রোহিঙ্গাদের জন্য ভারতের ত্রাণ ও কূটনৈতিক তৎপরতা

নিউজ ডেস্ক:  রোহিঙ্গা শরণার্থীদের ঢল সামলাতে বাংলাদেশকে সাহায্য করতে বিপুল পরিমাণ ত্রাণসামগ্রী পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে ভারত। বৃহস্পতিবার বিকেলেই চাল-ডাল-নুন-চিনি ইত্যাদি রসদ বোঝাই করে ভারতীয় বিমান বাহিনীর একটি বিশেষ এয়ারক্র্যাফট চট্টগ্রামে উড়ে যাচ্ছে – এবং আগামী কয়েকিন ধরে এই ত্রাণ পাঠানোর প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকবে।

রোহিঙ্গা শরণার্থীদের জন্য এই ত্রাণ পাঠানোর অভিযানের নাম দেওয়া হয়েছে ‘অপারেশন ইনসানিয়ত’। হিন্দিতে ইনসানিয়ত শব্দের অর্থ হল মানবিকতা।

রোহিঙ্গা ইস্যুতে আগাগোড়া মিয়ানমার প্রশাসনকে সমর্থন করে এলেও বাংলাদেশের কূটনৈতিক চাপেই যে দিল্লি এই ত্রাণ পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে তা অবশ্য পরিষ্কার। মিয়ানমার থেকে আসা লক্ষ লক্ষ রোহিঙ্গার স্রোত বাংলাদেশকে যে কী প্রবল সঙ্কটে ফেলে দিয়েছে, গত সপ্তাহেই তা ভারতের পররাষ্ট্র সচিবকে জানিয়ে এসেছিলেন দিল্লিতে নিযুক্ত বাংলাদেশি রাষ্ট্রদূত সৈয়দ মোয়াজ্জেম আলি।

ঢাকায় নিযুক্ত ভারতীয় রাষ্ট্রদূত হর্ষবর্ধন শ্রিংলাকেও গত সোমবার দিল্লিতে ডেকে পাঠানো হয়। দুদিন ধরে দিল্লিতে সরকারকে রোহিঙ্গা পরিস্থিতি নিয়ে বিশদে ব্রিফ করার পর শ্রিংলাও বুধবার ঢাকায় ফিরে গেছেন – আর তারপরই ভারত সিদ্ধান্ত নিয়েছে এই সঙ্কটে হাত গুটিয়ে বসে না-থেকে তারা ত্রাণসামগ্রী পাঠাবে।

তবে এই ত্রাণ পাঠানোর অভিযান যে বাংলাদেশের বিপদে তাদের সাহায্য করতেই, সেটাও ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তাদের বিবৃতিতে স্পষ্ট করে দিয়েছে। তাতে বলা হয়েছে, দুই দেশের মানুষের মধ্যেকার নিবিড় বন্ধুত্বের সম্পর্কের পটভূমিতে বাংলাদেশের যে কোনও বিপদে ভারত চিরকালই সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছে এবং এবারেও তার কোনও ব্যতিক্রম হবে না। বাংলাদেশ সরকারের যে কোনও প্রয়োজনে ভারত যে সব সময় সাহায্যে প্রস্তুত, সে কথাও পরিষ্কার করে দিয়েছে।

সুতরাং অন্যভাবেও এই বিবৃতির ব্যাখ্যা করা যায় – যে এই ত্রাণসামগ্রী আসলে ঠিক রোহিঙ্গাদের সাহায্য করতে নয়, বাংলাদেশকে সাহায্য করতেই পাঠানো। বস্তুত বিবৃতিতে ভারত সরকার একবারও রোহিঙ্গা শব্দটি ব্যবহারই করেনি, মিয়ানমার থেকে আসা শরণার্থী বলেই তাদের অভিহিত করা হয়েছে। এর কারণ হল মিয়ানমার সরকার রোহিঙ্গা শব্দটি মোটেও পছন্দ করে না, তারা বাঙালি অভিবাসী বলেই তাদের উল্লেখ করে – আর তাদের অনুভূতিকে মর্যাদা দিয়ে ভারতও বহু বছর ধরে সরকারি বিবৃতিতে কখনও রোহিঙ্গা শব্দটি ব্যবহার করে না।

ফলে চট্টগ্রামে ভারত ত্রাণসামগ্রী পাঠাচ্ছে মানেই রোহিঙ্গা ইস্যুতে তাদের অবস্থান পুরোপুরি পাল্টে গেল বিষয়টাকে এভাবে দেখা মোটেও ঠিক হবে না। বরং রোহিঙ্গা সমস্যাকে কেন্দ্র করে ভারতীয় কূটনীতির সামনে যে উভয় সঙ্কট তৈরি হয়েছে, যে মিয়ানমার না বাংলাদেশ কোন বন্ধুপ্রতিম প্রতিবেশীর কথাকে তারা বেশি গুরুত্ব দেবে – এটা তার মধ্যে একটা ভারসাম্য বিধানের চেষ্টা (‘ব্যালান্সিং অ্যাক্ট’) বলেই পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন।

চট্টগ্রামে আজ ইন্ডিয়ান এয়ারফোর্সের যে বিশেষ বিমানে ত্রাণসামগ্রীর প্রথম কনসাইনমেন্ট উড়ে যাচ্ছে, তাতে থাকছে চাল, গম, দুতিনরকমের ডাল, রান্নার তেল, লবণ, চিনি, বিস্কুট, ইনস্ট্যান্ট নুডলসের প্যাকেট আর মশারি। ভারতীয় কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বাংলাদেশ যে ধরনের ত্রাণসামগ্রী চাইবে সেগুলোই পাঠানোর জন্য ব্যবস্থা নেওয়া হবে – আর এ জন্য দুদেশের কর্তৃপক্ষ নিজেদের মধ্যে নিয়মিত যোগাযোগও রেখে চলছেন।

বাংলাদেশে আসা লক্ষ লক্ষ রোহিঙ্গা শরণার্থীর জন্য এই ‘মানবিক ত্রাণ’ পাঠানোর মধ্যে দিয়ে ভারত তাদের রোহিঙ্গা নীতিকে একটা মানবিক চেহারা দেওয়ার চেষ্টা করছে কোনও সন্দেহ নেই – তবে মিয়ানমারের সঙ্গে সম্পর্কে তাতে যাতে কোনও বিরূপ প্রভাব না-পড়ে, দিল্লি সে ব্যাপারেও রীতিমতো সতর্ক থাকছে।