বাঙ্গলি জাতি আজ কত টুকু কলঙ্ক মুক্ত

ফখরুল আলম: আর মাত্র কয়দিন পরই চলে আসবে আগষ্ট মাস। বাঙালি জাতির শোকের মাস। বাঙ্গালি জাতি কি আজও কলঙ্ক মুক্ত হলো ? না কি কলঙ্ক মুক্ত করার নামে শ্লোগানই শুনবো চিরকাল। আদৌ কি বাংলাদেশ সেই কলঙ্ক মুক্ত হবে তা এখন জানতে চায় দেশ বিদেশের সচেতন মহল। ৪২ বছর আগে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগষ্ট ধানমন্ডির ৩২ নাম্বারে বঙ্গবন্ধুর বাসভবনে ঘটে এক বীভৎস ঘটনা। কিছু সেনা বাহিনীর কর্মকর্তাদের হাতে স্ব-পরিবারে প্রাণ দিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুুজিবুর রহমান।

এই নৃশংস ঘটনায় ওই দিন যারা আরো প্রাণ হারিয়েছেন তারা হলেন- বঙ্গবন্ধু শেখ মুুজিবুর রহমান এর সহধর্মিনী বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব, পুত্র শেখ কামাল, শেখ জামাল, শেখ রাসেল, পুত্রবধু সুলতানা কামাল, রোজী জামাল, ভাই শেখ নাসের ও কর্নেল জামিল। ভাগ্নে বীর মুক্তিযোদ্ধা শেখ ফজলুল হক মনি, তার অন্তঃসত্বা স্ত্রী আরজু মনি, ভগ্নিপতি আবদুর রব, শিশু বাবু, আরিফ, রিন্টু খাঁন সহ আরো অনেক। শুধু প্রাণে বেঁচে গেলেন দেশে না থাকায় বঙ্গবন্ধুর জ্যেষ্ঠ কন্যা আজকের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও কনিষ্ঠ কন্যা শেখ রেহানা। সে দিনের এই ঘটনাটি বাঙ্গালি জাতির জন্য সত্যিই কলঙ্কজনক ঘটনা। সমগ্র বিশ্ববাসী এ ঘটনার জন্যে আজো কাঁদে।

১৯৭৫ সালের এ হত্যাকান্ড ছিল মূলতঃ একটি রাজনৈতিক হত্যাকান্ড। হয়তো কোন রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের জন্য দেশী বিদেশী কোন একটি চক্র বা গোষ্ঠি এটি করিয়ে ছিল সেনা বাহিনীর এসব কর্মকর্তাদের কাজে লাগিয়ে। সুদীর্ঘ ৩৫ বছর পর ১২ সেনা কর্মকর্তাকে ফাঁসির আদেশ দেয় উচ্চ আদালত। আর এরই মধ্যে ৫ জনকে ফাঁসি দিয়ে বাঙ্গালি জাতি কলঙ্কের কালিমা মোচন করতে যাচ্ছিল। ২০১০ সালে ২৭ জানুয়ারী সেই হত্যাকান্ডের দায়ে মেজর (অব.) বজলুল হুদা, লে. কর্নেল (অব.) মহিউদ্দিন আহমেদ (আর্টিলারি), কর্নেল(অব.) সৈয়দ ফারুক রহমান, লে. কর্নেল (অব.) সুলতান শাহরিয়ার রশীদ খাঁন, মেজর (অব.) একেএম মহিউদ্দিন আহমেদ (ল্যান্সার) এদেরকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদন্ড দেয়া হয়।

আত্মস্বীকৃত খুনিদেরকে আদালত রায় দিয়েছিল মৃত্যুদন্ড। এমন তো রায় ছিল না যে মৃত্যুর পর ও তাদের দেহটাকে শাস্তি দিতে হবে। তারা ও তো ছিল স্বাধীন দেশের স্বাধীন নাগরিক। তা ছাড়া তারা ছিল মুক্তিযোদ্ধা। মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে রাষ্ট্রীয় মর্যাদা না পেলে কি হবে। তারা ওই দিন পেয়েছিল আওয়ামীলীগের দেয়া জুতা মারার মর্যাদা। আওয়ামীলীগের নেতাকর্মীরা ওইদিন তাদের লাশের কফিনে কফিনে জুতা আর জুতা দিয়ে ঢেকে রেখেছিল। একটা সভ্য দেশের সভ্য জাতি হিসেবে এটা করতে পারে ভাবতে ও অনেকের কাছে অবাক লাগে।

আমাদের নবী হযরত মোহাম্মদ (সা.) বলেছেন- লাশের উপর কোন রকম জুলম, নির্যাতন না করতে। এমন কি লাশ ধীরে ধীরে বহন করতে। মৃত ব্যাক্তি যেন কষ্ট না পায়। আমাদের নবী করিম (সাঃ) লাশ দেখলে দাড়িয়ে যেতেন । কিন্তু ওই দিন দেখা গেল আওয়ামীলীগের নেতা কর্মীরা রাস্তায় রাস্তায় দাড়িয়ে নিহতদের কফিনে ছুড়ে মারছে জুতা। সেই দিনের বেশ কয়েকটি পত্রিকার শিরোনাম ছিল- জুতায় জুতায় ঢাকা ছিল খুনিদের কফিন।

নিহতদের স্বজনরা যখন কফিন খোলেন তখন দেখতে পান জুতা আর জুতা। অথচ তারা প্রত্যেকই ছিল এক একটি শিক্ষিত সেনা কর্মকর্তা, মুক্তিযোদ্ধা। মেজর(অব.) বজলুল হুদা ২ নম্বর সেক্টর ওকে ফোর্স, লে. কর্নেল (অব.) সুলতান শাহরিয়ার রশীদ খাঁন ৬ নম্বর সেক্টরে যোদ্ধ করেছিলেন। কর্নেল(অব.) সৈয়দ ফারুক রহমান ছিলেন মুক্তিযোদ্ধের সর্বাধিনায়ক এমএজি ওসমানীর সহকারী।

