪৫ কোটি ডলার। বাংলাদেশে গত অর্থবছরে রফতানি বেড়েছে মাত্র ২ শতাংশ। রেমিট্যান্স কমেছে প্রায় ১৫ শতাংশ। অন্যদিকে আমদানি বেড়েছে ৯ শতাংশ। গত ২ মাসে আমদানি বেড়েছে প্রায় ৩৪ শতাংশ।

অর্থনীতিতে লেনদেনের ভারসাম্যের প্রভাব নিয়ে অর্থনীতিবিদদের মধ্যেই বিতর্ক আছে। অর্থনীতির জনক অ্যাডাম স্মিথ মনে করতেন, বাণিজ্য ঘাটতি নিয়ে উদ্বেগের কিছু নেই। এ বিষয়ে তার ‘অবাধ সুবিধা’ নামে একটি তত্ত্ব রয়েছে। অ্যাডাম স্মিথের অনুসারীদের মতে, কোনো দেশের ক্রয় ক্ষমতা থাকলে সে বিদেশ থেকে বেশি বেশি পণ্য আমদানি করতেই পারে। যেমন: মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এশিয়ার দেশগুলো থেকে যে পরিমাণ পণ্য আমদানি করে, তার চেয়ে ওইসব দেশে রফতানি করে খুবই কম। যুক্তরাষ্ট্র বেশি আমদানি করছে তার সক্ষমতার কারণে।

অবশ্য যুক্তরাষ্ট্রের সফল ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগকারী ওয়ারেন বাফেট মনে করেন, বড় আকারের বাণিজ্য ঘাটতি তার দেশের অর্থনীতির জন্য হুমকি। ২০০৬ সালে বার্তা সংস্থা এপিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘আমরা (যুক্তরাষ্ট্র) খুব ধনীর মতো আচরণ করছি অথচ সারাবিশ্ব আমাদের কাছে বাণিজ্যের কারণে ৩ ট্রিলিয়ন ডলার পাবে।’ অর্থনীতিবিদ জন মেনার্ড কীনসের মতে, দুটি দেশের মধ্যে বাণিজ্যে ভারসাম্য না থাকলে তা ঘাটতিতে থাকা দেশটির অর্থনীতির জন্য মারাত্মক পরিণতিও বয়ে আনতে পারে।

বাংলাদেশের ক্ষেত্রে লেনদেনের ঘাটতি বেড়ে গেলে তাকে উদ্বেগজনকই মনে করেন বেশিরভাগ অর্থনীতিবিদ। বিশ্বব্যাংক সম্প্রতি বাংলাদেশের অর্থনীতির ওপর যে হালনাগাদ প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে তাতে লেনদেন ঘাটতিকে অন্যতম চ্যালেঞ্জ বলে মন্তব্য করেছে। কেননা এর প্রভাবে ইতোমধ্যে টাকার দর কমে গিয়ে আমদানি ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে। অনেক সময় বিনিয়োগজনিত কারণে আমদানি বেড়ে লেনেদেন ঘাটতি তৈরি হলে তাকে ইতিবাচক হিসেবে দেখা হয়। তবে বাংলাদেশে বিনিয়োগের কারণেই বেশি আমদানি হচ্ছে— তা বলা যাবে না। কারণ চাল সংকটের কারণে খাদ্য আমদানি বেড়ে গেছে। জ্বালানি তেলের দামও বাড়ছে। অন্যদিকে কর ফাঁকি বা অর্থ পাচারের জন্য মূলধনী যন্ত্রপাতির নামে অন্য কিছু আমদানি হচ্ছে কি না তা নিয়েও সন্দেহ রয়েছে। শুন্য শুল্ক বা কম শুল্কের আইটেমে অর্থ পাচারের আশঙ্কা থাকে। গবেষণা সংস্থা সিপিডি বিভিন্ন সময়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ও বাংলাদেশ ব্যাংকের পাশাপাশি গণমাধ্যমকেও এ বিষয়ে অনুসন্ধানের আহ্বান জানিয়েছে।

বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে ভালো হলো, রফতানি ও রেমিট্যান্স বাড়ুক। আবার বিনিয়োগ ও উৎপাদনকেন্দ্রিক আমদানিও বাড়ুক। তবে সামগ্রিক লেনদেন ভারসাম্যের উদ্বৃত্ত যদি বিদেশ থেকে ঋণ বেশি আসার কারণে হয়, তারও একটা ঝুঁকি আছে। সব মিলিয়ে বলা যায়, লেনদেনের ভারসাম্যে ঘাটতি বা উদ্বৃত্ত কতটুকু হলো তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো কোন কারণে এটি হচ্ছে।

লেখক: সাংবাদিক