দক্ষিণ-পূর্ব ইউরোপে জোরালো হচ্ছে চীন ও রাশিয়ার প্রভাব

নিউজ ডেস্ক:   অতীতে বিভিন্ন সময় দক্ষিণ-পূর্ব ইউরোপের দেশগুলোকে বিভিন্ন ক্ষেত্রে চীন ও রাশিয়া ওপর নির্ভর করতে দেখা গেছে। তবে সম্প্রতি করোনা ভ্যাকসিন ইস্যুতে দক্ষিণ-পূর্ব ইউরোপের দেশগুলোকে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের টিকা প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর তুলনায় চীন ও রাশিয়ার ভ্যাকসিন প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি বেশি নির্ভরশীল হতে দেখা গেছে।

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এসব দেশের ওপর ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের উদাসীন মনোভাবের কারণে ধীরে ধীরে দেশগুলো চীন ও রাশিয়ার দিকে ঝুঁকছে। অনেকে আবার বলছেন, এসব দেশকে ঘিরে চীন ও রাশিয়া ইউরোপে তাদের নতুন রাজনৈতিক বলয় সৃষ্টি করছে।

গত ২২ ডিসেম্বর ইউরোপিয়ান মেডিসিন্স এজেন্সি ফাইজার ও বায়োএনটেক উদ্ভাবিত করোনার ভ্যাকসিনকে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রয়োগের অনুমতি দেয়। এর ধারাবাহিকতায় গত ২৭ ডিসেম্বর থেকে ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের সদস্য দেশগুলো করোনার টিকা কার্যক্রম শুরু করে, যদিও নির্ধারিত সময়ের একদিন আগেই সবাইকে অবাক করে পূর্ব ইউরোপের দেশ হাঙ্গেরি ও স্লোভাকিয়া এবং ইউরোপের অন্যতম প্রতিপত্তিশালী দেশ জার্মানি দেশটির সাধারণ মানুষের মধ্যে করোনার ভ্যাকসিন প্রয়োগ শুরু করে।

পাশাপাশি গত ৬ জানুয়ারি জরুরিভিত্তিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আরেক টিকা প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান মডার্না উদ্ভাবিত ভ্যাকসিনকেও অনুমোদন দিয়েছে ইউরোপিয়ান মেডিসিন্স এজেন্সি। এছাড়াও অক্সফোর্ড ও অ্যাস্ট্রাজেনেকা উদ্ভাবিত করোনার ভ্যাকসিনকেও অনুমোদনের বিষয়ে ইতোমধ্যে আলোচনা চলছে ইইউ দেশগুলোতে। ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন ইতোমধ্যে ফাইজার, মডার্না, জ্যানসেন ফার্মাসিউটিক্যাল এনভি, কিউরভ্যাক, অ্যাস্ট্রজেনেকা, সানোফি, গ্ল্যাক্সোস্মিথ ক্লাইনসহ ভ্যাকসিন সরবারহকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর সাথে ৩০০ মিলিয়ন ডোজের টিকা কেনার অগ্রিম চুক্তি স্বাক্ষর করে রেখেছে।

তবে দক্ষিণ-পূর্ব ইউরোপের দেশগুলো এখনও টিকা কার্যক্রম শুরু করতে পারেনি। যদিও এ অঞ্চলে অবস্থিত গ্রিস, রোমানিয়া, বুলগেরিয়া, ক্রোয়েশিয়া ও হাঙ্গেরি ইইউর সদস্য দেশ হওয়ায় টিকা প্রাপ্তিতে এসব দেশকে তেমন একটা প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হতে হয়নি। তবে আলবেনিয়া, মন্টিনিগ্রো, বসনিয়া অ্যান্ড হার্জেগোভিনা, কসোভো, ইউক্রেন, মেসিডোনিয়াসহ এ অঞ্চলের বেশিরভাগ দেশই টিকা কার্যক্রম শুরুর বিষয়ে এখনও কোনো নীতিমালায় পৌঁছাতে পারেনি। অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতার দিক থেকে এসব দেশ ইউরোপের অন্যান্য দেশের চেয়ে যোজন যোজন পিছিয়ে।

