জিয়ার বীর উত্তম খেতাব কেন বাতিল হবে না?

সুমন দত্ত

বাংলাদেশের সাবেক সামরিক শাসক জিয়াউর রহমানের খেতাব বাতিলের প্রস্তাব নিয়ে দেশের রাজনৈতিক পরিবেশ উত্তপ্ত। হবারই কথা। কারণ বাংলাদেশে অনেক পাকিস্তানপন্থী মুসলিম লীগার নিজেদের অস্তিত্ব বাঁচাতে রাজনীতি বহাল রেখেছেন জিয়ার ওপর ভর করে। যেমন সাকা পরিবার, গোআ পরিবার।

জিয়া মুসলিম লীগার, পাকিস্তানি হানাদারদের দোসর ইত্যাদি প্রমাণ হয়ে গেলে সর্বনাশ। এদের রাজনীতি এদেশ থেকে উচ্ছেদ হয়ে যাবে। এই উচ্ছেদ আতঙ্কে এতদিন বিএনপির যেসব কর্মীরা ঘুমিয়ে ছিল। তারা এখন বিএনপির কর্মসূচিতে নামছে। নিজেদের প্রতিষ্ঠাতার ইজ্জত বাঁচাতে এটা তারা করতেই পারে। জিয়া নব্য রাজাকার হয়ে গেলে, কোনো মুখে বাংলাদেশের পতাকা লাগিয়ে এরা এদেশে রাজনীতি করবে?

তাদের এখন একমাত্র এজেন্ডা যে কোনো মূল্যে জিয়াকে মুক্তিযোদ্ধা বহাল রাখতেই হবে।

জিয়া মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন কিনা? তার বীর উত্তম খেতাব ফিরিয়ে নেয়া যায় কিনা? এসব নিয়ে বিতর্ক নতুন নয়। ৯ মাসের মুক্তি সংগ্রামে এদেশ স্বাধীন হয়েছে। এটা দালিলিক সত্য। তবে এদেশের মুক্তি সংগ্রাম চলেছে বহুদিন আগে থেকে। বলতে গেলে ভারত ভাগের পর থেকেই। সাম্প্রদায়িক ভিত্তিতে ভারতবর্ষ ভাগ হয়েছে। অথচ বাংলাদেশ নামক ভূখণ্ডটি ছিল অসাম্প্রদায়িক। এদেশের সংস্কৃতি ছিল অসাম্প্রদায়িক। যে কারণে ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে স্বাধীনতা সংগ্রাম পর্যন্ত যতগুলো আন্দোলন হয়েছে তার নেতৃত্বে ছিল আওয়ামী লীগ ও বাম ধারার কিছু অংশ (চীনা বাম বাদে)।

পাকিস্তান পন্থি ধর্মীয় দলগুলো এসব আন্দোলনের বিরোধিতা করে গেছে। তাদের এসব বিরোধ সত্ত্বেও এদেশ স্বাধীন হয়। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর দেখা যায়, পাকিস্তানের আমলের সাম্প্রদায়িক দলগুলো নতুন নামে দল গঠন করে, এদেশে সেই পাকিস্তান আমলের রাজনীতি শুরু করে দিয়েছে। আর এদের রাজনীতি করার মাঠ তৈরি করে দিয়েছেন বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা মরহুম জিয়াউর রহমান। যিনি আবার একজন বীর উত্তম খেতাবধারী মুক্তিযোদ্ধা।

১৯৭৫ সালে জাতির জনক বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করার পর এদেশে শুরু হয় নতুন এক রাজনীতি। মুক্তিযুদ্ধের ছাল গায়ে জড়িয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের নায়ক বঙ্গবন্ধুকে গালি মারা, তার সমালোচনা করা, ভারত বিরোধিতা, ওয়াজ মহফিলে সাম্প্রদায়িক গালাগালি। জামাতি মওদুদিবাদ প্রচার ও প্রসার। এসবই হচ্ছে পাকিস্তান পন্থি দলগুলোর লক্ষণ। রাজনীতির মাঠে এরা ভারতীয় দালাল সনাক্তে সিদ্ধহস্ত। সারাদিন সবকিছুর মাঝে ভারতীয় ও ইহুদী ষড়যন্ত্র খুঁজে বেড়ায়। বাস্তবে এদেশে আকাম কুকর্মের সূত্রপাত হয় এদেরই হাত ধরে।

ভেবে অবাক হই যে বাংলাদেশ সৃষ্টি হয়েছে বহু লক্ষ মা বোনের ইজ্জতের বিনিময়ে। বহু বুদ্ধিজীবী হত্যার মধ্য দিয়ে। বহু মানুষের প্রাণের বিনিময়ে। সেই মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী শক্তির পৃষ্ঠপোষক জিয়াউর রহমান কীভাবে একজন বীর উত্তম খেতাবধারী মুক্তিযোদ্ধা হন?

