২০/৩০ হাজার সাংবাদিক, কর্মচারীর দায়িত্ব নিয়ে ইতিহাস রচনা করা যায়

ওয়াহিদুজ্জামান:   মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আপনার প্রতি গভীর শ্রদ্ধা। বেশ কয়েকবার দেশের প্রধানমন্ত্রী হিসাবে দায়িত্ব পালনকালে অনেকগুলো ঐতিহাসিক কাজ সম্পূর্ণ করেছেন। বিশেষ করে পার্বত্য শান্তি চুক্তি, সমুদ্র জয়, রোহিঙ্গা সমস্যা, উড়ালসেতু, বিদ্যুৎ উৎপাদন, পদ্মা সেতু, বৈশ্বিক মহামারি করোনা মোকাবেলায় দুরদর্শিতা ইত্যাদি অসংখ্য কাজে জন্য অনাদিকালের ইতিহাসে আপনার নাম স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। আমরা মনে করি, বঙ্গবন্ধুর নাম ছাড়া যেমন বাংলাদেশের ইতিহাস রচনা সম্ভব নয়, ঠিক তেমনিভাবে আপনার নাম উচ্চারণ ছাড়া বাংলাদেশের উন্নয়নের ইতিহাস রচনা সম্ভবপর হবেনা। সেজন্য সমগ্র জাতি আপনার কাছে চিরদিন কৃতজ্ঞতার পাশে আবদ্ধ থাকবে।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আজ আমি আপনার কাছে এমন একটি প্রস্তাবনার অবতারণা করতে চাই, যা শুনে আনেকে অবাক হতে পারেন। আপনিও ভাবতে পারেন, এটা কী করে সম্ভব! অনেকে বলবেন, পৃথিবীর কোথাও এর নজীর নেই। তারা আরো বলতে পারেন, এটা করা যদি সম্ভব হতো, তবে এতোদিন ধরে বিজ্ঞজনরা হাত গুটিয়ে বসে থাকতেন না। এ নিয়ে অসংখ্যজন আলোচনা সমালোচনার ঝড় তুলবেন, এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু কোথাও করা হয়নি বা কেউ করেনি বলে আমরাও করবনা বা পারবনা, এমন ভাবনার কোন মানে হতে পারেনা। আমি শুধু বলতে চাই, কেউ করনি বলেই তো আমরা তা করে বিশ্ববাসীকে দেখিয়ে দিতে চাই এবং নতুন ইতিহাস রচনা করতে।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আমি বাংলাদেশের সাংবাদিক সমাজের কথা বলছিলাম। তারা এই সন্মানিত রাষ্টের চতুর্থ স্তম্ভের বাসিন্দা। জীবন মৃত্যু পায়ের ভৃত্য করে দিনরাত দেশ ও জাতির সেবায় কাজ করে যায় অবিরত। নেই ঘুম, নেই ক্লান্তি, নেই বিশ্রাম। তারা দেশের উন্নয়ন সমৃদ্ধির অতন্দ্র প্রহরী কিন্তু কেউ খবর রাখেনা তাদের।সবার কথা তারা বলে কিন্তু নিজের সুখ দু:খের কথা তারা বলতে পারেনা। অনেকটা নিরবে নিবৃত্তে নিঃস্ব রিক্ত হয়ে ক্ষয়ে ক্ষয়ে তাদের মৃত্যু হয় কেউ তার খোঁজ রাখেনা। অথচ রাষ্ট্রের অনান্য স্তম্ভের সকল আমলা, কর্মচারী, সেবকদের রাজার হালে প্রতিপালন করা হয়, কিন্ত সাংবাদিকদের প্রতি কোন কর্তব্যই পালন করা হয়না। মাঝে মাঝে রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে ভিক্ষুকের মত কিছু সাহায্য ছুড়ে ফেলে দেয়া হয়, যা তাদের জন্যে অপমান করার সামিল। তারপরও তারা চুপ করে থাকে, কিছু বলেনা। তাদের অবস্থা অনেকটা এরকম যে “জেনে শুনে বিষ করেছি পান।” সুতরাং কিছুই করার নেই।