ভাষা সৈনিক খোন্দকার আব্দুল মালেক শহীদুল্লাহ

মুর্শেদ আলম খান

খোন্দকার আব্দুল মালেক শহীদুল্লাহ ৫২’ র ভাষা আন্দোলন থেকে ৭০ ‘ র নির্বাচন অত:পর ৭১’ এ স্বাধীনতা যুদ্ধ । প্রতিটি আন্দোলন সংগ্রামে কখনও সক্রিয় কর্মী, কখনো দক্ষ সংগঠক, কখনো বা জনতার নিরঙ্কুশ রায়ে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি। স্থান, কাল, পরিবেশ, পরিস্থিতি বিবেচনায় দায়িত্ব পালনে এতটুকু পিছপা হননি। বরং প্রতিটি ক্ষেত্রে বৃহত্তর ময়মনসিংহ অঞ্চলের দেশ প্রেমিক জনতাকে সংগে নিয়ে এগিয়ে চলেছেন ।

১৯৬৩ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারী ময়মনসিংহের শ্যমগন্ঞ্জে পিতার কর্মস্থলে খোন্দকার আব্দুল মালেক শহীদুল্লাহ জন্ম গ্রহন করেন।তাঁর পিতার নাম খোন্দকার আব্দুল মান্নান একজন ডাক্তার ছিলেন। তাঁর মাতা করিমননেছা ছিলেন একজন গৃহিনী।দুই ভাই ওপাঁচ বোনের মধ্যে তাঁর অবস্থান ছিল দ্বিতীয়।

খোন্দকার মালেক শৈশব থেকে দূরন্ত প্রকৃতির ছিলেন। অত:পর তিনি পিতার কর্মস্থল দেওয়ানগন্ঞ্জ কো- অপারেটিভ হাইস্কুলে ভর্তি হন। সেই সময় ৯ ম শ্রেণীতে অধ্যয়নরত অবস্থায় যখন দেশে মাতৃভাষা রক্ষার আন্দোলন শুরু হয়, তখন সেখানে গঠিত রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের যুগ্ম আহবায়ক ছিলেন। আন্দোলনে সক্রিয় থাকায় গ্রেফতার এড়াতে আত্ন গোপনে চলে যান। আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে জড়িয়ে পড়ায় তাঁর পক্ষে পড়াশুনা চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হয় নি। ফলে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পাঠ চুকিয়ে ঢুকে যান সক্রিয় রাজনীতিতে।তিনি মুসলিমলীগ বিরোধী ছাত্রকর্মী শিবির এর দেওয়ানগন্জ থানাশাখার নির্বাচিত আহবাহক হয়ে ১৯৫৪’র নির্বাচনে যুক্তফ্রন্ট প্রার্থীর পক্ষে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেন।

১৯৫৫ সালের ১১ জুন বাবার বদলির কারনে চট্টগ্রামে চলে গেলে তিনি সপরিবারে মুক্তাগাছায় চলে আসেন। মুক্তাগাছায় এসে ১৯৫৬ সালে গিয়াস উদ্দিন আহমেদ আহবায়ক এবং তিনি যুগ্ম আহবায়ক হয়ে শাসনতন্ত্র প্রতিরোধ কমিটি নামে একটি সংগঠন করার মধ্য দিয়ে মুক্তাগাছায় সক্রিয় রাজনীতি শুরু করেন। গভর্ণর শাসন শুরু হলে তাঁর নেতৃত্বে মুক্তাগাছায় খাদ্য সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয়। এ সময় ময়মনসিংহ হতে ত্রিশ ট্রাকভর্তি সরকারী চাউল টাঙ্গাইলে যাওয়ার পথে তাঁর নেতৃত্বে খাদ্য সংগ্রাম পরিষদের সদ্স্যদের উপস্থিতিতে থানার সামনে থেকে মাত্র ৫০ পয়সা কেজি মূল্যে পরিবার প্রতি পাঁচ সের হারে দুর্ভিক্ষ কবলিত অনাহারী মানুষের চাল বিক্রীর ব্যবস্থা করেন। বিক্রয় লব্দ টাকা থানার মাধ্যমে সরকারী কোষাগারে জমা দিয়ে দেন। গর্ভণর শাসনকালে চরম খাদ্যাভাব দেখা দিলে খাদ্য সংগ্রাম পরিষদের উদ্যোগে তাঁর নেতৃত্বে কয়েক হাজার মানুষ মুক্তাগাছা থেকে ভুখা মিছিল করে পায়ে হেটে ময়মনসিংহ যান ।

