• গোপালগঞ্জে হিরু হত্যা মামলায় ৫ জনের ফাঁসি
25 May 2017 8:11 pm
Logo

প্রচ্ছদ »  প্রথম অস্থায়ী রাজধানী ও দুই যুবকের গল্প

ঢাকানিউজ24 ডেস্ক | আপডেট: 4:46 May 2, 2017

প্রথম অস্থায়ী রাজধানী ও দুই যুবকের গল্প

প্রথম অস্থায়ী রাজধানী ও দুই যুবকের গল্প

সোহরাব হাসান:  রংপুর, ঠাকুরগাঁও, নীলফামারীর গা ঘেঁষে আছে যে জেলাটি, তার নাম লালমনিরহাট। একসময় এখানে প্রচুর লাল পাথর পাওয়া যেত। সে কারণে জেলার নাম লালমনিরহাট। জেলা শহরটির ঠিক মাঝখানে মোগলহাট রেলগেট। ব্রিটিশ আমলে এটি ছিল রেলের বিভাগীয় সদর দপ্তর। রেল বিভাগের বহু স্থাপনা ও জমি রয়েছে, যার অনেকাংশ এখন প্রায় পরিত্যক্ত।

১০০ কিলোমিটার দূরত্বে বুড়িমারী স্থলবন্দর। লালমনিরহাটবাসীর দাবি, জেলা সদর থেকে মাত্র আট কিলোমিটার দূরের মোগলহাটে আরেকটি স্থলবন্দর নির্মাণ করা হোক। লালমনিরহাটে বিমানবাহিনীরও প্রচুর জমি আছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালে এখানে বিমানঘাঁটি স্থাপন করা হয়েছিল। বর্তমানে একটি প্রশিক্ষণকেন্দ্র আছে। বিমানবাহিনীর জায়গায় এডুকেশন ভিলেজ করার প্রস্তাব রয়েছে।

লালমনিরহাট উন্নয়ন আন্দোলন পরিষদ জেলায় একটি কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, বগুড়া-সিরাজগঞ্জ ছয় কিলোমিটার রেলসংযোগ, মোগলহাট পরিত্যক্ত রেলপথ চালু, এম টি হোসেন ইনস্টিটিউটকে টাউন হলে রূপান্তর, রেললাইনের ওপর উড়ালসেতু নির্মাণ ও একটি অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার দাবি জানিয়েছে। পঞ্চগড় ও লালমনিরহাট থেকে গিয়ে অনেকে ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ ও গাজীপুরের বিভিন্ন কারখানায় কাজ করেন। ওই অঞ্চলে শিল্পকারখানা হলে তাঁদের ঘরবাড়ি ছেড়ে ‘পরবাস’ বেছে নিতে হতো না। এই লালমনিরহাটেই ইতিহাসখ্যাত নূরলদীনের জন্ম।

ফেরার পথে ঠাকুরগাঁওয়ের পরিবেশক মোহাম্মদ নূরে আলমের সঙ্গে আলাপ হলো। তাঁর এক ছেলে ও দুই মেয়ে। বড় মেয়ে স্নাতক পাস করেছেন। বাবাকে সহায়তা করতে প্রতিদিন দোকানে আসেন। যতক্ষণ হকার আসেন, ততক্ষণ তিনিও থাকেন। লালমনিরহাটের আরেক পরিবেশক সাজিদ আলম। পাকিস্তান আমল থেকে তাঁরা পত্রিকার সঙ্গে যুক্ত। বাবা হকার ছিলেন। বাবার পর ছেলে হকারি করতেন। সেই সাজিদ এখন প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী।

লালমনিরহাটের একটি জায়গায় দেখলাম পাশাপাশি মসজিদ ও মন্দির। দুই সম্প্রদায়ের মানুষ আসেন, যাঁর যাঁর ধর্মালয়ে ইবাদত ও উপাসনা করেন। কোনো ঝগড়া নেই, বিরোধ নেই। মসজিদের ইমাম ও মন্দিরের পুরোহিতের মধ্যেও বন্ধুত্ব আছে বলে জানান সাজিদ। এটাই সত্যিকার বাংলাদেশ।

তুলনায় দক্ষিণের চুয়াডাঙ্গা অর্থনৈতিকভাবে অগ্রসর, কিন্তু স্থানীয় নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা মনে করেন, সরকার তাঁদের প্রতি সুনজর দিচ্ছে না। শহরটি মাথাভাঙ্গা নদীর তীরে অবস্থিত। মাথাভাঙ্গা নামে একটি জনপ্রিয় আঞ্চলিক দৈনিক পত্রিকাও আছে।চুয়াডাঙ্গায় তুলাকল, চিনিকল, বরফকল, ওয়েল্ডিং কারখানাসহ বেশ কিছু শিল্পকারখানা আছে।

