ফেব্রুয়ারি মাসের সড়ক দুর্ঘটনার প্রতিবেদন

সৈয়দ আবুল মকসুদ-এর মৃত্যুতে রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের শোক
সৈয়দ আবুল মকসুদ-এর মৃত্যুতে রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের শোক

নিউজ ডেস্ক:   গত ফেব্রুয়ারি মাসে দেশে সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে ৪০৬ টি। নিহত ৫১৭ জন এবং আহত ৬৫৯ জন। নিহতের মধ্যে নারী ৯৭, শিশু ৬৮। ১৫৬ টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় নিহত ১৭১ জন, যা মোট নিহতের ৩৩.০৭ শতাংশ। মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার হার ৩৮.৪২ শতাংশ। দুর্ঘটনায় ১২৭ জন পথচারী নিহত হয়েছে, যা মোট নিহতের ২৪.৫৬ শতাংশ। যানবাহনের চালক ও সহকারী নিহত হয়েছেন ৭৬ জন, অর্থাৎ ১৪.৭০ শতাংশ।

এই সময়ে ৬টি নৌ-দুর্ঘটনায় ৬ জন নিহত এবং ৫৫ জন আহত হয়েছে। ১৩ টি রেলপথ দুর্ঘটনায় ১৬ জন নিহত এবং ৪ জন আহত হয়েছে।

রোড সেফটি ফাউন্ডেশন ৭টি জাতীয় দৈনিক, ৫টি অনলাইন নিউজ পোর্টাল এবং ইলেক্ট্রনিক গণমাধ্যমের তথ্যের ভিত্তিতে প্রতিবেদনটি তৈরি করেছে।

দুর্ঘটনায় মোট নিহতের যানবাহনভিত্তিক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, মোটরসাইকেল আরোহী ১৭১ জন (৩৩.০৭%), বাস যাত্রী ৬৬ জন (১২.৭৬%), ট্রাক-পিকআপ-ট্রাক্টর-ট্রলি যাত্রী ৩৭ জন (৭.১৫%), মাইক্রো-কার-এ্যাম্বুলেন্স যাত্রী ১৬ জন (৩.০৯%), থ্রি-হুইলার (সিএনজি-ইজিবাইক-অটোরিকশা-অটোভ্যান-টমটম) ৭৪ জন (১৪.৩১%), নসিমন-ভটভটি-বোরাক-পাখিভ্যান-চান্দের গাড়ি যাত্রী ১৪ জন (২.৭০%) এবং বাই-সাইকেল, প্যাডেল রিকশা-রিকশাভ্যান, পাওয়ারটিলার যাত্রী ও শ্রমিক ১২ জন (২.৩২%) নিহত হয়েছে।

রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের পর্যবেক্ষণ ও বিশ্লেষণ বলছে, দুর্ঘটনাগুলোর মধ্যে ১৩৮টি (৩৪%) জাতীয় মহাসড়কে, ১২২টি (৩০.০৪%) আঞ্চলিক সড়কে, ৯৫টি (২৩.৩৯%) গ্রামীণ সড়কে, ৪৪টি (১০.৮৩%) শহরের সড়কে এবং অন্যান্য স্থানে ৭টি (১.৭২%) সংঘটিত হয়েছে।

দুর্ঘটনাসমূহের ৭৯টি (১৯.৪৫%) মুখোমুখি সংঘর্ষ, ১৪২টি (৩৪.৯৭%) নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে, ১২৩টি (৩০.২৯%) পথচারীকে চাপা/ধাক্কা দেয়া, ৪৯টি (১২.০৬%) যানবাহনের পেছনে আঘাত করা এবং ১৩টি (৩.২০%) অন্যান্য কারণে ঘটেছে।

দুর্ঘটনার জন্য দায়ী যানবাহন- ট্রাক-কাভার্ডভ্যান-পিকআপ ২৫.২৫ শতাংশ, ট্রাক্টর-ট্রলি-লরি ৪.৬৯ শতাংশ, মাইক্রোবাস-প্রাইভেটকার-অ্যাম্বুলেন্স-জীপ ৩.৫২ শতাংশ, যাত্রীবাহী বাস ১১.৬০ শতাংশ, মোটরসাইকেল ২৩.৯৩ শতাংশ, থ্রি-হুইলার (ইজিবাইক-সিএনজি-অটোরিকশা-অটোভ্যান) ১৯.৯৭ শতাংশ, নসিমন-ভটভটি-আলমসাধু-চান্দের গাড়ি-বোরাক-টমটম-ডাম্পার, পাওয়ারটিলার ৮.৮১ শতাংশ এবং প্যাডেল রিকশা-রিকশাভ্যান, বাই-সাইকেল ২.২০ শতাংশ।

