শিক্ষা থেকে ঝরে পড়ার কারণ ও প্রতিকারসমূহ

গোলাম মোরশেদ:  বিগত কয়েক দশকে বাংলাদেশ শিক্ষার হার বৃদ্ধি ও ঝরে পড়া রোধে নিয়মিত সাফল্য লাভ করেছে। তবে এখন পর্যন্ত প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শতভাগ ভর্তি নিশ্চিত করা যায়নি। বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরো (ব্যানবেইস) ২০১৯-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তির নীট হার ৯৭.৩৪%। আর শিক্ষা থেকে ঝরে পড়ার হার ১৭.৯০% যা এক দশক আগেও দ্বিগুণের বেশি ছিল।

তবে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস)-এর মাল্টিপল ইনডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভে-২০১৯ অনুযায়ী এখনো প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি যোগ্য বয়সীদের ৬.৪৮% শিশু বিদ্যালয়েই ভর্তি হতে পারেনা। আবার শিক্ষা থেকে ঝরে পড়ার এই হার শিক্ষার্থীদের বয়স বৃদ্ধির সাথে সাথে ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পেয়েছে। যেমন, নিম্ন মাধ্যমিকে ভর্তি যোগ্যদের মধ্যে ৩১.৫% শিশু শিক্ষার বাইরে অবস্থান করছে। পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা যায় সামগ্রিকভাবে ঝরে পড়া হ্রাস পেলেও কিছু কিছু বয়স বর্গে তা উর্ধ্বমুখী হচ্ছে। যেমন, ব্যানবেইসের ‘বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য-২০১৮’ এর প্রতিবেদনে দেখা যায় যে, এক বছরের ব্যবধানে মাধ্যমিকে ছেলেদের ঝরে পড়ার হার বেড়েছিল ২.৫%। আর ছাত্রীদের ঝরে পড়ার হার ১% এর কিছু বেশি হ্রাস পেলেও এখনো ছাত্রদের তুলনায় বেশি রয়েছে। অথচ সঠিক পরিকল্পনার মাধ্যমে ঝরে পড়া রোধ করে ছেলে-মেয়েদের একটি সুন্দর ভবিষ্যত নির্মাণ করা সম্ভব।

শিক্ষা থেকে ঝরে পড়া রোধ করতে হলে প্রথমে সমস্যার কারণগুলো চিহ্নিত করতে হবে। গবেষণার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়ার কারণসমূহ নির্ধারণ করতে হবে এবং কারণসমুহের ক্যাটাগরি বিশ্লেষণ করতে হবে। জানতে হবে সমাজের কোন ক্যাটাগরির সন্তানদের মধ্যে ঝরে পড়ার ঝুঁকি বেশি। এক্ষেত্রে অর্থনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক, জাতি,ধর্ম, বর্ণ, লিঙ্গ, বয়স প্রভৃতি বিষয়কে গুরুত্ব দিয়ে শ্রেণিবিন্যাস করতে হবে। যেমন ধনী বা সচ্ছল পরিবারের তুলনায় দরিদ্র বা অসচ্ছল পরিবারে কিংবা শহরের তুলনায় গ্রামাঞ্চলের শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়ার হার কি বেশি? প্রতিটা ক্যাটাগরির বা দলের সন্তানদের ঝরে পড়ার পেছনে কারণগুলো কি একইরকম নাকি ভিন্ন?

