‘গ্রাসিয়াস আ লা পিলোতা’ -ধন্যবাদ ফুটবল!

নিউজ ডেস্ক : যার বন্ধু ফিদেল কাস্ত্রো, যার চেতনায় চে- তিনি কবেই বা রাজপ্রাসাদের সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়েছেন। তার পরও তিনি তো ছিলেন রাজপুত্রই, ঈশ্বর যাকে রাজমুকুট দিয়েছিলেন ফুটবলের, তার জন্য তো বুয়েনাস আয়ার্সের ঐতিহাসিক কাসা রোসাদার দুয়ার খোলা থাকবেই। গতকাল আর্জেন্টিনার সেই প্রেসিডেন্ট প্যালেসেই চোখের জলে প্রিয় দিয়েগো ম্যারাডোনাকে শেষ শ্রদ্ধা জানাল আর্জেন্টিনাবাসী। আরও দুই দিন এই প্রাসাদেই আকাশি-সাদায় মোড়ানো কফিনে থাকবে তার নিথর দেহ। ঈশ্বরের সমীপে ‘ফুটবল ঈশ্বর’। মৃত্যুকে কখনোই যিনি ড্রিবলিং করতে দেননি, সেই ম্যারাডোনাকেই এক সাক্ষাৎকারে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল- মৃত্যুর পর যদি আপনার সমাধিতে কিছু লিখতে বলা হয় তাহলে কী লিখবেন? উত্তরে সেই শিশুসুলভ ভঙ্গি- ‘গ্রাসিয়াস আ লা পিলোতা’, বাংলায় যা দাঁড়ায়- ‘ধন্যবাদ ফুটবল’।

ফুটবল পায়ে ২১টি বছর যে আলপনা তিনি এঁকে গেছেন, যে বিনোদন তিনি দিয়ে গেছেন প্রজন্মের পর প্রজন্মকে। সাদাকালো টেলিভিশনে আর্জেন্টিনার ম্যাচ দেখা সেই প্রজন্ম কী করে ভুলে থাকতে পারে দিয়েগোকে।

বুধবার তার প্রয়াণের খবর শুনে সিডনি থেকে ফ্রান্সিসকো, বুয়েনাস আয়ার্স থেকে বরিশাল- সবখানেই যেন আপনজন হারানোর হাহাকার। ‘ম্যারাডোনা’ নামটির সঙ্গেই যে জড়িয়ে সব নস্টালজিয়া। ‘মনে পড়ে যায় তখন আমি’- ফেসবুক ওয়ালে প্রিয় ম্যারাডোনার ঝাঁকড়া চুলের ছবি দিয়ে কতশত পোস্ট। অদেখা মানুষটির জন্য এতটা আবেগ, এতটা শূন্যতা আর কবে দেখেছে এই বিশ্ব। যেখানে তার প্রয়াণে মুছে গেছে ব্রাজিল- আর্জেন্টিনার অলিখিত বিভেদের দেয়াল। বুধবার খবরটি শোনার পরই বুয়েনাস আয়ার্সের কাছে, ম্যারাডোনার বাড়ির কাছে হাজার হাজার শোকার্ত আর্জেন্টাইন জড়ো হতে থাকে। মোমবাতি আর ফুলের তোড়াসহ কোনো মা এসেছেন তার ছেলেকে কোলে নিয়ে। কেউবা বুকে ম্যারাডোনার ছবি এঁকে এসেছেন প্রিয় মানুষটিকে শেষবারের মতো দেখতে। যারা আসতে পারেননি তারা চার্চে গেছেন শ্রদ্ধা জানাতে। দেশবাসীর এই ব্যথা অনুভব করতে সময় নেননি আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্ট আলবার্তো ফার্নান্দেজ। ‘দিয়েগো, তুমি আমাদের বিশ্বের সর্বশ্রেষ্ঠ জায়গায় তুলে দিয়েছিলে। তুমি আমাদের অনেক সুখী করেছিলে। তুমি ছিলে সর্বকালের সেরা। তুমি আমাদের মাঝে ছিলে, এ কারণে আমরা ধন্য ছিলাম। সারাজীবন তোমাকে মনে রাখবে আর্জেন্টিনা।’ প্রেসিডেন্ট ফার্নান্দেজ ম্যারাডোনার পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানিয়ে দেশে তিন দিনের শোক ঘোষণা করেছেন।

