আমাদের কমিউনিস্ট আন্দোলন: পার্টি প্রশ্ন – মুস্তাফা হুসেন

আমাদের কমিউনিস্ট আন্দোলন: পার্টি প্রশ্ন – মুস্তাফা হুসেন
১. ভারত উজমহাদেশের বাংলা অঞ্চলে কমিউনিস্ট আন্দোলন শুরূ করেছিলেন কমরেড মুজফফর আহমদ, সামসুল হুদা আব্দুল হালিম,ধরনীকান্ত গোস্বামী প্রমুখ। ভারতের অন্যান্য অঞ্চলেও এ আন্দোলন শুরু হয়েছিল। ইংরেজ তথা ইউরোপীয়দের সাথে বাংলা ও ভারতের অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক যোগাযোগ; রাশিয়ার সাথে বাণিজ্যিক যোগাযোগ বিশেষ করে প্রথম মহাযুদ্ধের সময় ও তার পরে রাশিয়ার কমিউনিস্ট অভ্যুথানের দিকে ভারত-বাংলা অঞ্চলের শিক্ষিত ও অর্ধশিক্ষিত তরূনদের আকৃস্প ও অনুপ্রণিত করেছিল। ইংরেজ বিরোধী জার্মানী ছিল বিদ্যোহী ভারত প্রবাসীদের নিকট নতুনতদর চিন্তা ও তথ্য প্রসারর অন্যতম কেন্দ্র। প্রথম মহাযুদ্ধের আওয়াজে ইউরোপের আধুনিক,বৈজ্ঞানিক কৃৎকৌশলই শুধু বাংলা তথা ভারতে আসেনি,মাহকা;ী ও শ্রমজীবিদের অধিকার এবং স্বাশাসন এর চিন্তা ও বুদ্ধিগত ধারানাও এদেশে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। বেশী ছড়ায় ইংরেজী ভাষা ও শিক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমে।যদিও উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গুলিতে সমাজতান্ত্রীক এবং শ্রমজীবিদের মুক্তির ধারনা ও আলোচনাকে সরাসরি বিরোধীতা করা হত। তবুও শহর নগরে আগত তুলনামূলকভাবে-স্বল্পবিত্ত শিক্ষিত যুবসমাজের মধ্যে। কিছু কিছু সমাজবাদী চিন্তা ছড়িয়ে যায়। বিশেষ করে সংখ্যায় লঘিষ্ঠ প্রায়-বিত্তহীন মুসলমান যুবসমাজের মধ্যে। এর আসল কারন হল: ১) চাকুরীর সুযোগ ও সংখ্যার তুলনায় শিক্ষিত বেকারের সৃষ্টি ও সংখ্যাবৃদ্ধি, ২) সামন্তবাদী সংস্কৃতি ও ধারনার বিরুদ্ধে গনতান্ত্রীক চেতনা ও ধারনার প্রসার,প্রচলিত সমন্তবাদী সংস্কৃতির বিরূদ্ধে বিদ্রোহের গণতান্ত্রীক আকাংখা সাম্যবাদী ও সমাজবাদী চিন্তার মধ্যে তার খোরাক খোঁজে পায়; ৩)চাকুরী সন্ধানরত প্রায়-বিত্তহীন মুসলমান যুবকেরা রাজনীতিতে জমিদার ও ধনিক শ্রেণীর নেতৃত্বাধীন কংগ্রেস ও মুসলিম লীগের আওতার বাইরে বিকল্প রাজনৈতিক চিন্তা ও সংগঠনের মধ্যে তাদের অভীষ্ট লক্ষ্য ও পথ খোঁজার চেষ্টা করে। ৪) কংগ্রেসের নেতৃত্বে আসীনদের মধ্যে হিন্দু ধর্মাবলম্বীগণের প্রাধান্য,তাদের বাস্তবকাজে সাম্প্রদায়ীকতার ঊর্ধে উঠার ব্যাপারে সীমাবদ্ধতা ও অনীহা, সাম্প্রদায়ীকতার ভিত্তিতে গঠিত মুসলিম লীগের সামন্ততান্ত্রীক মনোভান ও আচরণ কমিউনিস্ট আন্দোলন সৃষ্টির পেছনে প্রেরনা যোগায়।এ ছিল অ-সর্বহারা শ্রেণীর তরূন যুবকদের নতুন দিকে যাত্রার জমিন ও রাস্তা। শিল্প শ্রমিকগনের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশই গ্রামীন কৃষি-ভূমি মালীকানার সাথে সম্পর্কীত ছিল। তবুও শিল্পায়নের পঞ্চাশ বছরের মধ্যেই সম্পূর্ন যন্ত্র নির্ভর কারখনায় যে কোন উৎপাদন উপায়ের (কৃষি সহ) মালীকানার সাথে বিযুক্ত সর্বহারা শ্রমিকগনের সংখ্যা বৃদ্ধি পায়। শিল্প ম্যমিকগণ তাদের সর্বহারা অংশসহ মজুরি বৃদ্ধির আন্দোলনে এগিয়ে গেলেও কমিউনিস্ট রাজনীতিতে তারা লক্ষ্যনীয়ভাবে সম্পৃক্ত হয়নি।
সামান্যিকরনে দাঁড়ায়,বিভিন্ন সামাজিক বর্গের মধ্যে স্বার্থগত দ্ব›দ্ব ও সংঘাত এক ধর্মীয় সম্প্রদায়ের সাথে আর এক ধর্মীয় সম্প্রদায়ের বিরোধকে প্রকট করে তোলে। বাংলা অঞ্চলে হিন্দু ধর্মাবম্বীদের সাথে মুসলিম ধর্মালম্বীদের প্রধানত চাকুরী ও ব্যাবসা-বাণিজ্য নিয়ে একটা স্বার্থগত দ্বন্দের পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়।
এ রকম পরিস্থিতিতে পূর্ব বাংলার স›দ্বীপ এর মুজফফর আহমদ, হাওড়ার আব্দুল হালিম, চুরুলিয়ার কাজী নজরুল কিশোরগঞ্জের ধরনী গোস্বামী, যশোরের আব্দুর রাজ্জাক খান, সামসুল হুদা (জেলা জানা নেই) চাকুরী, জীবিকা ও রাজনীতির সন্ধানে কলকাতায় আসেন। কিন্তু তখনকার সামাজিক অবস্থান নিশ্চিত করার জন্য (অথবা সমাজে টিকে থাকার জন্য) লড়াইয়ে শিক্ষিত যুবকদের সাথে প্রতিদ্বন্দিতায় তাদের বিক্ষুব্ধ ও হতাশ হওয়া ছাড়া অন্য কোন উপায় ছিলনা। তারা তৃতীয় চিন্তা করলেন। তারা বেকারত্বের কারনে মূলে গিয়ে উপনীত হলেন। রাজনৈতিক চিন্তায় তখনকার প্রচলিত স্বার্থগত দ্বন্দের সাম্প্রদায়িক-রাজনৈতিক রুপের অর্থাৎ কংগ্রেস ও মুসলিম লীগের চিন্তার আওতায় বাইরে নতুন ধারনার দ্বারা উদ্বুদ্ধ হলেন। ১৯২৫ সালে তারা কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিক শাখা হিসেবে কমিউনিস্ট পার্টি অব বেঙ্গল গঠন করলেন। কিন্তু এই সাংগঠনিক প্রকিয়ায় উপরোল্লিখিত কাজী নজরুল ইসলাম সহ অনেকেই ছিলেন না। কিন্তু তবুও তখনকার সময় কমিউনিস্ট আন্দোলন গঠন প্রক্রিয়ায় যারা প্রত্যক্ষ অথবা পরোক্ষ ভাবে সংশ্লিষ্ট ছিলেন অথবা অনুপ্রেরণা যুগিয়েছিলেন, তাদের নাম উল্লেখ করা হল, তাদের সামাজিক অবস্থান (শ্রেনী পরিচয়) চিহ্নিত ও বিবেচনা করার জন্য। মুজফফর এক গরীব কর্মচারীর কাছ থেকে তিন পয়সা ধার নিয়ে যাতায়াত খরচ মিটান, নজরুল রুটির দোকানে কাজ করে জীবিকা অর্জন করেন, আব্দুল হালিম প্রেসে কম্পোজিটরের কাজ করেন, রেবতি বর্মন কলকাতায় যান পত্রিকায় কাজ করার জন্য। সামসুল হুদা খিদিরপুরে ডাক শ্রমিকের কাজ করতেন। বাংলা অঞ্চলে এই পরিচয়ধারীরা সম্পত্তিবান শ্রেনীর লোক ছিলেন না। এদেরকে নিয়েই কমিউনিস্ট আন্দোলন ও সংগঠনের প্রাথমিক ভিত্তি গড়ে উঠেছিল।
