স্বাধীনতা সংগ্রামে মুক্তাগাছার বীরত্বগাথা

স্বাধীনতা সংগ্রামে মুক্তাগাছার বীরত্বগাথা
স্বাধীনতা সংগ্রামে মুক্তাগাছার বীরত্বগাথা

মুর্শেদ আলম খান:  মুক্তাগাছার রাজনৈতিক পেক্ষাপট(১৯৪৭ থেকে ৬৯) ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট তথাকথিত স্বাধীনতা লাভ বাঙ্গালী জাতির জন্য মূলত কোন সুফল বয়ে আনতে পারে নি।

এর ফলে গাঙেয় অববাহিকার এই জনগোষ্ঠী ইংরেজদের অধীনতা পাশ থেকে মুক্তি পেয়ে পশ্চিম পাকিস্তানী বেনিয়া শাসকচক্রের শিকার হয়ে পড়ে।

নব্য সৃষ্ট রাষ্টের বছর না পেরোতেই উর্দুভাষী শাসক চক্র প্রথম আঘাত হানে বাঙ্গালীর ভাষার উপর। সংখ্যা লঘিষ্ঠ পশ্চিমাগোষ্ঠী সংখ্যা গরিষ্ঠের পূর্ববাংলাকে উপনিবেশে পরিণত করে বাঙ্গালির কৃষ্টি,কালচার,অর্থনীতি এমনকি রাজনীতি নিয়ন্রণে রাখাতে প্রয়াসী হয়। ফলে সংঘর্ষ অনিবার্য হয়ে উঠে।

শুরু থেকেই নানামুখী নির্যাতন, নিপীড়ণ, শোষণ, বন্ঞ্চনার শিকার জাতি, অবস্থা পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তা অনুধাবন করতে সক্ষম হয়ে উঠে, বৈরী প্রকৃতির বিরুদ্ধে লড়াই করে বেড়ে উঠা বাঙ্গালী জাতি। ব্রিটিশ শাসক মুক্ত হয়ে পাকিস্তানের ভাগে পড়া বাঙ্গালী জাতিকে তার চূড়ান্ত বিজয় অর্জন পর্যন্ত বার বার কঠিন পরীক্ষায় সন্মুখীন হতে হয়েছে।

মুক্তাগাছার রাজনিতি–  মুত্তির আন্দোলনে মুক্তাগাছার আপমর মানুষ সমবেত হলে পুলিশী বাধায় জনতা ছত্রভঙ্গ হয় এবং      কিছু স্বাধীনতা কামী লোকে পুলিশ আটক করে।  গ্রেফতার কৃতদের ময়মনসিংহ জেলে পাঠিয়ে দেয়া হয়। এতে জনতার আন্দোলন থামে নি বরং আরও বেগবান হয়।

ব্যাপক নির্যাতন নিপীড়নের মাঝেও কঠোর ভাবে পালিত হয় সাত জুনের কর্মসূচী। ঢাকা, নারায়নগন্ঞ্চে,ময়মনসিংহ,   মুক্তাগাছায় পালিত কর্মসূচি কেন্দীয় ভাবে আলোচনায় স্থান পায়। এবিষয়টি বঙ্গবন্ধু তাঁর এক বিবৃতিতে উল্লেখ করেছিলেন।

১৯৬৯ এর গণ আন্দোলনের উত্তাল ঢেউ এসে ধাক্কা দেয় মুক্তাগাছায়। আন্দোলন সংগ্রামে জেগে উঠে জনতা। নানা কারণে মুক্তাগাছা তখন ময়মনসিংহের রাজনৈতিক আন্দোলনে মুখ্য ভূমিকা রাখে।

২৪ জানুয়ারী ময়মনসিংহ শহরে আন্দোলনরত অবস্থায় কলেজ ছাত্র আলমগীর মনসুর মিন্টু পুলিশের গুলিতে নিহত হলে এ অন্ঞ্চলে আন্দোলন আরও জোরদার হয়।।

