বিদ্যমান সমাজ কাঠামোতে বর্গাপ্রথার ভূমিকা : মুস্তাফা হুসেন

বিদ্যমান সমাজ কাঠামোতে বর্গাপ্রথার ভূমিকা
মুস্তাফা হুসেন

ভূমিকা: বাংলাদেশের বিদ্যমান সমাজ কাঠামোর বৈশিষ্ট্য নির্মাণ ও সংরক্ষনে বর্গাপ্রথার ভূমিকা অনস্বীকার্য। বন্তুর কৃষি উৎপাদন তথা এদতঅঞ্চলের সমগ্র উৎপাদন ব্যবস্থায় কৃষিজমির উৎপাদন সম্পর্কীয় ব্যবহারে বর্গাপ্রথা সুদূর প্রসারী ভূমিকা পালন করেছে। ফলশ্রæতিতে, কৃষি উৎপাদন পদ্ধতি পুরাতন বৃত্তকে ছেড়ে বেরিয়ে আসতে পারেনি বলে তা বাংলাদেশের মানুষের সমগ্র সমাজকাঠামোকে ভেংগেচুরে নূতন ভিত্তির উপর দাঁড় করাতে পারেনি-বিষয়ীগতভাবে (সাবজেক্টেভলি) শাসকশ্রেণী বা গোষ্ঠীসমূহের নিচেকার স্তরের মধ্যে ভাঙ্গনের বীজ বৃক্ষে পরিণত হলেও প্রকৃত ও প্রন্তিক চাষী বর্গাপ্রথার নিগড়ে বন্দী বলে এবং তারা শত সাধ সত্তে¡ও সাধ্য নইে বলে জাতীয় অর্থনীতির বিকাশের জন্য প্রয়োজনীয় কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধিতে কাঙ্খিত অবদান রাখতে সমর্থ হয়না, যদিও এখনও পর্যন্ত কৃষিই হলে উৎপাদন তথা সম্পদ সৃষ্টি ও বৃদ্ধির প্রধন ক্ষেত্র বা ভূমি ( সেক্টর) । কারণ ইনপুটস এর যে কোন স্বল্প ব্যবহার এড়ানোর জন্য বর্গাদরকে উচ্ছেদের ভয় খুচিয়ে থাকে এবং এরকম একিট ভয়, জমিতি দীর্ঘস্থায়ী উন্নয়নেকে নিরুৎসাহিত করে। যা নাকি বর্গাদার অন্যভাবে ফলপ্রসু করতে পারত। প্রণব বর্ধন। ক্লাসিক্যাল অর্থনীতিবিদরাও, চাষী কর্তৃক স্বল্পকালীন স্বত্বের নিরাপত্তাহীনতার বিরূপ ফলাফলের বিষয়ে উল্লেখ করেছেন। এমনিক ধনতন্ত্রী অর্থনীতিববিদ জন স্টুর্য়্টা মিলও ফ্রান্সে নগদ অর্থের বদলে শষ্যের নির্দিষ্ট অংশ খাজনা হিসেবে প্রধানের প্রথা)। বর্গাপ্রথা অথবা ঠিকাপ্রথা প্রকৃতপক্ষে অর্থনৈতিক ক্রিয়াকলাপেরই নামান্তর মাত্র। জমির মালিক তার সামাজিক ও রাজনৈতিক অবস্থানের শক্তিতে প্রথাগত (কনভেনশনাল) আইনী বলপ্রয়োগ অথবা আইনী সন্ত্রাস সৃষ্টি ও প্রদর্শনের মাধ্যমে উৎপাদনকে উৎপাদকের কাছ থেকে ছিনিয়ে নেয়।
শস্যে কর দেওয়ার প্রথাঃ
পাসি-সামন্ততান্ত্রিক উৎপাদন সম্পর্কের সাথে সম্পর্কীত। এটা বাংলাদেশের বেলায় সত্য। এখানে ইউরোপীয় ধরনের ঐতিহ্যবাহী সামন্ততন্ত্র বিকশিত হয়নি। কিন্তু প্রকৃত উৎপাদকের নিকট থেকে উৎপাদের অংশ ছিনিয়ে নিয়ে কেন্দ্রীয়ভাবে যে কোয়ের্সিব অর্থরিটি গড়ে উঠেছে অথবা প্রচেষ্ট হয়েছে তা সামন্ততান্ত্রিকতার মূল উদ্দেশ্যের সাথে সর্বঅংশোই মিলে যায়। কিন্তু বৃহৎ সামন্ততন্ত্র এখানে গড়ে উঠেনি, গড়ে উঠার আগেই বাইরের বলপ্রয়েঅগের শক্তি এস বিকাশের স্বাভাবিক ধারাকে বাধাগ্রস্ত করেছে। এখানে গড়ে উঠেছে পাতিসামন্ততন্ত্র, ক্ষুদ্রাকার ধরনের সামন্ততান্ত্রিক সংগঠন। শষ্য বা ফসলকে আত্মসাৎ করাই যার প্রকৃত বৈশিষ্ট্য। বাইরের শক্তি যে তথাকথিত স্বনির্ভর গ্রামে হস্তক্ষেপ। হতে পারেনি, অথবা করেনি অথবা হস্তক্ষেপ করার প্রয়োজন অনুভব করেনি, তার কারণ হলো, সেই গ্রাম কর্তৃত্বকারী এমন একটি শক্তি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, যার মূল ভিত্তিই ছিল উৎপাদিত ফসলের বৃহদাংশকে আত্মসাৎ করে নেয়া, যা অনেকটা এমনই অমোঘ যে তা ইশ্বরের সার্বভৌম শক্তিকেও হার মানায়। প্রাচীনকালের স্বনির্ভর গ্রাম সম্পর্কে যে কথা বলা হয় তা সব সত্য নয়। গ্রামের কর্তৃত্বকারী স্বেচ্ছাচারী গোষ্ঠীপতি ছাড়া আর কেউ প্রকৃত অর্থেই স্বাধীন স্বনির্ভর ছিল বলে মনে করার কোন কারণ নেই। এ রকম কোন ইতিহাস খুঁজে পাওয়া যা না। স্বনির্ভর গ্রামগুলিতে নির্ভেজাল ও নিরংকুশগণতন্ত্রের অস্তিত্ব সম্পর্কে যে কথা বলা হয় তা কতটুকু সভ্যতা ও মানবিকতার সাথে সংগতিপূর্ণ, সেই বিষয়টিও প্রশ্নসাপেক্ষ। গোষ্ঠীতন্ত্র বিরাজমান ছিল। ক্রমান্বয়ে তা বিকশিত হয়ে পাতিসামন্ততান্ত্রিকতায় পরিনত হয়।

বাংলাদেশের জলা-জংলা অঞ্চলে বিচ্ছিন্ন গ্রামগেুলোতে এক ধরনের আপাত যোগাযোগবিহীন জনপদ গড়ে উঠে। মূল কর্তৃত্ব ছিল গোষ্ঠীপতির হাতে। কিন্তু বাইরের শক্তির কাছে দুর্বলের আক্রোশ-সঞ্জাত আক্রমণাত্মক এবং পরিনামে পরাজয় নং, বরং আত্মরক্ষামূলক আত্মসমৎর্পনের কারণে পাতি সামন্ততান্ত্রিকতা হেয়ারারকি বা পিরপামিড-কর্তৃত্বের ধারায় আর বিকশিত হয়ে ওঠেনি। কুপমন্ডুক গ্রামীণ ব্যবস্থা নিজেকে বাঁচিয়ে রাখতে গিয়ে অভিজ্ঞতার বিনিময় থেকে বঞ্চিত হবে, উপরোক্ত পদ্ধতির ধারক ‘ উপাদ’ আত্মসাৎকারী ব্যক্তি বা ব্যক্তিবর্গ নিজেদের শোষণমূলকও কর্তৃত্বমূলক ব্যবস্থাকে বিকশিত করে তুলতে সক্ষম হয়নি। গ্রামীণ পরিসরে একধরনের স্বেচ্ছাতন্ত্র গড়ে তুলেছিলো যার মূল উৎস ছিল উৎপাদিত শষ্যের আত্মসাৎ। কর্তৃত্বকারী, বলপ্রয়োগকারী শক্তি কর্তৃক উৎপাদিত ফসল আত্মসাতের সেই ধারা আজো বিদ্যমান রয়েছে। চাষ করার পূর্বে অথবা ফসল ওঠার পরে নগদ মুদ্রা দিয়ে ভূস্বামীর দাবীকৃত কর সুযোগের নিবিময়ে ফসল ওঠার পর ভূস্বামীকে ফসলের অংশ প্রদান করে, তখন তা কর আর ধনীকৃষক যখন অতিরিক্ত পুঁজি বিনিয়োগ করে অধিক ফসল উৎপাদনের জন্য গরীব কৃষকের জমি চুক্তি নির্দিষ্ট সময়ান্তের অর্থপ্রদানের শর্তে গ্রহণ করে, তখন সেই অর্থ প্রদান কে বলা যেতে পারে ভাড়া।) পরিশোধে প্রথ বাংলাদেশের আজো গড়ে উঠেনি। বিভিন্ন স্থানে ছিটিফোটা ঘটনা দেখা যায়। কিন্তু ব্যপক ও সাধারণ প্রথা হিসেবে তা এখনো চালু হয়নি এবং চালু হয়নি বলে পাতিসামন্ততান্ত্রিকতার ক্ষয়িষ্ণু ধারা পরিমাণগত বৃদ্ধির ভেতরে দিয়ে গুনগতভাবে রূপান্তরিত হয়ে ধনতান্ত্রিক ব্যবস্থার দিকে অগ্রসর হয়নি অথবা প্রাক ধনতান্ত্রিক ব্যবস্থায়ও পরিণতি লাভ করেনি।
শস্যের মাধ্যম কর প্রদান আর নগদ মুদ্রার মাধ্যমে কর প্রদান গুণগতভাবেই পৃথক। দুইটি দুই উৎপাদন ব্যবস্থার দ্যোতক। আমাদের বাংলাদেশে ভূস্বামীকে শস্যে কর প্রদান করাটাই মুখ্য ধারা। মুদ্রায় করা প্রদান ব্যবস্থা চালু হয়নি। ফসলে কর আদায়টা ভূস্বামীকে শস্যে কর প্রদান করাটাই মুখ্য ধারা। মুদ্রায় কর প্রদান ব্যবস্থা চালু হয়নি। ফসলে কর আদায়টা ভূস্বামী জোতদার শ্রেণীর নিজ গ্রামে এবং জোতে স্বেচ্ছাতন্ত্রের প্রদান উৎস ভোগ্য সামগ্রীর স্বল্পতা অথবা প্রাচুর্য অথবা বৈচিত্র দিয়ে এই স্বেচ্ছাতন্ত্রের শক্তিকে পরিমাপ করা যায়না। যারা মনে করেন গ্রামে জোতদারী অথবা ভূস্বামী তন্ত্র, পাতিমান্ততান্ত্রিকতার বৈশিষ্ট্যর সাথে সাযুয্যপূর্ণ নয় অথবা সাদৃশ্যপূর্ণ নয়, তারা প্রকৃতপক্ষে ভূস্বামী শ্রেণীরই বংশধর অথবা ঐ সকল গোষ্ঠীরই লোকজন অথবা তাদেরই প্রতিনিধিত্ব করেন। ফলে পুথিগত বিদ্যার সাহায্যে, পাতিসামন্ততান্ত্রিকতার অবশিষ্টের অবর্তমানতার যে তত্ত¡ তারা প্রকাশ করেন, তা বাস্তবের সাথে সংগতিপূর্ণ নয় এবং বর্তমান অমনাবিক ব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখার জন্য বিদ্যাবত্তার যাদু প্রদর্শন ছাড়া আর কিছু নয়। কর হিসাবে শস্যের অংশ প্রদান এবং নগদ মুদ্রা প্রদান এক জিনিষ নয়। আপাতঃদৃষ্টিতে মনে হতে পারে উভয়ই এক, কিন্তু আসলে তা নয়। কারণ নগদ মুদ্রায় কর প্রদান এর মাধ্যমে বর্তমান কৃষকের বর্তমান অবস্থার সাথে পূর্বতন অবস্থার বৈশিষ্ট্যর ব্যত্যয় ঘটে। ভূস্বামীর সাথে জমির ফসলের তথা জমির সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়, তখন একমান্র মুদ্রাই হয়ে দাঁড়ায় সম্পর্কের ভিত্তি। আর মুদ্রাই যখন সম্পর্কের ভিত্তি হয়ে দাড়ায়, তখন জমি ভোগ দখল নিজেই নিয়ন্ত্রণ করেনা, সেও নুতন একটা নিয়মের নিয়ন্ত্রণে এসে যায়, যার নাম মুনাফা। এ বিষয়টি নিয়েই কার্ল মার্কস পুঁজি গ্রন্থে বিশদ ব্যখ্যা দিয়েছেন। বাংলাদেশের কৃষক এই দৈত্যের কবলে পড়েনি।
আন্তর্জাতিক সাম্রাজ্যবাদের মুনাফা-দৈত্যের কাছে বাংলাদেশী মুনাফা-দৈত্য লিলিপুটিয়ান- বৈশিষ্ট্যও অর্জন করতে পারেনি। বাংলাদেশে কর হিসেবে শস্যের অংশ গ্রহণের সাথে ভূস্বামীর বিচ্ছিন্নতা আসেনি। ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ভূস্বামীরা চুক্তিভিত্তিক নির্দিষ্ট সময়ান্তরে পৌনঃপুনিকভাবে কর হিসাবে নগদ মুদ্রা গ্রহণ করেন না। সকল ভূস্বামীরা উৎপাদিত ফসলের উপর তাদের কর সংযোগ বজার রাখেন। এটা বজায় রাখতে গিয়ে, কেবল বলপ্রয়োগ ও আইনপ্রক্রিয়া নয়, তারা পাতিসামন্ততান্ত্রিক দর্শন, পারিবারিক সম্পর্ক ও সমাজকাঠামো বজায় রাখতে বদ্ধপরিকর থাকেন। অর্থ সম্পর্ক নয়, রক্ত সম্পর্ক ও সমাজকাঠামো বজায় রাখতে বদ্ধপরিকর থাকেন। অর্থ সম্পর্ক নয় রক্ত সম্পর্ক (কিনশিপ) ও তার প্রথাগত নিয়ম কানুনকে প্রধান করে তোলেন। ফসলের খাজনা প্রদান এবং মুদ্রায় খাজনা প্রদানের মধ্যে একটি বড় প্রার্থক্য বিরাজমান। ফসলে খাজনাপ্রথায় উদ্বৃত্ত উৎপাদনের কোন প্রশ্ন থাকেনা। কিন্তু যখন উদ্ধৃত্ত উৎপাদনের জন্য জমি লীজ বা ভাড়া নেয়া হয়, তখন মুনাফা হিসাব করার সময় ফসলের প্রচলিত বাজার দরেই তা নিহসাব করা হয় এবং ভাড়াটিয়া-উদ্যোক্তা মুক্তবাজারের মুদ্রাব্যবস্থায় দ্বারা নির্ণীত বাজার দরেই জমির ভাড়া প্রদান করে থাকে। কিন্তু ভাগচাষী বা বর্গাদার সাধারণত প্রচলিত বাজারদরের সাথে মিলিয়ে কোন হিসাব করেনা। মুদ্রা সম্পর্কের ধারণাপ্রসূত হিসাব-নিকাশ তার সামগ্রিক চাষ প্রক্রিয়ায় নির্ণায়ক প্রভাব বিস্তার করে না। তাই উৎপাদ থেকে ভাগের ভাগ সে দিয়েই যায়-অনাহার থেকে নিজেকে রক্ষার প্রয়োজনে জমির সাথে নিজেদের শ্রমের সংযোগকে দীর্ঘতর করার জন্য; (অবশ্য যে অনিয়মটুকু সে করে সেটা প্রচলিত প্রথার অংশ নয়; সেটা অটিনয়ম। আর অনিয়মটা হল ভূস্বামীর দিক থেকে বিচার করলে ভূস্বামীকে তার প্রাপ্যভাগ (?) থেকে বঞ্চিত করা।) তার আরও একটা কারন এই যে, বিগত একশত বছরে দেখা গেছে যে, যে কৃষি উৎপাদন সম্পর্কের সাতে সম্পর্কিত অকৃষকেরা কৃষির সাথে প্রত্যেক্ষ সম্পর্কের আকর্ষণ ক্রমান্বয়ে শিথিল করেছে, কৃষির ওপর থেকে মনোযোগ অন্যত্র নিবিদ্ধ করার ফলে কৃষিতে মুদ্রাসম্পর্কের প্রাধান্য সৃষ্টি হয়নি; ফলে কৃষিতে কাঙ্খিত বিনিয়োগ করা হয়নি। এভাবে বর্গাপ্রথা টিকে থাকার কারনে এবং বর্গাপ্রথা টিকে থাকার কারণে এবং প্রাক পুজিঁবাদী সম্পর্কে পরিমানগতভাবে সুপরিনত/সুনিবিড় না হওয়ার কারনে গুণাত্মকে রুপান্তরিত হয়নি অর্থাৎ পুজিঁবাদ প্রধান হয়নি।

সংজ্ঞাঃ বর্গাপ্রথার সংজ্ঞা নির্ণয় করতে গিয়ে পশ্চিম বাংলা তথা ভারতের বিখ্যাত অর্থনীতিবিদ অশোক রুদ্রের শরণাপন্ন হতে হয়। তিনি বলেন কেন জমির মালিক যখন উৎপাদনে নিজের শ্রম নিয়োগ করেনা বা নিজের তত্ত¡াবধানে মজুর খাটিয়ে উৎপাদনে নিজের শ্রম নিয়োগ করেনা তখন সে যে উপায় অবলম্বন করে তা হল জমিকে অন্য কোন চাষীর হতে ছেড়ে দেয়া। যে চাষী সেই জমীতে নিজের শ্রম বা ক্ষেতমজুর শ্রমের সাহায্যে উৎপাদন করে এবং জমির মালিককে কোন নির্দিষ্ট হারে কর দেয়। জমির মালিক ও কৃষকের মধ্যে এই বিনিময় প্রথাকে ইংরেজীতে বলা হয় (Tenancy)। কাজ চালানোর জন্য আমরা প্রথাটিকে কর প্রথা অভিহিত করবো। এই প্রথা অনুসারে উৎপাদিত শস্যের একটি নিদির্ষ্ট অংশ কর হিসাবে জমির মালিককে দিতে হয়। জমির মালিক ও ভাগিদারের মধ্যে সম্পর্কের মূল স্তম্ভ অবশ্যই উৎপাদিত শ্যসোর অর্ধেক পায় ভাগীদার অপর অর্ধেক মালিক। শুধু পশ্চিম বাংলায় নয়, শুধু ভারতবর্ষ নয়, দুনিয়ার যেখানেই ভাগপ্রথা প্রচলিত আছে, সেখানে দেখা যায় যে আধাআধি ভাগটাই বেশী গুরুত্বপূর্ণ স্থান অধিকার করে আছে। উত্তরবঙ্গের অনেক অঞ্চলে ভাগপ্রথাকে বলা হয়। আধিয়ারি; ভাগিদার বা বর্গাদেরকে বলা হয় আধিয়ার। ভাগপ্রথা বলতে ‘Share Cropping tenancy’ বোঝানো হয়েছে। উৎপাদিত সামগ্রী বা উৎপাদিত শস্যের একটি অংশ অন্যতর ব্যক্তিকে কোন না কোন শর্তের ভিত্তিতে প্রদাণ করার প্রথা প্রাচীনতম কালেও সভ্যতা বিকাশের একটা পর্যায়েও লক্ষ্য করা যায়। সেট মনু সংহতির আমল থেকে সোভিয়েত বিপ্লবের পরবর্তী নেপ এবং বর্তমানে চীনে প্রচলিত কৃষি ভ‚মি ব্যবস্থায় প্রবর্তিত দায়িত্ব প্রথার মধ্যে পর্যন্ত বিরাজিত। আপাতঃ দৃষ্টিতে মনে হয় রূপ একই; কিন্তু অবস্থান ও প্রকৃতি, আচরণ ও বৈশিষ্ট্য অবশ্যই ভিন্নতর। (বস্তুর বিনিময়ে বস্তুর বিনিময় নয়, উৎপাদিত সামগ্রীর বিপরীতে গ্রহীতার কোন না কোন ধরনের ইচ্ছার বহিঃপ্রকাশ মন্দিরে,মসজিদে প্যগোডা অথবা গীর্জায় যে অর্থ বস্তু সামগ্রী দেয়া হয় তা। কোন না কোন শর্তাধীন পাপস্থলন অথবা বেহেশতে গমন প্রদান করা হয়। তা কিন্তু বস্তুর সংগে বস্তুর বিনিময়য নয়; বরং বস্তু প্রদানের বিনিময়ে অভিব্যক্তির প্রকাশ মাত্র। অর্থাৎ বস্তুর সংগে শক্তির বিনিময় এবং অবশ্যই তা একতরফা। নান কলাকৌশলে শক্তির অভিব্যক্তির প্রকাশ ঘটানো হয় বস্তু দখলের জন্য।)
বর্গাপ্রথার উৎপত্তি ও বিকাশঃ
