অমর্ত্য সেন এর ক্রয় ক্ষমতা, বিশ্ব ব্যাংকের পোষ্টাই এবং ভূমির জন্য সংগ্রাম- মুস্তাফা হুসেন

অমর্ত্য সেন এর ক্রয় ক্ষমতা, বিশ্ব ব্যাংকের পোষ্টাই এবং ভূমির জন্য সংগ্রাম-
মুস্তাফা হুসেন
পূর্ব বাংলার ঢাকায় কৈশোর জীবন শেষে অমর্ত্য সেন- ও তাদের পরিবারের সাথে তৎকালীন বাংলার এলিটদের কেন্দ্রভ‚মি কলকাতায় চলে যান। পেছনে পড়ে থাকে মানিকগঞ্জের গ্রামাঞ্চলে কৃষকদের প্রজাদের ও বর্গাদাসদের জীবনের সুখ দুঃখের স্মৃতি সম্বলিত জোতাদারি ব্যবস্থার পরিত্যক্ত ভূমি] অমর্ত্য সেন কলকাতায় পড়াশুনা শেষ করে অর্থশাস্ত্রে অধ্যাপনার জীবিকা গ্রহণ করেন]
পূর্ব বাংলার যে সকল মানুষ পশ্চিম বাংলাদাবাসী হয়ে সমাজ অর্থশাস্ত্র ও রাজনীতিতে বিশেষ ভূমিকা পালন করেন, অমর্ত্য সেন তাদের মধ্যে অন্যতম] তারা আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে এবং আধুনিক চিন্তা চেতনায় দীক্ষিত হয়ে সমাজ অর্থনীতি ও রাষ্ট্রের নানা সমস্যায় নিজেদের সংশ্লিষ্ট করেছিলেন [ তাদের নেতৃত্বে পশ্চিম বাংলায় বিশেষ ঘটনার মধ্যে ভ‚মি ব্যবস্থায় কাঠামোগত পরিবর্তনের প্রয়াস উল্লেখযোগ্য] অবশ্য পশ্চিম বংগে ভ‚মি ব্যবস্থায় মৌলিক ও সার্বিক কোন পরিবর্তন ঘটেনি] জ্যোতি বসুরা ভ‚মি মালিকদেরকে কনসেসন দিয়ে কৃষকদের সন্তুষ্ট করে শাসন ক্ষমতায় টিকে থাকেন] ভ‚মিতে মালিকানা ব্যবস্থায় সংস্কারের ফলে কৃষি উৎপাদনে সামান্য উদ্বৃত্তের সৃষ্টি হয়েছে কিন্তু এমন পরিমানে/পর্যায়ে উপনীত হয়নি যাতে করে তা উল্লেখযোগ্য স্বনির্ভরতার সহায়ক হয় এবং সা¤্রাজ্যবাদী ঋণকে বহুলাংশে ঠেকিয়ে রাখতে পারে। বিশ্ব ব্যাংকের ঋণ পশ্চিম বাংলায়-এ আধিপত্য বিস্তা করে] পূর্ব বাংলায়তো বিশ্বব্যাংকের পরামর্শদাতারা রাষ্ট্রীয় বাজেট তৈরি করে দেন অর্থাৎ পরোক্ষে রাষ্ট্র-ই চালিয় চালিয়ে থাকেন] বিগত একশত বছরে বাংলা অঞ্চলে জনগনের সার্বভৌমত্বের সংগ্রাম পরিচালিত হলেও তা যথার্থ পরিনতিতে পৌছায়নি।

মানুষের জীবনের সামাজিক, অর্থনৈতিক রাজনৈতিক, দার্শনিক, জৈবিক ইত্যাদি নানা সমস্যাকে আধুনিক কালের ইউরোপীয় পন্ডিত/বিশেষজ্ঞগণ নানা দৃষ্টিকোণ থেকে নানা আঙ্গিকে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেছেন পার্থিব জীবনে সমস্যাকে সমাধানের জন্য জীবনকে কেউ সার্বিক আঙ্গিকে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেছেন। আর কেউবা জীবনের খন্ডিত একটি দিককে নিয়ে বিশ্লেষণ করে জীবনের একটি প্রধান সমস্যা সমাধাণ করার প্রয়াস পেয়েছেন। নিতান্ত সাম্প্রতিক কালে উন্নত পৃথিবীর পন্ডিতগণ নারীর অধিকার, মানুষ বিশেষত নারী ও শিশুর পুষ্টি কিশোর-কিশোরী-সমস্যা আদিবাসী ও বনবাসীদের সমস্যা ইত্যাদি বিষয় বিশ্লেষণ করে । পৃথক পৃথকভাবে সমাধানের পথ বাতলেছেন। কেউ মনে করেছেন গাছের গোড়ায় জল দিলেই গাছ তাড়াতাড়ি পুষ্ট হবে কেউ মনে করেছেন বাড়তি ডালপালা কেটে দিলেই গাছ তাড়াতাড়ি ফলবতী হবে, কেউবা মনে করেছেন গাছের পাতার আশপাশে কার্বন ডাই অক্সাইড ছড়িয়ে দিলেই গাছ দীর্ঘকাল জীবিত থাকবে, ফুল দিবে, ফল দিবে ইত্যাদি।
