ক্ষুদে-মালিকদের আরেক ধান্দাবাজিঃ এনজিও – মুস্তাফা হুসেন

ক্ষুদে-মালিকদের আরেক ধান্দাবাজিঃ এনজিও – মুস্তাফা হুসেন
বাংলাদেশে সামন্ততন্ত্রের বিকাশ হয়নি,পুঁজিতন্ত্রেরও বিকাশ ঘটেনি। সামন্ততন্ত্রের যেটুকু সম্ভাবানা ছিল বহিঃশক্তির প্রবল চাপের কাছে তা নতিঃস্বীকার করে এবং বামন হয়ে,স্বনির্ভর হয়ে বেঁচে থাকে। নাম পাতি-সমন্ততন্ত্র। ঝুঁকিবিহীন প্রক্রিয়ায় ও কায়দায় অন্যের শ্রমের ফল ও ফসল আত্মসাৎকারী এই শ্রেণীটি(পাতি-সামন্ততন্ত্রী) বাংলাদেশের সমাজে নানা নামে পরিচিত। কেউ বলেন একে মধ্যবিত্ত,কেউ মধ্যশ্রেনী আবার কেউবা মধ্যস্তরের জনগণ বলে একে অভিহিত করে থাকেন। মুলত:কৃষি-অর্থনীতির সম্পর্কের সাথে সম্পকীত হয়ে এরা অর্তনীতির তথা স্বার্থনীতির নানা দিকে বাহুবিস্তার করে সম্প্রসারিত হয়েছে,কিন্তু অল্প সংখ্যাকেরই উৎপাদন অর্থনীতির সাথে সরাসরি কোন সম্পর্ক বিদ্যমান রয়েছে,বৃটিশ আমলে,পাকিস্তান আমলে এবং বাংলাদেশে আমলে এদের শক্তি ও সাহস ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পেয়েছে।
তবে সংখ্যায় বেড়েছে বলে,নিজেদের মধ্যে প্রবল অন্তর্দ্বন্দে-ও লিপ্ত হয়েছে। ১৯৪৭ এর বাংলা ভাগের ঘটনা তার একটি উদাহরন। বাংলা ভাগের ঘটনার পেছনে তাদের অবদান যথেষ্ট যা সবচ মহলেই স্বীকূত। কৃষি অর্থনীতি থেকে বহির্গমনের পরিনামে যে যে ক্ষেত্রে তাদের পদচারনা ঘটেছে, তার এককি হল আমলাতন্ত্র দ্বিতীয়টি বিদেশী বণিকদের দালালী ফড়িয়াগিরি; তৃতীয়টি ঠিকাদারি,চতুর্থত আদম ব্যবসায়; এবং সর্বশেষ হল এনজিও ব্যবসায়। অনেকে বলেন, চরিত্রগত দিক দিয়ে লুম্পেন হওয়ার কারনে উৎপাদন বহির্ভুত কর্মকান্ডে এর নিজেদের নিয়োজিত করেছে। যাতে ঝুকিবিহীন উদ্যোগ; কিন্তু লাভ শতকরা এশত ভাগ। বাংলাদেশের শ্রমজীবি জনগন যথা চাষী জেলে,জোল,তাঁতী,কমার,কুমার,সুতার,মুচার প্রভৃতি মানব গোষ্ঠিকে অর্থনৈতিক ভাবে প্রবঞ্চিত, সামাজিকভাবে প্রমাণিত, অপদস্থ লাঞ্চিত করে এরা টিকে থাকে। নিজেদের আরাম আয়েশ বজায় রাখতে চেষ্টা করে। একটি বাস্তব কর্মক্ষেত্র ভিত্তিক পর্যবেক্ষন নির্ভর তথ্যে জানা গেছে যে, একটি বেসরকারী সংস্থা অথবা এনজিও সংস্থাস্থাপনার পেছনেমুল শক্তি উৎস হিসাবে পেটি ফিউডাল লিংকেজ অর্থাৎ পাতি সামন্ততন্ত্রীয় যোগ সুত্র প্রধান ভুমীকা পালন করে থাকে। এটা উন্নয়ন গবেষনার কোন কেইস স্টাডি নয়,তবে পর্যবেক্ষনের মধ্যে দিয়েই বেরিয়ে আসা কিছু সত্য ও বাস্তবতা।