প্রাচীন ভারতীয় সভ্যতায় জমিদার অর্থাৎ স্বত্বভোগীয ভুস্মামী শ্রেনীর অস্তিত্ব খুজে পাওয়া শক্ত। রাজার রাজস্ব দাবীর উর্দ্ধসীমা ছিল ছয় ভাগের এক ভাগ উৎপন্ন ফসল। বলি অথবা ভাগ সর্বনিম্ন হিসাবে সম্রাট অশোকের সময় আট ভাগের এক ভাগ পর্যন্ত দেখতে পাওয়া যায়। পাল রাজাদের কালে ষষ্ট্যধিকৃৎ অর্থাৎ ষষ্ঠাংশ ভাগ অদায়কারী কালেকটার পদের অস্তিত্ব পাওয়া যায়। উপরোক্ত ব্যবস্থায় ফসলে খাজনা বা কর পরিশোধ করা হত। অবশ্য রাজস্ব বা খাজনা দাতারাই জমির মালিক ছিলেন। পরবর্তী কালে বিদেশী বা বহিরাগত দখলদারী শাসকদের আগমনের সাথে সাথে কৃষক বা কুটিরশিল্পীদের নিকট থেকে উৎপাদিত সামগ্রী নিয়ে নেয়া বা আত্মসাতের পরিমাণ বৃদ্ধি পায়। সেনরাজারা রাজস্ব নেওয়ার প্রচলন করেছিলেন। নগদে অর্থাৎ কর্পদক মুদ্রায়। এখনও বাংলাদেশের মানুষ নিঃস্ব ও অর্থমুদ্রাহীন বা টাকাপয়সা ছাড়া অবস্থাকে কপর্দকহীন অবস্থা বলে বর্ণনা করেন। বিদেশীদের দ্বারা লুনঠনের ধারা স্বদেশী শোষকদের দ্বারা আজো অব্যাহত রয়েছে। একজন বর্গাচাষী তার উৎপন্ন ফসলের একশত ভাগের পঞ্চাশ ভাগ তো দিয়েই দেয়, তারপর অকৃষিজাত অর্থাৎ শিল্পপন্য কিনতে গিয়ে মালিকের বিক্রয় মারফত মুনাফা এবং ক্রয়-কর অথবা বিক্রয়-কর হিসাবে পরোক্ষ কর বাবদ উৎপন্ন ফসলের তিন-চতুর্থাংশেই প্রদান করতে বাধ্য হয়। পরেরটা ধনতান্ত্রিক অর্থনীতির মুক্ত বাজারব্যবস্থার মাধ্যমে তাদের হাতছাড়া হয়ে যায়। নয়া- উপনেবেশিক সাম্রাজ্যবাদী শোষণের জাঁতাকলে পড়ে এভাবেই বর্গাচাষী ও প্রান্তীক চাষী সর্বস্বান্ত হয়। নামে চাষী হলেও আসলে তার অলিখিত আইনে ভূমির সাথে বংশপরম্পরায় সংযুক্ত ভূমিদাস ছাড়া আর কিছুই নয়।
মুঘল যুগে বর্গাপ্রথার অস্তিত্ব ছিল। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর আমলে ছিল। ব্রিটিশ আমলে তা প্রসারিত হয়। মুঘল ও ব্রিটিশ আমলে শাসনকালে বাংলাদেশের কৃষি-অর্থনীতি তা কৃষিভূমি ব্যবস্থায় পরিবর্তন ঘটতে থাকে। পাঠান ও মুঘল আমলে সর্বপ্রথমে সর্বপ্রথম স্বত্বভোগী ভূস্বামীশ্রেণীর সৃষ্টি হয়। ব্রিটিশ আমলে জমিদাররা যে শুধু জমির মালিকানা পেলেন তা নয়, মুঘল আমলে শাহীশাসকদের স্বেচ্ছাচারী হস্তক্ষেপের কারণে দেশীয় বণিকদের সাথে বর্হিবিশে^র যে বাণিজ্যিক যোগাযোগ ক্ষীণ থেকে ক্ষীণতর হচ্ছিল, বিট্রিশ আমলে, ইউরোপীয় বণিকেরা তা সম্পূর্ণ হস্তগত করে এবং উঋরোপীয় বণিকদের মাধ্যমে বিশ^বাজারে সংগে নতুনতর শর্তে ঘনিষ্টতা জন্মে। ঔপনিবেশিক অর্থনীতির প্রয়োজনে সর্বাধিক রাজস্ব আদায়ের চেষ্ট, খাজনার চাপ, বাণিজ্যিক পন্যোৎপাদন ইত্যাদি নানা কারণে তৎকালীন পণ্য উৎপাদনে মালিকানা-পদ্ধতি ক্কিয়ৎ পরিবর্তনের ফলে অর্থনীতি ও সমাজকাঠামোতেও পরিবর্তনের আভাস পরিলক্ষিত হয়। মালিকানা ব্যবস্থায় পরিবর্তনের মধ্যে সবচাইতে উল্লেখযোগ্য ঘটনা হল কৃষি ভূমিব্যবস্থায় বর্গা প্রথার উৎপত্তি বিস্তার ও বর্গাচাষীদের সংগ্রাম। বাংলাদেশের বিমেষ করে অনুর্বর অঞ্চলের জমিদার বা জমির ইজারাদারগণ ভাগচাষী দিয়ে চাষ করানো শুরু করেন। উনিশ শতকের চাকুরীজীবি শিক্ষিত মধ্যবিত্ত জমি কিনে বর্গা বন্দোবস্ত করে একটা নিশ্চিত আয়ের ব্যবস্থা দিতে শুরু করেন। তারা নিকৃষ্ট মানের জমিতেও চাষের কোন জমি কিনে বর্গা বন্দোবস্ত দিতে শুরু করেন। তারা নিকৃষ্ট মানের জমিতেও চাষের কোন ঝুঁকি না নিয়ে উৎপন্ন ফসলের অর্ধাংশ লাভ করত। ১৮৫৯ ও ১৮৮৫ খৃস্টাব্দে প্রজাস্বত্ব আইন সমূহ পাশ হওয়া পর বাংলার জমিদার, মধ্যস্বত্বভোগী, ধনীকৃষক ও মহাজ আর খুশীমত প্রজা উচ্ছেদ করতে পারতেননা অথবা আইনে নির্দিষ্ট নিয়েমের বাইরে খাজনার হার বাদাতে পারতেন না। এই পরিস্থিতিতে এই শ্রেণীর মানুষেরা আয়ের অন্য পথ ধরেন। বর্গা ব্যবস্থা হলে সেই অন্য পথ। এই ব্যবস্থায় উৎপাদিত ফসলের পরিমাণ বৃদ্ধি পাক বা না পাক বর্গা ব্যবস্থা বর্গা জমিমালিক এর আয়ও হত তুলনা মূলক রূপে বেশি। উপরন্তু খুশীমতো প্রজা উচ্ছেদ কোন আইনগত বাধা চিল না। সমস্ত শ্রেণীর বর্গাদার ছিল ওঠবন্দী প্রজা। বর্গাদারা ছিল সম্পূর্ণভাবে মালিকের দয়ার উপর (১৮৮৫-১৯৪৭) প্রবন্ধে বিনয়ভূষন চৌধুরী বর্গাপ্রথা প্রচলনের কারন হিসাবে উল্লেখ করেন। (ক) জনসংখ্যা বৃদ্ধির চাপ, ফলে চাষী-পাট্টার সংকোচন (খ) ভূমিহীন ভ্রাম্যমান মজুরদের বর্গাদারে পরিণত হওয়ার প্রক্রিয়া (গ) ফ্লাউড কমিশনের দৃঢ় বিশ্বাস হয় যে বর্গাদারী প্রথা বেড়ে যাওয়ার প্রধান কারণ হল জমির বাণিজ্যিকরণ এবং অকৃষিজীবী সম্প্রদায়ের হাতে জমির সবচেয়ে মূল্যবান অধিকার অর্থাৎ ভোগ দখলের অধিকার চলে যাওয়া। ঋণপরিশোধে ব্যর্থ চাষী নিরুপায় হয়ে জমি বিক্রি করতে বাধ্য হয়, মহাজন এই সুযোগের অপেক্ষায় থাকে এবং শেষে এই জমিতে বর্গা চাষ চালু হয়।

পশ্চিম বঙ্গের কিছু গ্রামকে নমুনা হিসেবে নিয়ে অনুসন্ধান চালিয়ে ফ্লাউড কমিশন লক্ষ করেন যে, ১৯২৯ থেকে ১৯৩৯ এর মধ্যে হস্তান্তরিত জমির ৩৩.৭% বর্গাদার দিয়ে চাষ করানো হত। পূর্ববাংলায় এর পরিমাণ ছিল ২৯.৫%। পরবর্তীকালে বর্গাচাষের পরিমান আরো বাড়ে। আহরিত তথ্য থেকে জানা যায় ১৯৪৬ সালে, বাংলার বেশির ভাগ জমিই ভাড়া করা মজুদের বদলে বর্গাদার দিয়ে চাষ করানো হত। বিনয়ভূষণ চৌধুরী ও আর কে মুখার্জি, দি ডায়নামিকস অব এ রুরাল সোসাইটি (বারলিন)। পশ্চিম বাংলায় তুলনায় (১) ভারত উপ-মহাদেশের এককালীন রাজধানী কলকাতাকেন্দ্রীক পারিপাশির্^ক অঞ্চল হওয়ায়; (২) শিল্পপ্রধান এলাকা; এবং (৩) তুলনামূলক রূপে অনুর্বর এলাকা হওয়ার কারণে গ্রাম থেকে শহরাঞ্চলে অকৃষিজীবীকার সন্ধানে জন-বহির্গমনের ফলশ্রæতিতে বর্গাদার জমি চাষের ব্যপক বিস্তার ঘটে। পূর্ববাংলায় এ ঘটনা ঘটতে থাকে ১৯৪৭ সনের পর থেকেই। ঢাকা পূর্ববাংলার রাজধানী হওয়ার ফলে এবং চট্টগ্রাম, নারায়ণগঞ্জ ও খুলনা সহ বিভিন্ন শহরে সীমিত পরিসরে বাণিজ্য কেন্দ্র গড়ে উঠার ফলে এবং ব্যপক সংখ্যক মানুষ শহর-নগর-ভিত্তিক জীবিকার সাথে যুক্ত হওয়ার ফলে গ্রামাঞ্চলে বর্গাপ্রথার ব্যপক প্রসার ঘটে। বাংলাদেশে রাষ্ট্রের আবির্ভাবের পর ১৯৭২ সালের পর থেকে উক্ত প্রক্রিয়া ব্যপকতত হয়। এখন নিদ্বীধায় বলা যায়-বাংলাদেশের কৃষিজীবীর অধিকতর অংশই বর্গাপ্রথা বা ঠিকাপ্রথার ভিত্তিতে চাষ হয়। মধ্য ষাটের পর থেকে যান্ত্রিকতার ও সেচ কীটনাশক, সীমিত পরিসরে উফসীবীজ ইত্যাদি প্রযুক্তি প্রবর্তনের ফলে কিছু সংখ্যক ধনীকৃষক যিনি আবার বর্গাজমির মালিক ও বটে, কৃষিতে বিনিয়োগে উৎসাহিত হয়ে উঠবেন-এমত আশা করা গিয়েছিল। কিন্তু সরাসরি কৃষি মজুর নিয়োগের চাইতে বর্গাবন্দোবস্তের মাধ্যমেই জমির উৎপাদিত ফসল পেতে আগ্রহী হয়ে উঠেছেন। বিগত ত্রিশ বছরে তাতে কোন মৌলিক পরিবর্তন ঘটেনি। বরং একটা অদ্ভুত ঘটনা লক্ষ করা যাচ্ছে- অনেক বর্গাজমিমালিক-ধনীকৃষক কৃষিতে সরাসরি মজুর খাটিয়ে চাষবাস না করে, গ্রামের জমি বর্গা বা ঠিকা দিয়ে ক্ষুদ্র শিল্পে, ব্যবসা বাণিজ্যে বা ঠিকাদারিতে অতিরিক্ত সঞ্চয় বিনিয়োগ করেছেন। এটা নয়া-উপণিবেশিক সাম্রাজ্যবাদীদের বর্তমান বিশ^অর্থনীতির চুইয়ে-পড়া কল্যাণ- কামনার অবদান। (জন মাইনার্ড কেদনস)। গরীবও মাঝারী কৃষক, ঋণভারে জর্জরিত হয়ে উন্নেত প্রযুক্তিকে কাজে লাগাতে পারছেন না। কৃষি জমি চলে যাচ্ছে। গ্রাম ছেড়ে আসা শহরবাসী আমলা ও ব্যবসায়ীদের হাতে। ফলে না ঘটছে উন্নত প্রযুক্তির পূর্ণ প্রয়োগ না হচ্ছে বর্গাপ্রথার অবসান। না হচ্ছে কৃষিতে আন্তরিক বিনিয়োগ উৎসাহী ধনীকৃষকের আবির্ভাব। ধনীকৃষক মূানুগ হতে পারছেনা। তার দোদুল্যচিত্ততা থেকেই যাচ্ছে। সে একধারে জোতদার মহাজন ও ফটকাবাজ। বর্গা প্রথার জালে বন্দী গরীব ও মাঝারি কৃষক হাড়ভাঙ্গা পরিশ্রমের পরে অফসিজনে দিনখোড়াকির অভাবে উপবাস-অর্ধোপবাসে দিন কাটায়। চীন ও রাশিয়ার কৃষকের তো মাথাগুঁজার ঠাঁইটুকু ছিল। কিন্তু বাংলার কৃষি থেকে ক্রমান্বয়ে উচ্ছেদ হয়ে যাওয়া বর্গাচাষী নিঃস্ব থেকে নিঃস্বতর ও সর্বহারা হয়ে শহর ও বন্দর, হাট বাজারের পথে ঘাটে পড়ে থাকে।
