হেফাজতিদের হেফাজতের বিরূপ ফল

ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ভয়াবহ নৈরাজ্যে
হেফাজতিদের হেফাজতের বিরূপ ফল

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী

গত কয়েক দিন ধরে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে হেফাজতে ইসলামের কর্মী-সমর্থকরা যে তাণ্ডব চালিয়েছে, তা নতুন করে পেছন ফিরে তাকানোর তাগিদ দিয়েছে। বিশেষ করে গত রোববার হরতালের নামে তারা সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের আলোয় আলোকিত শহর ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ভয়াবহ নৈরাজ্যের সৃষ্টি করেছে। গত কয়েক দিনে সহিংসতায় হতাহতের ঘটনাও ঘটেছে। যানবাহন, সরকারি স্থাপনা, বাড়িঘর, সাংস্কৃতিক সংগঠনের কার্যালয়ে ভাঙচুর-অগ্নিসংযোগ ঘটিয়েছে হেফাজতে ইসলামের কর্মী-সমর্থকরা। সংবাদমাধ্যমেও তারা হামলা চালিয়েছে। ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরে ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ সংগীতাঙ্গন পুড়িয়ে দিয়েছে। নারায়ণগঞ্জ, রাজশাহী, মুন্সীগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ, সিলেট, চট্টগ্রাম, নোয়াখালীসহ বিভিন্ন স্থানে তারা ভাঙচুর চালায়। এই যে উন্মত্ততা, আস্ম্ফালন; এই যে নৈরাজ্য; নিশ্চয় এক দিনে এ পর্যায়ে গিয়ে পৌঁছেনি।

২০১৩ সালের ৫ মে দূর অতীত নয়। ওই দিন রাজধানী ঢাকার শাপলা চত্বরে হেফাজতিরা অবস্থান নিয়ে কর্মসূচি ঘোষণা করেছিল, যদিও তা পরে পুলিশি অভিযানে ভেঙে যায় ওই জমায়েত। তারা মুক্তচিন্তকদের একটি তালিকা করেছিল, যে তালিকায় ৮০ জনের বেশি মুক্তচিন্তকের নাম ছিল। রাজীব, অভিজিৎসহ হত্যাকাণ্ডের শিকার আরও কয়েকজনের নাম ছিল ওই তালিকাভুক্ত। এক পর্যায়ে হেফাজতিরা ধর্মাশ্রয়ী রাজনীতিতে তাদের প্রকাশ্য অবস্থান ঘোষণা করে। লক্ষণীয়, তাদের মধ্যে ভাঙনও দেখা দেয়। কয়েকটি ভাগে ভাগ হলেও রসুনের গোড়ার মতো তাদের গোড়া মূলত এক জায়গাই। অর্থাৎ ধর্মীয় গোঁড়ামি, অন্ধত্ব। আগেও যে কথা বলেছিলাম, আজও একই কথা বলছি- ভোটের রাজনীতির ছক কষে ধর্মান্ধ গোষ্ঠীগুলোকে নিয়ে রাজনীতিতে নিজেদের লাভালাভের হিসাব কষতে গিয়ে ক্ষতিটা শেষ পর্যন্ত শুধু নিজেদেরই হয়নি; গোটা দেশ ও সমাজেরই হয়ে গেল। এই ক্ষতি ও ক্ষত এত সহজে সারানো যাবে কিনা- এটি নিঃসন্দেহে বড় প্রশ্ন। একই সঙ্গে এই প্রশ্নটা এখন আর উপেক্ষার অবকাশ নেই যে, এর শেষ কোথায়? কারণ, স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উদযাপনকালে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা-মূল্যবোধ-অঙ্গীকার-প্রত্যয়বিরোধী যে উন্মাদনা দেশ-সমাজে তাদের কারণে নতুন করে কিছু বিষয় উত্থাপন করল; সেসবই দুশ্চিন্তার কারণ। এ কারণগুলো আমলে নিতেই হবে।