কর্নেল ফারুক রহমানের শেষ কথা ছিল-‘অন্যায় করিনি যা করেছি দেশের জন্যই করেছি’। কারাগারে শেষ দেখার সময় তার মা মাহমুদা রহমান কে বলে গেছেন- ‘মা আমার জন্য কাঁদবেন না। আমি দেশ প্রেমিক ছিলাম’। যদি তাই হয় তারা সে দিন যা করেছিল দেশের জন্য করেছিল। আর সত্যিকার অর্থে যদি তারা দেশপ্রেমিক হয়ে থাকে তবে তারা যেন বেহেস্ত বাসী হন। হয়তো সে সময়কার পরিস্থিতি বাধ্য করেছিল অথবা দেশের কোন মঙ্গলের জন্যই বা এই পরিস্থিতি হয়েছিল।

তবে কেন এ রকম ভাবে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগষ্ট এ হত্যাকান্ডটি ঘটে। সাধারণ জনগনকে বিযয়টি এখন ও ভাবিয়ে তোলে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন লন্ডন প্রবাসী আওয়ামীলীগের কর্মী বলেন ১৫ই আগষ্ট যে হত্যাকান্ড ঘটেছিল সেটি হয়তো কোন ভাল কাজের জন্যই হয়েছিল। যারা এ ঘটনা করেছিলেন তারা তো আর বোকা কিংবা মূর্খ কোন লোক জন ছিলেন না। তারা ছিলেন দেশের তখনকার সচেতন এবং দায়িত্বশীল লোকজন। হয়তো তখন দেশ পরিচালনায় একেবারেই ব্যর্থ ছিলেন তারা। পাশাপাশি তারা ক্ষমতায় থাকলে দেশ এবং জাতির আরো ক্ষতি হতো। আজ দেশ যতটুকু এগিয়ে আসছে তা হয়তো সে টুকুও আর সম্ভব ছিল না।

বঙ্গবন্ধুর হত্যাকান্ডের ১২ খুনির ৫ জনের ফাঁসি হয়েছে। আরো বাকী ৭ জন এর মধ্যে কর্নেল (অব.) আজিজ পাশা জিম্বাবুয়েতে অবস্থানকালে ২০০১ সালে ইন্তেকাল করেন। ফাঁসি রায় হওয়ার প্রায় ৫ বছর পূর্বেই তিনি মারা যান। কিন্তু তাতে কি, ওই দিন আজিজ পাশার গ্রামের বাড়ীতেও আওয়ামীলীগের নেতাকর্মীরা হামলা চালায়। পুলিশের উপস্থিতিতেই চলে ভাংচুর, লুটপাট ও বসত ঘরে অগ্নিসংযোগ। বাকী ৬ খুনি এখনো পলাতক। তারা হলো- লে. কর্নেল (অব.) খন্দকার আব্দুর রশিদ, লে.কর্নেল (অব.) শরিফুল হক ডালিম, লে. কর্নেল রাশেদ চৌধূরী, মেজর (অব.) নূর চৌধূরী, ক্যাপ্টেন (অব.) আবদুল মাজেদ ও রিসালদার মোসলেম উদ্দিন।

যারা দেশের বাহিরে অবস্থান করেছেন তাদেরকে কি আদৌ সম্ভব হবে দেশে ফিরিয়ে এনে ফাঁসি দেয়া? তা ছাড়া যুদ্ধাপরাধীরা তো অনেকই রয়েই গেছেন। না কি আবার আওয়ামীলীগ ক্ষমতায় এসে যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁিস দিয়ে পুনরায় জাতিকে কলঙ্ক মুক্ত করবে!!! না কি কলঙ্ক মুক্ত করার নামে আবার ক্ষমতায় যাওয়ার স্বপ্ন রাজনৈতিক দল গুলোর। তা হলে তো বি এন পি ও আবার ক্ষমতায় গেলে বলবে মরহুম প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান হত্যাকান্ডের বিচার করে খুনিদের ফাঁসি দিয়ে জাতি কে কলঙ্ক মুক্ত করতে হবে। এভাবে কি বাঙ্গালি জাতিকে বার বার ধোকা দিয়ে কলঙ্ক মুক্ত করে যাবে ওরা। ভাবতে ও অবাক লাগে যে দেশের মানুষ না খেয়ে মরছে, দরিদ্র সীমার নিচে পড়ে হাবু ডুবু খাচ্ছে সাধারণ মানুষ, সে দেশের নেতাকর্মীরা কলঙ্কের কালিমা মোচনে ব্যস্থ রয়েছেন সবাই।

তবে তাদেরকে বলবো এখনো সময় আছে আগে দেশ বাচাঁন, এবং দেশের মানুষের পাশে দাঁড়ান, ১৬ কোটি দেশের মানুষকে বাচাঁন। প্রতিহিংসার রাজনীতি থেকে সরে দাঁড়ান।বাঙালি জাতিকে কলঙ্ক মুক্ত করার নামে আর নয় রাজনীতি। বন্ধ করুন হত্যা, খুন, গুম সহ সন্ত্রাসী সকল কার্যক্রম। সময় এসেছে সবাই মিলে দেশ গড়ার। আসুন সকল দ্বিধাদ্বন্ধ ভুলে গিয়ে সবাই মিলে মিশে দেশটা কে এগিয়ে নিয়ে যাই।