১৯৫৬ সালের প্রথম দিকে মুক্তাগাছা থানা আওয়ামী লীগ গঠিত হলে মুজাটি গ্রামের আ: খালেক সভাপতি এবং তিনি সাধারন সম্পাদক হন। অল্প সময়ের মধ্যে তাঁর বলিষ্ঠ নেতৃত্ব সকলে মাঝে আস্থা স্থাপনে সক্ষম হয়। মুক্তাগাছা পূর্ব পাকিস্তান যুবলীগ, পাট শ্রমিক ইউনিয়ন, রিক্সা শ্রমিক ইউনিয়নও বিড়ি শ্রমিক ইউনিয়ন গঠিত হলে সবগুলো কমিটিতে তাকে সভাপতি নির্বাচিত করা হয়। গভর্ণর প্রথা বিলুপ্ত হলে থানা আওয়ামী লীগ পূর্ণগঠিত হয়। তখন কারানির্যাতিত ভাষাসৈনিক বিভূতি ভূষণ আর্চায্য চৌধুরী সাধারন সম্পাদক এবং তিনি সাংগঠনিক সম্পাদক হন। ১৯৫৭ সালে আওয়ামী লীগ ভাঙ্গে ন্যাপ গঠিত হলে খোন্দকার মালেক শহিদুল্লাহ থানা আওয়ামী লীগের সাধারন সম্পাদক নির্বাচিত হন। এ সময় তাকে সভাপতি করে হরিজন ইউনিয়ন গঠিত হয়।

১৯৫৯ এ বৃহত্তর ময়মনসিংহে স্বাধীন পূর্ব বাংলা সংগ্রাম পরিষদ গঠনে তাঁর সক্রিয় অংশ গ্রহন ছিল। ১৯৬০/৬১ সালে মুক্তাগাছায় সাহিত্য সম্মেলন হয়। তৎকালীন থানার ওসি খোরশেদ আলম সভাপতি, থানা কৃষি অফিসার সাধারন সম্পাদক, এবং খোন্দকার আ: মালেক শহীদুল্লাহ ও আর কে হাইস্কুলের শিক্ষক সন্জিব গুহকে যুগ্ম সম্পাদক করে ১৩ সদস্যের সম্মেলন কমিটি গঠিত হয়। হঠাৎ প্রশাসনের চাপের মুখে ওসি ও কৃষি অফিসারসহ দশজন পদত্যাগ করায় সম্মেলন নিয়ে সাহিত্য পরিষদ মহাসংকটে পড়ে যায়। পরে সকলের সম্মতিক্রমে খোন্দকার মালেক শহীদুল্লাহর নেতৃত্বে সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এই সম্মেলনে হাজার হাজার মানুষ রাত ১ টা পর্যন্ত উপস্থিত থেকে কার্যক্রমকে সার্থক করেন।সম্মেলনে প্রধান অতিথি খ্যাতিমান সাহিত্যিক ড: আলাউদ্দিন আল আজাদ তাঁর বক্তবের এক পর্যায়ে বলেন এ পর্যন্ত বহু সম্মেলনে অংশ গ্রহন করেছি কিন্তু আজকের এ সম্মেলনের মতো এত জনতার উপস্থিতি এবং স্বত: স্ফুর্ততা আমি আর কোথাও দেখি নি।এ জন্য তিনি মুক্তাগাছাবাসী ও আয়োজক কমিটির ভূয়সী প্রশংসা করেন।