যারা ধর্ম নিয়ে রাজনীতি করে, তাদের সামনে তো কোনো ইস্যু নেই। তারা একটার পর একটা ইস্যু তৈরি করে। দেশের মানুষের জীবন-মরণ সমস্যা, অর্থনৈতিক সমস্যা, বেকার সমস্যা ইত্যাদি নিয়ে তারা ইস্যু সৃষ্টি করে না। বিগত ৯-১০ বছরে তাদের সঙ্গে সরকার দফায় দফায় যে সমঝোতা করেছে, এর মধ্য দিয়ে তারা শক্তি সঞ্চয় করেছে। সেসব পুঁজি করেই এখন আরও শক্তি সঞ্চয় করতে চাইছে।

দেশে এখন রাজনীতি কার্যত স্থবির। শক্তিশালী বিরোধী দল নেই। অথচ প্রকৃত গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক কিংবা সরকার ব্যবস্থায় এর কোনো বিকল্প নেই। বিএনপি অনেকটা নিজেদের কারণে, অনেকটা সরকারের চাপে কোণঠাসা। জাতীয় পার্টি বিরোধী দল (?) হিসেবে জাতীয় সংসদে আছে, রাজপথে নেই। এই শূন্যতার সুযোগ তারা (হেফাজতে ইসলাম) নিতে চাচ্ছে। বিভক্ত হেফাজতে ইসলামের কোনোটির দিকে আছে জামায়াতের সমর্থন, কোনোটির দিকে অন্য ধর্মীয় দলসহ ডানপন্থি কয়েকটি দলের সমর্থন। হেফাজত এখন রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে দাঁড়াতে চাচ্ছে। হয়তো এভাবেই ভবিষ্যতে হেফাজত এক সময় বিভক্তি গুছিয়ে একটি সংঘবদ্ধ ধর্মীয় রাজনৈতিক দল হিসেবে নতুনভাবে অন্য চেহারায় আবির্ভূত হবে। তাতে সামগ্রিকভাবে আরও ক্ষতি হবে রাজনীতি, সমাজ ও দেশের। ক্ষতি হবে প্রগতির ও মানবিক মূল্যবোধের। আরও বেশি করে আক্রান্ত হবে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি।

সুপ্রিম কোর্টের সামনে থেকে ভাস্কর্য সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল হেফাজতে ইসলামসহ অন্যান্য ধর্মীয় দলের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে। হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর চত্বর থেকে লালনের ভাস্কর্যের ক্ষেত্রেও ঘটেছিল একই ঘটনা। মনে রাখা দরকার, ভাস্কর্য যেমন একটি প্রতীক; এর অপসারণও একটি প্রতীক। তখন যাদের দাবিতে এই ভাস্কর্যগুলো সরানো হয়েছিল, এখন তারা মাঠে অধিকতর সক্রিয়। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবর্ষ উদযাপনকালে তার ভাস্কর্য নির্মাণের বিরোধিতা যারা করল, তারাও বিচ্ছিন্ন কোনো শক্তি নয়। এক গ্রুপ ভাবছে, আগের গ্রুপ তো সুযোগ নিয়েছে; এখন আমরা কিছু সুযোগ নিই। এভাবেই ধর্মান্ধরা সুযোগ খোঁজে, খুঁজতে থাকবে এবং এ প্রেক্ষাপট তৈরি করে দেওয়া হয়েছে।

২০১৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে কওমি মাদ্রাসার দাওরায়ে হাদিস ডিগ্রিকে হঠাৎ বিশ্ববিদ্যালয়ের মাস্টার্সের মর্যাদা দেয় সরকার আইন করে। একমুখী শিক্ষার প্রতি গুরুত্ব না দিয়ে ধর্মীয় শিক্ষার প্রসার ঘটানো হচ্ছে সংস্কার না করে।
হেফাজতের বিপদ সম্পর্কে আমরা তো আগে থেকেই অবগত ছিলাম। তাদের কর্মকাণ্ড সম্পর্কে সংবাদমাধ্যমে অনেক কিছুই বারবার উঠে এসেছে। আমরা সতর্ক করে দিয়েছিলাম সরকারকে। কিন্তু সরকার সেসব আমলে নেয়নি। উপরন্তু তাদের সঙ্গে সরকার আপসকামিতার নীতি গ্রহণ করেছিল। মাদ্রাসা শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে আরও গভীরভাবে ভাবার তাগিদ আমরা দিয়েছি বহুবার।