আন্দোলন দমাতে জেলা আওয়ামীলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক খোন্দকার মালেক শহীদুল্লাহ,ন্যাপ নেতা কাজী আ: বারীসহ ময়মনসিংহে অসংখ্য নেতাকর্মীকে পুলিশ গ্রেফতার করে জেলে নিয়ে যায়।গ্রেফতার অভিযান চলতে থাকে সর্বত্র।

মুক্তাগাছায় আন্দোলনকারীরা মুসলিম লীগের অফিস এবং থানা মুসলিম লীগের সাধারণ সম্পাদক আ: হেকিম চেয়ারম্যানের বাড়িতে হামলা চালিয়ে ভাংচুরকরে। এ ঘটনায় আওয়ামী লীগ ও ন্যাপের ৪৯ জন নেতাকর্মীকে আসামী করে মামলা করা হয়।

আন্দোলন দমাতে পুলিশ ও ইপিআরের তৎপরতা বৃদ্ধি করা হয়। তবুও আন্দোলন থামে নি বরং জনতার স্বত:স্ফুর্তঅংশ গ্রহণে আন্দোলন আরও জোরদার হয়।

জমিদার বাড়ির সামনের মাঠে মনঞ্চ করে স্বত:স্ফুর্তভাবে একুশে ফেব্রুয়ারীর কর্মসূচী পালিত হয়। সেখানে শেরপুর সহ বিভিন্ন এলাকা থেকে আগত শিল্পীদের অংশ গ্রহণে দিনব্যাপী গণ সংগীত পরিবেশিত হয়। এদিন রাতে গাবতলী উচ্চ বিদ্যালয়ের দুইজন ছাত্রকে পুলিশ গ্রেফতার করে থানায় নিয়ে আসে।

এ সংবাদ ছড়িয়ে পড়লে পরদিন সকালে হাজার হাজারজনতা তাদের ছাড়িয়ে নিতে থানা ঘেরাও করে। জনতা তাদের মুক্তির দাবিতে শ্লোগান দিতে থাকে। কেউ কেউ পটকা ফাটিয়ে জনতাকে উচ্ছসিত করতে থাকে। থানা প্রশাসন পরিস্থিতি শান্ত করতে নানা ভাবে চেষ্টা চালান। কিন্তু আগত জনতা দৃঢপ্রত্যয়ের সাথে সংঘবদ্ধ হয়।  গ্রেফতারকৃত দুইজনকে ছাড়িয়ে না নিয়ে বাড়ি ফিরবে না।

পরিস্থিতি উল্টো বুঝতে পেরে ময়মরসিংহ থেকে একজন ম্যাজিস্ট্রেট সহ  অতিরিক্ত পুলিশ আনা হয়। বড় ধরনের সংঘর্ষের আশংকায় অ্যাম্বুলেন্স প্রস্তুত রাখা হয়। হাবিবুর রহমান ও পরেশ চন্দ্র সাহার নেতৃত্বে ছাত্র নেতারা থানার ভেতরে ম্যাজিস্ট্রেট ও ওসির সাথে বৈঠকে বসেন।

সেখানে আটককৃতদের ছেড়ে দেয়া নিয়ে আলোচনা চলতে থাকে। বাহিরে জনতার শ্লোগান চলতে থাকে। প্রশাসন আটককৃতদের আদালতে সোপর্দ ব্যাতিত ছাড়তে রাজী না হওয়ায় আলোচনা ভেঙ্গে যাওয়ার উপক্রম হয়। ফলে পরিস্থিতি আরো উত্তপ্ত হয়ে উঠে।

অ্যাকশনের পুরো প্রস্তুতি নেয় পুলিশ। এমন সময় আগরতলা ষড়ষন্ত্র মামলায় আটক শেখ মুজিবুর রহমানসহ সকল রাজবন্ধিদের মুক্তি দেয়া হয়েছে মর্মে রেডিওতে ঘোষণা দেয়া হয়। ঘোষণা শুনার পর আটক দুই ছাত্র নেতাকে তাৎক্ষনিক ছেড়ে দেয়া হয়। জনতা তাদের সংগে নিয়ে সেদিন শহরে মিছিল করে। আন্দোলন সংগ্রামের পথ পেড়িয়ে আসে ১৯৭০ এর নির্বাচন।

চলবে পর্ব-১