কর্মক্ষেত্র হলো-মেঘনা তীরবর্তী দুটি জেলা। বেসরাকারী সংস্থা টির মুল উদ্যোক্তা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক। পড়াসুনার প্রয়োজনেই বিদেশীদের সাথে পরিচয়। জাপানের একটি সংস্থা মার্কিন একটি সংস্থা এবংসুইডেনের একটি সংস্থার আর্থীক অনুদানে একটি বেসরকারী সংগঠন প্রতিষ্ঠা। তার প্রাথমিক এবং মুল কাজ হল গ্রামেরগরীব এবং ভুমীহীনদের মধ্যে ঋণ বিতরন। ঋনের সহায়তায় আয় সৃজন প্রকল্পের সাথে সাথে তারা সমর্থন মুলক আরো কিছু কিছু প্রকল্প প্রনায়ন ও বাস্তবায়ন,সেগুলো হলো–শিক্ষা প্রকল্প, পরিবার পরিকল্পনা প্রকল্প ইত্যাদি। পরিবার পরিকল্পনা প্রকল্প গহন না করলে,বিদেশীরা অর্থাৎ ইউরোপ-আমেরিকা,জাপান অর্থাৎ সাত বৃহতজাতি ভুক্ত দেশ গুলোর ধনকুবের গণ অনুদান ও সাহায্য দিতেরাজী নন। যার জন্য পরিবার পরিকল্পনা প্রকল্প গ্রহন করতেই হয়।
কিন্তু মুশকিল হল পরিবার পরিকল্পনা প্রকল্প বাস্তবায়নে সরাসরি ও প্রত্যক্ষ কোন ফলাফল দেখা যায়না,তাই সেই ক্ষেত্রে আশা করা যায় না। মিনিমাম কিছু অর্থ ব্যয় করেই কেবল পরিবার পরিকল্পনা নামক কিছু সেবা প্রকল্পকে টিকিয়ে রাখতে হয়,একই রকম কাজে স্বল্পতম সময়ে ব্যয়ের নমুনা এই রকম-একই কর্মক্ষেত্রে যেখানে সরকারী কমীরা বেতন দুইহাজার টাকা সেখানে বেসরকারী কর্মীরা বেতন চারশত টাকা। অর্থাৎ পাঁচগুন বেশী। অন্যদিকে পরিচালনা পর্ষদ ও উর্দ্বতন কর্মকর্তাদের মাসিক ও বাৎসরিক পাওনা এবং রিয়েল ওয়েজেস বাবদ সরকারী কর্মকর্তার চাইতে দুই/তিন গুন বেশী খরচ হয়। এখানে উল্লেখ করা আবশক্য যে বেসরকারী সংস্তা সমুহ বাংলাদেশের সরকারের কোম্পানি আইন অনুসারে রেজিষ্টিভক্ত। সুতারাং বেসরকারী সংস্থা সমুহ কোম্পানি ও শিল্প ও শ্রম আইন এরসকল বিদিমালা মেনে চলতে বাধ্য। শ্রম আইনএরআওতায় কোন বেসরকারী সংস্থার দ্বারা নিয়োজিত কোন কমীকে শ্রম আইন বহিভুত বেতন হার কোন বেসরকারী সংস্থা প্রদান করতে পারেন।
যদিও অত্যন্ত অমানবিক ভবে এক ধরনের বেতন (আসলে বেতন নয়,ভাতা) প্রদান করা হয় এবং বলা হয় যে, বেসরকারী সংস্থা কম ভাতা দিয়ে ,বেশী কাজ করিয়েনিতে অদিকতর দক্ষ ও পারদশী অর্র্থাৎ ব্যবস্থাপনাগত দিক দিয়ে অধিকতর যোগ্য, । অতএব সরকারী সংস্থার দরকার নেই;মুক্ত বাজার অর্থনীতিতে ব্যবস্থাপনার,(আরেক অর্থে কাজ করিয়ে নেয়ার) ক্যাপাসিটিতে অধিকতর পারঙম বলে কেবলশঅথ্য বেসরকারী সংস্থা সমুহই সবা ও উন্নয়ন মুরক খাতগুলো দেখভল করার অধিকার সংরক্ষন করে এমত ধারানা ও পরিবেশ প্রস্তুত করা। বাংলাদেশের সীমানার আওতায় কোন একটি এলাকার জনগনের মধ্যে আর্থীক অতবা সামাজিক সেবা ক্ষেত্রে একচ্ছত্র ভাবে এবং পাবলিকলী কাজকর্ম করার পরিকল্পনা করে। গনপ্রজাতন্ত্রের জনগনের সেবার্থে নিদিস্ট ব্যক্তি কে উপযুক্ত যোগ্যতার ভিত্তিতে নির্বাচন ও নিয়োগ করার অধিকার সংরক্ষন করেন পাবরিক সার্ভিস কমিশন অথবা উপযুক্ত কর্তৃক ক্ষমতা প্রাপ্ত ব্যক্তি বা ব্যক্তিবর্গ। সেই ক্ষেত্রে বেসরকারী সংস্থা কি করে উপরোক্ত দায়িত্ব পালন করার ক্ষমতা সংরক্ষন করেন তাও প্রশ্নেন উদ্রেক করে। গন প্রজাতন্ত্রের জনগণের সরকারী ও বেসরকারী সেবকদের মধ্যে উজরোক্ত বৈষম্য ও দ্বন্দের সুযোগে মুক্তবাজার অর্থনীতির দাশনিকরা স্বাভাবিক চারমান প্রক্রিয়ায় একইভাবে সামাজিক অবস্থার পরিবর্তনের জটিলতরতত্বের অবয়ব সৃষ্টি করেন।
