• এইচএসসির পরীক্ষার খাতা দেখছে শিক্ষার্থীরা!
23 May 2017 9:08 am
Logo

প্রচ্ছদ »  বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক

ঢাকানিউজ24 ডেস্ক | আপডেট: 11:25 May 4, 2017

বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক

বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক

ফনিন্দ্র সরকার:  গণতান্ত্রিক এবং ক্রমশক্তিমান ভারতের উত্থানে চীন অনেকটাই শঙ্কিত বলে ধারণা করা হচ্ছে। চীন তার শঙ্কার জায়গা থেকে দক্ষিণ এশিয়ার ছোট দেশগুলোয় প্রভাব বিস্তারের লক্ষ্যে নানারকম কৌশল অবলম্বন করছে। ২০১৬ সালের অক্টোবর মাসে চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং বাংলাদেশ সফর করেন। গত ২৮ বছরের ইতিহাসে এটাই ছিল চীনা প্রেসিডেন্টের বাংলাদেশে প্রথম সফর। মূলত সেখান থেকেই বাংলাদেশে নতুন করে চীনা প্রভাব বলয় বৃদ্ধির পরিকল্পনা শুরু।

বাংলাদেশ-চীন সামরিক সম্পর্ক জোরদারে সম্প্রতি চীন দুটো ডুবোজাহাজ বাংলাদেশের কাছে বিক্রি করতেও সক্ষম হয়েছে। সেই সফরের সময় বাংলাদেশ-চীনের মধ্যে ২৭টি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। চীন বাংলাদেশের উন্নয়নের জন্য দুই হাজার চারশ কোটি ডলার দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেয়। চীনা অর্থায়নে সামগ্রিক অর্থে বাংলাদেশের উন্নয়ন যতটা ইতিবাচক তার চেয়ে বেশি রাজনৈতিকভাবে নেতিবাচক। কেননা বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে চীনের অবস্থান ছিল পাকিস্তানের পক্ষে। সে অবস্থানের তেমন কোনো হেরফের এখনো হয়নি।

যে দেশটি আমাদের বাঙালিদের ওপর নির্বিচারে গণহত্যা চালিয়েছিল, মা-বোনদের ইজ্জত নিয়ে মাতামাতি করেছিল সেই পাকিস্তানের সঙ্গে চীনের বন্ধুত্ব বর্তমানে আরও প্রগাঢ় হয়েছে। তার পরও বাংলাদেশ কৌশলগত অর্থনৈতিক কূটনীতি সমৃদ্ধকরণে চীনের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় চুক্তি করেছে বলে মনে হয়। তবে এসব বিষয় ভারতকে কিছুটা হলেও উদ্বেগের জায়গায় নিয়ে গেছে। এ অঞ্চলে চীন একচেটিয়া প্রভাব বিস্তার করুক সেটা ভারতের জন্য বর্তমান বাস্তবতায় সম্মানের নয়। সে জন্য ভারতও তার প্রভাব ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গিতে বজায় রাখার চেষ্টা করছে।

তাই দুবার পিছিয়েও গত ৭ এপ্রিল প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারত সফরের ব্যবস্থা হয়। ৪ দিনের সফরে দুই দেশের সম্পর্ক ভিন্ন এক উচ্চতায় সিক্ত হলেও বিএনপি এই সফরকে রিক্ত হয়ে ফিরে আসার সফর হিসেবে আখ্যায়িত করেছে। শেখ হাসিনার ভারত সফরে তিন ডজনের মতো চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়। এর মধ্যে প্রতিরক্ষাবিষয়ক তিনটি সমঝোতা স্মারকও স্বাক্ষরিত হয়েছে।

মুক্তিযুদ্ধে প্রত্যক্ষ সশস্ত্র সহায়তাকারী দেশ ভারত এই প্রথমবারের মতো বাংলাদেশের সঙ্গে এরূপ সমঝোতা স্মারকে সই করে। বাংলাদেশ ভারতের কাছ থেকে প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম ক্রয়ের লক্ষ্যে সমঝোতা স্মারকে স্বাক্ষর করে। বিস্ময়ের সঙ্গে একটা বিষয় লক্ষণীয় যে, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি প্রটোকল ভেঙে শেখ হাসিনাকে বিমানবন্দরে সশরীরে উপস্থিত থেকে স্বাগত জানান, যা কিনা বিরল ঘটনা। পার্শ্ববর্তী একটা ছোট দেশের প্রধানমন্ত্রীকে বড় দেশের প্রধানমন্ত্রী ছোট করে দেখেননি এবং সর্বোচ্চ সম্মান ও মর্যাদায় অভিষিক্ত করেছেন। আরও একটি বিরল ঘটনা হলো শেখ হাসিনাকে রাষ্ট্রপতির বাসভবনে থাকার ব্যবস্থা করা, যা অবশ্যই আমাদের গোটা জাতির জন্য গৌরবের এবং সম্মানের।