তার মানে ডাল ম্যা কুচ কালা হ্যাঁয়। এখন সময় হয়েছে এই কালা ডালের অনুসন্ধান করা। এটা করতে কারো তেমন বেগ পেতে হবে না। মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী কর্মকাণ্ড আমলে নিলেই এসব তথাকথিত খেতাবধারী মুক্তিযোদ্ধার খেতাব রাষ্ট্র কেড়ে নিতে পারে। যে রাষ্ট্র তাকে খেতাব দিয়েছে, সেই রাষ্ট্র তার খেতাব কেড়ে নেবার অধিকার অবশ্যই রাখে। এটা সংবিধান বিরোধী কোনো কাজ হবে না। যে চার মূলনীতির ওপর এদেশের অস্তিত্ব সৃষ্টি হয়েছিল, তার উপর যারা ছুরি চালিয়েছে, তাদের বিচার কেন করতে পারবে না রাষ্ট্র?

বলা হয় জিয়া বহুদলীয় গণতন্ত্রের জনক। জিয়া না থাকলে এদেশে বহুদলের রাজনীতি থাকতো না। এসব কথার কি গুরুত্ব বহন করে জানি না। তবে গণতন্ত্রের জন্মদাতা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে মাত্র দুটি দল রিপাবলিকান পার্টি ও ডেমোক্রেটিক পার্টি। শত বছরের বেশি গণতান্ত্রিক চর্চার ইতিহাসে ঘুরে ফিরে এই দুই দলে রাজনীতি ঘোরা ফেরা করছে।

পার্লামেন্টারি ডেমোক্রেসিতে ব্রিটেনকে বলা হয় সেরা গণতন্ত্র। সেখানেও মাত্র দুটি দল লেবার পার্টি ও কনজারভেটিভ। পৃথিবীর অধিকাংশ গণতান্ত্রিক দেশেই মাত্র দুটি পার্টির রাজনীতি থাকে। একমাত্র ভারতে তা ব্যতিক্রম। এর কারণ ভারতের একাধিক ভাষা ও সংস্কৃতি। যা পৃথিবীর অন্য দেশে নাই।

ভারতের আঞ্চলিক রাজনীতি দেখলেও দেখা যাবে, সেখানে দুটি দলের মধ্যে ঘোরা ফেরা করছে রাজনীতি। যেমন কেরালায় কমিউনিস্ট ও কংগ্রেস। তামিল নাডুতে ডিএমকে ও আন্না ডিএমকে, কাশ্মীরে ন্যাশনাল কনফারেন্স ও পিডিবি।

আমার এতসব বলার কারণ, কোনো ব্যক্তির ক্ষমতা নাই কোনো দেশে বহু দলের রাজনীতি জন্ম দেবার। কারণ গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় বহু দলের রাজনীতি হয় না। তাই জিয়া বহুদলের রাজনীতির জনক নয়।

তিনি এদেশে পাকিস্তাপন্থি রাজনীতি চালু রেখেছেন। তিনি স্বাধীন বাংলাদেশে মুসলিম লীগের রাজনীতির জনক। তাই মুক্তিযুদ্ধ খেতাবটা তার রাজনীতির সঙ্গে যায় না। আর এখন তো দেখতে পাচ্ছেন চেয়ার টেবিল সর্বস্ব দলগুলো আওয়ামী লীগ অথবা বিএনপির লেজ ধরে রাজনীতি করছে।

জিয়া সেক্টর কমান্ডার খালেদ মোশারফের হত্যাকারী, কর্নেল তাহেরের হত্যাকারী। এমন অসংখ্য মুক্তিযোদ্ধা সামরিক অফিসারের হত্যাকারী। উনি নিজে হত্যার শিকার হয়ে মারা গেছেন। এ কারণে ৭৫ পরবর্তী হত্যাকাণ্ডের জন্য জিয়ার বিচার এদেশে হয়নি। এখনো হচ্ছে না। যদিও বিষয়টি নিয়ে উচ্চ আদালতে রিট হয়েছিল।

