সোনালি অতীত নিয়ে সমৃদ্ধ ভবিষ্যতের পথে ছাত্রলীগ

লেখক ভট্টাচার্য 

শিক্ষা, শান্তি ও প্রগতির পতাকাবাহী সংগঠন, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হাতে গড়া সংগঠন, সোনার বাংলা বিনির্মাণের কর্মী গড়ার পাঠশালা, বাংলাদেশ ছাত্রলীগ অতিক্রম করেছে পথচলার ৭৩ বছর। ১৯৪৮ সালের ৪ জানুয়ারি সময়ের দাবিতে, স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে জন্ম হয়েছিল প্রিয় এ সংগঠনের। জন্মলগ্ন থেকেই ভাষার অধিকার, শিক্ষার অধিকার, বাঙালির স্বায়ত্তশাসন প্রতিষ্ঠা, দুঃশাসনের বিরুদ্ধে গণঅভ্যুত্থান, সর্বোপরি স্বাধীনতা ও স্বাধিকার আন্দোলনের সাত দশকে বিদ্যার সঙ্গে বিনয়, শিক্ষার সঙ্গে দীক্ষা, কর্মের সঙ্গে নিষ্ঠা, জীবনের সঙ্গে দেশপ্রেম এবং মানবীয় গুণাবলির সংমিশ্রণ ঘটিয়ে এগিয়ে চলেছে ছাত্রলীগ। বাংলাদেশ ছাত্রলীগের নেতাকর্মীর মধ্যে আছে তরুণ মুজিবের নান্দনিকতা ও আদর্শ, আছে কাজী নজরুলের বাঁধ ভাঙার শৌর্য, আছে ক্ষুদিরামের প্রত্যয়, আছে সুকান্তের অবিচল চেতনা। তাই তো ছাত্রলীগ শিক্ষার অধিকার রক্ষার পাশাপাশি জাতীয় রাজনৈতিক ও সামাজিক স্বার্থ সুরক্ষায় সবসময় মঙ্গলপ্রদীপের আলোকবর্তিকা হয়ে ছড়িয়ে পড়ে সর্বত্র।

১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে আন্দোলন জোরালো করার ক্ষেত্রে বঙ্গবন্ধুর প্রতিষ্ঠিত ছাত্রলীগের ভূমিকা ছিল অগ্রগণ্য। ১৯৬২ সালে তৎকালীন আইয়ুব খান সরকার গঠিত শরিফ কমিশন একটি গণবিরোধী শিক্ষানীতি প্রণয়ন করেছিল। সেই শিক্ষানীতির বিরুদ্ধে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ সব প্রধান শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা গণআন্দোলন ও গণজাগরণ তৈরি করে। বাষট্টির সেই আন্দোলনে রক্ত ঝরেছে অসংখ্য ছাত্রলীগ নেতাকর্মীর। বাঙালির স্বায়ত্তশাসন প্রতিষ্ঠার সনদ ছয় দফা বাস্তবায়নেও বঙ্গবন্ধু তখনকার ছাত্রনেতাদের নির্দেশ দিয়েছিলেন জেলায় জেলায় ছয় দফার পক্ষে প্রচারণা চালাতে। ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানেও বাংলাদেশ ছাত্রলীগ ছিল রাজপথের প্রমিথিউস। ছয় দফা নিয়ে আওয়ামী লীগ নেতাদের মধ্যে দ্বিমত ছিল; কিন্তু ছাত্রলীগের শক্ত অবস্থানের কারণে শেষ পর্যন্ত এ প্রস্তাব সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হয়।

গৌরব, ঐতিহ্য, সংগ্রাম ও সাফল্যের দীর্ঘ পথচলায় ছাত্রলীগ রক্ত দিয়েছে অনেক। ১৯৭১ সালের ৩ মার্চ বঙ্গবন্ধু ছাত্রলীগের সমাবেশে বলেছিলেন- ‘দানবের সঙ্গে লড়াইয়ে যে কোনো পরিণতিকে মাথা পেতে বরণের জন্য আমরা প্রস্তুত। ২৩ বছর রক্ত দিয়ে এসেছি। প্রয়োজনবোধে বুকের রক্তগঙ্গা বইয়ে দেব। তবু সাক্ষাৎ মৃত্যুর মুখে দাঁড়িয়েও বাংলার শহীদদের রক্তের সঙ্গে বেইমানি করব না।’ তাই তো মুক্তিযুদ্ধে আমাদের প্রাণের সংগঠনের ১৭ হাজার বীর যোদ্ধা বুকের তাজা রক্তে এঁকেছেন লাল-সবুজের পতাকা, এঁকেছেন ৫৬ হাজার বর্গমাইলের এক সার্বভৌম মানচিত্র। সেসব বীর যোদ্ধাই আমাদের অনুপ্রেরণা, আমাদের শক্তি, আমাদের সাহস।