প্রভাব, প্রতিক্রিয়া ও ফলাফল: 
বর্গাপ্রথার বিস্তারের ফলে কৃষিজগতের খুব ক্ষতি হয়েছিল- (এই মতের যারা সমর্থক) তারা বিশ্বাস করেন যে, এই প্রথা ক্রমশ ব্যাপক হতে থাকে। বর্গাচাসীদের ব্যাপক বৃদ্ধির ফলে বিরাট সংখ্যক প্রকৃত চাষীর সাথে চাষযোগ্য জমির একটা সরাসরি সম্পর্ক স্থাপিত হয়। বর্গাজমির মালিকের ব্যাপক বহির্গমনের ফলে, গ্রামীণ সমাজকাঠামোতে তাদের অনুপস্থিতর ফলে-গ্রামঞ্জলে প্রকৃতচাষীর বিমিশ্র ও অখন্ড বৈশিষ্ট্যর একটা ভিত্তি সৃষ্টি হয়-যা ছিল উৎপাদক-দিকায়নের একটা সূচকও বটে। এটা বর্গাপ্রথার একমাত্র সদর্থক বিবেচনা। অপরদিকে নেতিবাচক ফলশ্রুতি হল-বর্গাপ্রথার একমাত্র সদর্থক বিবেচনা। অপরদিকে নেতিবাচক ফলশ্রুতি হল-বর্গাপ্রথায় প্রথমদিকে অনুর্বর অহল্যাভূমীতে চাষেরর ফলে উৎপাদন বৃদ্ধিতে সহায়ক হলেও পরবর্তীতে উৎপাদন স্থবির হয়ে যায় এবং উৎপাদনে তুলনামূলক ক্রমাবনতি ঘটতে থাকে। একটি বিষয়ে মার্কসবাদী ও মার্কসবাদবিরোধী সমাজতাত্বিকেরা সম্পূর্ণ একমত হয়েছেন, যে নিজ জোতের তুলনায় ভাগজোত অবশ্যই কম উৎপাদনশীল। প্রথম কারণ এই যে ভাগীদার যেহেতু জমির স্বত্বের অধিকারী নয়। সেই হেতু সে জমিতে কোন দীর্ঘমেয়াদী পুঁজি নিয়োগ থেকে বিরত থাকবে। দ্বিতীয় কারণটি হল সেই খরচ কোন একটি মৌসুমে একটি ফসল ফলাবার জন্যই যে খরচের আবশ্যক) সংক্রান্ত যা দীর্ঘমেয়াদী ফলপ্রসবকারী নয়। এম.আজিজুল হক, “বাংলার কৃষক” গ্রন্থে, অনারেব জনাব আমির আলির একটি মন্তব্য উদ্ধৃত করেছেন, হস্তান্তরের অধিকার থাকলে জমির উপর কৃষকের দরদ বাড়ে এবং সে তার ধরে করেছেন, ‘হস্তান্তরের অধিকার থাকলে জমির উপর কৃষকের দরদ বাড়ে এবং সে তা ধরে রাখারই চেষ্টা করে। এবং অন্যান্য কৃষকের তুলনায় সে ভাল আবাদ করে ও উন্নততর জীবনধারন করে। হস্তান্তরের অধিকার থাকলে জমির উপর কৃষকের দরদ বাড়ে এবং সে তা ধরে রাখারই চেষ্টা করে। এবং অন্যান্য কৃষকের তুলনায় সে ভাল আবাদ করে ও উন্নততর জীবনধারন করে। হস্তান্তরের ক্ষমতা স্বত্¦ধিকারের একটি শর্ত। স্বত্বাধিকারী অর্থাৎ মালিকচাষী যে অন্যান্য কৃষকের তুলনায় ভাল আবাদ করে এটা সর্বজনস্বীকৃত। বিপরিতে স্বত্বাধীকারহীন বর্গাচাষী যে, জমির উপর দরদ অনুভব করেনা তা একই কৃষকের নিজ মালিকানার জমি এবং বর্গাচাষের জমি থাকলে বিষয়টি তুলনামূলকভাবে বিচার করা যায়। সমাজবিজ্ঞানিরাও বলেন যে, বর্তমানে শতকরা পঞ্চাশ ভাগেরও বেশি কৃষি পরিবার ভূমিহীন (যাদের ০.৫০ একরের বেশী চাষের জমি নাই)। ভূমির অসম বন্টন এবং প্রান্তিক ও দরিদ্র কৃষকদের সংখ্যাধিক্য কৃষিভূমির যথাযথ ব্যবহারকে যথাযথ ব্যবহারকে বাধাগ্রস্ত করে থাকে। যদি তাই হয় তা হলে সারা দেশে অর্ধেক এরও বেশি কৃষি জমি চাষকারী বর্গাচাষীদের সংখ্যাধিক্য এবং সাথে সাথে তাদের ভূমিমালিকানাহীনতা কি কৃষি ভূমির যথাযথ ব্যবহারকে বাধাগ্রস্ত করেনা ?
অনুপস্থিত ভূস্বামী-ব্যবস্থার প্রতিক্রিয়া : 
বাংলাদেশের কৃষিজমি মালিকদের অধিকাংশই বর্গাপ্রথার মাধ্যমে চাষবাস করায়। সামান্য কিছু অংশ পতিত ও রাখে বা পতিত রাখতে বাধা হয়। চল্লিশের দশকের এক নমুনা জরিপে দেখা গেছে যে শতকরা পঞ্চাশ ভাগেরও কিছু কম জমি বর্গাচাষের অধীন, যা দশ বছর পূর্বের তুলনায় অবশ্য অপেক্ষাকৃত অনেক বেশী। ১৯৪৩ সালের দুর্ভিক্ষ ও মন্বন্তরে এক বিশাল পরিমাণ জমি-অ-চাষী মহাজন, জোতদার, ব্যবসায়ী ও শহরবাসী চাকুরিজীবীদের কাছে হস্তাআন্তরিত হয়ে যায়। পূর্ববাংলার গ্রাম্য মোকামগুলো (সমগ্রভৌগলিক অর্থনৈতিক অঞ্চলের প্রাথমিক বাণিজ্যকেন্দ্র) সেসময়ই শ্রী-বৃদ্ধি প্রাপ্ত হতে থাকে। (যদিও লক্ষ লক্ষ নিরন্ন নরনারী মৃত্যুমুখে পতিত হয়-যাদের অধিকাংশই বর্গাচাষী)। ১৯৪৭ সনে হিন্দু ধর্মাবলম্বি ব্যবসায়ী সম্প্রদায়ের ব্যপক বাস্তুত্যগের ফলে প্রাথমিক বাণিজ্যকেন্দ্র সমূহ নিবিড় ধর্মাবলম্বি ব্যবসায়ী সম্প্রদায়ের ব্যপক বাস্তুত্যগের ফলে প্রাথমিক বাণিজ্যিকেন্দ্র সমূহ নিবিড় হওয়ার পথে সাময়ীকভাবে বাধাগ্রস্ত হয়। কিন্তু তার পরপরই অর্থাৎ চল্লিশের দশকের শেষ প্রান্ত থেকেই নুতন করে আবার জমতে শুরু করে। (গ্রাম্য-বাণিজ্যকেন্দ্র নিবিড়ায়নের দ্যোতকশব্দ)। মুসলমান ফড়িয়া ব্যবসায়ী, মহাজন, জোতদারগন বাস্তুত্যাগীদের বাস্তু ভিটা দখল করে, শূণ্যস্থান পুরনের চেষ্টা করে। সম্পূর্ণ পঞ্চাশের দশকে গ্রামাঞ্চলে অর্থাৎ প্রত্যক্ষ কৃষি -অর্থনীতির ক্ষেত্র থেকে ব্যপকসংখ্যক মানুষের স্থানত্যাগ ও শহরাঞ্চলে অধিবাসের ফলে কৃষিজমিতে অনুপস্থিত-ভূস্বামীদের সংখ্যা বৃদ্ধি পায়। বর্গাপ্রথার ব্যাপক প্রসার ঘটে।

কোরিয়া যুদ্ধের ফলশ্রুতিতে কাঁচা পাটের বাজারে উঠতিভাব দেখা দেয়া সত্বেও কৃষিঅর্থনীতি নির্ভর লোকদের মধ্যে অতিরিক্ত সঞ্চয়ের কারণে অতিরিক্ত বিনিয়োগের উদ্যোগ যেমন লক্ষ্য করা যায়না তেমনি কৃষি-অঞ্চল ত্যাগের প্রক্রিয়াও ঘাটতি পরিলক্ষিত হয় না। বরং ১৯৫১ সালে জমিদারী প্রথা উচ্ছেদ, বায়ান্ন সালে ভাষা আন্দোলন, চুয়ান্ন সালে সাধারণ নির্বাচন পূর্ববাংলার গ্রামীণ কৃষিসমাজকে যেরকম প্রবলভাবে নাড়া দেয়, তাতে করে, কৃষি অর্থনীতির মৌচাকে মৌমাছিদের স্থানচ্যুতি ঘটায়; তারা আরো মধুর আশায় শহরপানে উড়ে যায়। কিন্তু ডুডু ও টামাক-দুইএর বন্ধনেই নিজেকে জড়িয়ে রাখে। ষাট এর দশকে কোতদার-মহাজন-কাম-উঠতি ধনীকৃষক রাষ্ট্রীয় প্রণোদনায় কৃষিখাতে নানা এলিটদের জন্য একধরনের সাবসিডি বটে) পাওয়া সত্বেও আধুনিক প্রযুক্তি বিনিয়োগে আগ্রহী হয়নি। বরং অধিকাংশ ক্ষেত্রে তাদের হাতে জমি কেন্দ্রীভূত হওয়ার পরেও তারা পুরাতন-পদ্ধতিতে চাষাবাদ-বহির্ভূত অতিরিক্ত জমি বর্গাপ্রথাতেই সীমাবদ্ধ রাখে। সত্তুর দশকের প্রথম পর্যায়ে কৃষিঅর্থনীতির উন্নয়নের জন্য আধুনিক ভূমী ব্যবস্থাপনার অমিত সম্ভাবনা থাকা সত্তে¡ও রাজনৈতিক অস্থিরতা ও সঠিক দিকনির্দেশনার অভাবে তা ফলপ্রসু তো হয়ইনি, বরং