এর বাস্তব উদহারন হল—-প্রথমত একজন দুঃস্থ মহিলা পাঁচ হাজার টাকা ঋন নিয়ে একটি গাভী কিনে ছয় মাসে যখন গাভী বিক্রী করে দিতে বাধ্য হয়, অথবা রুগ্ম হয়ে মারা যায় অথবা গাভী চুরী হয়ে যায়; কিংবা একজন দুঃস্থ মহিলা তিন হাজার টাকা ঋন নিয়ে একটি সেলাই মেশীন ক্রয় করে এবং সেটি পরে চুরি হয়ে যায়, তখন ভ‚মিহীন ও বিত্তহীনদের ক্রয় ক্ষমতা বাড়ানোর সকল পরিকল্পনা শুন্যে মিলিয়ে যায়। দ্বিতীয়ত : গাভীর দুধ ক্রয় করার মত ক্ষমতা সকল গ্রাম বাসীর নেই, অতএব শুধুমাত্র দুধবিক্রীর অর্থে ভাতও কাপড়ের সংস্থান করার মত সামর্থ্য ভূমিহীন বা বিত্তহীন হয়না। ধনীকৃষক, জোতদার, অথবা উপরী পয়সার মালিক, ব্যবসায়ী বা চাকুরিজীবিগন গ্রামানচলে অত্যান্ত সল্পসংখ্যক ক্রেতা। তাদের বাদ দিয়ে কোন সামথ্যবান ক্রেযতা গ্রামাঞ্চলে নেই। অন্যদিকে কৃষকের মধ্যে শ্রম বিভাগের দরুন কেউ ফসল ফলাবে আর কেউ গরু ছাগল পুষবে, তারপর গ্রামের মুক্ত হাটে বেচা কেনার প্রক্রিয়ায় উৎপাদনের অদল বদল ও বিনিময়য করবে তেমন সৃষ্টি হয়নি গ্রামে আর হয়নি বলেই ভ‚মিহীন, বিত্তহীন এর জন্য আয় সৃজনের সকল প্রকল্প মখ থুবরে পরে যায়। তখন জিওফ্রে উড অথবা হাসনাত আব্দুল হাই হতাশা গ্রস্থ হতে পারেন। কৃষকের দারিদ্র্যর অনুসন্ধানে ব্রতি হতে পারেন, কিন্তু সত্যের সন্ধান পাওয়া যায় না।
বাংলাদেশের গ্রামীন উন্নয়ন প্রচেষ্টার উন্নয়ন বিশারদগন ঋন ব্যাবস্থা দিয়ে গ্রামীন বিত্তহীন ভূমিহীন দের অথবা গ্রামীন সর্বহারা দের (এই ধরনের রাজনীতিক পরিভাষা তার ব্যবহার করেন না।) ক্রয় ক্ষমতা বাড়ানোর নানা রকম পরিকল্পনার ব্যবস্থাপত্র ও উদহারন দিয়ে থাকেন। কিন্তু গ্রামীন সর্বহারাদেরকে ক্রয় ক্ষমতা বাড়ানোর দর্শন দিয়ে চিন্তা শক্তির অস্ত্র দিয়ে সজ্জিত করার পরিকল্পনা করেন না। গ্রামীন ব্যাংকের প্রতিষ্ঠাতা সহ সকল ঋন বিশারদগন একটি সত্যে উপনীত হয়েছেন যে গ্রামের সবচাইতে কমজোর সর্বহারা কেবল নয় সবচাইতে ক্ষমতাহীন হল গ্রাম্য বিত্তহীন ভূমিহীন কিংবা নারীগণ। এবং সবচাইতে আন্তরিক ও সত্যনিষ্ঠ মানুষ তিনিই, কারন তিনি কথা দিয়ে কথা রাখেন। কার্জ নেয়া টাকাটি তিনি এক বেলা না খেয়ে হলেও ঠিক ঠিকই দিয়ে দেন, পরিশোধ করেন। আরেকটি বিষয় ঋন বিশারদগন বিশ্লেষন করেন না, তা হল গ্রামীন বিত্তহীন, ভ‚মিহীনগন রাজনৈতিক ক্ষমতাহীন-ও কারন, তিনি প্রতিবাদ করেন না। গ্রামীন ক্ষমতা প্রতিভুর সামনা সামনি হয়ে প্রতিবাদ জানান না, কারন প্রতিবাদ জানানোর পেছনে তার শক্তি নেই, তার রাজনৈতিক ক্ষমতা নেই। প্রতিবাদ জানালেই রাজনীতি, তাদের রাজনীতিনেই। ঋন বিশারদগন তাদেরকে রাজনীতি দিতে চান না, ঋন দিতে চান, ঋন দিয়ে তাদের ক্রয়ক্ষমতা বাড়াতে চান।
