সুশাসন হলো সোনার বাংলা গঠনের মূল ভিত

সুশাসন হলো সোনার বাংলা গঠনের মূল ভিত
সুশাসন হলো সোনার বাংলা গঠনের মূল ভিত

মো. নাসির উদ্দিন খোন্দকার 

গুড গর্ভন্যান্স (Good Governance) বা সুশাসনের জন্য দরকার স্বচ্ছতা ও জবানদিহিমূলক ব্যবস্থা ডিজিটাল ব্যবস্থা প্রচলনের ফলে সরকার ব্যবস্থাসমূহকে আধুনিক ও যুগোপযোগী করার পাশাপাশি সরকারি ব্যবস্থাসমূহের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা সম্ভব। এর ফলে নাগরিকের হয়রানি ও বিড়ম্বনার অবসান ঘটে এবং দেশে সুশাসনের পথ নিষ্কণ্টক হয়। শাসন ব্যবস্থায় ও প্রক্রিয়ায় ইলেক্ট্রনিক বা ডিজিটাল পদ্ধতির প্রয়োগই হচ্ছে ই-গর্ভন্যান্স। ‘সুশাসন’ হলো ন্যায়নীতি অনুসারে উত্তমরূপে সুষ্ঠুভাবে ও নিরপেক্ষ দৃষ্টিতে দেশ বা রাষ্ট্র শাসন। সুশাসন হলো একটি কাঙ্ক্ষিত রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার প্রতিফলন। সময়ের প্রয়োজনে এবং শাসক ও শাসিতের সম্পর্কের ভিত্তিতে কোনো দেশের শাসন পদ্ধতির বিবর্তন হয়ে থাকে।

শাসিতের কাম্য শুধু শাসন নয়, সুশৃঙ্খল ও নিয়মতান্ত্রিক শাসন- যাকে আমরা সুশাসন বলতে পারি। কোনো দেশে সুশাসন আছে কি-না তা বোঝার জন্য প্রথমে দেখতে হবে সে দেশে শাসকের বা সরকারের জবাবদিহি আছে কি-না এবং গণতান্ত্রিক পরিবেশে দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসনিক স্বচ্ছতা আছে কি-না। সুশাসন একটি রাষ্ট্র ও সমাজব ব্যবস্থাকে কাঙ্ক্ষিত উন্নয়নের চরম শিখরে পৌঁছে দেয়। সুশাসনকে এক প্রকার মানদণ্ডও বলা যায় যে মানদণ্ডের সাহায্যে একটি রাষ্ট্র বা সমাজের সামগ্রিক অবস্থা যাচাই করা যায়। যে রাষ্ট্র বা সমাজ যত বেশি সুশাসন দ্বারা পরিচালিত হয় সেই রাষ্ট্র বা সমাজ ততো বেশি অগ্রগতির দিকে ধাবিত হয়। এক কথায় বলা যায় সুশাসন হলো একটি দেশের সামাজিক ও অর্থনৈতিক কার্যকরী ব্যবস্থা তবে ব্যবস্থাটি হবে উন্মুক্ত। স্বচ্ছ জবাবদিহিমূলক ও ন্যায্য।

সুশাসন হলো একটি কাঙ্ক্ষিত রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার প্রতিফলন। আধুনিক বিশ্বের রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায় সুশাসন প্রতিষ্ঠানকে রাষ্ট্রের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বলে বিবেচনা করা হয়। সুশাসনের মাধ্যমেই নাগরিকগণ তাদের আশা-আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করতে পারে, তাদের অধিকার ভোগ করে এবং তাদের চাহিদাগুলো মেটাতে পারে। সুশাসনের ফলে রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক এবং সামাজিক সম্পদগুলোর টেকসই উন্নয়ন ঘটে থাকে। তাই রাষ্ট্রের সকল ক্ষেত্রেই উন্নয়নের জন্য সুশাসন অত্যাবশ্যক। সুশাসন ব্যতীত রাষ্ট্রের কোনোরুপ উন্নয়ন সম্ভব নয়।

তাপসী বেগম স্বামী পরিত্যাগতা একজন মহিলা। অল্প বয়সে তার বিয়ে হয়েছিল। বিয়ের কিছুদিন পর জানতে পারেন তার স্বামী নেশা করে। প্রায়ই নেশাগ্রস্ত হয়ে রাতে বাড়ি এসে তাপসী বেগমকে মারধর করে। এক পর্যায়ে স্থানীয় থানায় স্বামীর বিরুদ্ধে মামলা করে। সুতরাং তার মামলার কোনো অগ্রগতি হয় না। উল্টো তার স্বামী তাকে মামলা তুলে নেওয়ার জন্য চাপ দিচ্ছে অন্যথায় তাকে মেরে ফেলার হুমকি দিচ্ছে।

