ইউনেস্কো-ব্রাজিলের উদ্যোগে সাংষ্কৃতিক উপস্থাপনায় মাতৃভাষা দিবস পালন

ইউনেস্কো-ব্রাজিলের উদ্যোগে সাংষ্কৃতিক উপস্থাপনায় মাতৃভাষা দিবস পালন
ইউনেস্কো-ব্রাজিলের উদ্যোগে সাংষ্কৃতিক উপস্থাপনায় মাতৃভাষা দিবস পালন

নিউজ ডেস্ক: মহান একুশে ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষ্যে এবছরের ইউনেস্কো প্রতিপাদ্য “ফস্টারিং মাল্টিলিঙ্গুয়ালিজম ফর ইনক্লুসন ইন এডুকেশন অ্যান্ড সোসাইটি “-এর আলোকে বাংলাদেশ দূতাবাস ব্রাসিলিয়া যথাযথ মর্যাদায় উদ্দীপণাপূর্ণ প্রানবন্ত পরিবেশে দুই দিনব্যাপী বিভিন্ন কর্মসূচীর মাধ্যমে মহান শহিদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের উদযাপন করে।

বিগত দু’বছরের সাফল্যের ধারাবাহিকতায় এবারও ইউনেস্কো-ব্রাজিল ও রাজধানী ব্রাসিলিয়া সরকারের সংষ্কৃতি ও শিক্ষা বিভাগের সহযোগিতায় ব্রাজিলের ২১ কোটি জনগণ এবং এদেশে বসবাসকারী লক্ষ লক্ষ বিদেশির কাছে একুশের বার্তা পৌঁছে দেবার নিমিত্ত্ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের অংশগ্রহণে একটি বড় আকারের বহুজাতিক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উদযাপনের পরিকল্পনা ও প্রস্তুতি ছিল। করোনা ভাইরাস পরিস্থিতি এবং এ সংক্রান্ত স্বাস্থ্য নির্দেশনার প্রেক্ষিতে দূতাবাস ভিন্ন আঙ্গিকে দু’টি ভিন্ন অনুষ্ঠানের মাধ্যমে দিবসটি উদযাপন করে।

মহান শহিদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উদযাপনের প্রথম পর্যায়ে একুশের সকালে শার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্স কর্তৃক জাতীয় পতাকা অর্ধনমিতকরণের মাধ্যমে সূচিত এ অনুষ্ঠানের শুরুতেই মহান ভাষা আন্দোলনে আত্মোৎসর্গকারী শহিদদের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়।

প্রবাসী বাংলাদেশী ও দূতাবাস পরিবারের সদস্যদের সাথে দূতাবাসে স্থাপিত শহিদ মিনারে পুষ্পস্তবক অৰ্পন করেন।

দূতাবাসে আয়োজিত এ অনুষ্ঠানে শহিদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষ্যে মহামান্য রাষ্ট্রপতি, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, মাননীয় পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও মাননীয় পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর বাণী পড়ে শোনানো হয়। অনুষ্ঠিত আলোচনাসভায় প্রবাসী বাংলাদেশীসহ আলোচকরা বায়ান্নর শহিদদের স্মৃতিতে শ্রদ্ধার্ঘ নিবেদন করে বলেন যে, বাঙালির ভাষা আন্দোলনই ছিল বাঙালি জাতির স্বাধীনতা সংগ্রামের সূত্রপাত। স্বাধীন বাংলাদেশে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সোনার বাংলা বাস্তবায়নে নিজ নিজ অবস্থান থেকে ভূমিকা রাখার বিষয়ে প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।

বক্তাগণ প্রবাসী বাংলাদেশীদের তাঁদের সন্তানদের সাথে বাংলা ভাষায় কথা বলতে এবং বাংলাদেশ এবং বাংলা ভাষাকে নিয়ে গর্ববোধ করার আহ্বান জানান। আলোচনা সভায় অন্যতম প্রধান আলোচক হিসেবে দূতাবাসের সামরিক উপদেষ্টা খ্রিঃ পূর্ব ৬০০ সাল থেকে বাংলা ভাষার বুৎপত্তি এবং ক্রমবিকাশ আলোচনা করেন।

আলোচনা সভায় শার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্স ভাষাশহীদদের সর্বোচ্চ ত্যাগের মহিমায় দীক্ষিত হয়ে তাঁদের স্বপ্নের শোষণ বঞ্চনাহীন এক বাংলাদেশ গড়ে তোলার লক্ষ্যে কাজ করার জন্য সকলকে আহ্বান জানান। তিনি বলেন ভাষা আন্দোলন আমাদের স্বাধীনতার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিল যা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে দুই দশক সংগ্রাম ও ত্যাগ-তিতিক্ষার মধ্য দিয়ে একাত্তরে চুড়ান্ত পরিণতি লাভ করে।