উত্তর জনপদের জীবন শান্ত ও নিরিবিলি। রাস্তাঘাট, দোকানপাট বেশ পরিচ্ছন্ন। কিন্তু ঈশ্বরদী হয়ে পদ্মা পার হতেই রাস্তাঘাট ও দোকানপাটে কেমন যেন মালিন্য।

চুয়াডাঙ্গায় পাঠকের মুখোমুখি অনুষ্ঠানে প্রায় সব বক্তা চুয়াডাঙ্গাকে বাংলাদেশের প্রথম অস্থায়ী রাজধানী ঘোষণা করা হলেও এর আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি নেই বলে আক্ষেপ করলেন। তাঁরা বললেন, বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ নিজে দেখে গেছেন, ২৫ মার্চের পর এখানকার মানুষ কীভাবে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছেন। ১০ এপ্রিল এখানেই বাংলাদেশ সরকারের কাজ শুরু হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু খবরটা বিদেশি গণমাধ্যমে প্রচারিত হওয়ায় পাকিস্তানি সেনারা চুয়াডাঙ্গা আক্রমণ করে এবং শপথ অনুষ্ঠানটি মেহেরপুরের বৈদ্যনাথতলায় স্থানান্তর করা হয়, যা আজ মুজিবনগর নামে পরিচিত।

চুয়াডাঙ্গাবাসীর আফসোস, জেলা শহর হওয়া সত্ত্বেও এখানে একটি মানসম্মত মিলনায়তন নেই। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে চুয়াডাঙ্গার প্রস্তাবিত মিলনায়তনটি দর্শনায় নিয়ে যান দায়িত্বপ্রাপ্ত উপদেষ্টা। শ্রীমন্ত টাউন হল নামে যে মিলনায়তনে প্রথম আলোর অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়, সেটি প্রায় জরাজীর্ণ। চুয়াডাঙ্গার একমাত্র মিলনায়তন।

আলোচনায় চুয়াডাঙ্গা সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ মো. কামরুজ্জামান ঘোড়সওয়ার কিশোরীকে নিয়ে প্রথম আলোর উদ্যোগের প্রশংসা করে বলেন, সমাজের পিছিয়ে পড়া মানুষদের এভাবে এগিয়ে নিতে হবে। সাবেক অধ্যক্ষ মো. সিদ্দিকুর রহমানের মতে, দেশের উন্নয়নে সবচেয়ে বড় বাধা দুর্নীতি। তাঁর ধারণা, প্রথম আলো শক্ত ভূমিকা নিলে দেশে দুর্নীতি থাকবে না। মুক্তিযোদ্ধা সিরাজুল ইসলাম মুক্তিযুদ্ধে চুয়াডাঙ্গাবাসীর অবদানের স্বীকৃতি আদায়ে প্রথম আলোকে পাশে চাইলেন।

সরকারি কৌঁসুলি (পিপি) মহ. শামসুজ্জোহা একটি পেশাগত সমস্যা তুলে ধরলেন। জানালেন, একজন পিপির সম্মানী দৈনিক মাত্র ২৫০ টাকা। এই টাকা দিয়ে একজন মানুষ কীভাবে চলেন? জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি মো. নুরুল ইসলাম প্রথম আলোর বিশেষ সংখ্যায় মফস্বলের জনজীবন তুলে ধরার দাবি জানালেন।

উদীচী চুয়াডাঙ্গার সভাপতি নওশের আলী বললেন, রাজনীতির সুষ্ঠু ধারা ফিরিয়ে আনতে প্রথম আলো উদ্যোগী ভূমিকা নিতে পারে। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র রুবেল হোসেনের দাবি, কৃষিপ্রযুক্তি ও নতুন জাতের বীজ নিয়ে প্রথম আলোয় আরও প্রতিবেদন ছাপা হোক। কলেজশিক্ষক এমরান আল আমিনের আশা, ভবিষ্যতে এমন স্লোগান নিয়ে প্রথম আলো হাজির হবে, যাতে পুরো বাংলাদেশের চিত্র বদলে যাবে।

তিন জেলায় পাঠকের মুখোমুখি আয়োজনে অনেকের সঙ্গে আলাপ হয়েছে। অনেক জীবনের গল্প শুনেছি, কিন্তু সব গল্প তো এখানে জায়গা দেওয়া সম্ভব নয়। তবু দুজন উদ্যমী মানুষের কথা তুলে ধরছি।