সেই কমিটির নেতৃত্বে মুক্তাগাছায় রবীন্দ্র- নজরুল জয়ন্তী পালিত হয়। সেখানে খোন্দকার মালেক শহীদুল্লাহর আমন্ত্রণে সৈয়দ নজরুল ইসলাম ও সৈয়দ মো: আ: সুলতান বক্তব্য রাখেন। মুক্তাগাছায় ঘটা করে রবীন্দ্র শতবার্ষিকী উদযাপন উপলক্ষে শক্তিশালী কমিটি গঠিত হয়। কমিটিতে তৎকালীণ সার্কেল অফিসার মহিউদ্দিন আহমেদ সভাপতি, খোন্দকার আ: মালেক শহীদুল্লাহ সম্পাদক, খোন্দকার আব্দুল রহিম বি এল, বকুল আচার্য্য চৌধুরী ও কলম আলী উকিল( সাবেক এম এল এ) যুক্ত ছিলেন । সরকারের বাধার মুখে তা উদযাপন সম্ভব হয় নি।

১৯৬২ সালে সামরিক শাসনের শেষের দিকে তিনি এবং আবু তাহের ছানা মিয়া ( উপজেলা আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি) নেতৃত্বে একটি ভূখা মিছিল সার্কেল অফিসার( সি ও) অফিস ঘেরাও করে। ১৯৬৩ সালে প্রলংকারী ঘূর্ণী ঝড়ে দেশের উপকূল এলাকায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। তখন তাঁর আহবানে ক্ষতিগ্রস্থদের সাহায্যার্থে মুক্তাগাছার মানুষ এগিয়ে আসে। নিতাই কুন্ডুর নেতৃত্বে একটি শিল্পীদল “ভিক্ষা দাও হে পৌরবাসি’ গানটি গেয়ে বাড়ি বাড়ি গিয়ে খাদ্য সামগ্রী সংগ্রহ করে। তখন আক্রান্তদের সাহায্যার্থে নতুন- পুরাতন কাপড়, এগার শতাধিক বরাক বাঁশ, ছনের ঘরের ফ্রেম, খাদ্য সামগ্রী সহ সংগৃহীত যাবতীয় জিনিস ঘূর্ণীঝড় আক্রান্ত চট্টগ্রামের উপকূল বাড়ির মাঝে বিতরণ করা হয়।

১৯৬৪ সালে আওয়ামীলীগ পূর্ণগঠিত হলে তিনি থানা কমিটির আহবায়ক এবং পূর্ব পাকিস্তান কৃষক সমিতির জেলা কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক নির্বাচিত হন। ১৯৬৪ সালে পূর্ব পাকিস্তান কৃষক সমিতির সমাবেশ মুক্তাগাছা আর কে হাইস্কুলে করার লক্ষে প্রস্তুতি কমিটি গঠিত হলে পূর্ব পাকিস্তান ন্যাপের সহসভাপতি এ কে সিরাজুল ইসলাম উকিল সেখানে সভাপতি এবং খোন্দকার আব্দুল মালেক শহীদুল্লাহ সাধারন সম্পাদক হন। সম্মেলনে সভাপতিত্ব করার কথা ছিল মাওলানা আ: হামিদ খাঁন ভাসানীর। মাওলানার নির্দেশে সম্মেলন স্থগিত করা হয়। পরে কাউন্সিল করে থানা আওয়ামীলীগের কমিটি হলে মৌলভী ইয়াকুব আলী সভাপতি ও তিনি সাধারন সম্পাদক নির্বাচিত হন। এ সময় আওয়ামী লীগের ডাকা হরতালে বাঁধা দেয়া নিয়ে মুসলিম লীগের কর্মীদের সাথে গন্ডগোল হয়। তিনি এবং আব্দুল রশিদ কালামিয়া ও শিশির কুমার রক্ষিত গ্রেফতার হন।