সুশাসন প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড়ো প্রতিবন্ধকতা হলো দুর্নীতি। যে কাজ মানুষের বিবেককে তাড়িত করে সাধারণভাবে তাই দুর্নীতি। রাজনৈতিক, প্রশাসনিক, সামাজিক ক্ষমতা ও প্রতিপত্তি খাটিয়ে অবৈধ সুযোগ নেয়া, কারো সম্পদ ও সম্পত্তি জবর দখল করা, জনগণের অধিকার ভোগে বিঘ্ন সৃষ্টি এ সবই দুর্নীতির পর্যায়ভুক্ত। খাদ্যে ভেজাল, নকল ওষুধ তৈরি, ওজনে কম দেওয়া, খাদ্যসামগ্রীতে ফরমালিন দেওয়া সর্বোপরি আইন ফাঁকি দিয়ে ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর স্বার্থ রক্ষা করাও দুর্নীতির অন্তর্ভুক্ত। ক্ষমতার অপব্যবহারই দুর্নীতি। দুর্নীতি জনগণের দুর্ভোগ বাড়ায়। দুর্নীতি জাতীয় উন্নয়নের অন্তরায় এবং দুর্নীতি হলো দারিদ্র্যের মূল কারণ। এসব কারণে সুশাসন প্রতিষ্ঠায় দুর্নীতি মস্ত বড়ো বাধা হয়ে দাঁড়ায়। দারিদ্র্য এবং সুশাসন কখনো একসাথে চলতে পারে না। দুর্ভিক্ষ, অনাহার, অর্ধাহার, অপুষ্টি, নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যসামগ্রীর অপ্রতুলতা, নিত্যপণ্যের মূল্যের সীমাহীন ঊর্ধ্বগতি এগুলো সুশাসনের অন্তরায় সৃষ্টি করে। দারিদ্র্য মানুষের মৌলিক চাহিদা পূরণের প্রতিবন্ধক হিসেবে কাজ করে। মুক্ত ও স্বাধীনভাবে জীবনযাপনের পথে দারিদ্র্য মানুষের সামনে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। দারিদ্র্যকে মোকাবিলা করতে না পারলে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করা যায় না।

নাগরিকদের সচেতনতার অভাব হলো সুশাসন প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে অন্যতম বাধা। নাগরিকগণ যদি তাদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন না হয় তাহলে সুশাসন প্রতিষ্ঠা সম্ভব হয় না। নাগরিক সচেতনতা সৃষ্টির অন্তরায় হলো শিক্ষার অভাব। প্রতিনিধিত্বশীল গণতন্ত্রের মৌলিক উপাদান হলো নির্বাচন, যার মাধ্যমেই জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত হয়। জনগণ যদি সচেতন না হয় তাহলে অসৎ, অযোগ্য, দুর্নীতিবাজ প্রতিনিধি নির্বাচিত হতে পারে। সুশাসন প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয় উপাদান যেমন আইনের শাসন, মানবাধিকার সংরক্ষণ, সমাজের সকল স্তরে নারী-পুরুষের মধ্যে সমতা, সমাজের সকল শ্রেণির প্রতি ন্যায়পরায়ণতা, স্বচ্ছতা, জবাবদিহি চর্চা প্রভৃতির কার্যকর ভূমিকা পালনের জন্য দরকার নাগরিক সচেতনতা। সচেতনতার অভাব সুশাসন প্রতিষ্ঠার অন্যতম অন্তরায়।

সুশাসনের সমস্যা সমাধানের অন্যতম অনুষঙ্গ হলো গণমুখী সেবা উদ্বোধনে গুরুত্ব দেওয়া। জনগণের সেবায় নিত্য নতুন উদ্ভাবনার সৃষ্টি করতে হবে। সুশাসন প্রতিষ্ঠায় গণমুখী সেবা উদ্ভাবনের প্রয়োজন অবশ্যম্ভাবী। কারণ দ্রুত পরিবর্তনশীল প্রেক্ষাপটে নতুন নতুন উদ্ভাবনা জনগণের সেবায় কাঙ্ক্ষিত ফল লাভে কার্যকর ভূমিকা পালন করে। এর অর্থ হলো গণমুখী সেবা অধিকতর উন্নত করা, স্বল্প সময় সেবা প্রদান, কম ব্যয়ে সেবা প্রদান। এটি কার্যকর হলে সুশাসনের প্রতিষ্ঠা সহজতর হবে সুশাসন প্রতিষ্ঠায় সরকার ও নাগরিকদের তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। তবে সরকারের ভূমিকাই অধিক গুরুত্বপূর্ণ। সরকার রাষ্ট্রের পরিচালক হিসেবে ভূমিকা পালন করে। তাই সুশাসন প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি ভূমিকা পালন করতে পারে সরকার।

 লেখক : কলাম লেখক ও সরকারী কর্মকর্তা