স্বাধীনতা সংগ্রামে মুক্তাগাছার বীরত্বগাথা

স্বাধীনতা সংগ্রামে মুক্তাগাছার বীরত্বগাথা
স্বাধীনতা সংগ্রামে মুক্তাগাছার বীরত্বগাথা

অধ্যাপক মুর্শেদ আলম খান: ৭০’র ঐতিহাসিক সাধারণ নির্বাচন। ১৯৭০ সালে ঘরোয়া রাজনীতি চালু হলে দেশব্যাপী রাজনৈতিক অঙ্গণ সরব হয়ে উঠে। সাধারণ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করা হয়। জনতার আন্দোলন সংগ্রামের স্রোতের গতি পাল্টে যায় নির্বাচনের দিকে।

সারা দেশের মতো মুক্তাগাছা হয়ে উঠে নির্বাচন মুখর। মুক্তাগাছার আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে একটা বড় ধরনের হোঁচট আসে। ব্যাপক জনপ্রিয়, সাংগঠনিকভাবে দক্ষ থানা ছাত্রলীগ সভাপতি অমৃত দে কে দল থেকে অব্যাহতি দেয়া হয়। এরই সাথে দল ত্যাগ করে ন্যাপ(ভাসানী) যোগ দেয় বলিষ্ঠ নেতা পরেশ চন্দ্র সাহা। পাশাপাশি সময়ে আততায়ীর হাতে নির্মমভাবে খুন হন তুখোর ছাত্রনেতা অমৃত দে। স্থবিরতা ভর করে মুক্তাগাছার রাজনীতির গতি পথে।

তবে থমকে যাওয়া ছাত্র রাজনীতিতে গতির সন্ঞ্চার হতে খুব একটা সময় লাগে নি। নতুনভাবে দায়িত্ব পাওয়া সভাপতি খবির উদ্দিন ভূইয়া, সাধারণ সম্পাদক ফজলুল হক দুদু এবং অন্যান্য পদে রহিম বাদশা, আবুল কাশেম প্রমুখ ছাত্রনেতাদের বলিষ্ঠ নেতৃত্বে ৩/৪ দিনের মধ্যে পুরোপুরি চাঙ্গা হয়ে উঠে ছাত্র রাজনীতি।

চলমান আন্দোলন সংগ্রামের পথ বেয়ে আসা নির্বাচনের জন্য চলে জোর প্রস্তুতি। নির্যাতন, নিপীড়ন, শোষণ, বন্ঞ্চনার শিকার পাকিস্তানের পূর্বাংশের সাড়ে সাত কোটি মানুষের জন্য এ নির্বাচন খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এ নির্বাচন বাঙ্গালীর অস্তিত্ব রক্ষার নির্বাচন। এ নির্বাচন পূর্ব পাকিস্তানীদের টিকে থাকার নির্বাচন। সমগ্র জাতির সাথে সাথে মুক্তাগাছাবাসীও সেটা রন্ধ্রেরন্ধ্রে অনুধাবন করেছে।

তাই সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে ভুল হয় নি। নির্বাচন শুরু হল। কোতয়ালী এবং মুক্তাগাছা নিয়ে গঠিত জাতীয় পরিষদের আসনে আওয়ামী লীগের মনোনয়নে প্রার্থী হলেন বিশিষ্ট আইনজীবি আওয়ামীলীগ নেতা সৈয়দ আব্দুস সুলতান। আর প্রাদেশিক পরিষদে আওয়ামী লীগ থেকে প্রার্থী হলেন তৎকালীন মুক্তাগাছাবাসীর অবিসংবাদিত নেতা বৃহত্তর ময়মনসিংহ জেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক খোন্দকার আ: মালেক শহীদুল্লাহ।