জেল থেকে বের হয়ে দেখেন এলাকায় কলেরার মহামারী। তখন তাঁর নেতৃত্বে ডা: অবনি কান্ত স্যানাল, ডা: আনোয়ারুল হক লস্কর, ডা: হাসান আলী খান সহ বিশিষ্ট চিকিৎসক ও ব্যাক্তিদের সমন্বয়ে টীম গঠন করে চিকিৎসা সেবা দিয়ে বহু লোকের প্রাণ বাঁচাতে সক্ষম হন। পৌরসভা নির্বাচন এলে মুসলিম লীগ প্রার্থী আপন চাচা খোন্দকার আ: মজিদকে বিপুল ভোটের ব্যবধানে পরাজিত করে পৌর কমিশনার নির্বাচিত হন। ১৯৬৪ সালে পূর্ব পাকিস্তান বিড়ি শ্রমিক সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হলে তিনি যুগ্ম আহবায়ক হন। আহবায়ক ছিলেন তৎকালীণ বাম নেতা সাংবাদিক ও পরবর্তীতে মন্ত্রী সিরাজুল হোসেন খান। 

তিনি ১৯৫৭ সালে দৈনিক ইত্তেফাকের মুক্তাগাছার সংবাদদাতা ছিলেন এবং ১৯৬২ সালে দৈনিক সংবাদের ময়মনসিংহ জেলার নিজস্ব সংবাদদাতা হিসেবে সাংবাদিকতা করেন। এ সময় সংবাদে নব নির্বাচিত এম, এন, এ ‘দের সাক্ষাৎকার পড়ে তাঁর এক রিপোর্টিং এর কারনে ঢাকায় বিমানবন্দরে ছাত্র জনতার হাতে মোনায়েম খান লান্ঞ্চিত হন। ১৯৬৬ সালের ১০ ই মার্চ আওয়ামীলীগের সাধারন সম্পাদক শেখ মুজিবর রহমান মুক্তাগাছায় আসেন। দরিচারআনি বাজারে ( তখন বড় মাঠ ছিল) জনসভায় হাজার হাজার জনতা উপস্থিত ছিল। সভায় সভাপতিত্ব করেন মৌলভী ইয়াকুব আলী। খোন্দকার আব্দুল মালেক শহীদুল্লাহর দক্ষ পরিচালনায় সভায় শেখ মুজিবর রহমান ছাড়াও সৈয়দ নজরুল ইসলাম, আব্দুল মমিনসহ আওয়ামী লীগের প্রথম সারির নেতারা বক্তব্য রাখেন। একই বছর বৃহত্তর ময়মনসিংহ জেলা আওয়ামী লীগের সম্মেলনে সৈয়দ নজরুল ইসলাম সভাপতি, রফিক উদ্দিন ভূইয়া সাধারন সম্পাদক এবং খোন্দকার আব্দুল মালেক শহীদুল্লাহ সাংগঠনিক সম্পাদক নির্বাচিত হন।

১৯৬৬ সালের ৭ ই জুন দরিচারআনি বাজারে ৬ দফার সমর্থনে আহুত জনসভায় বক্তব্যরত অবস্থায় গ্রেফতার হন। গ্রেফতারের খবর ছড়িয়ে পড়লে বিভিন্ন গ্রাম থেকে প্রায় ১৫/২০ হাজার জনতা প্রিয় নেতাকে গ্রেফতারের প্রতিবাদে থানা ঘেরাও করে। পরিস্থিতি বেগতিক দেখে প্রশাসন ময়মনসিংহ থেকে অতিরিক্ত পুলিশ ও ই পি আর এনে উপস্থিত জনতার উপর বেপরোয়া লাঠীর্চাজ করে। প্রায় এক হাজারেরও অধিক লোক আহত হয়। এ সময় সাতজন আটক হন। পরে জনতা স্বেচ্ছায় কারাবরণের জন্য অবস্থান নিলে প্রশাসন ও ময়মনসিংহ থেকে আসা নেতৃবৃন্দের অনুরোধে খ,ম, শহীদুল্লাহ থানার সামনে দাঁড়িয়ে উপস্থিত জনতার উদ্দেশ্যে বক্তব্য দিয়ে পরিস্থিতি শান্ত করেন।

