প্রতিবন্ধী দিবসের প্রতিজ্ঞা হঊক কর্মসংস্থান সৃষ্টি

গোলাম মোরশেদ:   আজ ০৩ ডিসেম্বর, ২৯তম আন্তর্জাতিক প্রতিবন্ধী দিবস। জাতিসংঘ ঘোষিত এই দিবসটি ১৯৯২ সাল থেকে পালিত হয়ে আসছে। ২০২০ সালে এ দিবসটির প্রতিবাদ্য হল, বিল্ডিং ব্যাক বেটারঃ টুয়্যার্ড এ্যা ডিজঅ্যাবিলিটি-ইনক্লুসিভ, অ্যাক্সিসিবল এ্যান্ড সাস্টেইনেবল পোস্ট কভিড ওয়ার্ল্ড (Building Back Better: toward a disability-inclusive, accessible and sustainable post COVID-19 World)। এ বছর কভিডকে গুরুত্ব দেয়ার অন্যতম কারণ হলো সারাবিশ্বে ছড়িয়ে পড়া কভিডের প্রভাবে সামাজিক অসমতাগুলো আরো বৃদ্ধি পাওয়া। সমাজে প্রতিবন্ধীরা সবসময়ই বঞ্চনার শিকার হয়ে আসছে। বাল্যবিবাহ, শিক্ষা গ্রহণের হার, কম কর্মসংস্থান, স্বাস্থ্যসেবা, সামাজিক মর্যাদার মত বিভিন্ন বিষয়ে প্রতিবন্ধীরা অপ্রতিবন্ধীদের তুলনায় বেশি অবহেলিত। যেমন গবেষণায় দেখা যায় যে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রতিবন্ধী শিশুদের উপস্থিতির হার অর্ধেকেরও কম। তিন ভাগের একভাগ প্রতিবন্ধী ব্যক্তি দারিদ্রতার কারণে চিকিৎসাসেবা নিতে পারেনা।

প্রতিবন্ধীদের মাঝে বিবাহের হার অপ্রতিবন্ধীদের তুলনায় অনেক কম আবার বিবাহ বিচ্ছেদের হার বেশি। আর পুরুষ প্রতিবন্ধীর তুলনায় নারী প্রতিবন্ধীর ক্ষেত্রে এসকল মৌলিক চাহিদা প্রাপ্তিতে অসমতা ও বঞ্চনার হার তুলনামূলক বেশি। আর কভিডের প্রভাব সমাজের গ্রথিত এই অসমতাগুলোকে আরো বেশি ত্বরান্বিত করেছে। বেসরকারী উপাত্ত অনুযায়ী বাংলাদেশের কর্মজীবী প্রতিবন্ধীদের তিন-চতুর্থাংশ করোনাকালীন সময়ে কর্ম হারিয়েছে। বর্তমানে দারিদ্রসীমার নিচে অবস্থানকারী পরিবারের মধ্যে বেশিরভাগ প্রতিবন্ধী ব্যক্তিই বেকার হয়ে পড়েছে। তাই ২০৩০ সালের টেকসই উন্নয়নের এজেন্ডার (কাউকে পিছনে না রেখে সামনে এগোনো) লক্ষ্যে প্রতিবন্ধীদের অধিকার রক্ষা ও মূলধারার কর্মসংস্থানে অন্তর্ভুক্তকরণ একটি বড় চ্যালেঞ্জ।

জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী সারা পৃথিবীতে প্রতিবন্ধী ব্যক্তির সংখ্যা প্রায় ১ বিলিয়ন। আর বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস)-২০১৯, প্রতিবেদন অনুযায়ী বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার ৬.৯৪ শতাংশ কোননা কোন ধরনের প্রতিবন্ধীতায় ভুগছে। বিবিএস তাদের জরিপে প্রতিবন্ধকতার ছয় ধরনের সমস্যাকে (অটিজম, শারীরিক প্রতিবন্ধীতা, মানসিক প্রতিবন্ধীতা, দৃষ্টি প্রতিবন্ধীতা, বাক প্রতিবন্ধীতা এবং শ্রবণ প্রতিবন্ধীতা) উল্লেখ করে প্রতিবন্ধকতার তীব্রতা অনুযায়ী মোট তিনটি ভাগে বিভক্ত করেছে; আংশিক প্রতিবন্ধীতা, তীব্র প্রতিবন্ধীতা এবং সম্পূর্ণ প্রতিবন্ধীতা।

