লোকসান ঘুচিয়ে মুনাফার ধারায় খালিশপুর জুট মিল

নিউজ ডেস্ক: সরকারি কারখানা মানেই লোকসানি প্রতিষ্ঠান— এ আপ্তবাক্যকে ভুল প্রমাণ করেছে খুলনার খালিশপুর জুট মিলস লিমিটেড। সাম্প্রতিক মাস গুলোয় পাটকলটি প্রায় ৩ কোটি টাকার পুঞ্জীভূত লোকসান কাটিয়ে লাভের মুখ দেখেছে। গত অর্থবছরের শেষ দুই মাসে প্রতিষ্ঠানটির মুনাফা হয়েছে মোট দেড় লাখ টাকা। শ্রমিকদের নিরলস পরিশ্রম, বর্তমান প্রকল্পপ্রধানের দক্ষ ব্যবস্থাপনা ও সর্বস্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আন্তরিক প্রচেষ্টায় এ দিনবদলের সূচনা হয়েছে বলে মিল কর্তৃপক্ষের দাবি।

শুধু লোকসান কাটিয়ে মুনাফার ধারায় প্রত্যাবর্তনই নয়, বরং উৎপাদন বৃদ্ধিতেও সাফল্য দেখিয়েছে খালিশপুর জুট মিল। সংশ্লিষ্ট উপাত্ত অনুযায়ী, কিছুদিন আগেও পাটকলটির দৈনিক উৎপাদনের পরিমাণ ছিল ২৫-২৬ টন। অথচ বর্তমানে মিলটিতে উৎপাদন হচ্ছে ৩৬-৩৮ টন পাটজাত পণ্য। প্রায় ৪০ শতাংশ উৎপাদন বৃদ্ধির সুবাদে আগের প্রায় ৩ কোটি টাকা লোকসান ঘুচিয়ে প্রতিষ্ঠানটি এখন লাভের মুখ দেখছে। গত মে মাসে মিলটির মুনাফা ছিল ৫০ হাজার টাকা। জুনে মুনাফার আকার দ্বিগুণ হয়ে দাঁড়ায় ১ লাখ টাকা।

১৯৫২ সালে খুলনার খালিশপুরে ভৈরব নদের তীরে ৭০ দশমিক ৩০ একর জমিতে প্রতিষ্ঠিত হয় পিপলস জুট মিলস লিমিটেড। এর দুই বছর পর ১৯৫৪ সালে মিলটি বাণিজ্যিক উৎপাদনে যায়। ১৯৭২ সালে মিলটি বাংলাদেশ পাটকল করপোরেশনের (বিজেএমসি) আওতায় আসে। ২০০৭ সালের ৩১ জুলাই প্রায় ১৪৪ কোটি টাকা দেনার দায়ে তত্কালীন সরকার পিপলস জুট মিলস বন্ধ ঘোষণা করে ও পুনরায় বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে মিলটি চালুর উদ্যোগ নেয়।

এক বছরের মাথায় ২০০৮ সালের ৭ জুলাই বেসরকারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স কাজী ফার্মস মিলটি লিজ নিয়ে উৎপাদন শুরু করে। তবে লোকসানের কারণে ২০০৯ সালের ৩০ ডিসেম্বর মিলটি পুনরায় বিজেএমসির কাছে হস্তান্তর করে তারা। ২০১০ সালের জুলাইয়ে তত্কালীন সরকার খালিশপুর জুট মিলস লিমিটেড নামে কারখানাটি পুনরায় চালুর উদ্যোগ নেয়। ওই বছরের ৩০ সেপ্টেম্বর এটি পরীক্ষামূলক উৎপাদনে যায়। ২০১১ সালের ৫ মার্চ আনুষ্ঠানিকভাবে মিলের উৎপাদন কার্যক্রম উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

২০১২-১৩ অর্থবছরে খালিশপুর জুট মিল থেকে প্রায় ১০৪ কোটি টাকা মূল্যের ১৩ হাজার ৩১৯ টন পাটজাত পণ্য বিভিন্ন দেশে রফতানি করা হয়। এছাড়া ২০১৩-১৪, ২০১৪-১৫, ২০১৫-১৬ ও ২০১৬-১৭ অর্থবছরে পাটজাত পণ্য রফতানির মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটির আয় হয় যথাক্রমে ৬৯ কোটি ৯৪ লাখ, ৯৯ কোটি ৩৩ লাখ, ৯৯ কোটি ৫৫ লাখ ও ৭৮ কোটি ২৫ লাখ টাকা।

গত এক বছরে খালিশপুর জুট মিলের পরিচালনা ব্যবস্থাও আগের চেয়ে অনেক উন্নত হয়েছে। মিলের বর্তমান প্রকল্পপ্রধান খুচরা যন্ত্রাংশ সরবরাহকারীদের সিন্ডিকেট ভেঙে দিয়েছেন। বর্তমানে মিলের যন্ত্রাংশ কেনা হচ্ছে ওপেন টেন্ডারের মাধ্যমে। ফলে যন্ত্রাংশ কেনা থেকে শুরু করে স্কিন প্রিন্টিং, তুষ কেনা— সবকিছুতেই প্রতিষ্ঠানটির খরচ অনেকাংশে কমে গেছে।

খালিশপুর জুট মিল সিবিএর ভারপ্রাপ্ত সভাপতি চৌধুরী মিজানুর রহমান মানিক জানান, বর্তমান প্রকল্পপ্রধান ড. মাহবুব রশিদ জুলফিকার গত বছরের ২৭ আগস্ট কাজে যোগ দেন। এরপর থেকেই তিনি সিবিএ ও নন-সিবিএ নেতা এবং সাধারণ শ্রমিকদের সঙ্গে নিয়ে উৎপাদন বৃদ্ধির মাধ্যমে মিলটিকে বিজেএমসির আওতাধীন মডেল পাটকল হিসেবে প্রতিষ্ঠার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।

প্রতিষ্ঠানটির ম্যানেজার (প্রশাসন) মোস্তফা কামাল আহমেদ বলেন, মিলের কার্যক্রমে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা হয়েছে। আগের অনিয়মগুলো দূর করার চেষ্টা চালানো হচ্ছে। দুর্নীতি ও অনিয়ম না হলে কোনো প্রতিষ্ঠানই যে অলাভজনক থাকে না, খালিশপুর জুট মিলই তার যথার্থ প্রমাণ।