তিনি আপোষহীন বলিষ্ঠ নেতৃত্বের কারণে বার বার জেলে যান । ১৯৬৯ সালের ২৪ জানুয়ারী ময়মনসিংহে আলমগীর মনসুর মিন্টুকে পুলিশ গুলি করে হত্যা করলে তুখোর আন্দোলন গড়ে উঠে। আন্দোলনরত অবস্থায় অন্যান্য নেতাসহ তিনি গ্রেফতার হন। ২৩ ফেব্রুয়ারী তিনি জেল থেকে মুক্তি পান। রাজনীতি চালু হলে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান টাংগাইল হয়ে ময়মনসিংহ যাবার পথে মুক্তাগাছা কমিউনিটি সেন্টার(বর্তমান পৌরসভা পাঠাগার) এক কর্মী সমাবেশে বক্তব্য রাখেন। সেখানে খোন্দকার মালেক শহীদুল্লাহর কৌশলী উপস্থানায় বঙ্গবন্ধু প্রধান অতিথির বক্তব্য রাখেন। বক্তব্যের শেষের দিকে তিনি খোন্দকার মালেক শহীদুল্লাহর ভূয়সী প্রশংসা করে বলেন দেশে ঘরোয়া রাজনীতি চালু হবার পর এখানেই প্রথম রাজনৈতিক বক্তব্য রাখলাম আর সেটা এই মালেকর কারনেই।

১৯৭০ সালে টাংগাইলে জনসভা করা হয়। সেখানে সকাল ১০ টায় ময়মনসিংহ টাংগাইল সড়কে ঢাকা যাবার পথে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান বক্তব্য রাখার কথা প্রচার করা হয়। কিন্তু এত সকালে জনতা সমবেত হবে না ভেবে বঙ্গবন্ধু সেখানে না থেমে তার গাড়ী বহর মুক্তাগাছা পার হয়ে যায়। এ অবস্থায় খোন্দকার মালেক কয়েকজন নেতাকর্মী সহ পেছন থেকে ট্রাক নিয়ে গিয়ে মধুপুরের কাকরাইদ নামক স্থানে গাড়ী বহরের গতি রোধ করেন। বঙ্গবন্ধু বলেন মালেক আজ আমার পক্ষে তোর ওখানে যাওয়া সম্ভব হবে না। ঢাকার সার্জেন্ট জহুরুল হকের মৃত্যু বার্ষির্কীর অনুষ্ঠানে আমাকে যোগদান করতে হবে। কাজেই আমার পথ ছেড়ে দে আমি অন্য একদিন তোর মুক্তাগাছায় গিয়ে বক্তব্য রাখবো। 