লালমনিরহাটের মাহবুবকে নিয়ে আমি বছর দুই আগে লিখেছিলাম। শারীরিক প্রতিবন্ধিতা সত্ত্বেও তিনি স্নাতক পাস করেছেন। লালমনিরহাটের একটি সরকারি প্রতিষ্ঠানে পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলেও অজ্ঞাত কারণে তাঁকে চাকরি দেওয়া হয়নি। প্রথম আলোয় লেখালেখি হলে একাধিক বেসরকারি সংস্থা তাঁকে চাকরি দিতে চেয়েছিল। কেউ কেউ আর্থিক সহায়তার কথাও বলেছেন।

কিন্তু তাঁরা সেই কাজটি করতে চেয়েছেন তাঁকে নিয়ে সংবাদ সম্মেলন করে সবাইকে জানান দিয়ে। কিন্তু মাহবুব রাজি হননি। তিনি মনে করেছেন, ওরা তাঁর প্রতিবন্ধিতা নিয়ে ‘ব্যবসা’ করতে চাইছেন। এরপর মাহবুব আইনে স্নাতক ডিগ্রি নিয়ে একজন সিনিয়রের অধীনে নবিশ আইনজীবী হিসেবে কাজ করছেন। এখনো বার কাউন্সিলের অনুমোদন পাননি। প্রথম আলোর অনুষ্ঠানে তাঁর প্রত্যয় দেখে মনে হয়েছে, মাহবুবেরা হারবেন না। হারবেন না, হারতে পারেন না।

আরেক উদ্যমী যুবক রফিকুল হাসান। তিনি পীরগঞ্জের একটি কলেজে পড়ান। আর ফাঁকে ফাঁকে জনসেবা করেন। তাঁর জনসেবার ধরনটি ভিন্ন। প্রথম আলোয় প্রকাশিত ‘জনসংখ্যা আর কত বাড়লে সরকার সজাগ হবে?’ উপসম্পাদকীয়টির আট হাজার ফটোকপি বিলি করেছেন রফিকুল ট্রেনে ঘুরে ঘুরে। যাত্রীদের জনসংখ্যা বিষয়ে সচেতন করতে। এ ছাড়া তিনি নিয়মিত বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কোচিং ও নোট বইবিরোধী পোস্টার সাঁটেন।

তাঁর ধারণা, কোচিং-নোট বইয়ের কারণেই শিক্ষার মানের অবনতি ঘটছে। কিন্তু ওই কোচিং-নোট বইয়ের পৃষ্ঠপোষকেরা তাঁর পোস্টার ছিঁড়ে ফেলেন। ঢাকায় ফেরার পর টেলিফোনে জানতে চাইলেন, পোস্টার ছেঁড়ার প্রতিবাদে তিনিও পাল্টা পোস্টার ছিঁড়তে পারেন কি না। আমি বললাম, কাজটা ঠিক হবে না। বরং আপনি বিষয়টি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের জানান। তাঁরা ব্যবস্থা নেবেন। তিনি মেনে নিলেন।

সবশেষে পাঠকের মুখোমুখি অনুষ্ঠানের জন্য আমাদের তিন প্রতিনিধি—পঞ্চগড়ের শহিদুল ইসলাম, লালমনিরহাটের আবদুর রব ও চুয়াডাঙ্গার শাহ আলম সনিকে ধন্যবাদ জানাতেই হয়। তাঁদের উদ্যোগী ভূমিকা ছাড়া এই চমৎকার আয়োজন সম্ভব হতো না। (শেষ)

সোহরাব হাসান: কবি, সাংবাদিক।
sohrabhassan55@gmail.com

আর্কাইভ
Jun0 Posts
Jul0 Posts
Aug0 Posts
Sep0 Posts
Oct0 Posts
Nov0 Posts
Dec0 Posts
May0 Posts
Jun0 Posts
Aug0 Posts
Sep0 Posts
Oct0 Posts
Dec0 Posts
Jan0 Posts
Feb0 Posts
Mar0 Posts
May0 Posts
Jun0 Posts
Jul0 Posts
Aug0 Posts
Sep0 Posts
Oct0 Posts
Nov0 Posts
Dec0 Posts
Jan0 Posts
Feb0 Posts
Mar0 Posts
Apr0 Posts
May0 Posts
Jun0 Posts
Jul0 Posts
Aug0 Posts
Sep0 Posts
Oct0 Posts
Nov0 Posts