দুর্ঘটনায় আক্রান্ত যানবাহনের সংখ্যা ৬৮১টি। (ট্রাক ১২১, বাস ৭৯, কাভার্ডভ্যান ১৮, পিকআপ ৩৩, লরি ৬, ট্রলি ১৭, ট্রাক্টর ৯, মাইক্রোবাস ১৩, প্রাইভেটকার ৮, অ্যাম্বুলেন্স ২, জীপ ১, মোটরসাইকেল ১৬৩, ইজিবাইক-সিএনজি-অটোরিকশা-অটোভ্যান ১৩৬, টমটম ৪, ডাম্পার ২, নসিমন-ভটভটি-আলমসাধু-চান্দের গাড়ি-বোরাক ৫২, বাই-সাইকেল ৬, প্যাডেল রিকশা-রিকশাভ্যান ৯ এবং পাওয়াটিলার ৪টি।

সময় বিশ্লেষণে দেখা যায়, দুর্ঘটনাসমূহ ঘটেছে ভোরে ৬.৪০%, সকালে ২৮.৮১%, দুপুরে ১৭.৪৮%, বিকালে ২২.১৬%, সন্ধ্যায় ৬.৮৯% এবং রাতে ১৮.২২%।

দুর্ঘটনার বিভাগওয়ারী পরিসংখ্যান বলছে, ঢাকা বিভাগে দুর্ঘটনা ২৪.৮৭%, প্রাণহানি ২১.৮৫%, রাজশাহী বিভাগে দুর্ঘটনা ১৭.৭৩%, প্রাণহানি ১৬.৬৩%, চট্টগ্রাম বিভাগে দুর্ঘটনা ১৯.৭০%, প্রাণহানি ১৭.৯৮%, খুলনা বিভাগে দুর্ঘটনা ৮.৬২%, প্রাণহানি ১২.১৮%, ময়মনসিংহ বিভাগে দুর্ঘটনা ৫.১৭%, প্রাণহানি ৫.২২%, বরিশাল বিভাগে দুর্ঘটনা ৯.৮৫%, প্রাণহানি ১০.২৫%, রংপুর বিভাগে দুর্ঘটনা ৮.৩৭%, প্রাণহানি ৮.৮৯% এবং সিলেট বিভাগে দুর্ঘটনা ৫.৬৬%, প্রাণহানি ৬.৯৬% ঘটেছে।

ঢাকা বিভাগে সবচেয়ে বেশি দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি ঘটেছে। ১০১টি দুর্ঘটনায় নিহত ১১৩ জন। সবচেয়ে কম ময়মনসিংহ বিভাগে। ২১টি দুর্ঘটনায় নিহত ২৭ জন। একক জেলা হিসেবে ঢাকা জেলায় সবচেয়ে বেশি দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি ঘটেছে। ২৯টি দুর্ঘটনায় ৪১ জন নিহত। সবচেয়ে কম মেহেরপুর জেলায়। ২টি দুর্ঘটনায় ১ জন নিহত।

গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্যের ভিত্তিতে জানা যায়, নিহতদের মধ্যে পুলিশ সদস্য ৮ জন, র‌্যাব সদস্য ১ জন, সাবেক এনএসআই কর্মকর্তা ১ জন, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক ও রেজিস্ট্রারসহ বিভিন্ন স্কুল-কলেজ-মাদরাসার শিক্ষক ১৮ জন, চিকিৎসক ৪ জন, জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের এপিপি ১ জন, ইসলামী বক্তা ১ জন (মিজানুর রহমান চাঁদপুরী), উপজেলা কার্যালয়ের অফিস সহকারী ১ জন, আইনজীবী ২ জন, নাট্যকর্মী ১ জন, সাংবাদিক ৩ জন, ব্যাংক কর্মকর্তা ৫ জন, এনজিও কর্মকর্তা-কর্মচারী ১৬ জন, ঔষধ ও বিভিন্ন পণ্যসামগ্রী বিক্রয় প্রতিনিধি ২৭ জন, স্থানীয় পর্যায়ের বিভিন্ন ব্যবসায়ী ৪৩ জন, ইরান প্রবাসী ১ জন, পল্লী বিদ্যুতের লাইনম্যান ও সুপারভাইজার ২ জন, মোটর মেকানিক ৩ জন, পাটকল শ্রমিক নেতা ১ জন, পোশাক শ্রমিক ১১ জন, ইটভাটা শ্রমিক ৫ জন, কৃষি শ্রমিক ৮ জন, রাজমিস্ত্রি ২ জন, ডিসিসি-এর পরিচ্ছন্নতাকর্মী ১ জন, পত্রিকার হকার ১ জন, চারলেন প্রকল্পের নিরাপত্তাকর্মী ১ জন, মানসিক প্রতিবন্ধি ৪ জন, ইউপি সদস্য ৩ জনসহ স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা ৯ জন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ২ জন এবং জাপানী বিশ্ববিদ্যালয়ের ১ জন শিক্ষার্থীসহ দেশের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ৮৩ জন শিক্ষার্থী নিহত হয়েছে।

রাজবাড়ির জেলা প্রশাসক দিলসাদ বেগম এবং রূপপুর পারমানবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের প্রকৌশলী রাশিয়ান নাগরিক শেরগাই গারকিন গুরুতর আহত হয়ে বর্তমানে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। এছাড়া স্বেচ্ছাসেবক লীগের কেন্দ্রীয় সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হয়েছিলেন।

দেশে সড়ক দুর্ঘটনার প্রধান কারণসমূহ:

১. ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন;

২. বেপরোয়া গতি;

৩. চালকদের বেপরোয়া মানসিকতা, অদক্ষতা ও শারীরিক-মানসিক অসুস্থতা;

৪. বেতন ও কর্মঘন্টা নির্দিষ্ট না থাকা;

৫. মহাসড়কে স্বল্পগতির যানবাহন চলাচল;

৬. তরুণ ও যুবদের বেপরোয়া মোটরসাইকেল চালানো;

৭. জনসাধারণের মধ্যে ট্রাফিক আইন না জানা ও না মানার প্রবণতা;

৮. দুর্বল ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা;

৯. বিআরটিএ’র সক্ষমতার ঘাটতি;

১০ গণপরিবহণ খাতে চাঁদাবাজি।

সুপারিশসমূহ:

১. দক্ষ চালক তৈরির উদ্যোগ বৃদ্ধি করতে হবে;

২. চালকের বেতন ও কর্মঘন্টা নির্দিষ্ট করতে হবে;

৩. বিআরটিএ’র সক্ষমতা বৃদ্ধি করতে হবে;

৪. পরিবহনের মালিক-শ্রমিক, যাত্রী ও পথচারীদের প্রতি ট্রাফিক আইনের বাধাহীন প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে;

৫. মহাসড়কে স্বল্পগতির যানবাহন চলাচল বন্ধ করে এগুলোর জন্য আলাদা পার্শ্বরাস্তা (সার্ভিস লেন) তৈরি করতে হবে;

৬. পর্যায়ক্রমে সকল মহাসড়কে রোড ডিভাইডার নির্মাণ করতে হবে;

৭. গণপরিবহনে চাঁদাবাজি বন্ধ করতে হবে;

৮. রেল ও নৌ-পথ সংস্কার ও সম্প্রসারণ করে সড়ক পথের উপর চাপ কমাতে হবে;

৯. টেকসই পরিবহন কৌশল প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করতে হবে।

১০.“সড়ক পরিবহন আইন-২০১৮” এর সুষ্ঠু প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে।

মন্তব্য: সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণহানি বেপরোয়াভাবে বাড়ছে। গত জানুয়ারি মাসে ৪২৭টি দুর্ঘটনায় ৪৮৪ জন নিহত হয়েছিল। গড়ে প্রতিদিন নিহত হয়েছিল ১৫.৬১ জন। ফেব্রুয়ারিতে প্রতিদিন নিহত হয়েছে গড়ে ১৮.৪৬ জন। এই হিসেবে ফেব্রুয়ারিতে প্রাণহানি বৃদ্ধির হার ১৮.২৬ শতাংশ।

মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় প্রাণহানি চরমভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। এসব দুর্ঘটনায় নিহতদের প্রায় সবার বয়স ১৩ থেকে ৪০ বয়সের মধ্যে। ৬টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় ১৬ জন যুবক নিহত হয়েছে, ২ জন গুরুতর আহত। অর্থাৎ প্রতিটি মোটরসাইকেলে ৩ জন করে আরোহী ছিল। সড়ক নিরাপত্তা বিষয়ে অজ্ঞতা, অবহেলা এবং ট্রাফিক আইনের প্রয়োগহীনতা এর প্রধান কারণ। দেশের কলুষিত রাজনীতি বেপরোয়া মোটরসাইকেল চালনায় উৎসাহিত করছে। মোটরসাইকেল ক্রয় ও চালনার ক্ষেত্রে ট্রাফিক আইনের প্রয়োগ এবং নিয়মিত মনিটরিং নিশ্চিত করতে না পারলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হবে। এই আতঙ্কজনক প্রেক্ষাপটে সরকার মোটরসাইকেলের নিবন্ধন ফিস কমানো এবং সিসি বা অশ্বশক্তি সীমা উন্মুক্ত করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে, যা মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা বৃদ্ধি করবে। বিষয়টি সরকারের ভেবে দেখা উচিত।

ফেব্রুয়ারিতে রেল ক্রসিংয়ে ৪টি দুর্ঘটনা ঘটেছে। দেশে ৮২% রেল ক্রসিং অরক্ষিত। এসব রেল ক্রসিংয়ের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। দুর্ঘটনায় ১৮ থেকে ৬৫ বছর বয়সী কর্মক্ষম মানুষ নিহত হয়েছেন ৪০৩ জন, অর্থাৎ ৭৮%। চিত্রটি ভয়াবহ! পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তির নিহত বা আহতের মধ্য দিয়ে অসংখ্য পরিবার পথে বসছে, হারিয়ে যাচ্ছে সামাজিক অর্থনীতির মূল স্রোত থেকে। ফলে দেশে বাড়ছে আর্থ-সামাজিক সংকট। অথচ সড়ক পরিবহন খাতে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠায় দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি নেই। পরিস্থিতি বিবেচনায় টেকসই পরিবহন নীতি প্রণয়নের মাধ্যমে গোটা পরিবহন ব্যবস্থা ঢেলে সাজানো অতীব জরুরি। এ বিষয়ে সরকারকে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হবে।