রাজনীতি দিয়ে, উৎপাদক হিসাবে গ্রামীন কৃষি অর্থনীতিতে তাদের অবস্থানকে শক্তিশালী করতে চান না। অথচ মজাদার ব্যাপার হল যার মূল উৎপাদক কৃষক সেই প্রান্তিক ও গরীব কৃষক কে, প্রয়োজনীয় ঋন (যাতে সত্যিকার অর্থেই অতিরিক্ত বিনিয়োগের কারনে অতিরিক্ত উৎপাদন হয় এবং সেই অতিরিক্ত উৎপাদন পুনরায় নুতন করে উৎপাদন বিনিয়োজত হয়) প্রদান করেন না-যা সমগ্র কৃষি অর্থনীতিতেই উৎপাদন প্রক্রিয়ায় গতিবেগ সঞ্চার করে, মাঝারী কৃষক প্রান্তিক চাষী ও বর্গাচাষীর প্রানান্ত প্রচেষ্ঠার ফলশ্রæতিতে উৎপাদন বাড়ে। কিন্তু তোলা দুধে পোলা বাঁচেনা, ঝিনুক দিয়ে সন্তানের মুখে পানি সঞ্চারিত হয়না, ঋন নিয়েও চাষীর ক্রয় ক্ষমতা বাড়েনা। ফসল চলে যায় মহাজনের গুদামে। মহাজন গুদামজাত মালামাল চড়াদামে অফসিজনে বিক্রি করে। ব্যাংকে টাকা পুঞ্জিভ‚ত হয়, কিন্তু গ্রামীন কৃষী অর্থনীতিতে পুজির সৃষ্টি হয়না। বাংলাদেশ সরকারের অর্থ চলে যায় বিদেশী ঋন পরিশোধে। বিদেশী ব্যাংকের খাতায় দেশী মুদ্রার অংক বড় হয়, আর দেশী ব্যাংকের খাতায় বিদেশী মুদ্রার অংক ছোট হয়। তাতে কলেজ- বন্ধুরা বিচলিত হন। দেশী-খাতার বিদেশী অংক বড় করতে মহান আত্ম-মহাজন এগিয়ে আসেন। দেশি নেতা-নেত্রীরা অনেক কষ্টে ঋন যোগাড় করেন। শহরাঞ্চলে, বাড়ী হয়, গাড়ী হয়, গ্রামের ক্ষুধার্ত মানুষ চলে আসে শহরে। ফুট পাতে খোলা আকাশের নিচে পড়ে থাকে। আর গাড়িওয়ালা, বাড়ীওয়ালাদের পদসেবা করে। গরীবরা এমন ঝাঁকে ঝাঁকে আসে যে শহরের বড়লোকদের বিরক্তির সৃষ্টি হয়। ঋনবিশারদগন গ্রামাঞ্চলে এনজিও খোলার এজেন্সি নেন। গ্রামীন গরীব জনগনকে সেবা প্রদান এর মুখোশ পরে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যানের মহান বানী প্রচার করেন, কিন্তু তলে তলে ঋনের ব্যবসা করেন, এবং গায়ের চামরা ছিলে ঋন আদায় করেন।
বস্তুত কোটি কোটি বিদেশী অতিরিক্ত মুদ্রা সঞ্চলিত হয় বাংলাদেশের অর্থ রক্ত প্রবাহে, তাতে বেশী অর্থ রক্ত প্রবাহের টাপ বাড়ে। তদনুযায়ী উৎপাদন বাড়েনা বলে নানা রকম সমস্যা দেখা দেয়। গ্রামীন ফসল, গ্রামীন অর্থ চলে আসে শহরে, নগরে। কিন্তু কর্ম নেই, তার সংস্থান নেই। কর্মহীন কিন্তু অন্নহীন নয়, তেমন সব যুবক উম্মত হয়ে তার দৈনন্দিন অবস্থান বদলের চেষ্টা করে। এই অবস্থান বদলের চেষ্টা করতে গিয়ে যে প্রক্রিয়ায় তারা অংশ গ্রহণ করে তার নাম সন্ত্রংশ, তার নাম সশত্র অপরাধ। অন্যদিকে