নজিরবিহীন জলজটে নাকাল ঢাকাবাসী

নিউজ ডেস্ক:  টানা বৃষ্টিতে নজিরবিহীন ভোগান্তিতে পড়েছে রাজধানীবাসী। গতকাল প্রধান প্রধান সড়ক থেকে অলিগলি, সবই ডুবে যায় পানিতে। কোথাও হাঁটু কিংবা কোমর পানি, আবার কোথাও বুকপানি। জলজটের কারণে যানবাহন চলাচল প্রায় বন্ধ হয় যায়। গণপরিবহন ছিল না বললেই চলে। অনেক জায়গায় রিকশাও পাওয়া যায়নি। কোথাও পাওয়া গেলে ভাড়া দিতে হয়েছে কয়েকগুণ বেশি। এ যেনো দুঃসহ এক নগরজীবন।

প্রতিবছর বর্ষাকাল এলেই এমন নরকযন্ত্রণায় পড়তে হয় ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের বাসিন্দাদের। তবে দায়িত্বে থাকা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও সেবা সংস্থার এ নিয়ে যেন কোন মাথাব্যথা নেই। প্রকল্প নেওয়া হয়, অর্থও বরাদ্দ হয়। তবে কাজের কাজ কিছুই হয় না।

এদিকে রাজধানীর অনেক সড়কে চলমান উন্নয়ন কাজের কারণে খোঁড়াখুড়ি করা হয়েছে। সেসব সড়কে লেজেগোবরে অবস্থা। স্বাভাবিকভাকে পানি মাড়িয়ে হাঁটার অবস্থাও নেই। আর গর্ত থাকায় একাধিক সড়কে ঘটেছে দুর্ঘটনা। অনেক এলাকায় নৌকা চলেছে। রূপনগরের তুরাগ, উত্তরা ১৩ ও ১৪ নম্বর, বাড্ডা সাতারকুল, বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা, মুগদা, মান্ডা ও মেরাদিয়ায় রাস্তা পারাপারে মানুষ নৌকা ব্যবহার করেছে। বেশি ভোগান্তিতে পড়েছে অফিস ও স্কুল-কলেজগামীরা। এদিকে প্রায় হাঁটু পানি জমে যায় প্রশাসনের প্রাণকেন্দ্র সচিবালয়ের ভেতরেও। এক ভবন থেকে আরেক ভবনে যাওয়ার উপায়ও ছিল না। একদিকে ডুবে থাকা রাজপথ, অন্যদিকে ঘন্টার পর ঘন্টা ঠায় দাঁড়িয়ে থাকা যানবাহনের দীর্ঘ সারি- দুইয়ে মিলে রাজধানী হয়ে উঠে অচল নগরী।

রাজধানীর ব্যস্ততম মতিঝিলের অফিসপাড়ার অবস্থাও ছিল করুণ। পানি ভেঙে, আবার কখনো হেঁটে, কখনো গাড়িতে করে যেতে হয়েছে অফিসগামীদের। তার ওপর বেশির ভাগ ফুটপাত কেটে রাখায় হাঁটারও উপায়ও ছিল না। জলাবদ্ধতার কারণে বহুমুখী ভোগান্তির শিকার হন নগরবাসী।

সরেজমিনে মানিক মিয়া এভিনিউয়েও গিয়ে দেখা যায়, পানি থৈ থৈ করছে। ধানমন্ডি ১৬ নম্বরে (পুরনো ২৭ নম্বর) কোমর পানি। ইঞ্জিনে পানি ঢুকে যাওয়ায় রাস্তায় বন্ধ হয়ে পড়ে আছে সিএনজিচালিত অটোরিকশা, প্রাইভেট কার।

মঙ্গলবার রাতে বেশি না হলেও বুধবার সকাল থেকে অবিরাম বৃষ্টিতে রাস্তায় পানি জমতে শুরু করে। নগরীর প্রধান সড়কের মধ্যে মানিক মিয়া এভিনিউ, ধানমন্ডি ১৬ নম্বর থেকে শুরু করে শান্তিনগর, সেগুনবাগিচা, সচিবালয়, পুরান ঢাকার বেশিরভাগ এলাকা চলে যায় পানির নিচে। ফার্মগেট থেকে কাওরান বাজার পর্যন্ত পানি জমে থাকায় এই এলাকায় সকালের দিকে গাড়ি ধীরে ধীরে এগুতে পারলেও বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে থমকে যায়।

রাজধানীতে দুই সিটি করপোরেশনের আওতাধীন খোলা ড্রেনগুলো ময়লা-আবর্জনায় ভরাট হয়ে গেছে। দীর্ঘদিন ধরে পরিষ্কার না করায় সেগুলো পানি নিষ্কাশনের পথ বন্ধ করে দিয়েছে। তাই সামান্য বৃষ্টি হলেই রাজধানীর রাস্তাঘাট ও অলিগলিতে পানি জমে যায়। তুলনামূলক উঁচু এলাকাগুলো থেকে ধীরে ধীরে একটা পর্যায়ে পানি নেমে গেলেও ভারি বৃষ্টি হলে নিচু এলাকাগুলোতে জলাবদ্ধতা স্থায়ী রূপ নেয়। অথচ পানি নিষ্কাশনের দায়িত্বে থাকা ঢাকা ওয়াসা হাত গুটিয়ে বসে আছে। দখল-দূষণে একাকার হয়ে আছে ছোট-বড় ২৬টি খাল।

সংস্থাটির বিশাল জনবল রয়েছে ড্রেনেজ (রক্ষণাবেক্ষণ-মেরামত) বিভাগে। বৃষ্টির পর রাস্তায় পানি-কাদায় নগরবাসী হাবুডুবু খেলেও ওয়াসার এই বিভাগ কয়েক বছর ধরে সম্পূর্ণ বেকার অবস্থায় রয়েছে। এখন তারা অর্পিত দায়িত্ব ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ওপর ছেড়ে দিতে মরিয়া।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রাজধানীর জলাবদ্ধতা সমস্যা সমাধানে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও সেবা সংস্থার কাজের সমন্বয় করতে হবে। এসব কাজে জনগণের সম্পৃক্ততা ও সচেতনতা বাড়াতে হবে। এছাড়া দখল হয়ে যাওয়া খাল উদ্ধারের উদ্যোগ নিতে হবে। সমপ্রতি ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন ২৩টি খাল উদ্ধারের উদ্যোগ নিলেও তা পিছিয়ে যাচ্ছে। এজন্য অপরিকল্পিত নগরায়ণের পাশাপাশি সরকারি বিভিন্ন সংস্থার সমন্বয়হীনতাকে দায়ী করছেন নগর পরিকল্পনাবিদরা।