কমিউনিস্ট আন্দোলন করতে গিয়ে তারা কৃষক ও শ্রমিকের স্বার্থনুগ বাংলার কৃষক ও শ্রমিক পার্টি গড়ে তোলেন। (প্রথমে লাঙ্গল ও পরে গনবাণী পত্রিকা ব্যপক প্রচারের কাজ করে। বাংলার রাজনৈতিক সাহিত্যে লাঙ্গল ও গনবাণী পত্রিকা এবং নজরুলের সাম্যবাদী ও বিদ্রোহী কবিতা ম্যাক্সিম গোর্কীর মা উপন্যাসের মতই গরিব নিপীড়িত মানুষকে উদ্দীপ্ত করে, তাদেরকে জাগানোর জন্য বিপ্লবী ভ‚মিকা পালন করে। কিন্তু তাদের প্রচেষ্টার এই ধারা খুব বেশী দূর এগোয়নি। তাদের কমিউনিস্ট আন্দোলনের সাথে যুক্ত হল জাতীয় স্বাধীনতা আন্দোলনের সশস্ত্র বিপ্লবী ধারার একটি অংশ। রবীন্দ্রনাথদের ঠাকুর পরিবারের মধ্যে থেকে সৌমেন্দ্রনাথও কমিউনিস্ট পার্টি গড়ার উদ্যোগ নেন। এই প্রচেষ্টাকে বিদ্রæপ করে রবীন্দ্রনাথ লেখেন{কৃষানের জীবনের শরীক যে জন, কর্মেও কথায় সত্য আত্মীয়তা করেছে অর্জন…….ইত্যাদি}। তিনি নকল মজদুরীকে ভাল নয় বলে নিন্দা করেছেন। যদিও ১৮৬৬-৭০ সালে কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিকের উদ্যোগী কমিটির মধ্যে সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যই ছিল শ্রমজীবি শ্রেনীর লোক, যে ধারাটা আমাদের দেশে অনুসৃত হয়নি বা দেখা দেয়নি। ১৯০৫ সালের বিপ্লবের পর লেনিনের আপ্রান চেষ্টা ছিল রাশিয়ান সোশ্যাল ডেমোক্র্যাটিক লেবার পার্টিকে এই ধারায় প্রতিস্থাপিত করা। কমিউনিস্ট পার্টি গড়ার প্রথম যুগে মুজজফরদের ধারাটা ছিল প্রধানত প্রচার ও আন্দোলনধর্মী। সংগঠন গড়ার সময় ক্রমান্বয়ে জাতীয়তাবাদী সশস্ত্র বিপ্লবী ধারার অংশ অর্থাৎ অনুশীলন ও যুগান্তর পার্টির লোকজন কমিউনিস্ট পার্টি পরিচালনা কাঠামোর মধ্যপর্যায়ের নেতৃত্বে চলে আসে। ফলে ত্রিশ দশকের প্রথম থেকে পঞ্চাশের দশকের শুরূ পর্যন্ত অনুশীলন ও যুগান্তর পার্টির সংগঠন প্রক্রিয়াই কমিউনিস্ট পার্টি গঠন পক্রিয়ায় প্রাধান্য বিস্তার করে।
এই সংগঠনের বিস্তার প্রক্রিয়ায় কমিউনিস্ট পার্টিতে চলে আসে ভ‚স্বামী শ্রেনী থেকে আগত উচ্চ একাডেমিক শিক্ষায় শিক্ষিত লোকজন। মুজফফর, আব্দুল হালিম, সামসুল হুদা, কাজী নজরুলদের উচ্চ একাডেমিক শিক্ষা ছিলনা বলে অনেকেই মনে করতেন। এ নিয়ে অনেকের মনে ক্ষোভ ছিল। যেমন সি-পি-আই এর ডক্টর নেন সেন বলেন, মুজফফরের মানসিক অনুদারতার কারনে পার্টি সংগঠনের সদস্য পদ লাভে তাকে দীর্ঘকাল অপেক্ষা করতে হয়।সরোজ মুখার্জি কলেন, ডক্টর ভ‚পেন দত্তের আড্ডাখানায় তখনকার অনুসন্ধিৎসু তরূনগন সমাজতন্ত্র সম্পর্কে জানার জন্য নিয়মিত যাওয়া আসা করতেন। মজফফর আহমদ,সরোজ মুখার্জি,রনেন সেন বা অমিতাভ চন্দ(গবেষক) কেউ বলেননি একাডেমিক শিক্ষায় যারা অনুগ্রসর সেই শ্রমিক বা শ্রিমিক নেতাদের মধ্যে থেকে কারা এগিয়ে এসেছিলেন,অথবা কারাই বা এগিয়েছিল শ্রমিকদের মধ্যে কমিউনিস্ট পার্টি গড়ে তুলতে। মানবেন্দ্রনাথ রায় প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশুনা ছাড়াই প্রভ‚ত জ্ঞানের অধিকারী ছিলেন।
তিনি আন্তর্জাতিক কমিউনিস্চ আন্দোলনের একজন নেতা হিসাবে করবীকৃতি লাভ করেন। তবু লেনিনাবাদী ধারনাকে পাশ কাটিয়ে ভারতের জনগনের মুক্তির জন্য তিনি গভীর তত্ব সমৃদ্ধ কোন কর্মসূচী হাজীর করতে ব্যর্থ হন, যেমনটা মাওসেতুং করেছিলেন চীনের জন্য। এর কারন কী?।
কারনটা নিহিত—মস্তিস্কে সঞ্চিত জ্ঞানের পরিমানের মধ্যে নয়। কারনটা নিহিত জ্ঞানটা কোন শ্রেণীর স্বার্থ পূরনে কাজে লাগানো যায় সেই সম্পর্কে পরিষ্কার ধারনার অভাবের মধ্যে। বিপ্লবী সংগঠন গড়ার পেছনে যে বিপ্লবী তত্ব দরকার, সেটা বারে বারই প্রমানিত। সামাজিক মানুষের কোন সংখ্যাগরিষ্ঠ গোষ্ঠী কোন চাহীদার তাগীদে বা তাড়নায় প্রচলিত সমাজের ভিত্তি-নিয়ম কানুনগুলো বদলে ফেলতে চায় সেটা বুঝতে পারলে বিপ্লবী তত্ব প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হয়। তাই তাত্বিক জ্ঞানের অগভীরতা ও অপ্রাচুর্য নয়, বিপ্লবী শ্রেনরি আকাংখা বুঝতে পারার অক্ষমতাই সমৃদ্ধ তত্ব হাজীর করতে বুদ্ধিজীবিদের অক্ষম করে তোলে।
ভারতের জাতীয় স্বাধীনতা দরকার, সাথে সাথে দরকার ভ‚মি সমস্যার বৈপ্লবিক সমাধান ও কৃষক শ্রেনীর মুক্তি, অর্থাৎ জাতীয় স্বাধীনতার বিপ্লব ও গনতান্ত্রিক বিপ্লব এক সাথেই সম্পন্ন করা প্রয়োজন, এই ধারনা ও উপলদ্ধির অনুপস্থিতিই তাকে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে সক্ষম করেনি। তিনি কালক্রম কমিউনিস্ট আন্দোলন থেকে সরে দাঁড়ান। বলা যায়, তিনি কমিউনিস্ট আন্দোলনের চিরাচিত ও রাশিয়ান পথ থেকে সরে দাঁড়াতে চেষ্টা করেন। কিন্তু তার উদারনৈতিক মানবতাবাদী পথ কোন আন্দোলনের সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়নি। শ্রীপট অমৃত ডাঙ্গে প্রমুখের পথ ও পারেনি। মার্কসবাদী কমিউনিস্টরা কোন কোন অঞ্চলে প্রভাব বিস্তার করলেও বিপ্লবের দিকে অগ্রসর হতে পারেনি। ভারতে তথা পশ্চিম বাংলায় একমাত্র চারু মজুমদারের শ্রেনী শতু চিহ্নিতকরনই ভারতের বিরাট অঞ্চল ব্যাপি একটা আন্দোলনের চমক সৃষ্টি করতে পেরেছিল। কিন্তু সাংগঠনিক পরিকল্পনাহীনতা এবং আন্দোলন ও সংগ্রামের পথ নির্দেশের ব্যর্থতা নকশালবাড়ীর পথকে আতুঁর ঘরেই শেষ করে দেয়।
খতিয়ে দেখা দরকার উপরে উল্লেখিত ব্যর্থতাগুলোর কারনগুলো কি কি?