প্রথমদিকে এসব দেশ কোভ্যাক্সের থেকে ভ্যাকসিন সংগ্রহের ঘোষণা দেয়। মার্চে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, সুইজারল্যান্ডের গ্যাভি এবং নরওয়েভিত্তিক কোয়ালিশন ফর অ্যাপিডেমিক প্রিপার্ডনেস ইনোভেশনস সম্মিলিতভাবে কোভ্যাক্স নামক এক বিশেষ প্রকল্প চালুর ঘোষণা দেয়। মূলত সহজ শর্তে কোভিড-১৯ এর ডায়াগনিস্ট থেকে শুরু করে করোনাভাইরাস প্রতিরোধে কার্যকরি ভ্যাকসিনের উদ্ভাবন এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোর মাঝে সহজে সে ভ্যাকসিন বিপণনের উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে কোভ্যাক্স যাত্রা শুরু করে। বর্তমানে প্রায় ৬৪টি দেশ এ কোভ্যাক্স প্রক্রিয়ার অন্তর্ভুক্ত। সদস্য রাষ্ট্রগুলো সম্মিলিতভাবে কোভাক্স পরিচালনায় যাবতীয় ব্যয়ভার বহন করে। কোভ্যাক্সের অধীনে জনসংখ্যা অনুপাতে প্রত্যেক সদস্য রাষ্ট্রের ২০ শতাংশ মানুষের জন্য টিকা বিতরণের পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে তবে প্রয়োজনীয় অর্থাভাবে এখনও সে প্রকল্প বাস্তবায়নের পথে আলোর মুখ দেখেনি। এখন তাই বাধ্য হয়ে এসব দেশগুলোকে চীন ও রাশিয়ার তৈরি করোনার ভ্যাকসিনের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।

দক্ষিণ-পূর্ব ইউরোপের অন্যতম প্রভাবশালী দেশ সার্বিয়া যদিও দেশটি সমগ্র পশ্চিমা জগতে পরিচিত এক খলনায়ক হিসেবে। দীর্ঘদিন ধরেই সার্বিয়া ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের সদস্য হওয়ার জন্য প্রচেষ্টা চালাচ্ছে। কিন্তু ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন সার্বিয়াকে তাদের সদস্য রাষ্ট্রের স্বীকৃতি দিতে নারাজ। তাই বাধ্য হয়ে সার্বিয়া বর্তমানে চীন, রাশিয়া ও তুরস্কের সঙ্গে জোটবদ্ধ হয়েছে। যদিও ফাইজার ও বায়োএনটেক ইতোমধ্যে দেশটিতে ৪ হাজার ৮৭৫ ডোজের টিকা সরবারহ করেছে এবং গত ২৪ ডিসেম্বর দেশটির ইতিহাসে প্রথম ব্যক্তি হিসেবে করোনার ভ্যাকসিন গ্রহণ করেছেন দেশটির প্রধানমন্ত্রী আনা ব্রানাবিচ। তবে গণহারে টিকাদান কার্যক্রম শুরু করতে দেশটি রাশিয়া ও চীনের থেকে ভ্যাকসিন কেনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

প্রায় সব ক্ষেত্রেই সার্বিয়ার সঙ্গে আলবেনিয়ার সম্পর্ক অনেকটা দাকুমড়ার মতো, তা সত্ত্বেও ভ্যাকসিন ইস্যুতে অনেকটা সার্বিয়ার মতো অবস্থান নিয়েছে ইউরোপের মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ এ দেশটি। আলবেনিয়ার প্রধানমন্ত্রী এদি রামা ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের করোনা ভ্যাকসিন কার্যক্রমকে সম্পূর্ণভাবে নীতি-নৈতিকতা বিবর্জিত হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেছেন, ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন (ইইউ) কেবল তাদের সদস্য দেশগুলোর কথা চিন্তা করছে।ইইউর বাইরেও ইউরোপে যে অনেক দেশ আছে তাদের বিষয়ে কখনও ভাবে না।

এদি রামার সুরেই কথা বলেছেন মেসিডোনিয়া, বসনিয়া অ্যান্ড হার্জেগোভিনা, মন্টিনিগ্রো, কসোভোসহ এ অঞ্চলের অন্যান্য দেশের রাষ্ট্রপ্রধানেরা।