আরও শিক্ষিত, সচ্ছল মধ্যবিত্ত যখন জীবন সংগ্রামে, পযুর্দস্ত হয়ে, কাংখীত ফলাফল লাভ না করতে পেরে হতাশায় ভেগে, তখন পা বাড়ায়, স্বাভাবিক অর্থনৈতিক কর্মধারার বাইরে এমন একটি কর্মকান্ডে বর্তমানে প্রচলিত, অর্থনৈতিক ক্রিয়াকলাপের সাথে যা সংগতিপূর্ন নয়। এমনটা ঘটে সাধারনত পুরাতন ধারার কৃষী সম্পত্তি সম্পর্কের সাথে যুক্ত অনুৎপাদক গোষ্ঠীদের বেলায়, তার নিজেদের ইচ্ছামত সামাজিক কাজ কর্মের বৈশিষ্ট্য নির্ধারন করতে চায়, যেখানে বিভাজিত শ্রমের সেই গুরুত্বপূর্ন অংশটাই অর্থাৎ উৎপাদন শক্তির ব্যবস্থাপনারও উপর তাদের কর্তৃত্ব বজায় রাখার চেষ্টাকরে, যে শ্রমের সাধন প্রক্রিয়ার বিনিময়ে তাদের পুরাতন সম্পত্তি সম্পর্কের ফলজাত সুখভোগের বিশেষধিকার টা নিশ্চিন্ত বজায় থাকে। এমনি করেই বিদেশী সাহায্যয নিয়ে সামাজিক সেবা ক্ষেত্র তৈরী করে, বেসরকারী আমলাতন্ত্রের মাধ্যমে ক্ষমতা, শক্তি, ও ভোগ নিশ্চিত করে ক্ষীয়মান পাতি-সামন্ত সম্পর্কের অবশেষে শেষ হওয়ার পর্যায়ে, বাংলাদেশে এমন অনর্থ সৃষ্টি হয়ে চলে।
অর্থনীতি বিদদের মতে আমাদের গ্রামীন শ্রমজীবিদের সমস্যার দিক দুটি, একটি হল ১)দারিদ্র্য, দূরী করন ২)অপরটি হল -ক্রয় ক্ষমতার সৃষ্টি। দারীদ্র দূরীকরনের সংগো সুষ্পষ্টনয়; কারন দারীদ্রের বৈশিষ্ট্যর কোন সীমারেখা নেই। কমিউনিষ্টরা যেমন বলে ভাত কাপড় জমি কাজ, কমিউনিষ্টরা এক আওয়াজ। কিংবা অন্ন বস্ত্র বাসস্থান, বাকশাল দেবে সমাধান; সেই ভাত, কাপড় ও অন্ন বস্ত্রের সংস্থাকে রাজনৈতিক ভাবে দারিদ্র্যের প্রান্তিক সীমারেখা হিসাবে ধরা হয়। অন্যদিকে আরো একটু অগ্রসর হয়ে, বাসস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসা ইত্যাদির অভাব ও দারিদ্র্যের লক্ষন বলে স্বীকার করে নেয়ার দাবী উঠছে। সুতরাং সেইসব লক্ষনাক্রান্ত বৈশিষ্ট্য গুলো দূর হলেই, দারিদ্র্যে দূরীভ‚ত হবে, এখন এরকম আশা করা হয়। তবে প্রশ্ন উঠেছে- এনজিও গুলো সেই আশা পুরন করতে পারছে কিনা? উত্তর হলো বিগত দীর্ঘ বিশ বছরেও সেই আশা পূরন হয়নি। বিদেশী দাতা সংস্থা ঋনের পর ঋন দিয়েয চলেছে- এনজিও গুলো বিদেশী মহাজনী ঋনের কমিশন এজেন্ট হিসাবে বাড়ীবানিয়ে গাড়ি হাকিয়ে শহরে জীবন যাপন মানের চেকনাই জোরদার করেছে; অন্যদিকে গ্রামাঞ্চলে মাসে মাত্র তিন চার শত টাকার বিনিময়ে অর্থাৎ দৈনিক গড়ে পাঁচ ঘন্ট হিসাবে দৈনিক দশ টাকার বিনিময়ে শ্রমদান করে দারিদ্র্য দূরীকরনের মূল শর্ত জাতীয় উৎপাদন বৃদ্ধিতে হাজার করা হিসাবে ও অবদান রাখতে পারে না, এখানে গ্রামীন কৃষীজ উৎপাদন বৃদ্ধির মূল প্রেরণা হল- গ্রামীন জনগোষ্ঠীর উদগ্র ক্ষুধার জ্বালা। যে জ্বালা প্রশমিত করতে গিয়ে বর্গাচাষী, প্রান্তিক চাষী ও মাঝারী কৃষক, প্রধানত: শ্রম নির্ভর চাষের মাধ্যমে গ্রামীন কৃষী ও কুটির শিল্পের উৎপাদন বৃদ্ধি করে চলে।