কোন একজন ব্যক্তির মাধ্যমে ও নেতৃত্ব জনগনের কোন অংশের চাহীদা মাফিক আদর্শ উদ্দেশ্য ও কর্মসূচী বাস্তবায়ীত হলে এ কথা মনে করার কোন কারন নেই যে উপরোক্ত ব্যক্তি তার অলৌকিক ও অপৌরূষেয় ক্ষমতার বলে সকল মানুষের চাহীদাকে নিজের মাঝে উপলদ্ধি করতে সক্ষম হন। অলৌকিক ও অপৌরূষেয় কোন ক্ষমতা নয়, বরং লোকদের মাঝে উপরোক্ত ব্যক্তির একাত্ম হওয়াে ঘটনাই তাকে জনগণের চাহীদাকে নিজের মাঝে উপলদ্ধি করার সুযোগ এনে দেয়। এম, এন রায় সে সুযোগ নেননি। সে সুযোগ ডাঙ্গেরও হয়নি।
চারু মজুমদার গনতান্ত্রিক কেন্দ্রীকতাকে মানেননি। উদ্যোগ ও হঠকারীতার মধ্যে পার্থক্য নির্দেশ করতে তিনি ব্যর্থ হন। সুতরাং এর পরে বলা যায়, কেবলমাত্র বুদ্ধিজীবির বৃদ্ধিবৃত্তি বা জ্ঞান চর্চা নয়, শ্রমজীবি শ্রেনীর অভিজ্ঞতার অনুশীলন, পরিচর্যা ও মানসিক শ্রম চর্চাই তাদের মুক্তির সত্যিকার পথ দেখাতে পারে।
কার্ল মার্কস ও এঙ্গেলস বৈজ্ঞানিক কমিউনিজম এর তত্ব প্রতিষ্ঠা করেন। এই তত্ব প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে সমাজে বিজ্ঞান অর্থশাস্ত্র ও রাজনৈতিক বিজ্ঞান ইত্যাকার অনেক বিষয়ে তাদের পূর্বেকার সকল চিন্তা ভাবনাগুলো বিশ্লেষন করেন ও নিজেদের মতামত রাখেন। তারা, ব্যক্তির মুক্ত যে সামাজিক মুক্তির মধ্যে নিহিত একথা ব্যাখ্যা বিশ্লেষন করে দেখান।একথা বিশ্লেষন করতে গিয়ে শ্রমই যে মানব প্রজাতির উচ্চতর স্তরে উপনীত হওয়ার একমাত্র নির্ধারক উপাদান সেই কথা বলেন। এক পর্যায়ে উনবিংশ শতাব্দীতে কার্ল মার্কসদের যুগে শ্রম এর সাথে নতুন শক্তিরূপে আবিভর্‚ত পুঁজির দ্বন্দ তীব্রতর হয়। শ্রম এর ঘনিভ‚ত রূপই পুঁজি। তাই শ্রম এর এক রূপ এর সাথে আর এক রূপ এক দ্ব›দ্ব। নতুন এর সাথে পুরাতন এর দ্ব›দ্ব। শ্রমকে পুজির দাসত্ব থেকে মুক্তি দিতে হলে শ্রম এর পুঁিজতান্ত্রিক রূপক ধ্বংশ করা ছাড়া উপায় নেই। এই রূপটাকে ব্যক্তি একভাবে ধ্বংশ করতে পারেনা। তাকে ধ্বংশ করতে হলে সম্মিলিত সামাজিক শক্তির প্রয়োযজন। সামাজিক শক্তিকে সুস্থিত করতে পারে সমাজতন্ত্র। সমাজতন্ত্রকে প্রতিষ্ঠা করার জন্য শ্রমশক্তির অধিকারী শ্রমিক শ্রেনীকে উদ্যোগ নিতে হয়, মজুরী দাসত্ব থেকে তার নিজের মুক্তির জন্য, পুঁজিতন্ত্রের জোয়াল থেকে নিজেকে তথা সমাজকে, জণগনকে মুক্তি দেয়ার জন্য তাদেরকে চেষ্টা করতে হয়। ফ্রান্স এর বুর্জোয়া বিপ্লবে এবং প্যারিস অভ্যুত্থানে মার্কস ও এঙ্গেলস অংশ গ্রহণ করেছিলেন। প্যারি কম্যুন সত্তুর দিন টিকে ছিল। প্যারি কম্যুন এর বিপ্লবীদের অগ্নিঝরা আবেগ ছিল, আন্তরিকতা ছিল সর্বোচ্চ ও প্রশ্নাতীত। কিন্তু সাংগঠনিক শৃংখলা এমন ছিলনা, যাতে করে তারা প্রতিক্রিয়ার বিরুদ্ধে লড়াই করে, তাদের শক্তির পরিধি বাড়াতে পারে।
রাশিয়ার প্লেখানভ ও অন্যান্যরা শ্রম মুক্তি আন্দোলন গড়ে তোলেন। লেনিন ও তাদের সাথীরা এর সাথে যুক্ত হন। এরই প্রক্রিয়ায় তার বিপ্লবী অভ‚্যত্থান সংঘটিত করার জন্য শ্রমিক শ্রেনীর একটা সুশৃংখল রাজনৈতিক সংগঠন, দল বা পার্টি করার সিদ্ধান্ত নেন। রাশিয়ায় ভাদিমির ইলিচ উলিয়ানভ গোপনে লেনিন নাম নিয়ে শ্রমিক শ্রেনীর পার্টি হিসেবে পরিচিত সোশ্যল ডেমোক্র্যাটিক শ্রমিক পার্টির নেতৃত্বের পর্যায়ে চলে আসেন। প্রধানত পার্টির সাংযগঠনিক নীতি এবং দেশে বিদ্যমান শ্রেনী অবস্থানের ভিত্তিতে পরিকল্পিত পার্টিতে শ্রেণীশক্তি সমাবেশের প্রশ্নে মতভেদ দেখা দেয়। লেনিন, স্ট্যালিন সংখ্যাগরিষ্ঠ (বলশেভিক) হন। পার্টি সংগঠনের ব্যাপারে লেনিনের মতামত জয়ী হয়।
রুশ বিপ্লবের অভ্যুথান পর্বের অভিজ্ঞতাগুলো প্লেখানভ, লেনিন ও ষ্ট্যালিনের লেখায় বিশেষ করে লেনিনের ১৯০৩ থেকে ১৯০৫ এর ঘটনা বিশ্লেষনমূলক লেখায় পাওয়া যায়। ওখানে লেনিন গনতান্ত্রীক ও সমাজতান্ত্রীক বিপ্লবের জন্য সাচ্চা বিপ্লবীদের একটি সংগঠনে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার প্রয়োজনীয়তা; বুর্জোয়া, উদারনৈতিক বুর্জোয়া ও র‌্যাডিক্যাল বুর্জোয়াদের মধ্যে পাথর্ধক্য চিহ্নিত করার সমস্যা ও তা যাচাই করার প্রয়োজনীয়তা,বুর্জোয়াদের স্বাধীনতার পরিবেশকে ব্যবহার করার প্রয়োজনীয়তা,সমাজতান্ত্রীক গনতন্ত্র ও সাম্যবাদের ভাবাদশ প্রচারের কৌশল, সাংগঠনিক নেতৃত্বে বিপ্লবী সর্বহারা শ্রেনীর প্রাধান্য,নির্দিষ্ট দেশ বা অঞ্চলের উৎপাদন-কাঠামোর আর্থরাজনৈতিক পরিস্থিতিতে শ্রেনীশক্তির অবস্থান অনুযায়ী অভ্যুস্থারে প্রকৃতি নির্নয় ইত্যাদি নানা বিষয়ে তার মতামত রাখেন।লেনিন বিশেষ করে<এক পা আগে দুই পা পিছনে> বইতে পার্টি সংগঠন সম্পর্কে তার বক্তব্য উপস্থাপন করেন যা পৃথিবীর যে কোন অঞ্চলে অনু¯্রয়ে একটি ক্ষরধার বুদ্ধিদীপ্ত প্রস্তাব। একটি বিপ্লবী পার্টি গড়ার জন্য অবশ্যই অনুসরনযোগ্য।