মাদ্রাসা শিক্ষার্থীদের মধ্যে যে হতাশা-বঞ্চনা বাসা বেঁধেছে, যারা এর বীজ তাদের মনে বপন করছে এবং যে কারণে বিজ্ঞানমনস্ক শিক্ষার বিকাশ-প্রসার এ ক্ষেত্রে না ঘটার কারণে আলো ছড়াচ্ছে না- এ বিষয়গুলো নিয়ে ভাবা এবং কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার সময় কিন্তু বয়ে যাচ্ছে। উন্নতি হচ্ছে, জিডিপির চিত্র স্ম্ফীত হচ্ছে- এসব নিয়ে আত্মতুষ্টিতে না ভুগে গভীর দৃষ্টি দেওয়া উচিত ধর্মান্ধতা-উগ্রতার বিষবাষ্প সমাজদেহে কীভাবে, কী কারণে, কী উদ্বেগজনকভাবে কালো ধোঁয়া ছড়াচ্ছে এবং এর নিরসন কীভাবে দ্রুত করা যায়। মানব মর্যাদা, নাগরিক অধিকার, বৈষম্যহীন সমাজ; এসবই ছিল মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম অঙ্গীকার।

বাহাত্তরের সংবিধানের মূল স্তম্ভের ওপর আঘাত তো আরও আগেই এসেছে রাজনৈতিক হীনস্বার্থ চরিতার্থ করার লক্ষ্যে। এখন তো মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব দানকারী দলের নেতৃত্বাধীন সরকার দ্বারা দেশ চলছে। তাহলে বাহাত্তরের সংবিধানে ফিরে যেতে বাধা কোথায়? ধর্মাশ্রয়ী রাজনীতি নিষিদ্ধ করতে বাধা কোথায়? ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলগুলোর কার্যক্রম নিষিদ্ধ করতে বাধা কোথায়? এত প্রতিবন্ধকতা জিইয়ে রেখে আমরা মুক্তিযুদ্ধের অঙ্গীকার, প্রত্যয় বাস্তবায়নের স্বপ্ন দেখছি?

শিক্ষার্থীদের পাঠ্যপুস্তকে হেফাজতে ইসলামের হস্তক্ষেপটা মোটেও আবছা ছিল না; একেবারে স্পষ্টভাবে নিজেদের জাহির করে ফেলেছিল তারা। আইয়ুব-মোনায়েমের অন্ধকার শাসনামলে এ ধরনের পরিবর্তন আনার কোশেশ করা হয়েছিল। কিন্তু তখন প্রতিবাদের মুখে কর্তাদের সেই অভিপ্রায় ভেস্তে গিয়েছিল। কিন্তু স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষশক্তির দলগুলোর সমন্বয়ে গঠিত জোট সরকারের শাসনামলে আমরা কী দেখলাম? হেফাজতের দাবি বা আবদার অনেকটাই মেনে নেওয়া হলো! কী অবিশ্বাস্য! যে পাকিস্তান নিজেই তার নানা সংকট নিয়ে হাবুডুবু খাচ্ছে, কিন্তু পাকিস্তানের ভাবাদর্শধারীরা স্বাধীন বাংলাদেশে বেশ সানন্দে ডুগডুগি বাজাচ্ছে। পাঠ্যপুস্তকে হেফাজতে ইসলাম উত্থাপিত দাবির অনেক শর্ত রক্ষা করে, মেনে নিয়ে, আত্মসমর্পণ করে সর্বনাশের সড়কটা আরও চওড়া করে দেওয়া হয়েছিল। কাজেই এখন যা হচ্ছে কিংবা আরও যা হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে, এসবই ভুল কিংবা হীনস্বার্থে রাজনৈতিক সমীকরণের বিরূপ ফল।