পূর্বতন গবেষণাগুলোতে শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়ার বিভিন্ন কারণ জানা যায়। যেমন, ছাত্রাবস্থায় বিবাহিত মেয়েদের বেশিরভাগই শিক্ষা থেকে ঝরে পড়ে কিংবা বিয়ের উদ্দেশ্যে অনেকেরই পড়াশুনা বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে। মেয়েদের ঝরে পড়ার ক্ষেত্রে বাল্যবিবাহের পাশাপাশি দারিদ্রতা ও নিরাপত্তাহীনতা অন্যতম কারণ। বিগত সময়ে বেশ কিছু খবর প্রকাশিত হয়েছে যেখানে জানা যায় যে, বিদ্যালয় বা কলেজে যাওয়ার পথে হয়রানী কিংবা উত্যক্ত হওয়ার কারণে পড়াশুনা ছেড়ে দেয়। এছাড়া সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীর উপর ঘটে যাওয়া নিপীড়নের ঘটনা অভিভাবকদের মনে এক ধরনের আতংক সৃষ্টি করেছে বলে অনুমান করা যায়। বর্তমানে ১৫-১৯ বছর বয়সী মেয়েদের ৩২.৯% বিবাহিত। ২০-২৪ বছর বয়সীদের ক্ষেত্রে ১৫.৫% মেয়েরা পনের বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই বিয়ে করেছে এবং ৫১.৪% আঠারো বছরের আগে বিয়ে করেছে। এছাড়া কিছু শিক্ষার্থী রয়েছে যারা কোন একটি পরীক্ষায় অকৃতকার্য হলে কিংবা আশানুরূপ ফলাফল না হলে পড়াশুনা ছেড়ে দেয়। আবার কিছু শিক্ষার্থী ছাত্রাবস্থায় প্রেমের সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ে যার পরিণতি হিসেবে ঝরে পড়ে। কেউ কেউ ছাত্রাবস্থায় মাদকাসক্ত হয়ে পড়ে। সংখ্যায় কম হলেও পরিবারের বাইরে একা থাকতে না পারা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে আশোভন আচরণ (যেমন র‌্যাগিং, বুলিং) সহ বিভিন্ন কারণে অনেকেই ঝরে পড়ে। শিক্ষা থেকে ঝরে পড়া শিশুদের একটা বড় অংশ অভিভাবকহীন পথশিশু। এছাড়া বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের মাঝে অন্যদের তুলনায় ঝরে পড়ার হার বেশি।

বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা বাংলা এবং ইংরেজী মাধ্যমে হওয়ার কারণে যেসকল শিশুদের মাতৃভাষা বাংলা কিংবা ইংরেজী কোনটিই নয় তাদের জন্য প্রাথমিক পর্বে ঝরে পড়ার ঝুঁকি বেশি থাকে। বিশেষত ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীসহ মুলধারার বাইরের শিক্ষার্থীদের জন্য টিকে থাকার চ্যালেঞ্জ বেশি থাকে। কেননা নিজ মাতৃভাষায় পাঠ্য বই না থাকা এবং দক্ষ শিক্ষকের সংকট তাদের মাঝে ঝরে পড়ার প্রবণতা বৃদ্ধি করে। শুধু ভাষাগত সমস্যার কারণে প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করার আগেই বিদ্যালয় থেকে ঝরে পড়ে অনেক শিশু। দুর্গম এলাকার বিদ্যালয়গুলোতে পাঠ্যবই ও পাঠদানের ভাষা বুঝতে না পেরে শিশুরা ঝরে পড়ছে।

এছাড়া এলাকাভিত্তিক ঝরে পড়ার প্রবণতাও দেখা যায়। যেমন, কিছু এলাকায় স্থানীয় উৎপাদন ব্যবস্থার পরিবেশগত ভিন্নতার কারণে বিশেষ মৌসুমে শিক্ষার্থীদের পারিবারিক কাজে যুক্ত হতে হয়। তখন বিদ্যালয়ে না যেতে যেতে ঝরে পড়ার প্রবণতা সৃষ্টি হয়। এছাড়া শিক্ষকদের রূঢ় আচরণ, ঘনঘন পরীক্ষার চাপ, প্রাথমিক স্তর থেকে ওপরের দিকে শিক্ষার ব্যয় ক্রমেই বেড়ে যাওয়া, ব্যয়বহুল প্রাইভেট কোচিং ইত্যাদি কারণে শিক্ষার্থীরা ঝরে পড়ে। ঝরে পড়া শিক্ষার্থীদের বেশিরভাগই শিশুশ্রমের সাথে জড়িয়ে পড়ে। বর্তমানে ৫-১৭ বছর বয়সীদের মধ্যে ৬.৮% শিশু শিশুশ্রমের সাথে জড়িত আছে। এক্ষেত্রে ঝরে পড়া ঠেকাতে পারলে প্রত্যক্ষভাবে শিশুশ্রম বন্ধ করা সম্ভবপর হবে।

সরকারের বিনামূল্যে পাঠ্য বই বিতরণ, শিক্ষা বৃত্তি ও স্কুল ফিডিং কর্মসূচিসহ অন্যান্য সুযোগ সুবিধা ও দেশি-বিদেশী সংস্থার শিক্ষা প্রোগ্রামগুলো ইতিবাচক ভূমিকা পালন করছে। পাশাপাশি অধিক উন্নতির জন্য কর্তৃপক্ষকে আরো যুগোপযোগী পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়া ঠেকাতে প্রতিটা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে।