এই পথ পরিক্রমায় ইউরোপ আমেরিকার বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকগণ মানবদেহের পুষ্টির বিষয়ে অনেক গবেষনা করেন] এই গবেষনালবদ্ধ ফল আমরা আমাদের তৃতীয় দুনিয়ার দেশগুলির উন্নয়ন প্রচেষ্টায় অনেক গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করে থাকি] আমরা প্রধানত: অপুষ্টির মূল কারণ সমূহ উদঘাটনের জন্য তাদের দেয়া যূক্তির ধারসমূহ পরীক্ষা ও প্রয়োগ করে থাকি। যুক্তির ধার দিয়ে সমস্যাকে সাইজ করে কেটে কেটে ইচ্ছে মতো সাজিয়ে অনেক সিদ্ধান্তে পৌছানো যায়। কিন্তু সমস্যার মূল শিকড়ে পৌছানো যায় না। সমস্যার মূল শিকড়ে পৌছাতে গেলে বৃক্ষটাকে শুদ্ধ উপড়ে ফেলার আগে বৃক্ষটার জন্ম বৃত্তান্ত জেনে নিতে হয়।
তেমনি এক চেষ্টা অবশ্য অমর্ত্য সেন করেছিলেন। তিনি তৃতীয় দুনিয়ার দেশগুলির মানুষের অনাহার আর ক্ষুধা এবং অপুষ্টির পেছনে দারিদ্র মানুষের ক্রয় ক্ষমতা ও স্বত্বাধিকার অভাবকে দর্শন করেছিলেন মানুষের দেহের অপুষ্টিকে আর্থরাজনীতিক পরিমন্ডলে মানসম্পন্ন শ্রমের চাহিদা ও যোগদানের সমস্যা হিসাবে ধরে নিয়ে এর কারন নির্নয়ে ব্রতী হয়েছিলেন। অমর্ত্য সেন মুলত: তিনটি বিষয় নিয়ে বিশ্লেষন ও গবেষনা করেন। এগুলো হল: দারিদ্র্য, দুর্ভিক্ষ্য ও অপুষ্টি। এর তিনটির পেছনের আরও প্রচ্ছন্ন ক্রীড়নক গুলো হল (কারনগুলো হল )প্রাক-অধিকার, স্কত্বাধিকার, ক্রয় ক্ষমতা, ক্ষতিপুরন ও তথ্য তথ্যের বিদ্যমানতা ও অবিদ্যমানতা । অর্থাৎ জনগনের জীবনের যে ঋণত্মক দিক তাদেরকে প্রতিনিয়তই উৎপাদন ও উন্নয়নের ক্ষেত্রে পেছনে টেনে নিয়ে আসে তাকে নিয়েই তিনি বিশ্লেষন গবেষনা করেন।তার গ্রন্থ পোভার্টি এ্যান্ড ফেমিন (দারিদ্র্য ও দুর্ভিক্ষ ) একটি গবেষনা গ্রন্থ ।এই গবেষনাটি ১৯৬৯ সনে আন্তর্জাতিক শ্রমসখংস্থা কর্তৃক চালুকৃত বিশ্ব কর্মসুচীর জন্য গ্রহন করা হয়। এটা সাধারনভাবে ক্ষুধা ও অনাহারের ঘটনা এবং বিশেষভাবে দুর্ভিক্ষ সৃষ্টির সাথে সংশ্লিষ্ট । বিশ্লেষন পদ্ধতিটা স্বত্বাধিকারমুখীন যা না কি মালিকানা এবং বিনিময়ের উপ্র কেন্দ্রীভুত । আন্তর্জাতিক শ্রমসংস্থা অমর্ত্য সেনকে দিয়ে এই গ্রন্থটি লিখিয়েছেন। তাদের উদ্দেশ্য বিভিন্ন দেশের জাতীয় সিদ্ধান্ত প্রনেতাদেরকে গনদারিদ্র্য ও বেকারত্ব দুরীকরনে তাদের নীতি ও পরিকল্পনা পুন-প্রনয়নে সাহায্য করা। ১৯৭৬ সালে বিশ্ব কর্মসংস্থার সম্মেলনে প্রত্যেক দেশের জনগনের প্রাথমিক পণ্য প্রয়োজন মেটানো এবং কর্মসংস্থানকে অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে কার্যকারী করার অঙ্গীকার ব্যক্ত করা হয়।