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আমি দেশের এই নীলকন্ঠ হতভাগা সাংবাদিকদের কথা বলছিলাম, রাষ্ট্রীয়ভাবে এদের দায়িত্ব নিয়ে আপনি একটি গৌরবময় ইতিহাস রচনা করতে পারেন। জগতের অনাধিকালের ইতিহাসে হয়ে উঠতে পারেন কালজয়ী রাষ্ট্রনায়ক। অথচ বিষয়টি খুবই সহজ। ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়ন দুটির হিসাবে সারাদেশে হয়তো ১০হাজার সাংবাদিকের তালিকা থাকতে পারে। ছড়িয়ে ছিটিয়ে আরো ১০হাজার সাংবাদিক ধরা হলে সাংবাদকর্মচারীর সংখ্যা হয়ত আরো ১০হাজার হবে।সবমিলিয়ে বাংলাদেশে সাংবাদিকতার পেশায় রয়েছে মাত্র ৩০হাজার মানুষ। এই সাংবাদিকদের জন্য সরকার প্রতিনিয়ত সংবাদপত্রের মাধ্যমে বিজ্ঞাপনসহ নানা ভর্তুকি দিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু অত্যন্ত দঃখের বিষয়, সাংবাদিক ও কর্মচারীরা সেই সুযোগসুবিধা থেকে নানা কারনে বঞ্চিত হচ্ছে।

রাষ্ট থেকে তাদের প্রাপ্তিটুকু পাওয়ার নিশ্চয়তা তৈরি করতে পারছেনা। রাষ্ট্র ইচ্ছে করলে সাংবাদিকদের অংশের টাকা সরাসরি মাসিক হারে তাদের হাতে তুলে দিতে পারে। সাংবাদিকদের জন্য বিজ্ঞাপনের রেট বা অনান্য সযোগসুবিধা বাড়িয়ে যে অতিরিক্ত টাকা আসে, তা না দিয়ে সরকারি কোষাগারে নিয়ে সাংবাদিক ও কর্মচারীদের মাসিক বেতন হিসাবে দেয়া যেতে পারে। এক্ষেত্রে সংবাদপত্রগুলোকে কোন বিজ্ঞাপনি বিধি নিষেধে না রেখে উন্মুক্ত করা যেতে পারে এবং সেক্ষেত্রে সংবাপত্রগুলো প্রতিযোগিতা করে ব্যবসা ও বিজ্ঞাপন সংগ্রহ করতে পারে। এতে করে সংবাপত্র ও সাংবদিকদের মধ্য কোন সাংঘর্ষিক পরিস্থিতি তৈরি হবেনা। সরকারও স্বস্তিতে থাকবে।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আমরা আর একটি কথা বলতে চাই। সংবাদপত্র যদি রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ হয়ে থাকে, তবে রাষ্ট্রের অনান্য স্তম্ভের মত লক্ষ লক্ষ কর্মীদের দায়িত্ব নিতে পারলে রাষ্ট্র কেন সরাসরি সাংবাদিকদের দায়িত্ব নিতে পারবেনা। তাদের কী অপরাধ। রাষ্টের এ দ্বিমুখী নীতি কি সংবিধান লঙ্গনের সামিল নয়! মাত্র ২০/৩০ হাজার মানুষের সরাসরি দায়িত্ব নিলে কি রাষ্ট্র দেউলিয়া হয়ে যাবে? না নিলেই বরং রাষ্ট্রের এই স্তম্ভটিকেই অস্বীকার করা হবে।