যখন বাঙালি জাতি, বাংলাদেশ ও বঙ্গবন্ধু সমার্থক শব্দে পরিণত হয়েছিল, ঠিক তখনই বাঙালি জাতির হাজার বছরের ইতিহাসের উজ্জ্বলতম নক্ষত্রটিকে নিভিয়ে দিতে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট হিংস্র হায়েনা আঘাত হানে। ১৯৭৫-পরবর্তী বঙ্গবন্ধুবিহীন বাংলাদেশের রাজনৈতিক ভাগ্যাকাশ যে কালো মেঘ গ্রাস করেছিল, সেই মেঘ সরাতে প্রত্যাশার সূর্য হাতে ১৯৮১ সালে প্রত্যাবর্তন করলেন আমাদের প্রাণের নেত্রী দেশরত্ন শেখ হাসিনা। সেদিন নেত্রীর পাশে ভ্যানগার্ডের ভূমিকায় ছিল বাংলাদেশ ছাত্রলীগ। সামরিক শাসনের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে ১৯৮৩ সালে শিক্ষা আন্দোলন ও সর্বদলীয় ছাত্র ঐক্যের ১০ দফা তৈরিতে নেতৃত্ব দেয় বাংলাদেশ ছাত্রলীগ।

১৬ কোটি বাঙালির প্রাণের স্পন্দন, সমৃদ্ধ বিনির্মাণের সুনিপুণ কারিগর দেশরত্ন শেখ হাসিনার প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণে বাংলাদেশ ছাত্রলীগ ১৯৮৮ সালের ভয়াবহ বন্যার ক্ষতি মোকাবিলায় পালন করেছে অগ্রণী ভূমিকা। সে সময় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে তিনবেলা নিজ হাতে রুটি তৈরি করেছে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। সারারাত জেগে তৈরি করেছে খাবার স্যালাইন। সেগুলো পৌঁছে দেওয়া হয়েছে দুর্গম এলাকার মানুষের কাছে। পরবর্তী সময়ে ১৯৯৮ সালের বন্যাসহ সব প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে বাংলাদেশ ছাত্রলীগ একইভাবে বিপন্ন মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ২০০২ সালের ২৩ জুলাই বিএনপির পেটোয়া পুলিশ বাহিনী ও ছাত্রদলের ক্যাডাররা গভীর রাতে শামসুন নাহার হলে ঢুকে ছাত্রীদের নির্যাতন করে। ছাত্রলীগ সেদিন দোষীদের বিচারের দাবিতে সোচ্চার ভূমিকা পালন করে। ২০০৭ সালের ১৬ জুলাই সেনা নিয়ন্ত্রিত বিতর্কিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের হাতে আটক আমাদের প্রিয় নেত্রীর মুক্তি আন্দোলনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সবুজ চত্বরে প্রথম সাহসী উচ্চারণ তুলেছিল ছাত্রলীগই। বাংলাদেশ ছাত্রলীগ কাজী নজরুল ইসলামের কবিতার মতোই- ‘এক হাতে মম বাঁকা বাঁশের বাঁশরী; আর হাতে রণতূর্য’ নিয়ে প্রস্তুত থাকে। আন্দোলন-সংগ্রামের পাশাপাশি দুস্থ শিশুর মাঝে শিক্ষা উপকরণ বিতরণ, শীতার্তদের মাঝে শীতবস্ত্র বিতরণ, রক্তদান, বৃক্ষরোপণ, পথশিশুর জন্য ভ্রাম্যমাণ পাঠদান কর্মসূচি ছাত্রলীগের দীর্ঘদিনের চর্চা। করোনা মহামারিতে বিশ্ব যখন বিপর্যস্ত সে সময়েও মানুষের পাশে থেকেছে ছাত্রলীগ। করোনায় আক্রান্তের মৃতদেহ দাফনে যখন স্বজনরাও এগিয়ে আসার সাহস পায়নি, তখন মৃত্যুভয় তুচ্ছ করে এগিয়ে এসেছে ছাত্রলীগ।

১৯৭৩ সালের ৪ মার্চ বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন- ‘শেখ মুজিবুর রহমানকে বেটে খাওয়ালেও বাংলা সোনার বাংলা হবে না, যদি বাংলাদেশের ছেলে আপনারা সোনার বাংলার সোনার মানুষ পয়দা করতে না পারেন।’ তাই বাংলাদেশ ছাত্রলীগের প্রতিটি নেতাকর্মীর ব্রত সোনার মানুষ হওয়ার। বাংলাদেশ ছাত্রলীগ তার সোনালি অতীতের মতো সমৃদ্ধ ভবিষ্যৎ গড়বে। দেশরত্ন শেখ হাসিনার নেতৃত্বে ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার প্রচেষ্টায় ছাত্রলীগের প্রতিটি নেতাকর্মী মেধা ও শ্রম দিয়ে সর্বোচ্চ অবদান রাখতে চায়। নবীনদের মেধা দেশ গড়ার কাজে লাগুক, স্বাধীনতার মূলমন্ত্রে বিধৌত হোক নতুন প্রজন্মের বিবেক ও চেতনা। প্রজন্মান্তরে ছাত্রলীগের অবস্থান সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে, মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে। বঙ্গবন্ধুর আদর্শ বুকে ধারণ করে, সব অশুভ শক্তিকে পেছনে ফেলে, দেশ গড়ার প্রত্যয়ে এগিয়ে যাব আমরা। ৭৩তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে এটাই ছাত্রলীগ নেতাকর্মীর শপথ।

সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ ছাত্রলীগ