গ্রামীন উৎপাদন বাড়ুক কিংবা নাই বাড়–ক, এনজিওর সংখ্যা বৃদ্ধি হয়েই চলে। উপায়ন্তর না দেখে শেষ পর্যান্ত, সরকারী আমলাতন্ত্রের কেন্দ্রস্থল বাংলাদেশ সরকারের সচিবালয়; মন্ত্রনালয় থেকে সার্কুলার জারী হয়ে-যে অমুকএনজিও কাজ করলে অমুক এলাকায় কাজের দ্বৈততা সৃষ্টি হবে কিনা তা জানানো হোক। এতেই তার ধনতন্ত্র, পরনির্ভশীল পুঁজিতন্ত্র, সামরিক বেসামরিক আমলাতান্ত্রিক আর্থ সামাজিক ব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখতে অথবা তাকে টিকিয়ে রাখার সহায়ক কর্মকান্ডে অংশীদারা। বেসরকারী আমলাতন্ত্র, সরকারী আমলাতন্ত্রকে টেক্কা দিয়ে অধিকতর ব্যবস্থাপনা দক্ষতার সুবাদে বিজয়ী প্রতিযোগী হিসাবে, প্রধান ধারা রুপে দেখা দিবে কিনা এমত আশা করে এনজিও কর্তারা। বেসরকারী আমলাতন্ত্র নিয়ন্ত্রিত বাজার মানেনা, কিন্তু মুক্ত বাজার মানে, অথচ মুক্ত বাজারের নিয়মানুযায়ী সরাসরি বাজারে নেমে ব্যবসা বানিজ্যের প্রক্রিয়ায় বানিজ্য পুজিঁ গড়ে তুলতে ভয় পায়; সংকোচ বোধ করে, অর্থ পুজিঁর সীমাবদ্ধতা এবং পাতি সামন্ত সংস্কৃতির প্রভাব জনিত কারনে মানসিক অনিহা তথাকথিত মধ্যবিত্তকে (যাদের রয়েছে পুরাতন কৃষি সম্পত্তি সম্পর্কের মাধ্যমে উদ্ধৃত্ত উৎপাদন হস্তগত করার কাযেমী- স্বার্থ) শিল্প পুঁজি দূরে থাক ঐতিহ্যিক বনিক পুঁজি নয়, সাধারন ব্যবসায়ী পুঁজি সৃষ্টির দিকেও এগিয়ে দেয়না, ফলত: তারা দেশে বসেই তাদের মেধা ও শ্রমকে বিক্রী করে, কাজে লাগিয়ে তাদের ভোগ প্রবনতাকে শান্ত করার চেষ্টাকরে। সা¤্রাজ্যবাদী-অর্থ ঋনের অক্টোপাস-শুর গ্রামীন গরীবদের শ্রম শোষন করতেও অনুপ্রবেশ করেগ্রামের গরীবের হোগলার/ছনের ছাউনীতে এনজিও-র সেবা কমের মুখোশ পড়ে।।
আমেরিকা, ইউরোপ অথবা জাপান যেখানেইই হোক, এক-দুই মাস হতে পাঁচ-ছয় বছর স্বপ্নের দেশগুলোতে, খোদ মহাজনদের দেশে কাটিয়ে এলে জীবন ধন্য করা যায় তেমন ইচ্ছা-ও পাতি-সামন্ততন্ত্রী, পাতি-ধনিকদের কর্ম স্পৃহার পেছনে কাজ করে। পাতি-সামন্ততন্ত্রীদের অবশিষ্টরা ঝুঁকি নিতে চায়না। যেমন কৃষি অর্থনীতিতেও বর্গা প্রথার চাষের বন্দোবস্ত্র দিয়ে দেয়, ঝুঁকি নেয় না।
লেখাপড়া শিখে, প্রভ‚ত বিদ্যা অর্জন করে, বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ ডিগ্রী নিয়ে বিদেশ থেকে টাকা এনে দেশ সেবা করে। তাতে বিদেশী অর্থদাতাদের (ঋণ, সাহায্য, অনুদান, মনজুরী, খয়রতি- কত নামেই যে তাকে ডাকা যায়) সঞ্চিত অর্থের সুরাহা হয়, কিন্তু অর্থ গ্রহীতাদের আয়ের প্রবৃদ্ধি ঘটে না। তাই এই প্রশ্ন অহরহ-ই উঠে – পনের শতকের পর থেকে ইউরোপীয় খৃষ্টান মিশনারিরা আগে যেতো