শরৎ এল কাশের বনে, কাশফুলের প্রহর

জোহরা শিউলী:  কয়লার ট্রেনটা আসছে। ঝিক ঝিক ঝিক ঝিক। সেই সঙ্গে ভাইবোন অপু-দুর্গার ভোঁ দৌড়…

এটা একটা সিনেমার দৃশ্য। উর্বীর বাবা ছবিটা প্রায়ই দেখেন। নাম পথেরপাঁচালী। মাঝেমধ্যে মা-ও দেখেন। আর মুগ্ধ হন। ‘মানুষ এত সুন্দর একটা সিনেমা কীভাবে বানায়?’ মুগ্ধতার সঙ্গে বাবাকে এই প্রশ্নটাও করেন। মা-বাবা সিনেমা নিয়ে গল্প চালিয়ে যান। নয় বছরের ছোট্ট উর্বীর চোখ তখন টিভির পর্দায়।

‘বাবা, এই সাদা ঘাসগুলো কী? এত বড় বড়? আবার ফুলও আছে?’

‘হা হা হা।’ অট্টহাসি বাবার। ‘এটা ঘাস না রে। গাছ।’

‘কী গাছ, বাবা?’ উর্বীর চোখেমুখে উৎসাহ।

‘এটা হলো কাশফুল।’

‘ফল হয় এই গাছে?’

‘না রে মা। শুধু ফুলই হয়।’

‘আচ্ছা, এই গাছ কতগুলো কিনে নিয়ে আসতে পারো না বাবা, আমাদের বাসার টবের জন্য?’

‘না রে বোকা, এই গাছ টবে হয় না। এটা হয় নদীর ধারে।’

‘তবে গত রোজার ঈদে যে দাদাবাড়ি গেলাম, ব্রহ্মপুত্র নদের ধারে গেলাম, তখন তো দেখলাম না।’

‘এটা হয় শরৎকালে। ষড়্ঋতুর বাংলাদেশ পড়েছ না? বাংলা মাস ভাদ্র-আশ্বিন। এই দুই মাস শরত্কাল। তখন তুমি নদীর ধারে কিংবা একটু জলাশয় যেখানে বেশি, সেখানে কাশফুল দেখতে পাবে।’

বাবা কাশফুলের বর্ণনা দেন আর মনে মনে হারিয়ে যান শৈশবে। আহা! কী সুন্দর দিনই না ছিল। পূজার ছুটিতে মফস্বলের অলিগলিতে পূজা দেখে বেড়ানো, নদীর তীরে কাশফুলের মধ্যে কতই-না ছোটাছুটি। বন্ধুবান্ধব, কাজিনদের সঙ্গে হইহই-হুড়োহুড়ি। এমনকি সুযোগ পেলে নদীতে নেমে পানির মধ্যে গোসলের নামে লম্ফঝম্পও কম হতো না…

এদিকে উর্বী ছুটে গিয়ে তার ছোট ভাই আরিয়ানকে ডেকে নিয়ে আসে এমন সুন্দর একটা ফুলের গাছ দেখানোর জন্য। সিনেমায় অপু-দুর্গা হাত-ধরাধরি করে বিস্ময় নিয়ে ট্রেন দেখে। আর উর্বী-আরিয়ান দুই ভাইবোন দেখে ট্রেনের ধোঁয়া। ঝাঁকে ঝাঁকে কাশফুল।

‘বাবা, চলো না, এখন তো শরত্কাল; আমরা কাশফুল দেখে আসি।’ উর্বী বলে।

বাবাও ওদের কাশফুল দেখার বায়নাটা পূরণের উদ্যোগ নিলেন। ঠিক হলো, ওরা যাবে দাদাবাড়ি ময়মনসিংহে।

তিন দিনের ছুটি। কু ঝিক ঝিক ট্রেন চলল ময়মনসিংহ। সবুজে ঘেরা সর্পিল পথ পার হয়ে ট্রেন পৌঁছায় প্ল্যাটফর্মে। ট্রেন জার্নি কাবু করতে পারে না ওদের। হইহই-রইরই প্রতিটি বেলা। বিকেলে যথারীতি বাবার সঙ্গে উর্বীরা চলল ব্রহ্মপুত্রের পাড়ে। বর্ষা গেছে খুব বেশি দিন হয়নি। নদীতে থইথই পানি। এখানে ব্রহ্মপুত্রের পাড়ে জয়নুল গ্যালারি। সবুজ গাছ। খোলা মাঠে চলল ভাইবোনের দৌড়ঝাঁপ।

সবুজের মধ্যে একচিলতে পিচঢালা পথ। রিকশা ছাড়া নেই তেমন কোনো যানবাহন। বাবা তাই ভাইবোনকে দিয়ে দিলেন অপার স্বাধীনতা। আরিয়ান-উর্বী হাত-ধরাধরি করে ছুটল। ঢাকার জীবনে এমন দিন কি আর পাওয়া যায়! জয়নুল গ্যালারির সবুজে মাতামাতি শেষে ওরা নৌকায় উঠল। নদীর এই পার থেকে ওপারে যাওয়ার জন্যই নৌকায় ওঠা।

দূর থেকেই দেখতে পেল বাতাসে কাশফুলের কেঁপে কেঁপে ওঠা। বড় বড় চোখ করে দেখল উর্বী-আরিয়ান। একেকটা গাছ লম্বায় যেন মা-বাবার সমান। নৌকা থেকে নেমেই বাবার হাত ধরে কাশফুলের বাগানে ছুটল ওরা। কী সুন্দর!

এই সুযোগে মা কয়েকটা ডাল ছিঁড়ে নিলেন। মাকে এমন খুশি হতে ওরা আগে কখনো দেখেনি। মনে হয় মায়ের যেন বয়স কমে গেছে অনেক। বাবাও খুব খুশি। একঝাঁক কাশফুলের মধ্যে হঠাৎ বিরতি, মাঝখানে কিছু জায়গায় হালকা কাশফুল। সেই জায়গা পার হওয়ার পর আবার ঘন ঝোপে ভরা।

‘ওয়াও…আপু দেখো না কত্ত বড় বড় হাঁস!’ আনন্দে দিশেহারা সাত বছর বয়সী আরিয়ান। একটু দূরেই উর্বী দেখতে পেল হাঁসগুলোকে। তাই তো, হাঁস এত বড় হলো কী করে! পাশ থেকে বাবা বললেন, ‘এগুলো রাজহাঁস।’ ছোট্ট একটা জায়গায় পানি খাচ্ছিল হাঁসগুলো। আরিয়ান-উর্বীর আনন্দে দিশেহারা অবস্থা দেখে ওরা যেন একটু বাঁকা চোখে তাকাল।

দুষ্টু আরিয়ান হাঁসগুলোকে চমকে দেওয়ার জন্য দিল এক ছুট। তার পেছন পেছন উর্বী। কাশফুল পার হয়ে, লতাপাতা মাড়িয়ে দৌড়ে যায় দুজনে, দুহাত ধরে। ঠিক যেন পথেরপাঁচালীর অপু-দুর্গার মতো।