তিনি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর জন্য প্রাক-প্রাথমিক ও প্রাথমিক স্তরে মাতৃভাষা ভিত্তিক শিক্ষার প্রবর্তনসহ মাতৃভাষার সুরক্ষা, সংরক্ষণ ও প্রচারের জন্য বাংলাদেশ সরকারের নেয়া উদ্যোগের উপর আলোকপাত করেন।

অনুষ্ঠানে বলিভিয়া ভিত্তিক সংগঠন Global Voice প্রথম বারের মতো প্রবর্তিত আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা পুরষ্কারের জন্য নির্বাচিত হওয়ার খবরটি উপস্থিত সকলকে পুলকিত করে। করোনা প্রাদুর্ভাব কেটে যাবার পর বৈশ্বিক পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে দূতাবাস একটি বড় অনূষ্ঠান আয়োজনের মাধ্যমে Global Voice-র পরিচালক জনাব Eddie Avila-র হাতে পুরষ্কার তুলে দেয়া হবে বলে অনুষ্ঠানে ঘোষণা করা হয়।

মহান শহিদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উদযাপনের দ্বিতীয় পর্যায়ে ইউনাস্কো-ব্রাজিল ও রাজধানী ব্রাসিলিয়া সরকারের সহযোগিতায় শুক্রবার, ২৬ ফেব্রুয়ারি, ২০২১ তারিখ ব্রাজিল সময় সকাল ১০ টায় (বাংলাদেশ সময় সন্ধ্যা ৭ টায়) একটি ভার্চ্যুয়াল বর্ণাঢ্য বহুজাতিক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠা্নের আয়োজন করে। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের পূর্বে অনুষ্ঠিত আলোচনা পর্বে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র সচিবের ভিডিও বার্তা প্রচার করা হয়। পররাষ্ট্র সচিব তাঁর বক্তব্যে মহান একুশে উদযাপনে সহযোগিতা করার জন্য ইউনেস্কো-ব্রাজিলকে ধন্যবাদ জানান।

একটি স্থায়ী শহীদ মিনার স্থাপনের নিমিত্ত জায়গা বরাদ্দ করার জন্য ব্রাসিলিয়ার গভর্নরকে ধন্যবাদ জানান। বাঙালির মাতৃভাষায় কথা বলার অধিকার রক্ষায় শহীদদের স্মৃতিবিজড়িত একুশে আজ আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের মর্যাদায় অভিষিক্ত। বিভিন্ন দেশের জনগণের কাছে বাংলাদেশের ভাষা, সংস্কৃতি এবং ঐতিহ্য তুলে ধরার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ দূতাবাস আরো জোড়ালো ভূমিকা রাখবে।

ইউনেস্কো ও ব্রাসিলিয়া সরকারের প্রতিনিধিবৃন্দ তাঁদের বক্তব্যে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের গুরুত্বের প্রতি আলোকপাত করে এবিষয়ে কাজ করে যাওয়ার জন্য তাঁদের অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন।

অনুষ্ঠানের সাংস্কৃতিক পর্বে বাংলাদেশের উপস্থাপনায় “আমার ভায়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি, আমি কি ভুলিতে পারি”  স্প্যানিশ ফ্লামিংগো, ব্রাজিলের ইউনেস্কো-স্বীকৃত ঐতিহ্য কাপোয়েইরার বা ফোঁহো এন্ড সাম্বার মনমাতানো পরিবেশনা, জাপানের হিকারীদাইকো-তাইকো ড্রামের উচ্চনিনাদের পরিবেশনা, আর্জেন্টিনার বিশ্বখ্যাত ট্যাংগো, গ্রিসের পরিবেশনায় হেলেনিক সংষ্কৃতির একগুচ্ছ উপস্থাপন, কিউবার মনমাতানো আর রুদ্ধশ্বাস সালসা পরিবেশনা, ব্রাজিলের স্বনামধন্য সঙ্গীতশিল্পী আনা লেলিয়া-র পরিবেশনায় ‘শান্তির’ গানের মূর্ছনা, দর্শকমাতানো মিসরের ঐতিহ্যবাহী লোকনৃত্য, জ্যামাইকার পরিবেশনায় “সিয়ার স্বপ্ন”, সিরিয়ার কণ্ঠশিল্পী দিয়ালা ফায়াদের সুরেলা আরবি সঙ্গীতের পরিবেশনা, এসবই উপভোগ করেন অনলাইনে কয়েক হাজার মানুষ। বিশ্বের সকল মহাদেশ থেকে বিভিন্ন দেশে বসবাসকারী বাংলাদেশীরা অনুষ্ঠানটি উপভোগ করেন।

ঢাকানিউজ২৪.কম