বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতা আর সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান

রা’আদ রহমান:    “…এই দেশে ৯০% মুসলমান রয়েছে, এই দেশে ইসলামের বিধান চলবে। কোন ইহুদী-খ্রিস্টানের বিধান চলবে না। যে ব্যক্তি চলার চেষ্টা করবে, তাকে হত্যা করে ফেলা হবে। আপনাদের প্রতিষ্ঠানে যে গান বাজনা করেন, তা ইসলামের দৃষ্টিতে সঠিক নয়। গান-বাজনা একটি মন্দ কাজ…।”
“…আমরা আল্লাহর পথে জীবন দিতে রাজি। আর আমরা কোনো মুশরিকদের ভয় পাই না। সময় আছে আপনার, সাবধান হয়ে যান। এইসব গান বাজনা বন্ধ করেন…।”
বিনীত নিবেদক
[ বাংলাদেশ ইসলামী সচেতন দল ]

আচ্ছা, শৈশব-কৈশোরে স্কুলের বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতা আর সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের স্মৃতি মনে পড়লে নস্টালজিক হয়ে যাই না আমরা? সে সময়কার আনন্দময় সব অভিজ্ঞতাগুলো কী নির্মল সুন্দর এক স্মৃতি হয়ে সারাজীবন আমাদের সঙ্গী হয়ে রয়েছে। অথচ এই বাংলাদেশে আজ স্কুলের বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতা আর সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মত নির্মল ও স্বাভাবিক-সাধারণ ঘটনাকেও রীতিমত হারাম ও অপরাধ হিসেবে প্রচার করে সেটা বন্ধ করার জন্য স্কুলের প্রধান শিক্ষককে হত্যার হুমকি দেওয়া হচ্ছে। কী, কল্পনা করতেই কেমন বিবমিষা লাগছে, তাই না?

কিন্তু আসলেই এই ঘটনা ঘটেছে। স্কুলের বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতা আর সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান “ইহুদী-নাসারার বিধান” ও গান-বাজনা ইসলামের দৃষ্টিতে হারাম” মর্মে সিদ্ধান্ত জানিয়ে তা বন্ধের নির্দেশ দিয়ে একটি চিঠি পাঠানো হয়েছিল এক স্কুলের প্রধান শিক্ষকের কাছে। ব্যাপারটা হজম হবার আগেই আরও জানিয়ে রাখি, ৪ তারিখে স্রেফ চিঠি পাঠিয়েই ক্ষান্ত হয়নি এই ইসলাম সচেতন ধর্মপ্রাণেরা, নভেম্বরের ৬ তারিখ দিনাজপুরের ঘোড়াঘাটে জয়রামপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শফিকুল ইসলামের কার্যালয়ে ঢুকে তাকে মারধোর ও গুলি করে হত্যার হুমকি দিয়েছে এরা। প্রধান শিক্ষকের চিৎকার শুনে আশপাশ থেকে লোকজন ছুটে না এলে সম্ভবত আরও খারাপ কিছু ঘটতে পারতো। প্রধান শিক্ষকের অপরাধ ছিল— কেন তিনি ৪ তারিখে পত্র পাবার পরেও স্কুলের সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড বন্ধে উদ্যোগ গ্রহণ করেননি।

সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন সূত্রে জানা গেছে— প্রতিবছরের মতো এবারও জয়রামপুর উচ্চ বিদ্যালয়ে বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের প্রস্তুতি চলছিল। এরমধ্যে গত ৪ নভেম্বর সকালে প্রধান শিক্ষক শফিকুল ইসলাম সকালে তার অফিসকক্ষের মেঝেতে “প্রিয় জয়রামপুর উচ্চ বিদ্যালয়, একটি শুভ বার্তা” লেখা চিঠি পান। খাম খুলে ভেতরে বাংলা, আরবি ও ইংরেজি মিশ্রিত লেখা একটি চিঠি পান। চিঠিতে বলা হয়, গান বাজনা করা যাবে না, ইসলামে ইহা নিষিদ্ধ। যদি কেউ এ চিঠি অমান্য করে তাকে হত্যাসহ বিদ্যালয় উড়িয়ে দেওয়া হবে।