বাইবেল নিয়ে তারপর হাজির হতো দাঁড়িপাল্লা নিয়ে। বর্তমান শতকে ইউরোপ আমেরিকায় বনিকেরা আর সশরীরে আসে না। আমাদের মতো প্রাগ পুঁজিবাদী দেশের বিদ্ধান বুদ্ধিমানেরা আগে প্রচার করে মহান জন সেবার মর্মবানী, তারপর ঋন বিতরন করে, খাতকের চামড়া ছিলে ঋন আদায় করে। আর বিদ্যান বুদ্ধিমানেরা সারা দুনিয়াদে ধন্য হন। নোবেল সাহেবের পুরস্কার পাওয়া না পাওয়া খুব একটা উল্লেখযোগ্য কোন ব্যপারনয়। শহরে নগরে বসে শিক্ষার উজ্জ্বল আলোয় আলোকিত হয়ে পাতি সামন্ততন্ত্রের অবশিষ্ঠরা উম্মুখ হয়ে থাকেন, দেশ ও জনসেবার জন্য উদগ্রীব হয়ে যান। তারপর ব্রাক, প্রশিকা,গন সাহায্য সংস্থার সেপিরেট এর রথ নির্মান করে প্রজাদের সাথি হবার জন্য প্রামে চলে আসেন। কেবল রায়তী প্রজা নয়, ভ‚মিহীন, ভ‚মীদাস, বর্গাদাস, বাড়ীদাস, গৃহদাস, ইত্যেকার আসল দাসদের কল্যানের জন্য মাসিক তিন চারশত টাকা থেকে আট নয় শত টাকা বেতন দিয়ে সেবাদাস পোষন করেন।
পাতি সামন্ততন্ত্রী পরিবার থেকে আগত শিল্পমালিকেরা ও তাই গার্মেন্টস শিল্পে কাজ করে, কারন এরা প্রকৃত দাস নয়, এরা মুক্ত দাস, এরা সর্বহারা শ্রমিক। রাত বারোটায় কারখানা থেকে ফিরতে গিয়ে ধর্ষীতা হয়েও গ্রামে ফিরতে চায়না।
পাতি সামন্ত সংস্কৃতির আওতায় এই হল ধান্দাবাজির নবতম সংস্করন। এনজিও বা বেসরকারী আমলাতন্ত্রের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার কলকবজা নিয়ন্ত্রনে অংশগ্রহন। গ্রামাঞ্চলে এনজিও বা বেসরকারী সংস্থাসমূহের সংগঠনের অস্তিত্ত সংরক্ষনের কায়দা টা উল্লেখযোগ্য। সরকারী প্রশাসনিক আমলাদেরকে তারা হাত রাখেন। তার যোগসূত্র হাতে ধরা থাকে (লিংকেজ) জাতীয় পর্য্যায়ের নেতৃস্থানীয় রাজনীতিবিদ, সাংবাদিক, অর্থনীতিবিদ, অধ্যাপক, প্রভৃতির সাথে। এইভাবে যুক্ত হয়-অমুকের ভাগিনা কিংবা বিশেষ ক্ষেত্রে উচ্চতম পদে আসীন অমুকের ভাতিজী জামাই, এইভাবে পাতিসামন্ত সংস্কৃতির অবশেষের ভারসাম্য রক্ষা করা হয়। এইভাবে প্রাক্তন জমিদার তালুকদার জোতদার বর্গমালিক শ্রেনীর স্বার্থ রক্ষিত হয়। এই অবশ্য সরকারী আমলাতন্ত্র এবং বেসরকারী আমলাতন্ত্র উভয়ের বেলায়ই সত্য।
পাতি সামন্ততন্ত্র তার ক্ষয়িষ্ণু পর্য্যায়ের কালেসকারী আমলাতন্ত্রের মাধ্যমে তার অদৃশ্য কায়েমী স্বার্থ কে যেমন বজায় রাখে। তেমনি এনজিও বা বেসরকারী আমলাতন্ত্র হল তার সর্বশেষ কর্মকান্ড যার মাধ্যমে পাতি সামন্ততন্ত্র তার শোষন সংস্কৃতির সর্বশেষ রুপকে বহাল রাখার প্রচেষ্টা চালায়। নয়া উপনিবেশিক শক্তি কোন একটি দেশের উঠতি ধনিক শ্রেনীর মাধ্যমে যেমন তাদের স্বার্থ হাসিল করে, উঠতি ধনীক শ্রেনীকে বা বনিক পুঁজীকে পরনির্ভশীল শিল্পপতি হাতে সাহায্য করে। সাথে সাথে তাদের উপর সতর্ক দৃষ্টিও