গ্রামাঞ্চলের বিরাট সংখ্যক গরীব কৃষক ভুমিহীন হয়ে ক্ষেমজুর এবং গ্রামাঞ্চলে থেকে বাস্তুত্যাগী হয়ে শহরের পথেঘাটে এসে আশ্রয় গ্রহণ করে। (প্রকৃতপক্ষে রাজনৈতিক অস্থিরতা ও অর্থনৈতিক দিকনির্দেশনার অভাবে বিদ্যমান শাসক শ্রেণীরই বৈশিষ্ট্য ছিল।) এবারও জমি চাষীর নিকট থেকে হস্তান্তরিত হয়ে অচাষীর কাছে অধিকতর কেন্দ্রীভূত হয়। বিশ বছর পর পর্যালোচনা করে দেখতে পারি, উপরোক্ত কেন্দ্রীভবন কৃষিতে গুণাত্মক-ভাবে ব্যপক অর্থকারী ও বাণিজ্যিক বিনিয়োগের আওতায় আসেনা। বরং জমি মালিকের জন্য ঝুঁকিবিহীন বন্দোবস্তের মাধ্যমে নির্দিষ্ট সময়ান্তরে উৎপাদের অংশ আত্মসাতের প্রক্রিয়াতেই তারা সন্তুষ্ট। এটাই বাংলাদেশে বর্তমান ভূমী-ব্যবস্থার সচারচর ও প্রধান রূপ বর্তমান শাসক গোষ্ঠী কৃষককে ভর্তুকী দিয়ে উৎপাদন বৃদ্ধির মায়া প্রণোদনা দিয়ে তাদেরকে হাতে রাখতে চায়। কিন্তু ঋণ ও সাহায্য দাতারা তাতে রাজী নয়। জোতদার ও মহাজন সত্যিকার অর্থে ধনী কৃষকে রূপান্তরিতহবে কিনা তা দেখার বিষয় বটে। নাকি এরপরও তারা ঝুঁকিবিহীন বর্গা ও ঠিকা প্রথাতেই নির্দিষ্ট সময়ান্তরে উৎপাদনের অংশ আত্মাসাতে নিয়োজিত থাকবে, তাও লক্ষ্যনীয় প্রথাতেই নির্দিষ্ট সমায়ন্তরে উৎপাদনের অংশ আত্মসাতে নিয়োজিত থাকবে, তাও লক্ষ্যনীয় বিষয় হবে।
শোষকদের ভন্ডামী ও ব্যর্থ প্রচেষ্টা ঃ
প্রয়াশ শেক মুজিবর রহমান বাধ্যতামূলক গ্রামসমবায়ের ঘোষণা দিয়েছিলেন। কমিউনিস্টরা খোদ কৃষকের হাতে জমি ও সমবায় এই ঘোষণা দিয়েছিলেন। কিন্তু এতো কিবল ছিল ঘোষনাই মাত্র। ডানবাম নির্বিশেষে সকল রাজনৈতিক দল ও সমাজকাঠামোর বেনিফিসিয়াারি ও লিগেসির পতাকাবাহী হওয়ার ফলে কেউই প্রচলিত জোতদারী-মহাজনী-প্রধান কৃষিভূমি ব্যবস্থার কাঠামোকে পরিবর্তন করে জাতীয়ভাবে উৎপাদন বৃদ্ধির দর্শনকে বৈপ্লবিক উপায়ে কার্যকরী করতে রাজী হতে পারেননি। এখনো না ভারতীয় উপমহাদেশে রাজনৈতিক চিন্তায় সবচাইতে প্রগতিশীল বলে পরিচিত পশ্চিম বাংলায় ও না সেখানে এখনো কৃষিভূমি ব্যবস্থায় বর্গপ্রথাজাত তেভাগা পদ্ধতিই কার্যকারী। কার্ল মার্কস কথিত এশীয় উৎপাদন পদ্ধতির অঞ্চলেই অর্থাৎ দক্ষিণ কোরিয়া, তাইওয়ান, ইন্দোনেশিয়া ইত্যাদি দেশগুলিতে ভূমী ব্যবস্থায় সামন্ততান্ত্রিক সম্পর্কের অবসার ঘটানো হয়েছে। অথচ ভারতীয় উপমহাদেশীয় অঞ্চলে হয়নি। বিগত দেড়শত বছর পূর্বে অর্থাৎ ব্রিটিশ শাসনামলে বাংলা অঞ্চলের ভমিব্যবস্থায় যে প্রজাস্বত্ব কায়েম করা হয়েছিল, আজ থেকে প্রায় পঞ্চাশ বছর পূর্বে মধ্যস্বত্বূলক জমিদারী ব্যবস্থা সরকার কর্তৃক অধিগ্রহণের পরে প্রজাস্বত্বাধিকারের বলে বলীয়ান সেই প্রজারা অর্থাৎ জোতদারেরা দিনের পর দিন কেবল আরও শক্তিশালীই হয়েছে এবং উভয়ই বাংলাতেই তারা তথাকথিত রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্বের তত্বাবধানে নিয়োজিত/সমাসীন হয়েছে। বাংলা অঞ্চলের পূর্বাংশে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার উদ্দ্যোগের সময়ে এবং তার একুশ বছর পর ধনিক শাসকগোষ্ঠীর গণতান্ত্রিক আন্দোলনের সময়েও ভূমিব্যবস্থার বৈপ্লবিক পরিবর্তনের আকাঙ্খা ক্ষীণকন্ঠে ঘোষনাকারী ব্যক্তি ও দলসমূহ প্রকৃত পরিবর্তনকামী কর্মপ্রয়াসে সোচ্চার হয়নি। তার কারণ এই যে- কম্পিউটার যুুগে-ও তারা অনুপস্থিত ভুস্বামী এবং অমানবিক, আধুনিক বর্গা ও ঠিকাপ্রথা নামক এক জংলী প্রথার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সুবিধাভোগী।

বামপন্থীদের মধ্যে ইদানিং অনেক বিপ্লব পরবর্তী রুশদেশে নুতন অর্থনৈতিক নীতির (নেপা) প্রশংসায় পঞ্চমুখ হয়ে ভূমিব্যবস্থা পরিবর্তনে ধীরে চলা নীতিরই পরোক্ষ ওকালতী করেন। আবার কেউবা চীনের দায়িত্বপ্রথার সুফলপ্রদায়ী পদ্ধতির কার্যকারীতার উল্লেখ করেন। আপাতঃ দৃষ্টিতে নুতন অর্থনৈতিক নীতিকে খুব সুখকর মনে হলেও, ঘটনাটি খুব সুখের ছিল না। রুশদেশে বিপ্লবের পর সকল জমি জমিদারদের নিকট থেকে ঘটনাটি খুব সুখের ছিল না। রুশদেশে বিপ্লবের পর সকল জমি জমিদারদের নিকট থেকে বাজেয়াপ্ত করে জাতীয়করণ করা হয়েছিল। ভূমির স্বত্বাধিকার করা হয়েছিল একমাত্র রাষ্ট্র কেহ। আট দশক পরেও রাষ্ট্রীয় স্বত্বাধীকার কমবেশী বজায় রয়েছে। নেপ এর আমলে উদ্ধৃত্ত শস্য বাধ্যতামূলকভাবে বাজেয়াপ্ত/সংগ্রহ করার বদলে শস্যের মাধ্যমে কর পরিশোধের ব্যবস্থা প্রর্বতন করা হয়। এটা কৃষকের সাথে এমনি একটা রাষ্ট্রের বন্দোবস্ত- চুক্তি, যে রাষ্ট্র সমস্ত উৎপাদন উপায় এবং কৃষি-সরঞ্জামেরও মালিক। এখানে ব্যাক্তিমালিকানার কোন সামাজিক ও আইনগত ভিত্তি ছিলনা। চীনের দায়িত্বপ্রথাতে পরিবারের সাথে রাষ্ট্রের চুক্তি। আর রাষ্ট্রই সকল জমি ও যন্ত্রের মালিক। জমি হস্তান্তর ও তসরুপ করার একমাত্র একচ্ছত্র ও সাবর্ভৌম অধিাকারী কেবলমাত্র রাষ্ট্র সকল সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রই। এটাই নির্ধারক বৈশিষ্ট্য। াইদানিং চীনে অবশ্য জমি ও যন্ত্রের স্বত্বাধীকরা-চরিত্র পরিবর্তনের চেষ্টা চালানো হচ্ছে। পশ্চিম বাংলার ভেতাগা প্রথা ও নেপ আর দায়িত্বপ্রথা একই ধরনের বস্তু ও ঘটনা নয়।

ভারতীয় অনেক প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদই ইদানিং সিদ্ধান্তে পৌছেছেন যে তাভাগা ও বর্গাস্বত্ত কায়েমের ফলে পশ্চিম বাংলার কৃষি উৎপাদন, অন্যান্য রাজ্যের তুলনায় খুব হারে বাড়েনি। এবং অন্যদিকে তেভাগা পর্গাপ্রথায় যে পরিমান শস্য উদ্ধৃত্ত হয়েছে, তার তাৎক্ষনিক ও প্রত্যক্ষ ফলভোগী/লাভবান হয়েছে মালিকশ্রেনীই। বর্গাচাষী বা ক্ষেতমজুরের ক্রেতা হিসাবে সামর্থ্য সৃষ্টি হয়নি বা তাদের ক্রয়-ক্ষমতা বাড়েনি। যদিও কৃষি-অর্থনীতিতে তাদেরই সংখ্যাধিক্য। পরিণামে শ্রমশক্তির যোগান ও পরিপোষনের জন্য যদি ঘাটতি দেখা দেয় অথবা বিরুপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয় তবে বিস্মিত হওয়ার কিছু থাকবেনা। ক্রয়-ক্ষমতা যে শ্রমশক্তি উৎপাদনের পূর্বশর্ত, একথা বিখ্যাত অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন সহ অনেকেই বলেছেন। মার্কসবাদী সরকারের শানাধীন পশ্চিম বাংলায়ও সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলোর ধনিকশ্রেনীর অর্থসাহায্য লালিত ও পালিত বেসরকারী সংস্থাগুলো ভ‚মিহীন গরীবদেরকে সাহায্য করে তাদের ক্রয়ক্ষমতা বাড়ানোর চেষ্টা করছে, তাদের কষ্টলাঘরের প্রয়াসে রত থাকছে (?)