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আমি আসলে এ নিয়ে কোন বিতর্কে জড়াতে চাইনা। আমি শুধু বলতে চাই, যে মানুষগুলোর উপর দেশ জাতি তথা দুনিয়ার সুখ দুঃখ হাসি কান্না উন্নয়ন সমৃদ্ধি আশা আকাঙ্ক্ষা স্বপ্ন সম্ভাবনার কথা বলার গুরু দায়িত্ব দেয়া হয়েছে, সেই সকল মানুষগুলো নিজেরাই হতভাগা হয়ে অন্নহীন, বস্রহীন, আশ্রয়হীন, মর্যাদাহীন হয়ে বেগোরে প্রাণ হারাবে তা কি ঠিক হচ্ছে? মাত্র ২০/৩০ হাজার মানুষকে রাষ্ট্রের কোষাগারের আওতায় নিয়ে এসে তাদের মোটামুটি সন্মানজনকভাবে বেঁচে থাকার নিশ্চয়তা দিলে রাষ্ট্রের খুব বেশী ক্ষতি হবে বলে মনে হয় না।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী,  আমি মনে করি, এতে রাষ্ট্রের তেমন কোন ক্ষতিতো হবেই না বরং রুটিরুজির নিশ্চয়তা পেলে তারা আরো দ্বিগুন উৎসাহে দায়িত্বে ঝাঁপিয়ে পড়বে এবং তাতে বিপুলভাবে উপকৃত হবে দেশ জাতি তথা সমগ্র মানব জাতি। আর আপনি যদি এই মহান উদ্যোগটি গ্রহণ করেন, তাহলে মহাকালের ইতিহাসে কালজয়ী রাষ্ট্রনায়ক হিসাবে আপনি অমর হয়ে থাকবেন। এই পেশার অনাদিকালের মানুষ অনন্তকাল আপনাকে কৃতজ্ঞতার সাথে স্বরণে রাখবে।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী,  সবশেষে ছোট করে আর একটি কথা বলতে চাই। মনে হতে পারে, এ সিদ্ধান্ত কী করে গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করা সম্ভব! আনেকে যুক্তি দিতে পারেন, এতে হয়ত আমরা সরকারে তল্পিবাহক হয়ে পড়বো। শেষেরটির উত্তর আমরা এভাবে দিতে পারি, সংবাদপত্র মালিকদের কাছ থেকে টাকা নিতে গিয়ে আমরাতো তাদের তল্পিবাহক হয়েই আছি। রাষ্ট্রের তহবিল থেকে টাকা নিলে কোন সরকারের নয়, রাষ্ট্রের তল্পিবাহক হলে সেটা কি বর্তমানের চেয়ে বেশী অসন্মানজনক হবে?

আর সাংবাদিক ও কর্মচারীদের কিভাবে রাষ্ট্রীয় কোষাগারে আনা যেতে পারে, এ বিষয়ে আমাদের কাছে আবশ্যই কিছু পরামর্শ আছে। সরকার চাইলে আমরা তা দিতে চেষ্টা করবো। তারপরও আমরা মনে করি সরকারের এবিষয়ে অনেক গুরুত্বপূর্ণ ব্যাক্তিবর্গ রয়েছেন, যারা ইচ্ছে করলে এ বিষয়ে একটি কার্যকরী নীতিমালা তৈরি করতে পারেন।আমরা শুধু এইটুকুই বলবো, দেশে হাজার হাজার এমপিওভুক্ত স্কুল/কলেজ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান টিকে থাকতে পারলে সেই মডেলে রাষ্ট্রের ৪র্থ স্তম্ভের মাত্র দুই হাজার সংবাদপত্র নিয়ন্ত্রণ ও পরিচালনা করতে কিসের সমস্যা? সেখানে এমপিওভুক্ত স্কুল/কলেজ পরিচালনায় যদি কোন সমস্যা তৈরি না হয়ে থাকে, তবে সংবাদপত্রে মালিক সাংবাদিক কর্মচারীদের মধ্যে সমস্যা হবে কেন?

আমরা মনে করি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এ বিষয়ে সরাসরি উদ্যেগি হবেন এবং ভায়াবহ অশ্চিত জীবনযাত্রা থেকে সাংবাদিক ও কর্মচারীদের রক্ষা করে ইতিহাসে অমর হয়ে থাকবেন।