আর্থিক অন্তর্ভুক্তি বাড়াতে হলে চাই সামঞ্জস্যপূর্ণ নিয়ন্ত্রণ – ড. আতিউর রহমান

বিশেষ প্রতিবেদন : “মাত্রাতিরিক্ত ঋণ সরবরাহ ঠেকানো, সকল সেবাদাতাদের জন্য সমান সুযোগ সৃষ্টি এবং সর্বোপরি অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখার জন্য আর্থিক সেবা খাতকে নিয়ন্ত্রণ করা অবশ্যই দরকার। তবে অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করলে তা আর্থিক অন্তর্ভুক্তির প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে এবং ফল স্বরূপ পুরো অর্থনীতিই অস্থিতিশীল হয়ে পড়তে পারে।”

সম্প্রতি মালয়শিয়ার কুয়ালালামপুরে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর নেটওয়ার্ক এসইএসিইএন-এর আয়োজনে ওএমএফআইএফ পলিসি সামিটে মূল নিবন্ধ উপস্থাপনের সময় কথাগুলো বলেন বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. আতিউর রহমান। এসইএসিইএন-এর নির্বাহী পরিচালক ড. হ্যান্ড গেনবার্গের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই অধিবেশনে আরও বক্তব্য রাখেন অকল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ডেভিড মেয়েস। ড. আতিউর বলেন সর্বশেষ বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দার সময় উন্নত দেশগুলোতে আর্থিক সেবা খাতে দুর্বল নিয়ন্ত্রণের কারণে পুরো অর্থনীতিই বিপর্যয়ের মুখে পড়েছিলো।

অন্যদিকে একই সময়ে বাংলাদেশের মতো বেশ কিছু উন্নয়নশীল অর্থনীতির দেশে আর্থিক অন্তর্ভুক্তির এক নীরব বিপ্লব ঘটে গেছে।

ড. আতিউর আরও বলেন নিয়ন্ত্রণের সাথে আর্থিক অন্তর্ভুক্তির সম্পর্ক বৈরি নয়, বরং কার্যকর নিয়ন্ত্রণ করা গেলে তা আর্থিক অন্তর্ভুক্তির জন্য সহায়কই হয়। যেমন আফ্রিকায় কেনিয়া ও তানজানিয়াতে নিয়ন্ত্রক সংস্থার সুবিবেচনা প্রসূত সিদ্ধান্তের কারণে মোবাইল-ফোনভিত্তিক অর্থ স্থানান্তরের ক্ষেত্রে সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে ইতিবাচক প্রতিযোগিতার সৃষ্টি হয়েছে। অন্যদিকে ইন্দোনেশিয়ায় বৃহৎ প্রতিষ্ঠানগুলোকে ছোট সেবাদাতাদের তুলনায় বেশি সুবিধা দেয়ার ফলে সেখানে আর্থিক অন্তর্ভুক্তি বাঁধাগ্রস্থ পাঠানোর কৌশলের চেয়ে উন্নয়নশীল দেশগুলোর ‘গরুর গাড়ি’তে করে ধীরে ধীরে অল্প পরিমাণ টাকা পাঠানোর কৌশলকেই বেশি কার্যকর মনে হচ্ছে।

মোদ্দাকথা হচ্ছে ছোট-বড় সব অর্থনীতিতে আর্থিক খাত নিয়ন্ত্রণে একই নীতি বা কৌশল প্রয়োগ করা যাবে না। নিয়ন্ত্রণ করতে হবে সামঞ্জস্যপূর্ণ কৌশলে। নিয়ন্ত্রণকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে এমন নীতি তৈরি করতে হবে যাতে করে ঝুঁকির পরিমাণের সমানুপাতিকভাবে আর্থিক সেবা খাতের ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হয়। সর্বোপরি এটাও মনে রাখতে হবে শতকরা একশো ভাগ সঠিক হওয়া সম্ভব নয় কখনোই। যদি আমরা ভাবি যে কখনোই ব্যাংক ব্যবস্থার মাধ্যমে অর্থ পাচার বা সন্ত্রাসী অর্থায়নের মতো ঘটনা ঘটবে না তবে তা হবে বোকামী। বরং আমাদের উদ্দেশ্য হওয়া উচিৎ আর্থিক অন্তর্ভুক্তি যাতে বাঁধাগ্রস্ত না হয় সেদিকে খেয়াল রেখে অর্থ পাচার বা সন্ত্রাসী অর্থায়ন ঠেকানোর নীতিমালার কার্যকর বাস্তবায়ন। পাশাপাশি আর্থিক সেবা খাত নিয়ন্ত্রণ ও তদারকির ক্ষেত্রে সর্বাধুনিক প্রযুক্তির সর্বোচ্চ কার্যকর প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে।

ড. আতিউর আরও বলেন নিত্য নতুন প্রযুক্তির উদ্ভব ও ব্যাপকভিত্তিক ব্যবহারের ফলে যেসব চ্যালেঞ্জ তৈরি হচ্ছে সেগুলো মোকাবিলা করার জন্য প্রয়োজনীয় মানব সম্পদ উন্নয়নের বিষয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোকে বিশেষ মনযোগ দিতে হবে। সবশেষে তিনি বলেন ব্যাংকিং খাতের জন্য মানব সম্পদ উন্নয়নের প্রক্রিয়াটিকে যথা সম্ভব মানবিক হতে হবে। তাহলে আর্থিক সেবার বাইরে থাকা প্রান্তিক জনগোষ্ঠির আর্থিক অন্তর্ভুক্তির বিষয়ে ব্যাংক কর্মকর্তারা ইতিবাচক মনোভাব পোষণ করবেন।