। যদিও রাশিয়,চীন ও ভিয়েতনামে খাদ্যশস্যের অপরিমেয় বর্ধিত ফলন পুজিঁবাদীশেষগুলোকেও চমকে দিয়েছে চলতি দশকের শুরতেই। এ দেশগুলার সাথে পশ্চিম বাংলা ও বাংলাদেশের কৃষি-অর্থনীতির তুলনামূলক পর্য্যালেচনা-এই সিদ্ধান্তে নিতেই সাহায্য করবে-সমাজতন্ত্রের সময়কালে রাষ্ট্রীয়/সামাজিক সংস্থাগুলো কর্তৃক উৎপাদন ও বন্টনের দায়িত্বভাব গ্রহণের পূর্ব সমস্ত জমি রাষ্ট্রীয় মালিকানায় নিয়ে নেয়া না হলে, এবং সাথে সাথে ব্যাক্তিমালিকানা ও তার মনসেচ্ছার মূল ভিত্তিকে পৌনপুঃনিক শিক্ষা ও উদ্বুদ্ধকরনের সাহায্যে নিঃশেষ করা না হলে, উৎপাদকের স্বার্থরক্ষা, শ্রমশক্তির পরিপোষন চালিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। মনে হয় ধনতন্ত্রকে টিকিয়ে রাখা ও তার ক্রম বিস্তারের স্বার্থে সামন্ততন্তকে নিঃশেষ করার প্রয়োজনে উপরোক্ত ধরনেরই একটা ব্যবস্থার ইংগিত করেছিল অভিজ্ঞ সা¤্রাজ্যবাদী বিট্রিশ আমলা মিঃ ফ্লাউড অর্ধশতাব্দীরও বেশীকাল পূর্বে সাম্রাজ্যবাদী ব্রিটিশ সরকার কর্তৃক নিয়োজিত ফ্লাউড কমিশন ভুমিমালিকানা সম্পর্কে সকল মধ্যস্বত্বরে বিলোপ করে সকল জমি সরাসরি রাষ্ট্রের মালিকানা এনে চাষীর সাথে সরকারের সরাসরি সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব করেন। যদিও আজো অবধি বর্গা ও ঠিকা প্রথার বেনিফিসিয়ারিয়া ফ্লাউড সাহেবের কমিশনের প্রতিবেদনকে ভেংচি কেটে তাদের দিকে তাকিয়ে বিদ্রুপের হাসি হাসেন। এখানে কার্ল মার্কসের একটা বক্তব্যকে উদ্বৃত করা আবশ্যক জমির জাতীয়করন ভ‚-সম্পত্তিই হল সকল সম্পদের আদি উৎস এবং এটি এমন এক বিরাট সমস্যা হয়ে দাড়িয়েছে যার সমাধনের উপর নির্ভর করে আছে শ্রমিক শ্রেনীর ভবিষ্যৎ। জমির জাতীয়করন শ্রমও পুঁজির মধ্যে সম্পর্কের ক্ষেত্রে সম্পূর্ন এক পরিবর্তন ঘটাবে এবং পরিশেষে কি শিল্পের ক্ষেত্রে ও কী গ্রামীন ক্ষেত্রে উৎপাদনের পুঁজিতান্ত্রিক রুপটিকে দেবে বাতিল করে। অতঃপর শ্রেনী-বৈষম্য ও শ্রেনীগত বিশেষ সুযোগ সুবিধাা ও সমস্ত যার উপর ভিত্তি করে দাড়িঁয়ে আছে সেই অর্থনৈতিক বনিয়াদটিও যাবে লুপ্ত হয়ে।
বর্গাপ্রথা ও উৎপাদকদের পরিবর্তনশীল গঠনবিন্যাসঃ
‘মুঘল আমলে এক অর্থে জমি ছিল চাষীর অধীন। কিন্তু বাস্তবে চাষীই ছিল জমির অধীন’। ‘ইরফরন হাবিব’। কারন সামন্তবাদ জমি থেকে কৃষকের মুক্তির বদলে কৃষককে জমির সাথে আষ্ঠে-পৃষ্ঠে বেঁধে রেখেই শোষন চালায়। ‘এঙ্গেলস’। বস্তুূতঃ বিগত দেড়শ’ বছরে কৃষি অর্থনীতি থেকে উচ্ছেদকৃত ও উদ্বৃত্ত ভ‚মিহীন লোকজন বিভিন্ন অকৃষি পেশায় নিজেদের নিয়োজিত করলেও তারা জমির আষ্ঠে-পৃষ্ঠের বাঁধন সহজে ছাগতে পারেনি। জনসংখ্যা বৃদ্ধির সাথে সাথে ভ‚মিদাস পর্যায়ের বর্গাচাষী, গরীব চাষী ও প্রান্তিক চাষী ও প্রান্তিক চাষী পরিবারের লোকজন বাঁধাধরা পারিবারিক পেশায় বৃত্ত ছেড়ে প্রথমত নিতান্ত অদক্ষ পেশা যথা মাটিকাটা, নৌকার মাঝি, পালকি টানা, ফেরিওয়ালা ইত্যাদি পেশায় চলে আসে। সামন্তবাদী মূল্যবোধের অপপ্রভাবের কারনে স্বল্প দক্ষ কিছু পেশা (সেবা ক্ষেত্রে) যথা ধোপা-নাপিতের পেশায় নিয়োজিত হতে ইকম্ভত করলেও ১৯৪৭ ্র হিন্দুদের ব্যাপক দেশত্যাগের পর মুসলমান ভ‚মিহীনরাও আস্তে আস্তে এপেশাগুলোতে জড়িয়ে পড়ে। ১৯৮৭-৮৮ সনের এক নমুনা জরীপে লক্ষ্য করা যায় যে জনসংখ্যার মাত্র ছাপ্পান্ন শতাংশ কৃষি কাজের সাথে সংযুক্ত রয়েছে, বাকি অন্য অংশ অকৃষি পেশার সাথে জড়িত। ব্যাপক জনসংখ্যাবৃদ্ধির কারনে কৃষির উপর চাপ বর্ধিত হলে, ধনী ও মাঝারী কৃষকের জমি, উত্তরাধীকার-সূত্রে ভাগাভাগি কারণে, স্বল্পপায়তন ও ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র খন্ডে বিভক্ত হতে থাকলে, মাঝারী কৃষক গরীব ও প্রান্তিক চাষীতে; প্রান্তিক চাষী বর্গাচাষী ও ক্ষেতমজুরে পরিণত হয়। আধা সর্বহারা, সর্বহারার পক্ষে অকৃষি-পেশায় নিয়োজিত হওয়া, লাঙ্গল-জোয়াল ও কমপক্ষে একটি হালের বলদ জোগাড় করতে পারলে বর্গাচাষী হওয়া, অথবা সময়বিশেষ অন্যের জমিতে কামলা খেটে ক্ষেতমজুর হওয়া কোন বাঁধাধরা নিয়মের দ্বারা সীমায়িত ছিলনা। প্রশ্ন হল, পরিবারের সকল সদস্য মিলে রাত্রিদিন হাড়ভাঙ্গা পরিশ্রমে বর্গাচাষ করার শর্তে রাজী থেকে কেন কৃষিজীবী বর্গাচাষী হতে চায়? তার সম্ভাব্য জবাব হল-বর্গা বন্দোবস্ত জমি নিলে কমপক্ষে একবছরের জন্য, পরিমান যত কমই হোক অন্নসয়স্থানের একটা নিশ্চয়তা পাওয়া যায়। কিন্তু ক্ষেতমজুর হিসাবে অথবা এক মাসের জন্য জমির কাজ করার মধ্যে দিয়ে নিক্যদিনই অনাহারের অনিশ্চয়তার মধ্যে প্রহর গুনতে হয়। অপরদিকে পুরাতন জীবনধারায় অভ্যস্ত কুসং-স্কারাচ্ছন্ন জোতদার-জমিমালিক বিনা ঝুঁকি অথবা কমঝুঁকিতে নির্দিষ্ট সময়ান্তরে উৎপাদের অংশ হতে পাওয়ার আশায় বর্গায় জমি বন্দোবস্ত দিতে প্রস্তুত থাকে।
পরিবর্তন প্রক্রিয়ায় প্রতিবন্ধকঃ
ধনীকৃষক ও মাঝারী কৃষক পুঁজি বিনিয়োগ করে, শ্রম কয় করে উদ্বৃত্ত ফসল আত্মাসাতের মাধ্যমে সঞ্চয় করে আবারো প্রচুর উদ্বৃত্তের মালিক হয়েছেন, এমন দৃষ্টান্ত খুব কমই পাওয়া যায়। একটি গ্রামে শতকরা দুইটি পরিবারও এমন নয় যদি বা কেউ থেকেও থাকেন তবে তিনি উদ্বৃত্তের সঞ্চয় নতুন নতুন জমি কেনাতেই বিনিয়োগ করেন; এবং তার ফার্মিং এর সামর্থ্যরে/আওতার বাইরের সংখ্যা লক্ষনযোগ্য নয়। (পূর্বতন পূর্বভঅংলারয় অর্থাৎ বর্তমান বাংলাদেশে ছোট চাষীরাই বর্গা নিয়ে থাকে, আর মালিক ও বড় কৃষকেরাই বর্গা দিয়ে থাকে-পুঁজি বিনিয়োগের ঝককি ঝামেলা এড়ানোর জন্য। কিন্তু পশ্চিম বাংলা অথবা উভয় পাঞ্জাবে তা হয়না)। দুইটি পদ্বতীর মধ্যে চাষাবাদ। এমন খুব কমই দেখা যায় যে, শুধুমাত্র অতিরিক্ত পুঁজি ও শ্রম বিনিয়োগের উপর নির্ভরশীল হয়েই (নিজেরব্যক্তিগত ও পারিবারিক শ্রম ছাড়া)কেবলমাত্র কৃষিঅর্থনীতির উপর নির্ভরশীল হয়ে, কৃষক তার আয়, সঞ্চয় ও জীবনমান উন্নত করেছেন। এটা শতকরা একভাগেও নয়। যারা কৃষিতে পুঁজিবাদী বিকাশ ঘটতে থাকার সূচকগুলো কৃষকের দৈনন্দিন-জীবনবহির্ভূত বিভিন্ন আচরন ও প্রক্রিয়ার মাধ্যমে দেখাতে চেষ্টা করেন, তারা কৃষকের উন্নততর বস্তুগত ব্যবহারিক জীবনের সূচক অর্থাৎ নিয়োগ দেহ,কাপড়-চোপড়,ঘরবাড়ী, আধুনিক দ্রব্য-সম্ভারের অবর্তমানতার দিকে আঙ্গুল নির্দেশ করেন না। তাদের অনেকেই অধিকতর পরিমাণে শিল্পজাতদ্রব্য রফতানী করার পরিসংয়খ্যানের সাহায্য পুজিবাদী বিকাশের অবস্থাকে প্রমানের চেষ্টা করেন। তারা কৃষকের চলমান সংস্কৃতি নয়; তারা যান্ত্রিক সেচ, সার যান্ত্রিক পাষ, কীটনাশকের চাহীদা-সরবরাহ ও মূল্যমানের উঠতি পড়তির বৈশিষ্ট্যসহ আধুনিক-প্রযুক্তির সাধারন প্রাপ্যতাকেই (গুনগত উল্লম্ফনন নির্দেশক নয়;পরিমানগত বৃদ্ধি নির্দেশক) পুঁজিবাদী পরিচয়ের সূত্র হিসাবে তুলে ধরেন, যা থার্মোমিটারের পারদের কৃষিজদ্রব্যের বাজারদরের জ¦র উঠানামার উপর নির্ভরশীল এবং পরিবর্তনশীল।