তিনি বঙ্গবন্ধুকে বলেন, বঙ্গবন্ধু আমি আপনার সময় নষ্ট করবো না। আপনি শুধু একটু সময়ের জন্য আমার ওখানে যাবেন এবং সমবেত জনতার সাথে একটু দেখা দিয়েই চলে আসবেন। নতুবা জনতার মাঝে আমি বিশ্বাস হারাবো। অবশেষে বঙ্গবন্ধুকে তিনি সেখান থেকে মুক্তাগাছায় নিয়ে আসেন এবং সমবেত জনতার উদ্দেশ্যে বঙ্গবন্ধু বক্তব্য রাখেন। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে তিনি মুক্তাগাছা আসনে প্রাদেশিক পরিষদে আওয়ামীলীগ মনোনীত প্রার্থী হন। নির্বাচনে তিনি কোন পোস্টারিং করেননি। এ সময় বঙ্গবন্ধু একদিন তাকে ঢাকায় ডেকে নিয়ে পোস্টার নিয়ে যেতে বললে তিনি বঙ্গবন্ধুকে বলেন বঙ্গবন্ধু পোস্টার দিয়ে, টাকা পয়সা খরচ করেই যদি নির্বাচন করতে হয় তা হলে এতদিন কি রাজনীতি করলাম। ও সব ছাড়াই তিনি নির্বাচনে জয়ী হতে পারবেন বলে বঙ্গবন্ধুকে আশ্বাস দিলেন। বঙ্গবন্ধু ফজলুল হক দুদুকে দিয়ে ইত্তেফাক অফিস থেকে কিছু লিফলেট ছাপানোর ব্যবস্থা করে পাঠিয়ে দেন।

নির্বাচনে বিপুল ভোটের ব্যবধানে তিনি নির্বাচিত হন।তাঁর সাথে প্রতিদ্বন্ধ্বী ৯ জন প্রার্থীরই জামানত বাজেয়াপ্ত হয়। জানুয়ারী মাসে জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিষদের ঢাকার সোহরাওয়াদী উদ্যানে নির্মিত নৌকা মঞ্চে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান নির্বাচিত দলীয় গণপরিষদ সদস্যদের শপথ বাক্য পাঠ করান। সেখানে শপথ নিয়ে জননন্দিত নেতা এলাকায় ফিরেন। এরপর মুক্তিযোদ্ধ শুরু পর্যন্ত তাঁর নেতৃত্বে এ এলাকায় নানা আন্দোলন সংগ্রাম মিছিল মিটিং চলতে থাকে পুরোদমে। ক্রমেই তাঁর জনপ্রিয়তা এমন অবস্থানে পৌঁছায় যে তার মুখ থেকে কোন কথা বের হতে হয়তো বিলম্ব হত কিন্তু সেটা স্বত: স্ফুত ভাবে পালিত হতে বিলম্ব হত না। তিনি মুক্তাগাছার নির্যাতিত, নিপীড়িত, লান্ঞ্চিত, বন্ঞ্চিত মানুষের কাছে প্রিয় নেতা হয়ে উঠেন।

মার্চ মাসে তিনি স্থানিয় নেতৃবৃন্ধ নিয়ে নিজ বাড়িতে (নন্দিবাড়ি খোন্দকার বাড়ি) মুক্তিযোদ্ধা প্রশিক্ষণ শিবির খুলে যুদ্ধা প্রস্তুতের কাজ শুরু করেন। তাঁর বলিষ্ঠ নেতৃত্বে, বিপুল জনপ্রিয়তা এবং সঠিক দিক নির্দেশনার ফলে পুরো যুদ্ধকালীন সময়ে মুক্তাগাছায় কোন নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যের মূল্য বৃদ্ধি পায় নি।

২২ এপ্রিল রাতে তিনি কয়েকজন সঙ্গী নিয়ে হালুয়াঘাট সীমান্ত এলাকায় অবস্থানরত জেলা আওয়ামীলীগের সাধারন সম্পাদক রফিক উদ্দিন ভূইয়ার সাথে কথা বলে ভারতের গাছুয়া পাড়ায় চলে যান। সেখানে হাতেম আলী তালুকদারের ব্যবস্থাপনায় মাত্র এক টাকায় ডাল ভাত খেয়ে ক্ষুধা নিবৃত্ত করে বাড়েঙ্গা পাড়ায় চলে যান। সেখানে রফিক উদ্দিন ভূঁইয়া, হাতেম আলী তালুকদার (এম, এন, এ) সৈয়দ আব্দুস সুলতান,( এম,এন,এ) সৈয়দ আহমেদ, শামসুল হক, ( এম,এন,এ) জুবেদ আলী, ( এম,এন,এ) মোশাররফ হোসেন( এম,এন,এ), নূরুল হক এডভোকেট ( এম,এন,এ), প্রফেসর হুমায়ন খালেদ( এম,এন,এ), ঈমান আলী, সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম( ছাত্রনেতা পরে ময়মনসিংহ জেলা আওয়ামীলীগের সা: সম্পাদক), শিশির কুমার রক্ষিতসহ তৎকালীন বৃহত্তর ময়মনসিংহ অঞ্চলে আশ্রয় নেন।