রাখে, এটা মালয়েশিয়া, দক্ষিন কোরিয়া ইত্যাদি দেশের ব্যপারে পরিলিক্ষিত হয়। কিন্তু নয়া উপনিবেশীক শক্তির আদর্শ ও সংস্কৃতি প্রচারের সবচাইতে নির্ভযোগ্য মিত্র হল আর্থ সামাজিক ভাবে রাজনৈতিক পশ্চাদপদ দেশ সমূহের পুরাতন সম্পত্তি সম্পর্কের সাথে সম্পর্কিত কায়েমী স্বার্থী গোষ্ঠী (বাংলাদেশের পাতি সামন্ততান্ত্রীরা) তৃতীয় দুনিয়ার দেশ সমূহে ব্যঙ্গের ছাতার মতো রাতারাতি গজিয়ে উঠা এনজিও সমূহ নয়া উপনিবেশীক শক্তির আদর্শ ও শোষন সংস্কৃতির প্রসারের কাজে পাতি সামন্ততন্ত্রীদের সর্বশেষ হাতিয়ার। এনজিওদের সর্বমোট বাজেট সাকুল্য রাষ্ট্রীয় বাজেটের অর্ধাংশের সমান। বিগত পচিঁশ বছরে তাদের অভিযাত্রা এবং সম্প্রসারন। রাষ্ট্রীয় সরকারী নিরীক্ষার কাছে তাদেরকোন জবাবদিহীতা নাই। অদৃশ্য সাম্রাজ্যবাদ তার নয়া উপনিবেশীক নীতির মর্মানুযায়ী সংস্কৃতির অধিপত্য বিস্তারের প্রয়োজনে তৃতীয় দুনিয়ার দেশগুলিতে এনজিওদের সম্প্রসারন ঘটাচ্ছে। এখানে জনগনের শক্তি/শ্রমিক কৃষক মেহনতিদের শক্তি সমাবেশ ঘটেনি। তাদের ঝাাকুনিতে সমাজটা নাড়া খায়নি। ফলে দেশের উৎপাদন ব্যবস্থার ভেতরে ভেতরে ঘুনে ধরে গেলেও নয়া উপনিবেশীক প্রভুত্বের প্রচারক দালাল বুদ্ধিজীবিদের টনক নরেনি। এনজিওদের মাধ্যমে বুর্জোয়া গনতান্ত্রিক মূল্যবোধের অনুপ্রবেশ ঘটানো হচ্ছে বলে যে কথা বলা হয় পাতি সামন্ততান্ত্রিকতার অবশেষ যুক্ত একটি দেশ ও সমাজে তা খুবই শোভনীয় মনে হলেও, আপাত: প্রবিষ্ট বহিশীকার খুব গভীরে প্রোথীত নয় বলে তা স্থায়ী কোন ফল উৎপাদনে সমর্থ বলে মনে হয় না। পাতিসামন্ততান্ত্রিকতার অবশেষ ও তার সংস্কৃতি প্রবল প্রতাপে সমাসীনই কেবল নয়; এনজিও দ্বারা বাহিত সামান্য বুর্জোয়া মূল্যবোধকে আঘাত হানতে উদ্যত। একটি পরনির্ভশীল শিল্পে নিয়োজিত নারী শ্রমীকেরা গ্রামীন পাতি সামন্ততন্ত্রী সাংস্কৃতির প্রভাবাধীন সীমানা থেকে এলেও, শুধুমাত্র নবতর সম্পত্তি সম্পর্কের কারনেই, পল্লীর নিগৃহীত সর্বহারা নারীরা শহরে এসে মাথা উচু করে দাঁড়ীয়ে পুরানো মূল্যবোধ-কে বিসর্জন দিয়ে দেয়, কারন সেখানে গ্রামীন পাতি-সামন্তসংস্কৃতির রক্তচক্ষু তাকে শাসন করতে সাহস পায়না। কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে শহরে-নগরে বুর্জোয়া-ব্যবস্থার ব্যাপক বিকাশ ঘটেছে। এনজিও সংস্কৃতিকে প্রত্যাখ্যান করতে এবং নয়  উপনিবেশীক নীতিকে প্রতিহত করতে বিকল্প ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরী। সেই বিকল্প ব্যবস্থা কি? বিকল্প ব্যবস্থা হলো–এনজিও সংস্কৃতির মূল উৎসের শিকড় কেটে দেয়। সেই শিকড় অর্থাৎ পাতি-সামন্ত সংস্কৃতি অর্থনীতি ও রাজনৈতিক ধ্বংশ করে দেয়া।

সাইফ শোভন, চিফ রিপোর্টার,ঢাকা নিউজ২৪.কম