(১৯৪৯-৫০ ই সনে কোরীয় যুদ্ধের সময়ে বাংলাদেশে কাঁচা পাটের দর হঠাৎ বেড়ে যাওয়ার ফলশ্রুতিতে পাট-চাষ অঞ্চলে নুতন ঢেউটিন দিয়ে ঘরবাড়ী তৈরীর হিড়িক পড়ে যায়, তার অর্থ এই নয় যে পুঁজিবাদী বাষাবাদের ফলে উদ্বৃত্তের দরুন অতিরিক্ত সঞ্চয় বাড়ী- নির্মানে নিয়োজিত হয়েছে।) কোতদার ও মাঝারি কৃষক পুজিঁ বিনিয়োগে যে উৎসাহী নন তা নয়, কিন্তু জোতদার ও মাঝারি কৃষক পূঁজি বিনিয়োগে যে উৎসাহী নন তা নয়, কিন্তু জোতদার বা জমি মালিক ধনী কৃষকে পুরোপুরি রূপান্তরিত না হওয়ার কারণ হল-পুঁজি বিনিয়োগের ঝুঁকি। অতিরিক্ত পুঁজি বিনিয়োগের কারণে উৎপাদিত ফসল তার খরচ পুষিয়েও উদ্বৃত্ত নিয়ে এসে তার হাতে সঞ্চয়ের পরিমাণ বৃদ্ধি করবে কি করবেনা- এই অনিশ্চিয়তাই তাকে পুুঁজি বিনিয়োগে উৎসাহিত করেনা। তাকে স্থিতাবস্থায় ধরে রাখে। তাকে পেছনের দিকে টেনে রাখে। পুরাতন উৎপাদন সম্পর্ক বাঁচিয়ে রাখতে সাহায্য করে।
বিগত পঞ্চাশ বছরে এই উৎপাদনশক্তি ও উৎপাদন সর্ম্পই কৃষককে এগিয়ে যেতে সাহায্য করেনি। বর্তমানে বাজারে ইনপুটস এর ক্রম উঠতি মূল্য এবং তারপর উৎপাদিত ফসলের পড়তি-মূল্যের দ্বারা জোতদার-কাম-ধনীকৃষকদের কর্মকান্ড নিয়ন্ত্রিত হয়। (বিগত পঞ্চাশ বছরেও এখানে কৃষি সহায়ক শিল্প গড়ে উঠেনি। ফলে বাধ্য হয়ে বিদেশী আধুনিক প্রযুক্তি-ই ক্রয় করতে হয়।) যে কৃষকের পারিবারিক পরিসরের বাইরে অতিরিক্ত মজুর অর্থাৎ শ্রমশক্তি বিনিয়োগের সামান্যতম সামর্থ্য রয়েছে তিনি লেন ধনী মাঝারি ও গরীব কৃষক এবং প্রান্তিক চাষী। ধনী কৃষকের দশ/বিশ জন মজুর নিয়োগের সামর্থ্য থাকলেও নিয়োগেচ্ছাটা পরিবর্তনশীল, যে কথা আগেই বলা হয়েছে। কিন্তু মাঝারি কৃষক ও প্রান্তিক চাষী যখন মজুর নিয়োগ করে তখন জীবন বাজী রেখেই তা করে অর্থাৎ উপবাসী থেকে অথবা মজুরদের সাথে দিনখোরাকী ভাগ করে খেয়েই তা করে অর্থাৎ উপবাসী থেকে অথবা মজুরদের সাথে দিনখোরাকী ভাগ রে খেয়েই তা করে। গ্রাম্য-মহাজন ও জোতদারদের নিকট থেকে ঋণ করেই যেস মজুর নিয়োগ করে। তাদের সাথে এই মজুরদের, দৈনন্দিন আচার আচারন, উঠবস খাওয়াপড়ার বিষয়ে সহসা সহজেই কোন পার্থক্য চোখে পড়ে না। গভীর পর্যাবেক্ষণলব্দ পার্থক্যটা হল-প্রান্তিক চাষীদের হালের লাংগল আছে, কৃষি মজুরদের তাে নই। এইভাবে খোদ চাষীকে চার ভাগে ভাগ করা যায়-[১] সামান্য জমির মালিক ও হাতিয়ারের মালিক, [২] কেবলমাত্র সামান্যতম জমির মালিক, [৩] কেবলমাত্র লাংগল-জোয়াল অর্থাৎ আদিম হাতয়ারের মালিক যে ধরণের চাষী সংখ্যায় খুব কম; [৪] কেবলমাত্র শ্রমশক্তির মালিক অর্থাৎ ক্ষেতমজুর। প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় ধরনের চাষীদের আভ্যন্তরীন পার্থক্য/বিরোধ নিরসনও মীমাংসার উপরই নির্ভর করছে পুঁজিবাদী পর্য্যায়ে উত্তরণের সাফাল্য। এ বিরোধ মীমাংসা কে করবে ? প্রান্তিক চাষী ও বর্গাচাষী? পাতিধনিক পাতি সামন্ততন্ত্রী শাসক গোষ্ঠী ? ক্ষেতমজুর না শিল্প শ্রমিক? মাঝারি কৃষক ও প্রান্তিক চাষীদের স্ত্রী-পুত্র পরিজনঅর্থাৎ পরিবারের সাত-আট বছর বয়সী শিশু থেকে সত্তূর বছরের বৃদ্ধা-ববৃদ্ধা পর্য্যন্ত সকল সদস্যই সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত কৃষি কাজে সময় দান করে। ক্ষেতমজুরদের সাথে এদের কোন পার্থক্য নেই। এক দল হল স্বচ্ছল আর এক দল হল অষ¦চ্ছল। ধান রোপা বা বোনা মৌসুমে যারা খোড়াকি কিনে খায় এবং যারা নিজেদের ঘরে সঞ্চিত ধান থেকে খোড়াকী খায়। অর্থাৎ আক্ষরিক অর্থে ঘারে ভাত থাকাটাই স্বচ্ছলতার পরিচায়ক। শুধু এবং শুধুমাত্র নুন লংকা দিয়ে সাতা ভাত ছাড়া অন্য খাদ্য বা পরিধেয় বা অন্য খরচতাদের জন্য বিলাসিতা মাত্র। আর যাদের ঘরে খোরাকি থাকেনা, ফলে জোতদার-কাম-মহাজনের কাছে ধরনা দিতে হয়, তারা অস্বচ্ছল। আমাদের দেশে একটা কথা প্রচলিত আছে যে, শুধু মাত্র শুঁটকিভর্তা (এখন শুঁটকির দাম অনেক বেশী) দিয়ে খেয়ে অনেক মাঝারি কৃষক অনেক জমির মালিক হয়েছে। এই জমি কেনা বা জমির মালিক হওয়াতে কি বোঝা যায়? জমি কিনে ভবিষ্যৎ বংশধরদের আপ-খোড়াকির ব্যবস্থা করা ছাড়া? এতো জমির সাথে বংশ পরম্পরায় সংযুক্ত কৃষকের পক্ষে প্রচলিত পরোক্ষ ভূমি-দাস ব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখা ছাড়া আর কিছু নয়!!
পাতিসামান্ততান্ত্রিকতার অবশেষের সাথে উৎপাদকশ্রেণীর দ্বন্দ্বঃ 
সার ও সেচ এর ব্যবহারের ব্যপারে লক্ষ করা যায়-প্রযুক্তি বিনিয়োগেও কৃষক হতাশ। কৃষক সেখানেই বিনিয়োগ সফল, যেখানে বিনিয়োগের অস্থিতিশীল অর্থ-পুঁজি এসেছে বাইরে থেকে-কেবলমাত্র কৃষির উদ্ধৃত্ত সঞ্চয় থেকে নয়। বাইরে থেকে অর্থাৎ কৃষক নিজের অথবা পরিবারের অন্য কারো প্রচললিত-ধারায়-আয়-বিহর্ভূত উৎস থেকে তা বিদেশেরই হোক অথবা দেশেরই হোক। বিশুদ্ধ ৃকষি-উদ্ধৃত্ত সঞ্চয় থেকে বিনিয়োগকে ধরতে হবে পুঁজিবাদী প্রবণতার অন্যতম সূচক হিসাবে অতবা তা পুরাতন প্রথা টিকিয়ে রাখার অর্থাৎ জমি কিনে বর্গাপ্রথার বন্দোবস্ত দেয়ার হাতিয়ার হিসাবেও। এটার নিরিধি । এই হিসাবে দেখতে গেলে দেখা যায় যে, প্রকৃত অর্থাৎ প্রান্তিক কৃষক এক ফসলে কমপক্ষে গড়ে পাঁচ থেকে দশ জন মজুর নিয়োগ করে উৎপাদন বাড়াবার চেষ্টা করে,, সে পর্বতকে একস্থান থেকে অন্য স্থানে নেয়ারই চেষ্টা করে; সে যেন বিশাল পাহাড় কেটে ঝড়না বহানোর-ই চেষ্টা করে। সারা জীবনের পাওনা মিলাতে গিয়ে সে যখন হিসাব করতে বসে তখন দেখে যে, যে পরিশ্রমের সাথে ফসলের বিনিময় হয়েছে তা বারো বছরের রূপবানের সাথে বারো মাসের রহিম বাদশার বিয়ের মতই। সবকিছু ঠাটবাট ঠিকই আছে, কিন্তু সামঞ্চস্যহীন, অবিশ^াস্য ও হতাশাবাঞ্জক। মানব-জমীন পতিত থাকে কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয়না। তারা ধর্মীয় ভাবের কাছে আত্মসমর্পণ করে। কৃষকের শ্রমনিবিড় উৎপাদনশক্তি এবং মালিকের ঝুঁকিবিহীন বর্গাচাষ পাশাপাশি বিদ্যমান থাকতে পারে। দুটি পদ্ধতিই প্রান্তিক চাষীর মধ্যে এক হতে পারে এবং হয়-ও । অর্থাৎ প্রান্তির চাষী একাধারে জমি বর্গাও নিতে পারে, সাথে সাথে নিজেদের পারিবারিক শ্রম ও মজুরর ভাড়াকরা শ্রমসহ নিবিড় শ্রমে চাষাবাদ করতে পারে; কিন্তু জোতদার কখনো তা পারেনা। তাই উভয় প্রথার পরিচিত দিকগুলোতে লাভবাস অর্থাৎ সুফলভোগী হতে পারে কেবল প্রকৃত/প্রান্তিক চাষী, জোতদার নয়। সে অর্থাৎ জোতদার হয় বর্গাচাষে জমি দেবে, অথবা মজুর নিয়োগ করে চাষ করাবে, কিন্তু একই জমিতে দুইটি করতে পারবেনা। এখানেই মালিক শ্রেণীর দুর্বলতা। এবং মালীক শ্রেণীর দুর্বলতার কারনেই তারা বর্তমানে কৃষিঅর্থনীতির উৎপাদন ব্যবস্থা টিকিয়ে রাখতে অনুপযুক্ত ও