ভারত বাংলাদেশকে ৫০০ কোটি ডলারের লাইন অব ক্রেডিট দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। প্রতিবেশী অন্য কোনো দেশকে ভারত এত টাকা এভাবে দেয়নি। ভারত-বাংলাদেশের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় অনেকগুলো চুক্তি স্বাক্ষরিত হলেও বহুল আলোচিত তিস্তাচুক্তিটি স্বাক্ষর হয়নি। তিস্তাচুক্তি স্বাক্ষর না হওয়া এবং সামরিক সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর হওয়ায় বিরোধী পক্ষ শেখ হাসিনার ব্যাপক সমালোচনা করছে। বিএনপি নেত্রী তো দেশ বিক্রির চুক্তি হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন, যা এর আগেও তিনি করেছেন। ভারতবিরোধিতাই যাদের রাজনৈতিক পুঁজি তারা এর বাইরে আর কী করতে পারে?

তিস্তাচুক্তিতে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ঘোরতর আপত্তিতে বোঝা যায়, ভারতের সঙ্গে খুব শিগগিরই তিস্তা সমস্যার সমাধান হচ্ছে না। তবে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সাড়ম্বরে ঘোষণা করেছেন, তার পিরিয়ডেই শেখ হাসিনার সঙ্গে তিস্তাচুক্তি হবে। ২০১৯ সালের প্রথমদিকে অথবা ২০১৮ সালের শেষদিকে বাংলাদেশে জাতীয় নির্বাচন। এই নির্বাচনের প্রাক্কালেই হয়তো চুক্তিটি হয়ে যাবে। শেখ হাসিনাও এটাকে বিরোধীদের নির্বাচনী এজেন্ডা হিসেবে ব্যবহৃত হতে দেবে না। নরেন্দ্র মোদিও চীনের প্রভাব বলয় প্রতিরোধে বাংলাদেশের সঙ্গে পানিবণ্টন চুক্তিসহ অমীমাংসিত বিষয়গুলো ফয়সালা করে ফেলবেন। তাতে আর সন্দেহ কী?

ভারতের সঙ্গে দিন দিন পাকিস্তানের তিক্ততা যতই বাড়ছে ততই চীনের সঙ্গে পাকিস্তানের সম্পর্ক জোরদার হচ্ছে। সেই একই কারণে চীন সার্কভুক্ত অন্য দেশগুলোয়ও প্রভাব বৃদ্ধি করে চলছে। চীন সম্প্রতি মালদ্বীপে বড় বড় অবকাঠামো নির্মাণ করে একচ্ছত্র প্রভাবের জানান দিচ্ছে। চীন পাকিস্তানের সঙ্গে সামরিক রাজনৈতিক ক্ষেত্রে কূটনৈতিক সম্পর্কের পরিধি বাড়াচ্ছে। এটা বাংলাদেশ-ভারতের জন্য একটা থ্রেট। ভারত-বাংলাদেশ তা না বোঝার কোনো কারণ নেই। ন্যায়সঙ্গতভাবে বিচার করলে দেখায় যায়, এই উপমহাদেশে অশান্তির বিষয়গুলোর প্রতি চীনের ঝোঁক একটু বেশি। কেননা দেশটি তালেবানদের সঙ্গেও আলোচনার প্রক্রিয়া শুরুর আগ্রহ দেখাচ্ছে।

চীনের নিরাপত্তাজনিত উপস্থিতি আফগানিস্তানে বেড়ে চলছে। গণমাধ্যমের খবরে প্রকাশ, চীন-আফগানিস্তান যৌথ সামরিক মহড়া করেছে। উল্লেখ করা যেতে পারে, ভারত ও চীন উভয় দেশই আফগানিস্তানে নানা কৌশলে প্রভাব বাড়ানোর প্রতিযোগিতায় লিপ্ত রয়েছে। ২০১৫ সালের ডিসেম্বরে ভারত আফগানিস্তানকে হেলিকপ্টার দিয়েছে। ২০১৬ সালে নয়াদিল্লি হার্ট অব এশিয়া কনফারেন্সের আয়োজন করে। সে কনফারেন্সে আফগানিস্তানের উন্নয়ন ও স্থিতিশীলতা নিয়ে আলোচনা হয়। সেখানে আফগানিস্তান বিষয়ে প্রাধান্য দেয়ার মূল কারণ হচ্ছে, তালেবান পতনের পর দেশটির মধ্যে পরাজিত শক্তি নানাভাবে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরিতে সক্রিয় রয়েছে। যারা অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরি করছে সেই তালেবানিদের সঙ্গেও চীনের সখ্য রয়েছে নেপথ্যে।