তিনি ক্যাপ্টেন বালজিৎ সিং, ব্রিগেডিয়ার স্যামসিং ব্যানারজির সাথে এবং মেঘালয়ের মূখ্যমন্ত্রী উইলিয়াম সাংমার সাথে বৈঠক করে দেশ এবং যুদ্ধ পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করেন। ঢালুসহ বিভিন্ন স্থানে ইয়থ ক্যাম্পেরর পরিচালনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। শিলিকুড়িতে পরপর দুইদিন সংসদ সদস্যদের নিয়ে সম্মেলনে যোগ দেন। পরে অস্থায়ি রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম ও প্রধান মন্ত্রী তাজ উদ্দিন আহমদের কথা মতো ১১ নং সেক্টররে যুদ্ধের খবরা- খবর প্রকাশের জন্য একটি সাপ্তাহিক পত্রিকা বের করার সিদ্ধান্ত নেন। যুদ্ধ চলাকালীন সময়ে মুজিবনগর সরকারেরমন্ত্রী এ এইচ এম কামরুজ্জামানের লিখা চিঠি নিয়ে আসামের গোহাটীতে কংগ্রেসের মূখ্যমন্ত্রী শরৎ সিনহার কাছে যান। সেখানে সব ঠিকঠাক হলে গোহাটির পানবাজারের একটি প্রেস থেকে নিয়মিত সাপ্তাহিক পত্রিকা বের করেন। সৈয়দ আ: সুলতান পত্রিকার নাম রাখেন “মুক্তি’.।

ইবনে আদম ছদ্মনামে তিনি নিজেই পত্রিকাটি সম্পাদক ও প্রকাশকের দায়িত্ব পালন করেন। যুদ্ধের সময় তিনি ওপার থেকে বৃহত্তর ময়মনসিংহ অঞ্চলের মুক্তিযুদ্ধাদের প্রশিক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। ১০ ডিসেম্ভর মুক্তাগাছা তথা ময়মনসিংহ অঞ্চল শক্রুমুক্ত হলে নিজ এলাকায় ফিরেন আসেন। স্বাধীনতার পর নেতা কর্মীদের নিয়ে যুদ্ধে বিধ্বস্ত জনপদের উন্নয়ন অর্থাৎ দেশ গড়ার কাজে নিয়োজিত হন।

তাঁর নেতৃত্বে মুক্তাগাছায় স্বেচ্ছা শ্রমের ভিত্তিতে রাস্তা নির্মাণ, বাড়িঘর মেরামতসহ ব্যাপক উন্নয়নের কাজ হয়। ১৯৭৫ এ বঙ্গবন্ধু হত্যার মধ্য দিয়ে দেশে রাজনৈতিক পরিবর্তন হলে তাকে আবার আটক করা হয়। ১৯৯৯ সালে তিনি মুক্তাগাছা পৌরসভার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন।

বার্ধ্যক্যে থাকা অবস্থায়ও তাঁর আন্দোলন সংগ্রাম থেমে থাকে নি। অন্যায়, অন্যাচারের বিরুদ্ধে তিনি সব সময় ছিলেন সোচ্চার।এই মহান ব্যাক্তি ২০২১ সালের ২ ফেব্রুয়ারী মুত্যু বরন করেন।

লেখক: অধ্যাপক ও কলাম লেখক ।