৪. উপরোক্ত আলোচনার আলোকে বাংলা অঞ্চলে পার্টি প্রশ্নটি পর্যালোচনা করা যায়। বাংলা অঞ্চলের পার্টি সংগতভাবেই নিজেদেরকে কমিউনিস্ট পার্টি অব বেঙ্গল বলে ঘোষনা করেছিল। কারন তারা নিজেদেরকে সারা ভারতের পার্টির সাংগঠনিক অংশ হিসাবে বিবেচনা করে। এটাতে তাদের কোনরূপ আঞ্চলিকতার মনোভাব প্রতিফলিত হয়নি। তারা কাজ শুরু করেন শ্রমিকদের নিয়েই। কিন্তু <সোশ্যাল যেমোক্র্যাসির দুই রনকৌশল (১৯০৫)>গ্রন্থে লেনিন যেমন বলেন, < ট্রেড ইউনিয়ন,ট্রেড ইউনিয়নবাদী শ্রমিক,ট্রেড ইউনিয়নে কাজ করা বিপ্লবী সমাজ-গনতন্ত্রী সর্বহারা শ্রমিক ইত্যাদি বিষয়ের মধ্যেকার পার্থক্যটা সম্পর্কে সচেতন হয়েই একজন কমিউনিস্ট বা সোশ্যল ডেমোক্র্যাটিক শ্রমিককে কাজ করতে হবে। তেমনস কোন অভিজ্ঞতাকে মনে রেখে ্রথম দিককার যুগের কতিপয় নেতৃত্বানয়ি ব্যতিত অন্য অধিকাংশ কমিউনিস্টরা কাজ করেননি। ফলে বাংলার কলকাতা হাওড়া,ভাগীরথী তীরবর্তী ও অন্যান্য শিল্পক্ষেত্রে ও অঞ্চলে প্রকৃত(মার্কসবাদী লেনিনবাদী) রাজনৈতিক জ্ঞান সম্পন্ন শ্রমিক ক্যাডার গয়ে উঠেনি। সনাতন পন্থায় সচেতন শ্রমিক গ্রামে চাষীদের মধ্যে গিয়ে রাজনৈতিকভাবে চাষীদেরকেও সচেতন ও শিক্ষিত করে গয়ে তোলে তেমন কোন অবস্থা সৃষ্টি হয়নে। এর বিষময় প্রভাব লক্ষ্য করা বিগত পঞ্চাশ বছরের রাজনীতিতে। একদিকে তে-ভাগা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে বিস্ফোরিত গন অভ্যুস্থানকে গনতান্ত্রূক বিপ্লবে রূপান্তরিত করা যায়নি, অন্যদিকে ট্রেড ইউনিয়নবাদের উদ্ভব হয়ে সকল শিল্পকারখানাকেই গলা টিপে মেরে ফেলতেদ উদ্যত হয় ট্রেড ইউনিয়নবাদের ফ্রাংকেনস্টইন। পূর্বসূরীদের শিক্ষা অনুযায়ী কমিউনিস্ট আন্দোলনের উদ্যোক্তারা সর্বহারা শ্রমিকরেক কেবল ট্রেড ইউনিয়নবাদ নয়,মার্কসবাদ লেনিনবাদী শিক্ষায় শিক্ষিত করবে; অপরাদিকে সাধারন শ্রমিকও ট্রেড ইউনিয়ন কাজের মধ্য দিয়ে দৈনন্দিন কাজের সাথে সাথে মার্কসবাদী লেনিনবাদী শিক্ষ নিয়ে নেতৃত্বের পর্যায়ে উঠে আসবে।সর্বহারা শ্রমিক যাতে ট্রেড ইউনিয়নবাদের সুবিধাভোগীদের খপ্পরে না পড়ে তার প্রতি খেয়াল রাখা দরকার, তেমনি শ্রমিক নিজেকেই নিজে শিক্ষিত করে গড়ে তোলা প্রয়োজন। নেতৃত্বর পর্যায়ে আসা প্রয়োজন।অন্যদিকে বিদ্যমান নেতৃত্বের উচ্চতর অবস্থান থেকে শ্রমিকদের সাথে বিশেষ ব্যক্তিগত যোগাযোগের মাধ্যমে উদ্যোগ নেয়া প্রয়োজন যাতে করে তারা প্রশিক্ষিত হয় নেতৃত্বের হাল ধরতে পারে।
এটা শুধু শ্রমিকদের বেলায় নয়, চাষীদের বেলায়ও সত্য। বাংলা অঞ্চলে কমিউনিস্ট আন্দোলনের মাধ্যে সাংগঠনিক কাজে এই প্রক্রিয়ার অভাব ছিল। কমিউনিস্ট কর্মীরা রিক্রুট হতে পারিবারিক ও নিতান্তই ব্যক্তিগত বন্ধুত্বের সূত্রে সৃষ্ট সম্পর্কের পরিবেশে। ভবানী সেনগুপ্তের ভাষায়-< ১৯৩৭ এর াাগ পর্যন্ত পার্টি ছিল অল্প সংখ্যাক কমরেডের সমষ্টি ডারা পরস্পরের কমরেড আবার সঙ্গে সঙ্গে অন্তরঙ্গও বটে। তাই তখনকার পার্টি যেন এক পরিবারের লোক-পারিবারিক চিহ্ন। > এই ধারাতেই পাতিসামন্ততন্ত্রী ও পাতি-বুর্জোয়ারা কমিউনিস্ট পার্টিতে নেতৃত্বাসীন হতে সক্ষম হন। বড় জমিদার, তালুকদার,জোতদর পরিবার থেকে আগত ব্যক্তিরা কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য হন। (পুরাতন সম্পর্ক অটুট রেখেই,আবার বলি সম্পত্তি নয়,পুরাতন সম্পত্তি সম্পর্ক আটুট রাখেই। সম্পত্তিবানদের মধ্যে কমিউনিস্টের সংখ্যা ছিল অল্পই,কিন্তু যারাই পুর্ব বাংলাছেড়ে পশ্চিম বাংলা গিয়েছে, তাদেরই জমি হাতছাড়া হয়েছে। অথচ এর পূর্বে তে-ভাগা আন্দোলনের সম তারা গনতান্ত্রীক বিপ্লবের রনকৌশল হিসাবে জমি জাতীয়করনের দাবী তুলতে পারেনি। মার্কসবাদ লেনিনবাদ এর জ্ঞান এর আলোকে তখনকার পরিস্থিতিতে উৎপাদন সম্পর্ক ও সম্পত্তি মালীকানার অতিত,বর্তমন ও ভবিষ্যৎ সম্পর্কে সুস্পস্ট থারনার অভাব,সর্বোপরি শ্রেণী সম্পুক্ত কমিউনিস্টদের অবচেতন মনে মালীকানা হারানোর ভয় ও মালকিানার প্রতি মোহ তাদেরকে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে সাহসী করেনি।পশ্চিম বাংলায় গিয়ে যে সকল কমরেড উদ্বান্ত হন তারা জমির ব্যাপারে কিছুটা মোহমুক্ত ছিলেন বলে তারা কিছুটা গনতান্ত্রীক সংস্কার করতে সাহসী হন।)