বাংলাদেশের সংবিধান ও প্রতিবন্ধীদের অধিকার রক্ষাকল্পে গৃহিত জাতীয় নীতিমালা অনুযায়ী কর্মসংস্থানসহ সকল প্রকার সুযোগ-সুবিধাতে প্রতিবন্ধীদের সমঅধিকারের কথা উল্লেখ থাকলেও দেশের কর্মসংস্থানে তারা অনেক পিছিয়ে রয়েছে। গবেষণায় দেখা যায় যে, প্রতিবন্ধীদের মধ্যে মাত্র ৩০.৮১ শতাংশ কর্মক্ষেত্রে নিয়োজিত। বাংলাদেশে বর্তমানে সামগ্রিক বেকারত্বের হার ৪.২ শতাংশ হলেও ১৪ বছরের বেশি বয়সী প্রতিবন্ধীদের প্রায় অর্ধেকই (৪২.৯৬ শতাংশ) বেকার। অন্যদিকে তাদের মধ্যে এক চতুর্থাংশ (২৫.৩৭ শতাংশ) গৃহস্থালী কাজে জড়িত এবং মাত্র ০.৮৭ শতাংশ চাকুরী প্রার্থী। অন্যদিকে স¤প্রতি একটি বেসরকারী গবেষণা প্রতিষ্ঠানের প্রকাশিত প্রতিবেদনে দাবি করা হয় যে, করোনার প্রভাবে ৮০ ভাগের বেশি প্রতিবন্ধী ব্যক্তি তাদের কাজ হারিয়েছে এবং ভবিষ্যতে তাদের কর্মসংস্থান নিয়ে হতাশা ব্যক্ত করেছে। কিন্তু যথাযথ পরিকল্পনা গ্রহণ করলে কর্মক্ষেত্রে প্রতিবন্ধীদের কাজের যথেষ্ঠ সুযোগ সৃষ্টি করা সম্ভব।

সরকারী চাকুরীক্ষেত্রে প্রতিবন্ধীদের কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে কোটাব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করলেও বেসরকারী কর্মসংস্থান খাতে প্রতিবন্ধীদের নিয়োগ ও কাজের সুযোগ প্রদান সীমিত পর্যায়ে রয়েছে। একইরকমভাবে ব্যবসা-বাণিজ্যেও এই বিষয়টিকে ধীরগতিতে আমলে নেওয়া হয়েছে। তবে সম্প্রতি এক্ষেত্রে পরিবর্তন আসছে বলে কিছু প্রতিষ্ঠান দাবি করছে। ইতিমধ্যে কিছু কিছু প্রতিষ্ঠান কর্মক্ষেত্রে প্রতিবন্ধীদের অন্তর্ভুক্তির সুবিধাসমূহ উপলব্ধি করতে শুরু করেছেন। যেসকল ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানে প্রতিবন্ধীদের নিয়োগ প্রদান করেছে তারা তুলনামুলক অধিক উৎপাদনশীল, সময়ানুবর্তী, একাগ্র, মনোযোগী এবং প্রতিষ্ঠানের প্রতি বিশ্বাসী ও অনুগত বলে জানা যায়। কর্মসংস্থানের সুযোগপ্রাপ্ত একজন প্রতিবন্ধী নিজ দায়িত্ব ও কর্তব্যে অপর আরেকজন অপ্রতিবন্ধী কর্মী অপেক্ষা বেশি প্রতিজ্ঞাবদ্ধ।

মূলধারার কর্মসংস্থানে প্রতিবন্ধীদের অংশগ্রহণ বৃদ্ধি করতে হলে দক্ষতা উন্নয়ন, প্রশিক্ষণ ও কর্মসংস্থানে অন্তর্ভুক্তকরণকে অন্যতম অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। প্রতিবন্ধীদের কর্মসংস্থানে অন্তর্ভুক্তকরণে প্রতিবন্ধকতাকে আমলে না নিয়ে ব্যক্তির মেধা ও সামর্থকে কাজে লাগানোর সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে। প্রতিবন্ধী ব্যক্তিকে কাজে খাপ খাইয়ে নেওয়ার যথাযথ সুযোগ প্রদান করতে হবে। আমাদের সমাজে এখনো অনেকেই মনে করেন যে, প্রতিবন্ধীদের কাজের পরিসর অনেক সীমাবদ্ধ। কিন্তু বিশেষজ্ঞদের মতে, সম্পূর্ন প্রতিবন্ধীতা ব্যতীত অন্য প্রতিবন্ধী ব্যক্তিগণ মোটামুটি সবধরনের কাজে সমর্থ। তবে সামাজিকভাবে সৃষ্ট নেতিবাচক ধারণার কারণে একজন প্রতিবন্ধী ব্যক্তি কর্মক্ষেত্রে অন্য আরেকজন অপ্রতিবন্ধীর সমপরিমাণ কর্মদক্ষতা দেখালেও তারা ভিন্ন অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হয় যা তাদের মানসিকভাবে আরো দুর্বল করে দেয়। প্রতিবন্ধীদের স¤পর্কে এমন ‘নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি’ তাদের স্বাভাবিক কর্মক্ষমতা ও মেধার প্রতি বঞ্চনাকে আরো প্রকট করে তোলে। আর যারা নারী প্রতিবন্ধী তাদের লিঙ্গীয় পরিচয় এই বৈষম্যকে আরো বাড়িয়ে দেয় এবং যার ফলে তারা তুলনামূলক বেশি ক্ষতিগ্রস্ততা ও বঞ্চনার শিকার হয়।