চীন আফগানিস্তানের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় ও বহুপক্ষীয় ফোরামে সম্পৃক্ত হতে চায়। এদিকে ভুটানেও চীন প্রভাব বিস্তার করতে এগিয়ে আসছে। যদিও তুলনামূলকভাবে ভুটানে ভারতের প্রভাব একচেটিয়া। অন্যদিকে ভারতীয় রাজনীতিক ও সামরিক-বেসামরিক কর্মকর্তারা বিশ্বাস করেন যে, নেপালে ভারতীয়দের অবরোধের পর চীনের প্রভাব বাড়তে শুরু করে। চীন এই সুযোগটি ভালোভাবেই কাজে লাগিয়েছে। নেপালের সাবেক অলি সরকারের আমলে চীনের সঙ্গে বাণিজ্য ও ট্রানজিট চুক্তি হয়েছে তবে সে চুক্তি বাস্তবায়নের গতি অনেক মন্থর।

যাহোক চীন অর্থনৈতিক ও সামরিক শক্তির দিক থেকে অনেকটা এগিয়ে থাকার কারণে তাদের দাম্ভিকতা একটু বেশি। ভারত-পাকিস্তানে যখনই সামরিক উত্তেজনা সৃষ্টি হয় তখনই চীন সরাসরি ভারতকে থ্রেট করে পাকিস্তানের পক্ষে অবস্থান নেয়। কিন্তু ভারত তাদের শক্তিমত্তা নিয়ে কখনো দাম্ভিকতা দেখায়নি। ভারত অত্যাধুনিক পারমাণবিক শক্তি অর্জন করলেও উপমহাদেশের শান্তি স্থিতিশীলতা রক্ষায় যেসব কর্মসূচি গ্রহণ করা দরকার তা করছে।

ভারত পারমাণবিক শক্তিধর দেশ হয়েও এনপিটি চুক্তির বহির্ভূত ছিল। এই চুক্তির বাইরে থেকেও ভারত চুক্তির শর্তগুলো মেনে চলেছে, যা চীনের পক্ষে সম্ভব হতো কিনা সন্দেহ। কোরিয়া-ইরান তো এনপিটি চুক্তির অন্তর্ভুক্ত হয়েও চুক্তির শর্ত লঙ্ঘন করে আসছে অনবরত। চীনের আধিপত্যবাদ কিংবা প্রভাব বলয় কতটা কূটনৈতিক ভারসাম্য রক্ষায় কার্যকর তা প্রশ্নসাপেক্ষ।

বাংলাদেশের রাজনীতিবিদ ও সুশীল সমাজ যদি অতীত থেকে কোনো শিক্ষা না নিয়ে থাকেন তবে সেটা দুর্ভাগ্য। শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগ তথা প্রগতিশীল রাজনৈতিক জোটকে ভারতপন্থি হিসেবে আখ্যায়িত করে মৌলবাদী তথা ডানপন্থি রাজনৈতিক জোট ধর্মীয় উন্মাদনা সৃষ্টি করতে পারে। ধর্মনিরপেক্ষ অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের মৌলিক চরিত্র বজায় রাখতে সব মহলকে সজাগ থাকতে হবে। বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের প্রত্যাশা ও বিশ্বাসের জায়গাটিতে যেন কোনোরূপ ক্ষত দেখা না দেয় সে খেয়াল রাখতে হবে উভয় সরকারকেই।

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির রাজনৈতিক পরিচয় হিন্দুত্ববাদী নেতা হিসেবে। কিন্তু তিনি যখন ক্ষমতায় এসেছেন তখন তার পরিচয় শুধু একটাই হবে, তিনি ভারতের সব নাগরিকের প্রধানমন্ত্রী। যে সেক্যুলার চরিত্রের ওপর ভিত্তি করে মহান ভারতের উৎপত্তি, সেটা বজায় রাখতে হিন্দুত্ববাদী দর্শনে বিশ্বাসী নেতা নরেন্দ্র মোদিও বহাল রাখবেন বলে বিশ্বাস করি।

পারস্পরিক বিশ্বাসের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ থাকলে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কে কোনোদিনই ব্যবচ্ছেদ ঘটবে না। ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক যত মজবুত হবে এ অঞ্চলের অপশক্তি ততটাই দুর্বল হবে। মানুষের জীবনমানের উন্নতি ঘটবে।

ফনিন্দ্র সরকার : কলাম লেখক ও আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক ।

আর্কাইভ
Jun0 Posts
Jul0 Posts
Aug0 Posts
Sep0 Posts
Oct0 Posts
Nov0 Posts
Dec0 Posts
May0 Posts
Jun0 Posts
Aug0 Posts
Sep0 Posts
Oct0 Posts
Dec0 Posts
Jan0 Posts
Feb0 Posts
Mar0 Posts
May0 Posts
Jun0 Posts
Jul0 Posts
Aug0 Posts
Sep0 Posts
Oct0 Posts
Nov0 Posts
Dec0 Posts
Jan0 Posts
Feb0 Posts
Mar0 Posts
Apr0 Posts
May0 Posts
Jun0 Posts
Jul0 Posts
Aug0 Posts
Sep0 Posts
Oct0 Posts
Nov0 Posts