ভাষা শহীদ আব্দুল জব্বার ও নতুন প্রজন্ম

Language Martyr Abdul Jabbar

রোবেল মাহমুদ

ভাষা শহীদ আব্দুল জব্বার ১৯১৯ সনের ১০ অক্টোবর ময়মনসিংহ জেলার গফরগাঁও উপজেলার রাওনা ইউনিয়নের পাঁচুয়া গ্রামে জন্ম গ্রহণ করেন। বাবার নাম হাছেন আলী ও মায়ের নাম সাফাতুন নেছা। স্থানীয় কৃষ্ণ বাজার ধোপাঘাট প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পঞ্চম শ্রেণী পর্যন্ত লেখাপড়া করেন। কিছুদিন বাবার কৃষি কাজে সাহায্য করেন। পনের বছর বয়সে তিনি কাজের সন্ধানে নারায়গঞ্জ চলে আসেন। এখানে এক ইংরেজ নাবিকের সাথে আব্দুল জব্বার রেঙ্গুন শহরে (বতর্মান মায়ানমারের ইয়াঙ্গুন) এসে জাহাজে কাজ শুরু করেন।

একটানা বার বছর আব্দুল জব্বার রেঙ্গুনে কাজ করে ভগ্ন স্বাস্থ্যের কারনে গ্রামে ফিরে আসেন। সেই সময় গ্রামের যুবকদের নিয়ে একটি গ্রাম ডিফেন্স পার্টি গঠন করে জন কল্যাণমুলক কাজে জড়িয়ে পড়েন। পরবর্তীতে আনসার ট্রেনিং নিয়ে নিজ গ্রামে আনসার কমান্ডার হিসেবে কাজ করেন।

এছাড়া বেশ গানের নেশা ছিল আব্দুল জব্বারের। তাই মাঝে মাঝে চলে আসতেন গফরগাঁও বাজারে জাবু মুন্সির দোকানে কলের গানের রেকর্ড নিতে। ঘন্টার পর ঘন্টা দুইজনে আড্ডা দিতেন,গান শোনতেন।

১৯৪৯ সালে আব্দুল জব্বার বন্ধুর বোন আমেনা খাতুনকে বিয়ে করে সংসারি হন। তাদের একমাত্র সন্তান নুরুল ইসলাম বাদলের জন্ম হয় ১৯৫০ সনে। তিনি বাংলাদেশ সেনা বাহিনীতে কর্ম জীবন শেষ করে ঢাকার তেজকুনি পাড়া বসবাস করেন। নুরুল ইসলাম বাদল মহান মুক্তিযুদ্ধের একজন বীর সৈনিক।

১৯৫২ সালের ২০শে ফেব্রুয়ারি আব্দুল জব্বার ক্যান্সার আক্রান্ত শাশুড়ীকে চিকিৎসার জন্য ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করান। সে সময় ঢাকা মেডিক্যালের বাইরে, বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসসহ বাংলাকে রাষ্ট্র ভাষার দাবিতে সোচ্চার ছাত্র-জনতার শ্লোগানে মুখরিত ঢাকার রাজপথ। একুশে ফেব্রুয়ারী আব্দুল জব্বার মেডিক্যাল গেইটের বাইরে শাশুড়ীর জন্য ফল কিনতে গিয়ে দেখেন রাষ্ট্র ভাষার দাবিতে ছাত্র-জনতার সমাবেশ। সেই সাথে রাষ্ট্র ভাষা বাংলার দাবিতে শ্লোগান আর মিছিলে উত্তাল রাজপথ। যুবক আব্দুল জব্বার অসুস্থ শাশুড়ীর জন্য ফল নেওয়ার কথা ভুলে গিয়ে ভাষার দাবিতে ১৪৪ ধারা ভঙ্গের সেই ঐতিহাসিক মিছিলে যোগ দেন। সে সময়ে পুলিশের এলোপাথারি গুলিতে অনেকের সাথে আব্দুল জব্বারও গুলিবিদ্ধ হন। আহত অবস্থায় ঢাকা মেডিক্যালে নেওয়া হলে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে তিনি ২১ ফেব্রুয়ারী রাতে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন। ভাষা শহীদ আব্দুল জব্বারকে আজিমপুর কবরস্থানে সমাহিত করা হয়।