প্রতিবন্ধকতা বিবেচনা না করে কর্মদক্ষতাকে বিবেচনা করে এই পিছিয়ে পড়া গোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নের লক্ষ্যে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি এবং নিয়োগ প্রদান করতে হবে। প্রতিটা সরকারী-বেসরকারী প্রতিষ্ঠানেই মেধা ও সামর্থ্য বিবেচনায় প্রতিবন্ধী লোকবল নিয়োগ প্রদান করতে হবে। প্রতিবন্ধীদের কর্মসংস্থানের উদ্দেশ্যে সহজ শর্তে ঋণের প্রদান করা যেতে পারে, যা তাদের উদ্যোক্তা হতে উৎসাহ দিবে। প্রতিবন্ধী কর্মজীবীদের জন্য প্রতিবন্ধীবান্ধব কর্মপরিবেশ তৈরি করা যেমন, সিঁড়ির পরিবর্তে লিফটের ব্যবস্থা, প্রতিবন্ধীবান্ধব টেবিল ও চেয়ারের ব্যবহার ইত্যাদি। প্রয়োজনে অফিসে হুইলচেয়ার ব্যবহারের অনুমতি প্রদান করতে হবে। যাতায়াতের জন্য বিশেষ পরিবহন ব্যবস্থা চালুসহ অফিসের নিকটে আবাসন সুবিধা প্রদান করা যেতে পারে। সকল প্রকার কাজের ক্ষেত্রে সহকর্মীদের আন্তরিক ও সহযোগিতাপরায়ণ হতে হবে। প্রতিটা প্রতিষ্ঠান তাদের কাজের ধরন বিবেচনায় যদি কাজগুলোকে আলাদা আলাদা করে ফেলে এবং প্রতিবন্ধীবান্ধব কাজের জন্য প্রতিবন্ধী লোকবল নিয়োগ দেয় (পূর্ণকালীন কিংবা খন্ডকালীন উভয় ভিত্তিতে) তাহলে সামগ্রিকভাবে প্রতিবন্ধীদের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। কিছু কাজ রয়েছে যা প্রতিবন্ধীবান্ধব হতে পারে যেমন, কলসেন্টারের সেবাদানমূলক চাকুরী, অফিসের অর্ভ্যথনা সেকশনের দায়িত্বপালন, টাইপিং ও ডাটা এন্ট্রি, নথিপত্র পর্যালোচনা, শপিং মলগুলোর হিসাবরক্ষণ বিভাগের দায়িত্ব পালন ইত্যাদি।

কর্মক্ষেত্রে প্রতিবন্ধীদের নিয়োগদানকে দাতব্য বা সামাজিক দায়বদ্ধতা না ভেবে এটিকে একটি বিচক্ষণ পন্থা হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। প্রতিবন্ধীদের জন্য সব কাজই উন্মুক্ত রাখা উচিত। প্রতিবন্ধীতার ধরন দিয়ে নয়, প্রতিবন্ধীদের মূল্যায়ন করতে হবে অন্যান্য স্বাভাবিক বা অপ্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের মতই তাদের মেধা ও কার্যসক্ষমতা দিয়ে। প্রতিবন্ধীদের যথাযথ সুযোগ প্রদান করলে তারাও অপ্রতিবন্ধীদের মতই নিজেদের প্রমাণ করার সুযোগ পাবে এবং সেই সুযোগ প্রাপ্তি তাদের অধিকার।

লেখক: শিক্ষা ও কর্মসংস্থান বিষয়ক গবেষক ও কলামিস্ট। তার গবেষণার আগ্রহের বিষয়ের মধ্যে আরো রয়েছে বেকারত্ব, শ্রমশক্তি, কৃষক এবং ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী।

ইমেইল-golammrshed@gmail.com