আইনে মৃত ব্যক্তির বিচার করা যায় না। কিন্তু উনি যাদের নিয়ে রাজনীতি করেছেন, যাদের পৃষ্ঠপোষকতা তিনি করেছেন, তাদের বিচার হয়েছে। প্রমাণ হয়েছে তারা ছিলেন স্বাধীনতার শত্রু, মুক্তিযুদ্ধের শত্রু। মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী কর্মকাণ্ডের জন্য আবদুল আলীম, সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী বিএনপির এসব নেতার সাজা হয়েছে। তাই নতুন করে প্রমাণ করার কোনো দরকার নেই বিএনপির রাজনীতি কাদের নিয়ে। ওইটা কাদের রাজনীতির প্লাটফর্ম।

এবার আসি খেতাব বাতিলের প্রস্তাব প্রসঙ্গে। খেতাব দেয়া যায়। আবার খেতাব ফিরিয়ে দেয়া যায়। খেতাব প্রত্যাখ্যানও করা যায়।

সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্ট হচ্ছে এই অজুহাতে ভারতের কংগ্রেস সমর্থক বেশ কয়েকজন কবি সাহিত্যিক রাষ্ট্রীয় খেতাব ফিরিয়ে দিয়েছেন।

আবার সময় মত রাষ্ট্রীয় পুরস্কার পাননি এই অভিযোগে রাষ্ট্রীয় খেতাব প্রত্যাখ্যানও করেছেন ভারতের গুণী সেতার বাদক ওস্তাদ ইমরাত  খান।

কানাডার দৌড়বিদ বেন জনসন সিউল অলিম্পিকে ১০০ মিটার দৌড়ে সোনা জিতেছিলেন। মাদক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ না হওয়ায় তার খেতাব কেড়ে নেয়া হয়েছিল।

তাই কাউকে খেতাব দিলে সেটা কেড়ে নিতে পারবে না। বিষয়টা এমন নয়। কারোর অর্জনে যদি খুত থাকে। কিংবা দোষ থাকে তবে সেটা সংশোধন করাই উত্তম কাজ। খেতাব কেড়ে নিয়ে সেটা সংশোধন করা যায়। তবে তা হতে হবে একটি বিশেষ প্রক্রিয়ার মধ্যে। কোনো ঘোষণার মাধ্যমে খেতাব কেড়ে নেয়া যায় না।

জিয়া এবং কতিপয় সেনা কর্মকর্তা যদি দুই নম্বরি করে বীর উত্তম খেতাব পায় তাহলে সেটা কেড়ে নেয়াই উচিত।

ইদানীং বহু ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা আবিষ্কার হচ্ছে। তাদের সনদ বাতিল করে দেয়া হচ্ছে। আর সেটা হচ্ছে একটি বিশেষ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে। তাই মুক্তিযুদ্ধের খেতাব কেন যাচাই বাছাই হবে না।

আমরা সবাই জানি এদেশে মুক্তিযুদ্ধ করতে গিয়ে ভারতীয় সেনাদের সহায়তা নেয়া হয়েছে। ভারতের অধীনেই যুদ্ধ পরিচালিত হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের সময় কে কোন ডিউটি করেছে, তা নিশ্চয় ভারতীয় সামরিক বাহিনীর লোকজনরা জানে।

তাই জিয়া যদি পাকিস্তানের চর হয়ে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেয়, তবে সেই খবর অবশ্যই ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা জেনে থাকবে। তাদেরকে জিজ্ঞাসা করেই বোঝা যাবে কে কোন সময় কি করেছে। আজ আমরা যাদের বীর শ্রেষ্ঠ বলি তাদের কথা ভারতীয় অফিসারই বাংলাদেশের সেনা কর্মকর্তাদের বলেছিল।

জিয়াউর রহমান মুক্তিযুদ্ধের সময় কি করেছিলেন, তা নিয়ে অবশ্যই অনুসন্ধান প্রয়োজন।

জাতীয় প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি বর্তমান চাঁদপুরে এমপি সাংবাদিক মুহাম্মদ শফিকুর রহমান বলেন, জিয়া মুক্তিযুদ্ধ করেনি। তিনি সেটা চ্যালেঞ্জ নিয়ে বলতে পারেন। তার মতে যারা মুক্তিযুদ্ধ করেছিল তাদের কয়েকটা বই থাকে। কে কোথায় কীভাবে মুক্তিযুদ্ধ করেছিল তা বইতে লিখে।