পাতি-সামন্ততন্ত্রীক, পাতি ধনিকদের পারিবারিক পরিচয়ের সূত্রেই যেমন পূর্বতন সংগঠন গড়ে উঠেছিল, সে ধারাতেই পরকর্তী কমিউনিস্ট পার্টিগুলো গড়ে উঠে। গোপনীয় অবস্থায় গড়ে উঠার কারনে পার্টির ভেতরে ক্ষয়িষœু পাতিসামন্ততান্ত্রীকতার প্রভাব কমিউনিস্ট তথা শ্রমক কৃষক আন্দোলনে পরিলক্ষিত হয়। পূর্ব বাংলায় পাকিস্তানি অমলে সাম্প্রদায়িক নিপীড়নের পরিস্থিতিতে পার্টি সংগঠন দাঁড় করাতে গিয়ে গনসংগঠনের নেতৃপদে মুনলিম কমরেডকে মনোনয়ন,পরবর্তীতে সভাপতি ও সাধারন সম্পাদক পদের যে কোন একটিতে হিন্দু অপরটিতে মুসলমান এইভাবে মনোনয়ন দেয়ার রীতি চালু করা হয়। এইভাবে চলতে গিয়ে কেন্দ্রীয় নেতৃস্থানীয় অনেক ব্যক্তি নিজেদের ব্যক্তিস্বার্থ হাসিলের অনেক সুযোগ নেয়। পার্টির শক্তি কমে যায়।পঞ্চাশের দশকের শুরু থেকে ধনী কৃষক ও জোতদার পরিবার থেকে আগত উচ্চ শিক্ষিত চাকুরীজীবি, অধ্যাপক, ডাক্তার ইত্যাদি পেশাজীবি মুসলিম ব্যক্তিরা কমিউনিস্ট পার্টিতে ব্যাপক হারে আসে। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর আবার ব্যাপক হারে কমিউনিস্ট পার্টি ছেড়ে চলে যায়। চল্লিশের দশক শেষ হওয়ার অর্থাৎ পাকিস্তান সৃষ্টির পূর্বে হিন্দু র্ধমালম্বী মধ্যবিত্ত শ্রেণীর ব্যক্তিরা যে হারে কমিউনিস্ট পার্টিতে ভীড় করে, তার চেয়ে দ্রæত হারে পশ্চিম বাংলায়য চলে যায় অথবা চলে যেতে বাধ্য হয়। বাহাত্তুর এর পরে হিন্দু মধ্যবিত্ত, নি¤œমধ্যবিত্ত শ্রেনী থেকে আগত ব্যক্তিরা কমিউনিস্ট পার্টিকে আশ্রয়ের একটি স্থান হিসেবে বিবেচনা করতে শুরু করে। একসময় একটি কমিউনিস্ট নামধারী সংগঠন (সি পি বি) এর ক্রেন্দ্রীয় কমিটির চার পঞ্চমাংশ সদস্যদের নিয়ে এরা বের হয়ে যায়। (অজয় রায়, শেখর দত্ত, নুরুল ইসলাম নাহিদ, সাইফুদ্দিন, সামশুদোহা)। ওয়ার্কস পার্টির নেতা রাশেদ খান মেনন এর বিরুদ্ধে সাবেক রাষ্ট্রপতি সৈরাচ্ছার এরশাদ কর্তৃক প্রদত্ত টাকা গ্রহণের অভিযোগে কমিউনিস্ট নামধারীদের ইমেজে কলংক লেপন করে। এতদঅঞ্চলে কমিউনিস্ট নামধারী সংগঠনের অস্তিত্ব বীলিন হওয়ায় উপক্রম হয়। সর্বহারা শ্রমজীবি শ্রেনী মধ্যে কমিউনিস্ট পার্টি গড়ে না তোলার কারনে পার্টি গঠন প্রচেষ্টা উপরোক্ত পরিনতিতে পৌছে।
৫।
কমিউনিস্ট পার্টি গড়ার প্রথম যুগে অর্থাৎ বীজ বপনের যুগে উপযুক্ত মাঠে বীজ বপন করা হয়নি। ( এম এন রায়, ভূপেন দত্তদের প্রচেষ্টা ফলবতী হয়। মজুর ও চাষীদের মধ্যে সংখ্যাগরিষ্ঠ ছিল মুসলমান; তাদের মধ্যে মুজফফর হেমন্ত সরকারদের প্রচেষ্টা তাৎক্ষনিকভাবে সফল হয়নি; ওয়ার্কস ও পিজ্যান্টস পার্টির বৈশিষ্ট হারিয়ে যায়; কিছু লোক চলে যায় সোস্যালিস্ট ও কমিউনিস্ট পার্টিতে; কিছু লোক যায় ফজলুল হকের নেতৃত্ত¡াধীন কৃষক শ্রমিক পার্টিতে; পূর্ব বাংলার যার সর্বশেষ পরিণতি পাকিস্তানের সাথে পূর্ব বাংলার জণগনের সংঘাতে পাকিস্তান আর্মীর নিকট কৃষকশ্রমিক পার্টির নাম নিয়ে এস এম সোলায়মানের আত্মসমর্পন। (প্রসংগত উল্লেখ করা আবশ্যক এটা < ওয়ার্কার্স এ্যান্ড পিজ্যান্টস পার্টি > ফ্রন্ট লাইনের ব্যর্থতা নয়, এটা কমিউনিস্ট সংগঠন-প্রচষ্টার তথাকথিত শিক্ষিত( প্রকৃত পক্ষে মধ্যবিত্ত) নেতৃত্ব লাইনের পরিনতি ও ব্যর্থতা)। অন্য অংশগুলোর মধ্যে পশ্চিম বাংলায় বিপ্লবী সমাজতান্ত্রীক দল, সমাজবাদী ঐক্যকেন্দ্র ও পূর্ববাংলার শ্রমিক কৃষক সমাজবাদী দল বামপন্থী হিসাবে পরিচয় দিয়ে থাকে। মুসলমান জমিদার, জোতদার ও ধনী কৃষকদের দ্বারা প্ররোচীত হয়ে হিন্দু জমিদার, জোতদার দের কে তাড়ানোর জন্য মুসলমান লীগকে ভোট দেয়।) অর্থাৎ উপযুক্ত সামাজিক গোষ্ঠী বা শ্রেনীতে বীজ বপন করা হয়নি। এবং অন্যদিকে সেই সামাজিক গোষ্ঠীতে উপযুক্ত বীজও বপন করা হয়নি। গনতান্ত্রীক সংস্কার ও ভৌগলিক-রাজনৈতিক স্বাধীনতা আন্দোলনের জন্য পাতি-সামন্ততান্ত্রিক ও পাতি-বুর্জোয়া সামাজিক গোষ্ঠীর মধ্যে পার্টির আদর্শ ও সাংগঠনিক ধারনার প্রচার সঠিক হতে পারে, গনতান্ত্রিক বিপ্লবের জন্য এই সামাজিক গোষ্ঠী দুটিকে নিউট্রালাইজ করা যেতে পারে। কিন্তু তাদেরকে ব্যাটক হারে পার্টিতে নিয়ে আসা, এমনকি পার্টি নেতৃত্ব নিয়ে আসা কতটুকু সঠিক হয়েছে, তা আজ প্রশ্ন সাপেক্ষ ও বির্তকের বিষয়।
৬.