এরপর ৬ তারিখ প্রধান শিক্ষক তার রুমে বসে কাজ করার সময় জয়রামপুরের দুইটি কওমি মাদ্রাসার পরিচালক আব্দুর রাজ্জাক, কৃষ্ণরামপুরের কৃষক আব্দুল ওয়াদুদ এবং অটোরিকশাচালক রুহুল আমিন নামে তিন ব্যক্তি স্কুল অফিসে ঢুকে শফিকুল ইসলামকে অকথ্য ভাষায় গালাগাল, চড়-থাপ্পড়, কিল ঘুষি মারতে শুরু করে। তারা তখন বলছিল, তোকে চিঠি দিয়ে নিষেধ করার পরেও কেন এইসব কার্যক্রম (সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের প্রস্তুতি) চলছে? এরপর অবিলম্বে এই প্রস্তুতি বন্ধ না করলে তাকে গুলি কওরে হত্যার হুমকি দেয় তারা। প্রধান শিক্ষকের চিৎকারে মানুষজন এগিয়ে আসার পরেও তারা বিন্দুমাত্র ভড়কায়নি, বরং বেশ দাপট নিয়েই স্থান ত্যাগ করেছে।

যদিও ঘোড়াঘাট থানায় সেই প্রধান শিক্ষক একটা সাধারণ ডায়েরি করেছেন, কিন্তু যে বিদ্যালয়ের বাচ্চাদের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মতো এমন সাধারণ একটা ঘটনাকে কেন্দ্র করে যে ভয়াবহ দুঃস্বপ্নের মধ্য দিয়ে তাকে যেতে হলো এবং এখনো হত্যার হুমকি বলবত আছে তার উপর, তাতে তিনি এই ঘটনা আদৌ ভুলতে পারবেন বলে মনে হয় না। বিশেষত যে সমাজে এ ধরনের নোংরা ধর্মান্ধতার স্পর্ধা আজকাল খুবই সাধারণ ঘটনায় পরিণত হয়েছে, সেখানে এসবই আগামীতে স্থায়ী হয়ে যাওয়ার আশংকাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

ঠাণ্ডা মাথায় স্রেফ দুই মিনিট ভাবতে বসলে সবার আগে যে প্রশ্নটা আপনার চিন্তায় ধাক্কা মারবে, সেটা হচ্ছে কিভাবে একজন অটোরিকশা চালক, একজন কৃষক আর দুই কওমি মাদ্রাসার পরিচালকের এতো বড় স্পর্ধা হলো যে সে তারা একজন সম্মানিত শিক্ষককে শুরুতে চিঠি দিয়ে স্কুলসহ উড়িয়ে দেওয়ার হুমকি দিয়েছে এবং তারপর নিজেরা এসে তার গায়ে হাত তুলেছে, গুলি করার হুমকি দিয়েছে। আর এতো বড় দুঃসাহস দেখানোর পরেও এই উগ্র ধর্মান্ধ সম্ভাব্য জঙ্গিদের বিরুদ্ধে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এখনো কোন ব্যবস্থা নেয়নি কেন? তারা আসলে কিসের জন্য অপেক্ষা করছেন? প্রধান শিক্ষককে মেরে ফেলার? নাকি স্কুলের বাচ্চাদের ক্ষতি হওয়র?

ধরে নিলাম কওমি মাদ্রাসার পরিচালক আব্দুর রাজ্জাক জীবনেও কখনো গান শোনে নাই। কিন্তু নিশ্চিত করেই বলতে পারি কৃষক আব্দুল ওয়াদুদ আর অটোরিকশাচালক রুহুল আমিন জীবনে অসংখ্য গান শুনেছে, টিভিতে নানা প্রোগ্রাম দেখেছে, সিনেমা হলে সিনেমা দেখেছে। অথচ এরা আজ লেবাস পড়েছে ইসলামী সচেতন দল নামের এক কথিত দলের, এরা আজকে একটা উচ্চ বিদ্যালয়ে মানুষ গড়ার কারিগর শিক্ষকের গায়ে হাত তুলছে, হত্যার হুমকি দিচ্ছে, স্কুল উড়িয়ে দেওয়ার হুমকি দিচ্ছে ইসলামে গান শোনা হারাম ইত্যাদি ফতোয়া দিয়ে। কিসের মুসলমান এরা? কে দিল তাদের এই ফতোয়াবাজির করার অধিকার? ইসলাম ধর্মকে আর কত ব্যবহার করবে এরা? ধর্মের সম্মানটা আর কত নর্দমার নোংরায় নামাবে?