জাতীয় পরিষদে প্রতিদ্বন্দ্বীতাকারী অন্যান্য প্রার্থীরা হলেন এম এ হান্নান( মুসলিম লীগ),মনোরন্জ্ন ধর( কংগ্রেস), মুখলেছুর রহমান(নেজামে ইসলাম), হাফিজ উদ্দিন আহমেদ( কে,এস,পি), মাওলানা মো: আরিফ রব্বানী( জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম), মো: কাশেম আলী( পিডিপি), আ: মান্নান( স্বতন্ত্র), কেরামত আলী তালুকদার( মুসলিম লীগ), মো: হারেজ আলী মোল্লা( জামায়াতে ইসলাম), মাওলানা আবু তাহের( ন্যাপ মোজাফফর), ও এডভোকেট শরাফ উদ্দিন আহমেদ( স্বতন্ত্র)। ন্যাপ (ভাসানী) সারাদেশে নির্বাচন বয়কট করে।

নির্বাচন প্রচারণা তুঙ্গে। বিজয়ের প্রত্যাশয়ে নিজ নিজ প্রতীকে ভোট আর দোয়া প্রার্থনা চেয়ে প্রার্থীর পাশাপাশি নেতাকর্মী সমর্থকরা ছুটে বেড়াতে থাকেন ভোটারদের বাড়িতে বাড়িতে। শ্লোগান, মিছিল, মিটিং গণসংযোগসহ নানামুখী প্রচার প্রচারণায় জনপদ হয়ে উঠে সরগরম।

জাতীয় ওপ্রাদেশিক পরিষদ উভয় ক্ষেত্রে জাতীয় ওস্থানীয় বিভিন্ন ইস্যুর পাশাপামি খোন্দকার আ: মালেক শহীদুল্লাহর ঈষার্ণীয় জনপ্রিয়তার উপর ভর করেই চলে এ এলাকায় আওয়ামী লীগের নির্বাচনী প্রচারণা। দুটি নির্বাচন পরিচালনায় মূল দায়িত্ব পড়ে তারই উপরে।

৭ই জুনের একটি মামলায় গ্রেফতারী পরোয়ানা জারী হওয়ায় প্রকাশ্যে মিছিল, জনসভায় যোগ দেয়া তাঁর জন্য কঠিন হয়ে পড়ে। তাই কর্মী সমর্থকদের সাহায্য আর জনতার ভালবাসা নিয়ে অনেকটা পালিয়ে পালিয়েই হাট- বাজার, দোকানপাট,রাস্তার মোড়ে মোড়ে, বাড়ি বাড়ি গিয়ে ভোট প্রার্থনা আর দোয়া চেয়ে ঘুরতে থাকেন খোন্দকার আ: মালেক শহীদুল্লাহ।

তিনি রাজনীতি করেন। মানুষ তাকে চেনে। তাকে জানে,বুঝে এবং নেতা বলে মানে। এবার তিনি ভোটে নেমেছেন। তার প্রচারে পোস্টার লাগবে কেন। তাই সিদ্ধান্ত নিলেন নিবার্চনী প্রচারে কোন পোস্টার তিনি ব্যাবহার করবেন না। অন্যান্যদের মার্কা সংবলিত পোস্টার শোভা পাচ্ছে সবর্ত্র। একমাত্র তাঁরই পোস্টার নেই। নির্বাচনী পরিস্থিতি জানাতে ঢাকায় গিয়ে বঙ্গবন্ধুর সাথে দেখা করলেন তিনি।

 বঙ্গবন্ধু সবশুনে তাকে পোস্টার নিয়ে যেতে বললেন। বঙ্গবন্ধুকে তিনি জানিয়ে দিলেন তিনি নির্বাচনে কোন পোস্টার ব্যবহার করবেন না। তাই বঙ্গবন্ধু তাকে কিছু না বলে তাঁর সংগে আসা মুক্তাগাছা থানা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক ফজলুল হক দুদুকে ইশারায় আড়ালে ডেকে নিয়ে বললেন তাঁর কথা( বঙ্গবন্ধুর) বলে ইত্তেফাক অফিসে সাংবাদিক সৈয়দ শাহজাহানের কাছ থেকে বিশ হাজার হ্যান্ডবিল ছাপিয়ে নিয়ে যেতে। সেই হ্যান্ডবিল,টিনের চুঙ্গা,আর থানা আওয়ামী লীগের একমাত্র নিজস্ব মাইকের মাধ্যমে শুরু হয় নির্বাচনী প্রচারণা।