ভাষা শহীদ আব্দুল জব্বার প্রসঙ্গে গফরগাঁওয়ের প্রবীণ লেখক ও কবি মোহাম্মদ ফারুক স্মৃুতিচারণ করে বলেন, তার মৃত্যুর পর দিন তৎসময়ে ঢাকা মেডিকেলের ছাত্র সিরাজুল ইসলাম তাকে সনাক্ত করে রক্তমাখা শহীদ জব্বারের শার্টটি গফরগাঁওয়ে পাঠিয়ে দেন। এই রক্ত মাখা শার্ট নিয়ে শহীদ জব্বারের আত্মাহুতি ও ভাষার দাবিতে গফরগাঁওয়ে ছাত্র-জনতা মিছিল করেন। সেই সংবাদ বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকে গুরুত্বের সাথে ছাপা হয়।

গফরগাঁওয়ের পাঁচুয়াতে ২০০৮ সালে ভাষা শহীদ আব্দুল জব্বার গ্রন্থাগার ও স্মৃতি জাদুঘর নির্মাণ করা হয়। অনেক দর্শনার্থী এখানে বই পড়তে ও ঘোরতে আসেন। এখানে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার ও শহীদ জব্বারের নামে রয়েছে একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়। জাদুঘরে শহীদ জব্বারের ব্যবহৃত কোনো জিনিস পত্র না থাকায় দর্শনার্থীদের আক্ষেপ রয়েছে।

এ ব্যাপারে ভাষা শহীদ আব্দুল জব্বারের একমাত্র ছেলে বীর মুক্তিযোদ্ধা নুরুল ইসলাম বাদল বলেন,বাবার ব্যবহৃত জিনিস পত্র আমাদের সংগ্রহে ছিলনা। উনার ব্যবসায় ব্যবহৃত কাঁসার একটি দাঁড়িপাল্লা ও ট্রেনিংরত সশস্ত্র ফটোগ্রাফ আনসার একাডেমীতে দেয়া হয়েছে।

বর্তমান গ্রাম পাঁচুয়াকে শহীদ জব্বার নগর নামে প্রতিষ্ঠা করতে সরকারি উদ্যোগটি ভেস্তে যাওয়ায় গ্রামবাসীর ক্ষোভ রয়েছে। এছাড়া পৌর এলাকায় পাবলিক হল মোড়ে অবস্থিত একটি স্মারক ভাস্কর্য সম্বলিত শহীদ জব্বার চত্বরটি এখন অবহেলার শিকার। গত ২০০৫ সালে তৎকালীন উপজেলা নির্বাহী অফিসার গৌতম কুমার সাংস্কৃতিক কর্মীদের নিয়ে এটি প্রতিষ্ঠা করেন। এখানে অবস্থিত সরকারি পাবলিক হলটিরও নামকরন করা হয়েছিল শহীদ জব্বারের নামে। যা এখন ভগ্নস্তুপে পরিণত হয়েছে। ভাষা শহীদ জব্বারের পরিবারের পক্ষে গফরগাঁওয়ে জেলা পরিষদ ডাকবাংলো সংলগ্ন নব নির্মিত মিলনায়তনটি শহীদ জব্বারের নামে নামকরনের দাবিতে আবেদন করা হয়েছে।

জব্বার নগর বাষÍবায়ন,মিলনায়তন ও জব্বার চত্বর সম্পর্কে গফরগাঁও উপজেলা নির্বাহী অফিসার তাজুল ইসলাম বলেন,আমি নতুন এসেছি সব কিছু আমার জানা নাই। খোঁজ নিয়ে বলতে পারব।

শহীদ আব্দুল জব্বারকে সরকার ২০০০ সালে মরণোত্তর ২১শে পদক দিয়ে সম্মানিত করেন।

লেখক:  লেখক ও সাংবাদিক