অবশ্য গত কয়েক সপ্তাহ ধরে দেশজুড়ে ধর্মের অনুভূতি রক্ষার নামে যা করা হচ্ছে এবং যা করতে দেওয়া হচ্ছে, তাতে এই ধরনের স্পর্ধা দেখানোর ঘটনা সামনে আরও ঘটবে। লালমনিরহাটের পাটগ্রামে শহীদুন্নবী জুয়েল নামে এক শিক্ষককে পিটিয়ে পুড়িয়ে মেরে ফেলা হলো কোরআন অবমাননার নির্লজ্জ মিথ্যাচার ছড়িয়ে। অসংখ্য মানুষ তাকে চরম বর্বরতায় পেটানোর ও তার লাশকে পোড়ানোর সময় স্রষ্টার শ্রেষ্ঠত্ব “আল্লাহু আকবর” ঘোষণা করছিল। মানুষগুলো একটা মানুষকে পিটিয়ে খুন করে পুড়িয়ে দিচ্ছিল স্রষ্টার শ্রেষ্ঠত্ব উচ্চারণ করতে করতে, স্রষ্টাকে, তার প্রেরিত ধর্মকে এরচেয়ে জঘন্য অপমান আর নোংরা অবমাননা আর কিছু হতে পারে না। অথচ এনিয়ে গত দুই সপ্তাহে প্রতিবাদ তো দূরে থাক, একটা টুঁ শব্দ উচ্চারণ করেনি ইসলামী দলগুলো।

অথচ এরমধ্যেই স্রষ্টা প্রেরিত ধর্মকে হেফাজতের দায়িত্ব তার হাত থেকে কেড়ে নেওয়া হেফাজতে ইসলামের নেতৃত্বে ফ্রান্স বয়কটের ডাকে বিশাল শো-ডাউন করেছে ধর্মভিত্তিক দলগুলো, ফ্রান্সের পণ্য বয়কট করা থেকে শুরু করে ফ্রান্সের দূতাবাস টুকরো টুকরো করার হুমকি পর্যন্ত নানাবিধ প্রতিবাদে সোচ্চার হলেও ময়মনসিংহে ধর্মকে ব্যবহার করে একটা নিরীহ মানুষকে মিথ্যা অভিযোগে পিটিয়ে পুড়িয়ে মেরে ফেলার প্রতিবাদে একটা টুঁ শব্দ উচ্চারিত হয়নি হেফাজতের সমাবেশ থেকে। এমনকি কুমিল্লার মুরাদনগরে ফ্রান্স বয়কট নিয়ে সামান্য এক ফেসবুক স্ট্যাটাসের কমেন্ট করার অপরাধে টানা দুই দিন ধরে একজন ফ্রান্স প্রবাসীর বাড়ি এবং তার আশেপাশের আরও চারটি বাড়ি পুড়িয়ে, লুটপাট চালিয়ে, নারীদের শ্লীলতাহানি করে রীতিমত বীভৎস এক পরিস্থিতির সৃষ্টি করা হলেও হেফাজতের সমাবেশ থেকে ন্যুনতম একটা প্রতিবাদও জানানো হয়নি।

ধর্মের নামে, ধর্মকে ব্যবহার করে উগ্র ধর্মান্ধদের এই জঘন্য বাড়াবাড়ি আর ধর্মকে নিকৃষ্টতম অবমাননার এই ভয়াবহতা চলছে নির্দ্বিধায়। অথচ দুঃখজনকভাবে সরকার-প্রশাসন থেকে শুরু করে ধর্মপ্রাণ ইসলামী আলেম-ওলামা,মুফতি-মুহাদ্দিসরা যাদের বক্তব্য জনগণ ইতিবাচকভাবে দেখে, তারা কেউই এই বাড়াবাড়ি ঠেকাতে সোচ্চার হচ্ছেন না, ধর্মের নামে বাড়াবাড়ি থামাতে বলছেন না, কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করছেন না। কিসের জন্য অপেক্ষা করছি আমরা? দেশটা পুরোপুরি উগ্র ধর্মান্ধের হাতে চলে যাওয়ার?

অবিলম্বে এই তথাকথিত “বাংলাদেশ ইসলামী সচেতন দল”-এর তিন সদস্যকে আইনের আওতায় এনে জিজ্ঞাসাবাদ করা হোক ও এই দলের ব্যাপারে তদন্ত করা হোক। কী উদ্দেশ্যে এতো নির্লজ্জ স্পর্ধা দেখালো তারা, দ্রুত সেটা খুঁজে বের করা হোক। জয়রামপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ও স্কুলের পূর্ণ নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হোক। ধর্মের নামে, ধর্মকে ব্যবহার করে আর একটা প্রাণও যেন ঝরে না যায়।