বরাবরের মতোই এসব ঘটনা নিয়ে রাজনৈতিক দোষারোপ শুরু হয়ে গেছে। আজ যারা বলছেন, হেফাজতিরা দেশ-সমাজবিরোধী কর্মকাণ্ড চালাচ্ছে; তারাই তো নিকট অতীতে হেফাজতিদের তুষ্ট করতে নানাভাবে তাদের আবদার গ্রাহ্য করেছিলেন। এও সত্য, পুঁজিবাদী শাসন বাংলাদেশে শিক্ষাব্যবস্থাকে তিন ধারায় বিভক্ত করেছে। মাদ্রাসা শিক্ষাকে মূলধারার কাছে আনার কথা সরকার মুখে বলছে, কিন্তু হেফাজতিদের চাপের মুখে মূলধারাকেই যেন মাদ্রাসার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। তাতে শাসকশ্রেণির ক্ষতি নেই। কারণ তাদের সন্তানরা এখন আর মূলধারায় খুব একটা নেই। তারা ইংরেজি ধারায় চলে গেছে কিংবা যাওয়ার চেষ্টা করছে।

সংবিধানের মূলনীতিতে ‘রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম’ পর্যন্ত চলে এসেছে এবং এই বোঝা থেকে সংবিধানকে মুক্ত করার কোনো ইচ্ছা আছে কি? তাহলে উপায় কী? এই দুঃসহ অবস্থা ও ব্যবস্থা কি চলতেই থাকবে? সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্প কি ছড়াতেই থাকবে? সুনামগঞ্জের শাল্লা উপজেলার নোয়াগাঁওয়ের ক্ষত, বীভৎসতা ফের যে বাস্তবতা তুলে ধরল, তা-ই কি নিয়তি বলে মেনে নিতে হবে? এর আগে রামু, নাসিরনগর, সাঁথিয়া কিংবা আরও বিভিন্ন স্থানে একই কায়দায় যেসব ঘটনা ঘটল, সেসবের বিচারের খবর কী? কোনোটির ক্ষেত্রেই তো জবাব প্রীতিকর নয়। না, অবশ্যই না। এই উন্মত্ততা, এই অরাজকতা বাংলাদেশের নিয়তি হতে পারে না। কোনোভাবেই না।

সভ্যতা অপেক্ষা করছে একটি নতুন মোড় নেওয়ার। সে পৌঁছাতে চায় এমন একটি ব্যবস্থায়, যেখানে মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্কটা শোষণমূলক হবে না; হবে মৈত্রীর। মনে রাখতে হবে, গণতান্ত্রিক পরিবেশ যদি বিরাজ না করে সেখানে যে কোনো অপশক্তিই মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে পারে। রাজনৈতিক স্বার্থে, রাজনৈতিকভাবে হেফাজতিদের পৃষ্ঠপোষকতা করে, হেফাজত করে যে বৈরী পথ তৈরি করে দেওয়া হয়েছে; সেই পথেই তারা হাঁটছে। গণতান্ত্রিক প্রগতিশীল রাজনৈতিক শক্তি, সাংস্কৃতিক গোষ্ঠীগুলোকে যূথবদ্ধ হতে হবে। অন্ধকারের শক্তি হটাতে এর কোনো বিকল্প নেই। তবে যারা স্ববিরোধিতার মোড়কবদ্ধ, তাদেরও তা থেকে আগে মুক্ত হতে হবে। সাম্প্রদায়িক শক্তির উত্থানের আশঙ্কা থেকে এক অস্থির পরিবেশ বিরাজ করছে। সব অপকর্মের বিরুদ্ধে কঠোর ও নির্মোহ হতে হবে সরকারকে। একই সঙ্গে সরকারের পরিস্কার অবস্থানও দরকার।

লেখক:  শিক্ষাবিদ ও সমাজ বিশ্নেষক