স্বাধীনতা সংগ্রামে মুক্তাগাছার বীরত্বগাথা

স্বাধীনতা সংগ্রামে মুক্তাগাছার বীরত্বগাথা
স্বাধীনতা সংগ্রামে মুক্তাগাছার বীরত্বগাথা

অধ্যাপক মুর্শেদ আলম খান।। ইতোমধ্যেই দেশের অনেক এলাকা পাকবাহিনীর দখলে চলে গেছে। অনেক জায়গায় চলছে নির্বিচারে হত্যা- লুন্ঠন। মুক্তাগাছা তখনও মুক্ত জনপদ,তবু মানুষের মাঝে ভয় আর আশংকা, কখন যেন ঢুকে পড়ে হায়েনার। নির্মমতার সীমা ছাড়িয়ে নৃশংসতার ছাপ ফেল যায় শান্তির নীড়ে।

আর্মী আসছে, আর্মী আসছে – এমন উড়ো খবরে মাঝে মধ্যেই ভীতি ছড়িয় পড়ে মানুুষের মাঝে। প্রিয় এলাকাকে শত্রুমুক্ত রাখার দৃঢ় প্রত্যয়ে টাংগাইল – ময়মনসিংহ সড়কের বিভিন্ন স্থানে বড় বড় গাছ কেটে, বাঁশপুতে,মাটি ফেলে পাকবাহিনীর আসার পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টিরমধ্য দিয়ে প্রতিরোধ গড়ে তোলে সম্মিলিত জনতা। 

২৩ এপ্রিল শুক্রবার। সকালের খাবারের শেষে দিনের কর্মে নিবিষ্ট হবার প্রস্তুতির সময়। এমন সময় হঠাৎ চারদিকে রব উঠে, “আইয়া পড়ছে- আইয়া পড়ছে” যমের হাত থেকে জান বাঁচাতে ভীত সন্ত্রস্ত মানুষ পরিবার পরিজন নিয়ে ছুটতে থাকে দিগ্বিদিক।

সব ফেলে শহর ছেড়ে পালাচ্ছে মানুষ। দৌড়াতে থাকা নিরস্ত্র নিরীহ মানুষের কাতারে শামিল হতে থাকে শত শত মানুষ।

সত্যিসত্যিই আজ পাক হানাদাররা চলে এসেছে। ঘড়ির কাটায় তখন আনুমানিক সকাল দশটার কিছু উপরে বাজে। স্বত: স্ফূর্ত জনতার সকল প্রতিরোধের ব্যুহ ভেঙ্গে স্বদেশের কুলাঙ্গার দালালদের সহায়তায় জামালপুর হয়ে ময়মনসিংহ যাবার পথে মুক্তাগাছায় প্রবেশ করে হানাদার বাহিনী।

নিমিষেই পন্ড হয়ে যায় স্বাধীনতাকামী মানুষের সবধরনের প্রতিরোধের ব্যর্থ চেষ্টা। পথে হানাদার দল নৃশংসতার ছাপ ফেলে যায় সর্বত্র। সুসজ্জিত কনভয় নিয়ে আসা হানাদারা বৃষ্টির মত গুলি ছুড়তে থাকে। এতে রাস্তার দু” পাশের গাছের ডালপালা ছিঁড়ে ছুটে পড়ে। যেন প্রচন্ড ঘূর্ণিঝড়ে তছনছ করে দিয়ে গেছে সব।

রাস্তার ধারে থাকা গরু- ছাগলগুলো পর্যন্ত সেদিন রক্ষা পায়নি পাষন্ড নিষ্ঠুরদের হাত থেকে। ভীতি ছড়াতে আগুন লাগিয়ে ছাই করে দেয়া হয় অসংখ্য ঘর- বাড়ি। এক সময় শহরে এসে থামল শত্রুর কনভয়। ভয়ার্ত মানুষ পালাতে থাকে শহর ছেড়ে। বন্ধ হয়ে যায় সব দোকানপাট।

চাঁদতাঁরা খচিত পতাকা নিয়ে পাকিস্তান জিন্দাবাদ বলতে বলতে এগিয়ে আসে লুলোভ দালাল শ্রেণীর কিছু লোক। বাড়িঘর, দোকানপাটের দড়জা ভেঙ্গে বলতে থাকে “লুটলো,। লুটের ঘোষণা পেয়ে সুযোগ সন্ধানীরা মানুষের জিনিসপত্র লুটে নিতে তৎপর হয়ে উঠে। নির্বিঘ্নে চলে লুটতরাজ।

দালাল দোসরদের বদৌলতে শহর থেকে গ্রাম পর্যন্ত নিরীহ মানুষের বাড়িতে লুটের ঘটনা ঘটতে থাকে। ভয়াবহ লুটতরাজ,নৃশংস হত্যাকান্ড,নির্যাতন,নিপীড়ন,ভাংচুর,অগ্নিসংযোগে তছনছ হয়ে যায় পুরো এলাকা। আর সেইদিন থেকেই হানাদার বাহিনীর দখলে চলে যায় মুক্তাগাছা।

তথ্য সূত্র: মুর্শেদ আলম খান ও এম ইদ্রিস আলীর লেখা মুক্তিযুদ্ধে মুক্তাগাছা বই থেকে। 

পর্ব-৪ চলবে…