জিয়ার মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে কোনো বই নেই। তিনি আরো বলেন, কলকাতায় আমরা যখন মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে পরিকল্পনা করছি। জিয়া তখন সেখান থেকে অদৃশ্য হয়ে যেতেন। তিনি কোথায় যেতেন? কি করতেন? কারো সঙ্গে যোগাযোগ রাখতেন না। আজ সময় হয়েছে এসব নিয়ে তদন্ত করা।

জিয়া আসলেই মুক্তিযুদ্ধ করেছিলেন কিনা তা তদন্ত করে বের করতে হবে। কর্নেল অলিরা জীবিত আছে। তারা কীভাবে মুক্তিযোদ্ধা হলেন? কয়টা পাকিস্তানি কোন স্থানে মারলেন, তার হিসাবটা জানতে চাইবে জাতি। এতে সমস্যা কি?

নতুন প্রজন্ম সত্য ইতিহাস জানতে চায়। বাংলাদেশে আজ যারা পাকিস্তান লাভার, তারা সেদিন কীভাবে তাদের প্রাণের ভাই ব্রাদারদের বুকে গুলি চালালো, সেই কাহিনী সবাই শুনতে চায়। জিয়াকেই দিয়েই শুরু হতে পারে এই তদন্ত।

সাক্ষ্য আইনে হত্যার সাক্ষী নিয়ে কিছু আলোচনা আছে। যিনি কাউকে হত্যা করতে দেখেন, তিনি এক নম্বর প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষী। তাহলে কি ধরে নেব যিনি কাউকে হত্যা করতে দেখেনি তিনি কোনো হত্যাকাণ্ডের সাক্ষী হতে পারেন না। কিংবা তার সাক্ষ্যে কারো বিচার হতে পারে না। বিষয়টা কিন্তু এমন নয়।

হত্যাকাণ্ড না দেখলেও আসামিকে যদি কোনো ব্যক্তি ঘটনাস্থল থেকে ছুরি চাকু কিংবা বিস্ফোরক নিয়ে দৌড়ে পালাতে দেখেন তবে তার সাক্ষ্যে ব্যক্তির মৃত্যুদণ্ড পর্যন্ত হতে পারে।

জিয়ার খেতাব বাতিল ওই দ্বিতীয় সাক্ষীর মতোই বাতিল হয়ে যেতে পারে। বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর জিয়া কর্মকাণ্ড কোনো রাষ্ট্র নায়কের মতো ছিল না। তিনি হত্যাকারীদের সঙ্গ দিয়েছেন। তিনি ইনডেমনিটি আইন করে হত্যাকারীদের বিচারের পথ বন্ধ করে হত্যাকারীদের দায়মুক্তি দিয়েছিলেন। যা জিয়াকে কখনই গণতান্ত্রিক নেতা মনে হয় না। কারণ গণতান্ত্রিক হলে তিনি এই হত্যাকাণ্ডের বিচার করতেন। তিনি তা করেননি। গণতান্ত্রিক সমাজে প্রতিটি অপরাধের বিচার হয়। কেউ আইনের ঊর্ধ্বে নয়।

৭ মার্চের বঙ্গবন্ধুর ভাষণ জিয়ার আমল থেকে বন্ধ হয়। অথচ সেটা ছিল মুক্তিযুদ্ধের এক বিরাট ইতিহাস। সেটা কোনো ভোটের ভাষণ ছিল না। যারা একটা ভাষণকে ঘৃণা করে, তারা কীভাবে মুক্তিযুদ্ধের সহায়ক শক্তি হয়? তারা তো গোলাম আযমের বংশধর। তাই এসব ভুয়া বীর উত্তম খেতাবধারীদের সম্মান রাষ্ট্রের ফিরিয়ে নেয়া উচিত। তার বদলে জিয়াকে তার সমর্থক মুক্তিযোদ্ধাদের পাকিস্তানের নিশানে ইমতিয়াজের জন্য মনোনীত করা হোক। যা জিয়ার দলের রাজনীতি ও কর্মকাণ্ডের সঙ্গে মানানসই।

লেখক: সাংবাদিক তারিখ ১৭-০২-২০২১