অসমর্থ। তাদের কাছ থেকে রাষ্ট্র কর্তৃক জমি নিয়ে নেয়াই যুক্তিসংগত। মূলতঃ পাতিসামন্ততান্ত্রিক চরিত্রের কারনেই এই দুর্বলতা। আর একটি কথা হচ্ছে, প্রান্তিক চাষী/বর্গাচাষী ফসল ফলানোর পর মালিকের কাছে তা তুলে দিয়ে পেট চালানোর খোড়াকি নিয়ে ঘরে ফিরে, মনে থাকে তার শংকা আবারো উদ্বেগ আবারো ভয়। বংশ না মানা প্রকৃতিকে বংশ এনে আবারো দুমুঠো ভাতরে ফফসল ফলানোর উদ্বেগ। কিন্তু তবু সে বাঁধা থাকে জমির সাথে, আপাত-স্বধীন ক্ষেতমজুরের মতো সাময়িক স্বচ্ছলতাও সে ভাগ করতে পারেনা, তবুও সে বাঁধা থাকে জমির সাথে, কারণ সে মালিক হাতিয়ারের মালিক কাঠের লাংগল আর জোয়াল বলদ ও এক টুকরা জমির মালিক। ইদানিং দেখা যায় বর্গা চাসী এবং প্রান্তিক চাষী অফসিজনে ক্ষেতমজুরের কাজও করে। কিন্তু ক্ষেমজুর নয়, সে বর্গাচাষী সে হাজার হাজার বছরের পুরনো হাতিয়ারের মালিক। নুতন প্রযুক্তি ব্যবহারে সে অপারগ, কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তা অতিরিক্ত উৎপাদন বৃদ্ধিতে সহায়ক নয়। একটি অঞ্চলের একটি কৃষক সমাজে যেমন সেই প্রক্রিয়া জাপটাজাপটি করে চলেছে।
কে হারে কে জেতে, মজুর নিয়োগ প্রথায় চাষ করানো হয়, কিন্তু বর্গাপ্রথাকে হার মানাতে পারে নি। কারণ, স্বাধীন মজুর এর সংখ্যা বৃদ্ধিই কেবল নয় সুনিশ্চিত শ্রমসরবারহের কারণে চাষী যেমন নিজেকে জমির সাথে বেঁধে রাখতে চায় অনাহার থেকে রক্ষ পাওয়ার জন্য; জমি-মালিকও তেমনি দৈনিক শ্রম ক্রয়ের ঝামেলা এড়াতে বর্গাপ্রথার পাল্লা ভারী করে। জোতদার ও জমি মালিকদের পাতিসামন্ততান্ত্রিক উৎপাদন ব্যবস্থার প্রতি অন্তর্নিহিত দুর্বলতা তাদের দ্বারা সৃষ্ট দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা কৃষি সমস্যাকে অমীমাংসেয় করে দুর্বলতা-তাদের দ্বারা সৃষ্ট দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা কৃষি সমস্যাকে অমীমাংসেয় করে তুলেছে। সার যখন জমি নষ্ট করে, তখন তারা সুষম সার ব্যবহার করেনা (অশিক্ষিত, ঝামেলা/ঝুঁকি এড়ানোর জন্য); পাওয়ার কলের খরচ-মূল্যে পোষায়না বলে পাওয়ার কল বাদ দেয়; কোন বিনিয়োগেই যখন না পোষায়, তখন জীবন যাপনের কোন জটিলতার প্রতি দায়বদ্ধ নয় বলে তারা পুরাতন খাজনাপ্রথাভিত্তিক উৎপাদন সর্ম্পকেই ফিরিয়ে আনে,,, টিকিেিয রাখে। পুরাতন উৎপাদন সম্পর্ক, নুতনতর উৎপাদন সম্পর্ক, নতুনবর উৎপাদন সম্পর্কের সামনে আসতে বাধা প্রদান প্রদান করে। জোতদার-মালিকশ্রেণীর চরিত্রের দ্বৈততার কারণে তাদের মধ্যে থাকে দোদুল্যচিত্ততা, কিন্তু পাতিসামন্ততান্ত্রিকতার বৈশিষ্ট্য প্রধান বলে তারা সামনে এগিয়ে আসতে সাহস পায় না। দ্বৈত চরিত্রের অধিকারী পাতিসমান্ততান্ত্রিক পাতিধনিক মালিক শ্রেণীর সাথে প্রকৃত/প্রান্তিক চাষীর দ্ব›দ্বই প্রধান বলে বর্তমান সমাজকাঠামো অনড় হয়ে পড়ে থাকে। তা ছাড়া বর্গাচাষী ও প্রান্তিক চাষী দ্ব›দ্বই প্রধান বলে বর্তমান সমাজকাঠামো অনড় হয়ে পড়ে থাকে। তাছাড়া বর্গাচষী ও প্রান্তিক চাষীরা পরস্পর থেকে বিচ্ছিন্ন বলে একত্রিত হয়ে জমি মালিক শ্রেণীর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে ও সাহস পায়না সংঘবদ্ধ হয় না। প্রগতির পথে বাধা হয়ে থাকে। কিন্তু পুরাতন ধ্যান ধারণার দ্বারা মোহগ্রস্ত চাষী এ বাধা সরাতে পারে না। গ্রাম ছেড়ে আসা কলে কারখানায় কাজ করা সর্বহারা শ্রমিক ও বাধা সরাতে পারে, কিছুটা সাহার্য করতে পারে, ক্ষেতমজুর; সমাঞ্জস্যহীনতার মীমাংসা মীমাংসা করতে পারে তারা। পাতিসামন্ততন্ত্রিশ্রেণী থেকে আগত আমলা মুৎসুদ্দ লুটেরা ধণিক ষামকগোষ্ঠী বর্তমান ভূমি ব্যবস্থার স্থিতাবস্থা ভাঙতে উৎসাহী ও আগ্রহী নয়। স্বাধীন উৎপাদন ব্যবস্থার সাথে সম্পর্কহীন একটি লুটেরা শাসকগোষ্ঠী পৃথক ও বৃহত রাষ্ট্রসমূহের তাবেদারী করতে গিয়ে বহির্ভূত আয়ের উৎসে লাভবান হয়ে থাকে বলে তারা বর্তমান সমাজকাঠামো অথবা কৃষিব্যবস্থার কাঠামো ভাঙতে এগিয়ে আসেনা। তাই শ্রমিকদের সাহায্যে কৃষক ক্ষেমজুর সংগঠন গড়ে তোলে এবং প্রবল সংগ্রামের মাধ্যমে সকল ভূমি জাতীয়করণ করার মাধ্যমেই উপরোক্ত সমস্যার নিরসন সম্ভব।
বিগত দুই শত বছরে বর্গাপ্রথার মালিকানার উপরে ভিত্তি করে, এদেশে একটি ক্ষুদে মালিক শ্রেণীর আবির্ভাব ঘটেছে, পাতি সামন্ততান্ত্রিকতার সাথে যারা নাড়ীর সম্পর্ক, একই পাতিসামন্ততান্ত্রিক উৎপাদন পদ্ধতির ঔরসে তার জন্ম কিন্তু পরিবর্তনশীল অবস্থার প্রেক্ষাপট তার নব নব রূপে আবির্ভাব, ও রূপান্তর। এদশে যে সামন্তবাগ বিকশিত হয়নি, অপূর্ন ও অপুষ্ট দেহ নিয়ে যায় জন্ম কিলাংগ বলে পাতিসামন্ততান্ত্রিকতার সীমিত বৈশিষ্ট্যসমূহ ্র যে ধারন করতে অপারগ, সেই গতি সামন্ততান্ত্রিকতার অবশেষের পক্ষেই সম্ভব হয়েছে বর্গাপ্রথার নামক শস্য/ফসল উৎপাদনআত্মসাৎ এর প্রক্রিয়া কে জন্ম দিতে ও টিকিয়ে রাখতে। এখন সে খুব শক্তিশালী যদিও পাক পুঁজিবাদের দ্বারা প্রান্তে ঐপনিবিশিক ব্যবস্থা শক্তি ধার করে এনে সকল পরনির্ভরলীম পুঁজিবাদের জন্মস দিতে চায় । তাই পাতিসামন্ততান্ত্রিকতা সা¤্রাজবাদেরও দালাল। (সুবোধ মুখার্জির বাংলার অর্থণৈতিক ইতিহাসের উদ্ধৃতি )। বাংলাদেশের তথাকথিত মধ্যবিত্তের শতকরা আশিবাগ-ই নামক ধরনের সাথে সম্পৃক্ত। মুঘল আমলে সামান্য পরিমাণে এবং ব্রিটিশ আমলে ব্যাপকভাবে সরাসারি কৃষি জীবিকার আওতা বহির্ভূত পেশা ভিত্তিক কর্মকান্ডে যারা নিজেদের নিয়োজিত করেছে, তাদের অধিকাংশই বর্গাপ্রথার উপর নির্ভরশীল ক্ষুদে মালিক সম্প্রদায়। অনৈতিক্যবাহী পেশা-উকিল, ডাক্তার, শিক্ষক, ঠিকাদার, যারা নিজেদেরকে মধ্যবিত্ত বলে অভিহিত করেন, যারা এদেশের ভৌগলিক রাজনৈতিক স্বাধীনতা আন্দোলনে, গণতান্ত্রিক আন্দোলন, সিভিল সমাজের আন্দোলনে ভূমিকা রাখেন, তারা সবাই বর্গা পথা গণতান্ত্রিক আন্দোলনে, সিভিল সমাজের আন্দোলনে ভূমিকা রাখেন, তারা সবাই বর্গা প্রথা নামক পতি সামন্ততান্ত্রিকতার অবশেষের উপর নির্ভরশীল জনগোষ্ঠী । এমনকি, এই বর্গা প্রথার সিড়ির উপর দাঁড়িয়েই , অধিকাংশ ক্ষুদ্র বৃহত শিল্প বৃহত শিল্প মালিক তাদের শিল্প কারখানা গড়ে তুলেছেন অধ্যবধি আবির্ভূত বাংলাদেশের রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ ও বর্গাপ্রথার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ বেনিফিসিয়ারী। বর্তমান বাংলাদেশের শিল্প সাহিত্র সংস্কৃেিত বিরাজমান বুদ্ধিজীবীরা ও বর্গাপ্রথার বেনিফিসিয়ারী। বর্গাপ্রথার উপর ভিত্তি করে যে সমাজকাঠামো সৌধ গড়ে উঠেছে, তাকে ভাংতে তথাকথিত মধ্যভিত্তরা তাই এগিয়ে আসেনি, আসবেও না। আসবেন বলে আশাও করা যায় না।

সাইফ শোভন, চিফ রিপোর্টার,ঢাকা নিউজ২৪.কম