আয়কর দিচ্ছেন ১ শতাংশেরও কম নাগরিক!

নিউজ ডেস্ক:    ১৭ কোটি মানুষের দেশে কর শনাক্তকরণ নম্বর (টিআইএন) আছে প্রায় ৪৫ লাখ নাগরিকের। কিন্তু বছর শেষে আয়কর বিবরণী বা রিটার্ন জমা দেন প্রায় ২০ লাখ। তাদের মধ্যে ৭ থেকে ৮ লাখ আবার সরকারি কর্মকর্তা। প্রতি মাসে বেতন ভাতা প্রদানের সময়ই ‘পে রোল ট্যাক্স’ কেটে রাখা হয়। অন্যদিকে যারা বছর শেষে রিটার্ন জমা দেন, তাদের প্রায় ১০ শতাংশ শূন্য রিটার্ন জমা দেন। অর্থাৎ এই ১০ শতাংশ করের আওতায় পড়েন না। সেই হিসাবে দেশে আয়কর দেন এক শতাংশেরও কম মানুষ।

দেশে চাকরি, ব্যবসা-বাণিজ্যসহ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাড়লেও সেই তুলনায় বাড়েনি নতুন করদাতা। এ প্রসঙ্গে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুর বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরেই করের আওতা বাড়ানোর কথা বলা হচ্ছে। কিন্তু বাড়ছে না। মাত্র ১ শতাংশ মানুষ আয়কর দেন। এটা কোনোভাবেই বাংলাদেশের অর্থনীতির সঙ্গে যায় না।’

তার মতে, ভোগান্তি বাড়ার আশঙ্কায় অনেকে কর দেওয়া থেকে বিরত থাকে। এ জন্য কর নীতি, কর প্রশাসন ও অটোমেশন সেক্টরে সংস্কার জরুরি। গত কয়েক দশকে কর ব্যবস্থায় কোনও সংস্কার হচ্ছে না। যে হারে অর্থনীতির আকার বাড়ছে, সেই হারে রাজস্ব আদায় করা যাচ্ছে না।

বিশ্বব্যাংকের হিসেবে জিডিপির তুলনায় কর আহরণে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে তলানিতে আছে। আটটি দেশের মধ্যে বাংলাদেশ সপ্তম। অর্থাৎ জনসংখ্যার অনুপাতে বাংলাদেশে সবচেয়ে কম নাগরিক আয়কর দেন।
আয়কর মেলা

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, বাংলাদেশে কর না দিয়ে পার পাওয়াটা খুব সহজ বলেই এমনটা হচ্ছে। আবার সরকারি সেবা কম পাওয়ার অজুহাতেও কর দেওয়া থেকে বিরত থাকেন অনেকে। এ কারণে করদাতার পেছনে না ছুটে সরকারের নজর শুল্ক ও ভ্যাট আদায়ের দিকেই বেশি। এতে ধনীরা কর ফাঁকি দিলেও দরিদ্রদের কাছ থেকে ঠিকই তা আদায় হচ্ছে।

বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, বাংলাদেশের জিডিপি পৌনে ৯ শতাংশেরও কম আসে কর থেকে। অথচ নেপালে জিডিপির মোট ২১ শতাংশের মতো কর থেকে আসে। যা দক্ষিণ এশিয়ায় সর্বোচ্চ।

দক্ষিণ এশিয়ায় সবচেয়ে কম কর-জিডিপি অনুপাত আফগানিস্তানে। ওই দেশে জিডিপির অনুপাতে সাড়ে ৭ শতাংশের মতো কর থেকে আসে। তারপরেই আছে বাংলাদেশ। তবে সরকারি হিসাব বলছে, ২০১৯-২০ অর্থবছরে কর-জিডিপি অনুপাত ১০ শতাংশ ছাড়িয়ে গেছে।

এদিকে ট্যাক্স জাস্টিস নেটওয়ার্কের (টিজেএন) তথ্য বলছে, মুনাফা ও সম্পদ স্থানান্তর করে বাংলাদেশ থেকে বছরে ৫ হাজার ৯৮০ কোটি টাকার কর ফাঁকি দিচ্ছে বিভিন্ন বহুজাতিক কোম্পানি ও ব্যক্তিশ্রেণির করদাতারা।

টিজেএন মূলত কর ফাঁকিবিরোধী একটি আন্তর্জাতিক ফোরাম। গত শুক্রবার বিশ্বব্যাপী কর ন্যায্যতা নিয়ে ‘দ্য স্টেট অব ট্যাক্স জাস্টিস-২০২০: ট্যাক্স জাস্টিস ইন দ্য টাইম অব কোভিড-১৯’ নামের যে প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়েছে, সেখানে বাংলাদেশ সম্পর্কে বলা হয়েছে, বছরে কর ফাঁকির পরিমাণ মোট কর রাজস্বের ৩.৪৬ শতাংশ। যা স্বাস্থ্য খাতে ব্যয়ের ৬১.৮৯ শতাংশ ও শিক্ষা খাতে ব্যয়ের ১৪ শতাংশের সমান।

টিজেএন বলছে, কর ফাঁকির টাকা শুধু বিদেশে পাচার হয়ে যাচ্ছে তা নয়, কর ফাঁকি দিতে অন্যান্য দেশ থেকে বাংলাদেশেও অর্থ এসেছে। অন্য দেশ বাংলাদেশের কারণে বছরে কর হারাচ্ছে ৮ লাখ ৮৮ হাজার ডলার বা প্রায় সাড়ে ৭ কোটি টাকা।