যেখানে বিপ্লবী সর্বহারা শ্রমিক শ্রেনীর পার্টি কমিউনিস্ট পার্টিতেই ঢালাওভাবে ধর্মঘাট/আন্দোলনকারী/বিক্ষোভকারী শ্রমিকেেক নিয়ে আসার ব্যাপারে কমরেড মার্তভ এর প্রস্তাব কি ভাবে লেনিন নাকচ করে দিয়েছিলেন তার একটা নমুনা আমরা বিবেচনা করে দেখতে পারি। লেনিন বলেন, < যে কোন বিক্ষোভরত অথবা আন্দোলনরত শ্রমিক নিজেকে ( সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক পার্টির) পার্টি সদস্য বলে ঘোষনা করলে পার্টি সদস্য হওয়া যায় না। তাকে একটা সুনির্দিষ্ট শৃঙ্খলার মধ্যে দিয়ে কাজ করতে হয়, পার্টি কর্মসূচী মানতে হয়। পার্টিকে কোন না কোন উপায়ে বস্তগত সাহায্য করতে হয়। >
সে ক্ষেত্রে, লেনিন, পার্টি সদস্য হওয়া নিয়ে, একজন সচেতন, রাজনৈতিক ক্রিয়ালাপে সক্রিয় ও সংঘঠিত শ্রমিকের সাথে শুধু ট্রেড ইউনিয়ন কার্যকলাপে নিরত একজন শ্রমিকের পার্থক্য করার কারন সমূহ ব্যাখ্যা বিশ্লেষেন করেন। তিনি অভিমত ব্যক্ত করেন যে, ট্রেড ইউনিয়ন কাজে সম্পৃক্ত সকল সংখ্যাগরিষ্ঠ শ্রমিককে সাধারনভঅবে সোশ্যাল ডেমোক্র্যটিক পার্টির সদস্য পর্যায়ে নিয়ে আসা নৈরাজ্যবাদী চিন্তাধারা। একমাত্র সুশৃংখলার নিায়মাধীন সংগঠিত শ্রমিকই পার্টি সদস্য হতে পারে। সাথে সাথে এটাও ধরে নেয়া যায় যে অসংখ্য শ্রমিক, অসংখ্য শ্রমজীবি মানুষ নানা আধারে নানা ফরমে, নানা সংগঠনে সংগঠিত হয়ে, ব্যক্তি হিসাবে, ক্ষুদ্র অথবা বৃহৎ সংগঠনের নিয়ম ও শৃংখলার নিয়ন্ত্রনাধীন হয়ে পার্টি সদস্য হতে পারে। শ্রমিক অথবা বুদ্ধিজীবিরা কমিউনিস্ট আন্দোলনে সম্পৃক্ত হতে গিয়ে সংগঠন গড়ার স্বাভাবিক নিয়মগুলো অনুসরন করবে।
(কিন্তু ক্ষুদ্র অথবা বৃহৎ সকল সংগঠনকেই একটি মহৎ বৃহত্তর লক্ষ্যে অগ্রসর করানোর জন্য একটি অন্তর্লীন নেটওয়ার্ক এর অস্তিত্ব থাকা প্রয়োজন বলে অনেকে মনে করেন। এই অন্তর্লীন নেটওয়ার্ক সমম্বয়কের বা নিয়ন্ত্রকের ভ‚মিকা পালন করবে। আবার অনেকে এই সমন্বয়কের ভ‚মিকাকেও অস্বীকার করেন। তারা সম্মিলিত মানুষের অভিপ্রায়টাকেই গুরুত্ব দেন বেশী। যদিও নিয়ন্ত্রন বা সমন্বয় না থাকলে বিভিন্ন গোষ্ঠীর অভিপ্রায় ও তার সংঘাত অনেক সময়ই সংঘাতময় বিশৃংখলায় পরিনত হতে পারে।)
বুদ্ধিজীবিরা সংখ্যায় কম, কিন্তু শ্রমিকরা সংখ্যায় বেশী। পিঁপড়ার সাথে হাতির তুলনা আর কি। দুই সংখ্যাকে তুলনা করলে গুনগতভাবে এরকমই অনুমান দাঁড়ায়। প্যারি কমিউনের অভিজ্ঞতায় পরিশীলিত হয়ে কার্ল মার্কস সিদ্ধান্তে আসেন যে শ্রমিক শ্রেনীই সংগঠিত হয়ে তাদের মজুরী দাসত্বের অবসান ঘটাবে সাথে সাথে অন্যান্য শ্রমজীবি মানুষের কাঁধের উপর খেকে সামঞ্জস্যহীন উৎপাদন সর্ম্পকের জোয়াাল অপসারিত করবে। উৎপাদক শ্রেনীর পার্টি গড়ে তোলার মূল মর্মবাণী অনুসারে শ্রমজীবি শ্রেণীর অগ্রগামীদের নিরন্তর কর্তব্য হল—- ক্রমান্বয়ে বৃহৎ থেকে বৃহত্তর অংশকে তাদের (অগ্রগামীদের) পর্যায়ে উন্নতী করা। পার্টির সদস্যভুক্তির পর্যায়ে নিয়ে আসা।
এ কাজটিই হয়নি। শ্রমিক এবং শ্রমজীবি শ্রেনী সক সময়ই থেকে গেছে আড়ালে। তাদেরকে এমনভাবে শিক্ষিত করে তোলা হয়নি যাতে করে তারা পার্টির নেতৃত্বর পর্যায়ে আসতে পারে। এখানে মুজফফরদের ওয়ার্কার্স এ্যান্ড পিজ্যান্টস পার্টি ফ্রন্ট লাইনের সাথে মানবেন্দ্র নাথ রায়দের মানবতাবাদী ও জাতীয়তাবাদী লাইনের পার্থক্য। ওয়ার্কার্স এ্যান্ড পিজ্যান্টস পার্টিকে ফ্রন্ট হিসাবে তৈরী ও ব্যবহার করার নীতি কমিউনিস্ট পার্টির ভেতর খুব বেশী দূর অগ্রসর হয়নি। পার্টিতে ভ‚স্বামী তথা সম্পত্তিবান শ্রেনী থেকে আগত উচ্চ শিক্ষিত বুদ্ধিজীবিরা নেতৃত্বাসীন হয়। ডঃ ভ‚পেন্দ্রনাথ দত্ত, ড:রনেন সেন, শ্রী ভবানী সেন গুপ্ত প্রভৃতি বুদ্ধিজীবিদের বিভিন্ন পরিমন্ডল গড়ে উঠে। পরবর্তীতে পার্টির কেন্দ্রীয়, প্রাদেশিক ও জেলা কমিটির নেতৃত্বে গনসংগঠনের সাথে ক্ষীনপ্রভাবযুক্ত রাজনীতি-প্রধান আধা বুদ্ধিজীবি প্রকৃতির লোকজন চলে আসেন। তাদের মধ্যে আবেগময় জাতীয়তাবাদী গনতান্ত্রীক প্রবনতা ছিল সুপ্ত। ফলে শ্রেনীসংঘাদের সংকটময় মুহুর্তে (১৯৪১,১৯৪৭,ও ১৯৭১) তাদের ভ‚মিকা ছিল দ্বিধাগ্রস্ত। পরিণতিতে শ্রমিক ও কৃষক সংগঠনে প্রশিক্ষিত পার্টি সদস্য তৈরীর মনোবৃত্তি ও প্রচেষ্টা কমে যায়।