প্রাথমিক শ্রেণিতে শিক্ষার্থীদের একটি জাতীয় ডাটাবেজ তৈরি করতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে শুধু পাঠদানকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ না করে এক একটি তথ্য ব্যবস্থাপক প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ করতে হবে। ফলে প্রতি শিক্ষাবর্ষ শেষে খুব সহজেই কোন কোন শিক্ষার্থী ঝরে পড়েছে তাঁর তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করা সম্ভব হবে। এর মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা কি কি কারণে শিক্ষাব্যবস্থা থেকে ঝরে পড়েছে তা পৃথকভাবে বিশ্লেষণ করা সম্ভব হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে তাদের অভ্যন্তরীণ শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়ার কারণ ও প্রতিকার অনুসন্ধান করতে হবে। প্রধান শিক্ষককে প্রতিটা শিক্ষার্থীর ঝরে পড়ার কারণসমূহের একটি প্রতিবেদন উপজেলা/জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা বরাবর প্রেরণ করতে হবে এবং যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

শিক্ষার গুরুত্ব সম্পর্কে ঝুঁকিপ্রবণ শিক্ষার্থীর পারিবারিক সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে। প্রতি শিক্ষাবর্ষে কতজন শিক্ষার্থী অকৃতকার্য হচ্ছে এবং তাদের মাঝে কতজন পরবর্তীতে পড়াশুনা চালিয়ে যাচ্ছে কিংবা ঝরে পড়ছে তা ফলো-আপ করতে হবে। অকৃতকার্য হওয়ার কারণে ঝরে পড়া শিক্ষার্থীদের শিক্ষায় ফিরে আনতে বিশেষ পাঠদানের ব্যবস্থা করতে হবে। তাদের পুনরায় ভর্তির জন্য উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। এক্ষেত্রে যেই বয়সী শিক্ষার্থীদের মাঝে ঝরে পড়ার প্রবণতা বেশি তাদের বিশেষ কাউন্সেলিং প্রোগ্রামের অধীনে নিয়ে আসা দরকার।

বিদ্যালয়ে শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। ঝুঁকিপ্রবণ শিক্ষার্থীর এবং তাদের পারিবারিক কাউন্সেলিংয়ের দায়িত্ব পৃথক পৃথক শিক্ষকের উপর অর্পণ করতে হবে। বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন শিশুদের জন্য আলাদা প্রোগ্রাম গ্রহণ করতে হবে। অভিভাবক ও শিক্ষকদের আরো সচেতন হতে হবে। তাদের বিশেষ যত্নের নির্দেশনা দিতে হবে। প্রত্যেক শিক্ষার্থীর ঝরে পড়া রোধে শিক্ষাবৃত্তিসহ বিভিন্ন ধরনের সুযোগসুবিধা বৃদ্ধি করতে হবে যেন তাদের পরিবার শিক্ষার্থীদের পড়াশুনার খরচকে কোনভাবেই বোঝা মনে না করে।

প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়মিত অভিভাবক সভা অনুষ্ঠিত হতে হবে। ঝরে পড়া ঠেকাতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে খেলাধুলা ও বিনোদনমুলক কার্যক্রমের উপর জোর দিতে হবে। প্রাইমারী ও সেকেন্ডারি পর্যায়ে বয়সবর্গ বিবেচনায় প্রয়োজনীয় খেলনা উপহার দিতে হবে।

মুলধারার বাইরের জনগোষ্ঠীর শিশুদের বিদ্যালয় থেকে ঝরে পড়ার হার কমাতে মাতৃভাষাভিত্তিক প্রাথমিক শিক্ষা চালু করতে জোরালো ভূমিকা পালন করতে হবে। যে সকল ছেলেমেয়েরা সাধারণ শিক্ষাব্যবস্থার সাথে খাপ খাওয়াতে পারছেনা তাদের কারিগরি শিক্ষায় অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। শিক্ষা সংক্রান্ত প্রায়োগিক গবেষণা প্রকল্পে দেশি-বিদেশী সংস্থাগুলোর যেসব মডেল ও দৃষ্টিভঙ্গি সফলতা অর্জন করেছে তা গ্রহণ করতে হবে। পাশাপাশি শিক্ষাব্যবস্থা যাতে ভীতিকর না হয়ে আগ্রহের বিষয় হয় সেদিকে গুরুত্ব দিতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে র‌্যাগিং কিংবা বুলিংয়ের মত ঘটনার বিরুদ্ধে আইনী ব্যবস্থা নিতে হবে।

লেখক:  গবেষক ও কলামিস্ট, বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব সোশ্যাল রিসার্চ (বিআইএসআর) ট্রাস্ট। 

ইমেইল- golammrshed@gmail.com