থানা আওয়ামী লীগের কোষাধ্যাক্ষ মেহের আলী সরকারের দরিচারআনি বাজারের টিনসেট ঘরটি (বিনা ভাড়ায়) ছিল আওয়ামী লীগের দলীয় অফিস। নির্বাচন পরিচালনার পাশাপাশি আগে থেকে দলীয় কর্মকান্ড পরিচালনার কেন্দ্র বিন্দুতে পরিণত হয় এই অফিসটি। মুক্তাগাছার তৎকালীন রাজনীতি, আন্দোলন সংগ্রামসহ বহু গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রমের রাজসাক্ষী এই টিন সেট ঘরটি।

দক্ষতার সাথে অফিস পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন ভাষা সৈনিক গিয়াস উদ্দিন আহমেদ। থানা আওয়ামী লীগের সভাপতি মৌলভী ইয়াকুব আলী, সাধারণসম্পাদক এডভোকেটশামসুল হক(পরবর্তীতে এম পি), শহর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শিশির কুমার রক্ষিত, থানা ছাত্রলীগের সভাপতি খবির উদ্দিন ভূঁইয়া ও সাধারণ সম্পাদক ফজলুল হক দুদু, ( পরবর্তীতে উপজেলা চেয়ারম্যান), সুভাষ চন্দ্র রক্ষিত, আবুল কাশেম, বশির উদ্দিন,শ্রমিক নেতা হায়াতুল্লাহ ফকির সহ আওয়ামী লীগের সকল অঙ্গ সংগঠনের নেতাকর্মীরা ঐক্যবদ্ধভাবে অক্লান্ত শ্রম দিলেন নির্বাচনে। সে সময় মাইকের ব্যবহার ছিল সীমিত।

থানা আওয়ামীলীগের একমাত্র মাইকটি প্রচারনার জন্য ব্যবহার করা হত। তার সাথে নিতাই ও কামাল এই দুইজন কর্মী টিন কেটে চুঙ্গা তৈরী করতো যা প্রচারে ব্যবহার করা হত। ডিসেম্বর ভোটের দিন। ভোটারদের স্বত:স্ফুর্ত উপস্থিতিতে সরগরম হয়ে উঠে ভোট কেন্দ্রগুলো।

ব্যাপক উদ্দীপনায় সকাল থেকে দিনব্যাপী চলে টানা ভোট গ্রহন। নেতা কর্মীদের এত দিনের নি:স্বার্থ শ্রম সার্থক হয়ে ধরা দেয় যখন দিনের শেষে ভোটের ফলাফল প্রকাশিত হয়। ফলাফলে আওয়ামী লীগের দুই প্রার্থী জাতীয় পরিষদে সৈয়দ আব্দুল সুলতান এবং প্রাদেশিক পরিষদে খোন্দকার আ: মালেক শহীদুল্লাহ বিপুল ভোটের ব্যবধানে জয়ী হন।

মানুষের বিজয়ের আনন্দে ভাসতে থাকে মুক্তাগাছা।সারাদেশের মত মুক্তাগাছার রাজনৈতিক পরিস্থিতিও পুরোপুরি আওয়ামী লীগের দখলে চলে আসে। এবার জনতার রায়ে পাওয়া কাঙ্খিত ক্ষমতা হাতে পাবার পালা। অধীর আগ্রহে ক্ষমতা বদলের অপেক্ষায় থাকে মুক্তাগাছাবাসী।

সূত্র: মুর্শেদ আলম খান ও এম ইদ্রিস আলীর লেখা মুক্তিযুদ্ধে মুক্তাগাছা বই থেকে।

চলবে পর্ব-২