সম্পত্তিবান শ্রেনী থেকে আগত উচ্চ একাডেমিক শিক্ষায় শিক্ষিত লোকজন বুদ্ধিবৃত্তি চর্চার সাহায্যে কমিউনিস্ট আন্দোলনে অংশগ্রহনের জন্য ক্রমান্বয়ে একটি ঝুকিঁবিহীন জীবনযাপনের সুযোগ নেন। কারন ইতোমধ্যে ওয়ার্কাস এ্যান্ড পিজ্যান্টস পার্টির ভূমিকা ক্ষীয়মান। অনুশীলন ও যুগান্তর দলের যে কমরেডরা কমিউনিস্ট পার্টিতে যাগ দিয়েছিলেন, তারা অপরিমীম দু:খকষ্ট ও নির্য়াতদন সয়ে গেলেও,কৃসকদের মাঝে গড়ে তেদালা তাদের আন্দোলনকে ধরে রাখতে পারেনি বুদ্ধিজীবি কমিউনিস্ট নেতৃত্ব। বলা যায় ষাট এর দশকের তথাকথিত আদর্শগত দ্বন্দের উৎস/ভিত হিসাবে কাজ করে এই বদ্ধিজীবি নেতৃত্ত। উদাহরন স্বরূপ, তেভাগ অন্দোলনের কৃষক অভ্যুন্থানকে ভ‚মির জাতীয়করনের মত কর্মসূচীর দিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার মত মন-মানসীকতা তাদের ছিলনা। ফলে ভ‚মি সমস্যা সমাধানের জন্য আন্দোলন প্রচেষ্টা ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয় এবং তার পরবর্তী পঞ্চাশ বছরেও আর মাথা তুলে দাঁড়াতে পারেনি।যার প্রেক্ষিতে দুই হাজার সালের শেষ মাসে ধনিক শ্রেণীর দল কংগ্রেসের নেতা প্রিয় রঞ্জন দাস মুন্সী বলতে সাহস পান যে সিপিআই এ খুব উপযুক্ত উচচ শিক্ষিত ভালণ নেতা রয়ে গেল,সি-পি-আই (এম) এ না থাকার কারনে জ্যোতিদ বসুর অপ্রতিদ্বন্দী হয়ে উঠার সুযোগ সৃষ্টি হয়।
উল্লেখ্য, কমিউনিস্টদের একটি অংশ ধনিক শ্রেনীর দল কংগ্রেসের তোসন নীতি ছেড়ে সি পি আই দল গঠন করে। মুলত: কৃষকদের জন্য তে-ভাগা ব্যবস্থা প্রবত্যনের কারনে গ্রামাঞ্চলেণ সি পি আই (এম) এর প্রভাব চব্বিশ বছর অটুট থাকে। সি পি আই(এম) থেকে সিপিআই (এমএল) এর অভির্বাব ঘটে এবং এক সময় পশ্চিম বাংলায় জঙ্গি কৃষক আন্দোলনের উদ্ভব হয়। পশ্চিম বাংলায় সি পি (এম) এর ভ‚ল নীতির কারনে এবং জমিতে বর্গাস্বত্ব কায়েমের পর বেপ্লবিক সংস্করের দিকে আর অগ্রসর না হওয়ার কারনে পশ্চিম বাংলায় ভারতীয় একচেটিয়া পুঁজির সমর্থক,অবশিষ্ট ভুস্বামী-স্বার্থের সমর্থক,পেটি বুর্জোয়াদের বৃহদাংশ মার্কেন সা¤্রাজ্যবাদের সাথেধ মিলে পশ্চিম বংলঅয় বম ধারাকে ধ্বংশ করার জন্য বন্ধ পরিকর। পূর্ব বাংলায় এর প্রভাব সুদুর প্রসারী।
বর্তমান সময় পর্যন্ত পশ্চিম বাংলায় কউিনিস্ট আন্দোলনের ইতিহাস বর্ননা করার কারন হল কমিউনিস্ট আন্দোলনে শ্রমিক কৃষকের স্বার্থ সম্পর্কিত ঝোঁক এর গতিধারা বিশ্লেষন করা।
পূর্ব বাংলায় সামান্য কিছু ব্যতিক্রম সত্বেও প্রায় একই ধরনের ঝোঁক পরিলক্ষিত হয়। মানবেন্দ্রনাথ রায় এর সর্বশেষ প্রত্যক্ষ অনুসারী আব্দুল মালেক এর মৃত্যুর সাথে সাথে ঐ ধারার অবসান ঘটে। কমিউনিস্ট ও ওয়ার্কার্স পার্টিও মুলত: সম্পত্তিবান শ্রেণী থেকে আগত বুদ্ধিজীবিদের দ্বারা পরিচালিত এবং শ্রমিক কৃষকদের মধ্যে স্বার্থ সংশ্লিষ্ট কোন গনভিত্তি এদেরও নিই। চাষী ও মজুম তার স্বার্থ আদায় করার জন্য কোন রাজনৈতিক দলকেই তার নিজের বলে ভাবতে পারেনি। সে সুযোগও পায়নি। এখানে লেনিন এর একটি অভিমত স্মরনেযোগ্য। তিনি তার এক পা আগে দুই পা পিছনে বাইতেদ বলেন, < (শ্রমিক শ্রেণীর) অগ্রগামী এবং সমগ্য অংশ, যা নাকি পূর্বেক্তের দিকেই আকৃষ্ট হয়, এর দুই এর মধ্যে পার্থক্য ভ‚লে যাওয়া: শ্রমিক শ্রেণীর বৃহত্তর অংশকে অগ্রগামীদের নিজেদের পর্যায়ে উন্নীত করার জন্য অগ্রগামীদের সার্বক্ষনিক কর্তব্য কে ভ‚লে যাওয়া; অর্থ হল আমদের কর্মকানেডর বিশালতার দিকে চোখ বন্ধ করে থাবা এবং কর্মকান্ড গুলোকে খুব সংকীর্ন/ছোট করে দেখা।>
শ্রমিক শ্রেণীর বৃহত্তর অংশকে উন্নীত করার জন্য অগ্রগামীদের সার্বক্ষনিক কর্তব্যের কাজটি হয়নি। মোজাফফরদের পাটি গড়ার প্রথম যুগে তো প্রশ্নই উঠেনা, দ্বিতীয় যুগে যকন বুদ্ধিজীবিদের মধ্যে কতিউনিস্ট চিন্তাধারার ঢেউ এসে লাগে তখনো এ ধরনের চিন্তাথারা তাদেরকে আলোড়িত করেনি।
পর্ব বাংলায় বিপ্লবী শ্রমিক শ্রেণীর পার্টি গড়ার অবস্থা আরও দুর্বল। রেল শ্রমিকদের মধ্যে কাজ,চট্রগ্রাম, নারায়নগঞ্জ ও পাবনায় অল্প সংখ্যক কারখানার শ্রমিকদের মধ্যে কাজ ছাড়া বিশাল চাষী শ্রেণীর মধ্যে ব্যাপক কোন কাজ হয়নি। তাদেরকে রাজনৈতিকভাবে শিক্ষিত করে কতোলার জন্য কোন কাজ হয়নি। অবশ্য একবারে যে কোন কাজ হয়নি তা নয়। কোন কোন অঞ্চলে তেভাগা আন্দোলনের সময় কৃষকদেরকে রাজনীতি সচেতন করে তোলার একটা প্রচেষ্টা নেয়া হয়েছিল, ফলে ঐ সকল অঞ্চলে কৃষকদর মধ্যে কিছু কিছু পার্টি সংগঠন দানা বাঁধতে শুরু করে(পাবনা,খুলনা,ঢাকা)।কিন্তু সবগুলো সংগঠনেরই নেতৃত্ব সম্পাত্তবান মালিক শ্রেনীর ব্যক্তিদের দ্বারা কুক্ষিগত হয়। জমির মালিকানা হারাবার ভয়ে তারা সামনের দিকে অগ্রসর হতে ভয় পায়।কৃষক আন্দোলন দানা বাঁধানোর প্রচেষ্টা ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়।