ফুটবল মাঠে চিরবৈরী প্রতিদ্বন্দ্বী হলেও ম্যারাডোনার প্রয়াণে আপনজন হারানোর ব্যথা পেয়েছে ব্রাজিলও। সেখানেও রিও ডি জেনেরিওর চার্চগুলোয় ম্যারাডোনার আত্মার শান্তি কামনায় প্রার্থনা চলছে। যার সঙ্গে সারাজীবন তুলনা করা হতো সেই পেলে লিখেছেন- ‘বন্ধু হারালাম। আবার আমরা একসঙ্গে ফুটবল খেলব আকাশে গিয়ে।’ পেলে থেকে নেইমার, ডুঙ্গা থেকে কার্লোস প্রত্যেকেই টুইট করে ফুটবলের পিকাসোর জন্য স্বজন হারানোর বেদনাই ব্যক্ত করেছেন।
আর্জেন্টিনার মতোই শোকে কাতর ইতালি। বিশেষ করে ন্যাপোলি। এ শহরেই জীবনের বেশ কিছু সময় কাটিয়েছিলেন ফুটবল ঈশ্বর। চুরাশি থেকে একানব্বই- ক্যারিয়ারের মধ্যগগনে থাকার সময় ন্যাপোলিতেই খেলেছিলেন। এক সাক্ষাৎকারে ম্যারাডোনা এই শহরের প্রতি তার আত্মার টানের কথা বলতে গিয়ে আবেগী হয়ে পড়েছিলেন। ‘মনে আছে প্রথম যখন এই ক্লাবে এলাম, সেদিন আশি হাজারের বেশি মানুষ এসেছিল আমাকে স্বাগত জানাতে। হেলিকপ্টারে করে নিয়ে আসা হয়েছিল আমাকে।’ সেই ন্যাপোলি এখন শোকে স্তব্ধ। দেয়ালে ম্যারাডোনার ছবি এঁকে তার সামনে মোমবাতি জ্বালিয়ে রাতভর অনেককে প্রার্থনা করতে দেখা গেছে। এমনকি আমাদের পাশের শহর কলকাতাতেও। ২০০৮ সালে কলকাতায় এসে মাদার তেরেসার মিশনে গিয়েছিলেন। সল্টলেক স্টেডিয়ামে লাখো মানুষের ভালোবাসায় সিক্ত হয়েছিলেন। তার প্রয়াণে কলকাতারও মন ভালো নেই। এবার মুজিববর্ষে বাংলাদেশে আসার একটা সম্ভাবনা ছিল তার। কিন্তু করোনার কারণে সবকিছু এলোমেলো হয়ে যায়। বাংলাদেশ যে তাকে কতটা আপন ভাবত, কতটা বাড়ির ছেলে মনে করত, এর কিছুটা জানা ছিল তার। যেবার মেসিরা ঢাকায় এলেন সেবার দলের সঙ্গে থাকা এক আর্জেন্টাইন সাংবাদিকের কাছেই শোনা। ‘আমরা জানি, বাংলাদেশের মানুষ কতটা ফুটবল ভালোবাসে। দিয়েগো একবার জানতে চেয়েছিল- তুমি কি জানো, আমরা নব্বইয়ের বিশ্বকাপ ফাইনালে হেরে যাওয়ায় বাংলাদেশের একটি ছেলে আত্মহত্যা করেছে?’
সত্যিই সে একটা সময় ছিল ম্যারাডোনা আর তার আর্জেন্টিনাকে নিয়ে এদেশের আবেগ মন্থনের রূপকথা। নব্বইয়ের বিশ্বকাপ ফাইনালে পশ্চিম জার্মানির কাছে মেক্সিকান রেফারি কোডেসাল মেন্ডিজ বিতর্কিত পেনাল্টি দেয়। তারপর ম্যারাডোনার সঙ্গে যেন কেঁদেছিল বাংলাদেশও। পাড়ায় পাড়ায় মিছিল বের হয়েছিল। ‘৯৪ বিশ্বকাপে যখন ম্যারাডোনাকে নিষিদ্ধ ড্রাগ নেওয়ার জন্য বহিস্কার করা হলো তখনও চোখে জল গড়িয়েছিল এদেশের কোটি কোটি ভক্তের। স্কুলের খাতায় ম্যারাডোনা আঁকা ছবি, ম্যারাডোনা লেখা জিন্সের প্যান্ট- এমনকি ঢাকার শান্তিনগরে তখন ‘ম্যারাডোনা’ হোটেলও উদ্বোধন হয়েছিল। তাদের সেই শৈশবের ম্যারাডোনা এখন সেই প্রজন্মের এখন মধ্যবয়স। প্রিয় মানুষটির প্রয়াণে ফেসবুকের দেয়ালই বেছে নিয়েছেন তারা।