৭.ব্যাপক জনগণকে পার্টির কর্মসূচীর সাথ সম্পৃক্ত ও সমবেত করার জন্য কমিউনিস্ট আন্দোলন গড়ার প্রথম যুগ থেকেই বিভিন্ন কৌশল অবরম্বন করা হয়। শ্রমজীবি শ্রেণীর দল হিসাবে পরিচয় দানকারী ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি ভারতীয় সমান্ত ও ধনিক শ্রেণির দল ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল কংগ্রেসের ভেতরে থেকেই কাজ শুরু করে। দুনিয়ার কমিউনিস্ট আন্দোলনের ইতিহাসে যা ছিল অভিনব। বাঘে ও ভেড়ায় এক ঘাটে পানি খাওয়ার কথ বললেও এ সখ্যতা বেশী দিন টেকেনি। বিদেশী বুর্জোয়া তথা সা¤্রাজ্যবাদীদের সাথে দেশী বুর্জোয়াদের স্বার্থ সংঘাত তিক্ততম ও তীব্রতম বলে ধারনা ও কল্পনা করা হলেও ধনিক শ্রেণীর দল কংগ্রেস ভারতের স্বাধীনতার দাবী ঘোষনা করতে যখন সাহস পাচিছলনা,তখন কমিউনিস্টরা পূর্ন স্বাধীনতার দাবী ঘোষনা করে। কমিউনিস্ট সংগঠনের পৃথক অস্তিত্ব অবশ্যম্ভাবী হয়ে দাঁড়ালেও তখনো কমরেড শ্রীপাট ডাংগে সহ কিচু লোক কংগ্রেসের ঘোষীত রাজনৈতিক নীতিমালা ধর্মনিরপেক্ষ এই অজুহাতে এর সাতে সখ্যতা বজায় রাখা ও চালিয়ে যাওয়ার পক্ষে অভিমহত ব্যক্ত করেন।কমিউনিস্টরা কংগ্রেসী সখ্যতার বাঁধন থেকে বেরিয়ে আসতে বাধ্য হলেও পরবর্তীতে সা¤্রাজ্যবাদের বিরূদ্ধে বৃহত্তর ফ্রন্ট গঠনের যে তত্ব কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিক সংগঠন থেকে হাজীর করা হয়েছিল, সেই তত্বানুসারে কাজ করার তাগিদে কংগ্রেসের সাথে (অধীনতমূলক?) মিত্রতার নীতি পুনরায় চালু করা হয় যা পঞ্চাশের দশক অবধি চলে। বাংলাদেরশ পাতি সামন্তবাদী পাতি ধনিক লুটেরা বুর্জোয়াদের সর্বশেষ পর্যন্ত টিকে থাকা মিত্র সি টি বি দুই হাজার সালের প্রারম্ভে উপরোক্ত শ্রেনীগুলোর সাথে মিত্রতার নীতি প্রকাশ্যে ত্যাগ করে। কমিউনিস্ট আন্দোলন করতে গিয়ে দেশীয় শোষক গোষ্ঠীর সাথে মিত্রতার এই আতœঘাতী নীতি পরিনাতে কমিউনিস্ট আন্দোলনকেও শক্তিশালী করতে পারে নাই, জাতীয় সামন্তবাদী ও পতি-বুর্জোয়া নেতৃত্বের ব্যর্থতা কমিউনিস্ট আন্দোলনকেও শক্তিশালী করতে পারে নাই, জাতীয় গনতান্ত্রকি বিপ্লবকেও এগিয়ে নিতে পারে নাই। (অধিকতর শক্তিশালীদের প্রতি ভয়,সমীহ ও আনুগত সব সময় এদেরকে সংকুচিত করে রাখে)।
কমিউনিস্ট আন্দোলনের দুর্বলতার এই সমস্যা কেবলমাত্র ফ্রন্ট গড়ে তোলে একসাথে কাজ করার নীতির মধ্যেই নয় দৈনন্দিন কাজ বাস্তবায়নের মধ্যেও তা নিহিত। সমস্যাটা দেখা দেয় একক দল ও জোট এই দুটি সংগঠনের কাজ একসাথে করতে গিয়ে। হয় জোর পড়ে একক সংগঠনের উপরে বেশীনা হয় জোর পড়ে জোট সংগঠনের উপরে। যার ফলে কোন কর্মসূচিই পূর্নাংগ রূপে বাস্তাবায়িত হয়না। আর ক্ষতি যেটা হয় সেটা হলো কমিুনিস্ট আন্দোলনে আগত দোদুল্যমান ক্ষুদেবুর্জোরারা আপাত:অদৃশ্য চোরা গর্তে হারিয়ে যায়। সর্বহারা শ্রতিকদের সে সুযোগ নেই,শৃংখলা ছাড়া তাদের হারাবার আর কিছুই নেই। মজুরি দাসত্বের বিরূদ্ধে সংগ্রামে তারা নিজেরা কখনো হারিয়ে যায় না। কমপক্ষে তাদের ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলনে লেগে থাকতে হয়। একশ বছরের সাল-তামামীর হিসাবে দেথাযায়,পেটি ফিউডাল,পেটি বর্জোয়ারা নেতৃত্বাধীন কমিউনিস্ট আন্দোলন সর্বহারা শ্রমজীবি মানুষকে তাঁর দাঁড়াবার সর্বশেষ অর্থাৎ প্রন্তিক স্থানে এনে দাঁড় করিয়েছে। ডাংগার বাঘ শ্রমজীবি মানুষকে তাড়িয়েছে,কিন্তু জলের কুমীরের হাত থেকেও পরিত্রান নেই। এখানে ট্রেড ইউনিয়ন নেতারূপী ফ্রাংকেনষ্টাইন শ্রম অথবা রক্ত শোষন করার জন্য দাঁত ও নখ মেলে বসে আছে।শোষক বুর্জোয়া শ্রেণী এটাই চাইছিল।পশ্চিম বাংলার বুদ্ধদের ভট্রাচার্য যতই কর্মসংস্কৃতির কথা বলুন না কেন, কর্মচারী সংগঠনের এতোদিন কার লালিত ভূত তাদেরকে গিলে খায়। পূর্ব বাংলায় ট্রেড ইউনিয়ন নেতারা অনেকেই কোটি কোটি টাকার মালিক। মালিক ও শ্রমিক নেতারা এক টেবিলে বসে মদ্যপান করেন।শ্রমিক নেতা পাজেরো অটো মোবাইল চড়ে যখন মালিকের সাথে পুঁজি ও শিল্প সমস্যার সমাধান করতে যান,তখন সাভারের কারখানা শ্রমিক কর্মস্থলে যেতে গিয়ে ভাসের একটাকা ভাড়া নিয়ে বাসের কন্ডাক্টারের সাথে ঝসড়া করে। এক শ্রমিক আর কিছু ুশ্রমিক দ্বারা দলিত,পিষ্ট ও নিহত হয়। এক শ্রমিকের জানের দাম পঞ্চাশ হাজার থেকে এক লাখ টাকা। সুতরাং আগুন লেগে যদি একশ শ্রমিক মরেও যায় তখন কোটি কোটি টাকা মুনাফা লুট কারীর দুয়েক কোটি টাকা ক্ষতি পূরন হিসাবে হাত থেকে বেরিয়ে গেলে ও তাদের গয়ে আঁচরটি লাগেনা। গনতান্ত্রীক শ্রম আইন প্রবর্তন তো দূরের কথা, একশ বছর আগের প্রবর্তিত কারখানা আইনই এখানে প্রযোগ হয়না, মানাহয়না। কোন কমিউস্টি আন্দোলন, কোন শ্রমিক আন্দোলনই শ্রমজীবিদের এ অধিকার নিশ্চিত করতে পারেনি। সুতরাং তা এ সত্যাকেই আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় যে সর্বহারা শ্রমজীবি শ্রেণীর ভেতর থেকে গড়ে তোলা একটি শক্তিশালী কমিউনিস্ট পাটিই জনগণকে পুঁজিবাদী শোষণ ও দাসত্ব থেকে সত্যিকার অর্থেই মুক্তি দিতে পারে।

সাইফ শোভন, চিফ রিপোর্টার,ঢাকা নিউজ২৪.কম