জা দ্রেজ ও অমর্ত্য সেন যৌথভাবে ক্ষুধা ও গণকর্মকান্ড বিষয়ক গবেষনা গ্রন্থ রচনা করেন। তাদের এই দুটি গবেষনা গ্রন্থে এবং আরও অন্যান্য লেখায় স্বাত্বধিকার ও বঞ্চনা, পুষ্টি ও সক্ষমতা, নারী ও তার ক্ষমতায়ন ইত্যাদি বিষয় বিশ্লেষিত হয়েছে। স্বত্বাধিকারের সাথেই আর একটি উল্লেখযোগ্য বিষয় হল ক্রয় ক্ষমতা। অমর্ত্য সেন ক্রয় ক্ষমতা বাড়ানোর কথা বলেছেন। বলেছেন মানুষের আদি অথবা গোড়াকার সম্পত্তি নানা ধরনের হতে পারে যেমন শ্রমক্ষমতা, জমিজমা ইত্যাদি। তারপর বলেছেন যে অধিকাংশ মানুষেরই শ্রমক্ষমতা ছাড়া আর কিছুই নেই এমন অবস্থাই সাধারন। এগুলো সবই প্রাক-অধিকারের অন্তর্গত। কিন্তু এই প্রাক-অধিকার কোথ থেকে এলো, কি ভাবে এলা অথবা কি ভাবে আসে বা সৃষ্টি হয় বা তিনি কিছুই বলেননি। (কার্ল মার্কস ঐতিহাসিক বস্তুবাদ পদ্বতির মাধ্যমে ব্যাখ্যা করেছেন এঙ্গেলস পরিবার, সমাজ ও ব্যাক্তিগত সম্পত্তি গ্রন্থের মাধ্যমে বিশ্লেষন করেছেন কী করে প্রাক-অধিকার এর সৃষ্টি হয়।) অমত্য সেন তা বলেননি। অথবা প্রাক-অধিকার অর্থাৎ শ্রমক্ষমতা ও জমিজমা এবং উত্তর-অধিকার অর্থাৎ ক্রয়ক্ষমতা কি করে নতুন সৃষ্টি করতে হয় সে ব্যাপারেও তিনি দিক নির্দেশ করতে যাননি। যদিও যে বিষয় ও ক্ষেত্র তিনি বেছে নিয়েছেন তাতে বাস্তব প্রমান পাওয়া যায়, বাংলার জমিদারি নামক সামন্তাবশেষের সামান্য অবসান হলেই প্রাক-অধিকার ও ক্রয়ক্ষমতা সৃষ্টিতে তা কেমন উল্লেখযোগ্য অবদান রাখে।
অমর্ত্য সেন এর মতামত আপাতত: মনে হয় সর্বরোগহর ঔষধ) কিন্তু হয়তোবা তার অজনাতেই তার চিন্তা ও ধারনা, পেপি-ফিউডাল পেটি-বুর্জোয়া শোষকদের দ্বারা কনসেসন-দেওয়ার মাধ্যেমে শোষন-কে আরো সহনীয় করে তোলার সহায়ক বটিকা) সমস্যার মূল ক্ষতকে আড়াল করে রাখার আলাপন) বিশ্বব্যাংকের ঋণ দ্বারা পরিচালিত পুষ্টি কর্মসূচী সম্পর্কে পরবর্তী এক অংশে আলোচনা করা হয়েছে। ভ‚মি মালিকানা সমস্যা ও ভ‚মির জন্য সংগ্রাম প্রতিটি বিষয়ের সাথে সম্পর্কীত বলে নানান বিষয়ের সাথে আলোচনায় এসে য়ায়।
মানুষের দেহের রোগগ্রস্ততা ও অপূষ্টিকে যদি সমস্য হিসাবে ধরা হয়, তাহলে এর কয়েকটি কারন নির্নয় করা যায়। প্রথম কারনটি নিহিত উৎপাদনব্যবস্থা ও পদ্বতির মধ্যে যেখানে, উৎপাদের সরলতা ও বৈচিত্রহীনতা বিরাজমান থাকে এবং উৎপাদন-কাঠামো, উৎপাদন-উপকরন ও উৎপাদন সম্পর্কের উপর ব্যক্তি মালিকের একচ্ঠত্র/একচেটিয়া মালিকানার নিরংক‚শ আধিপাত্য (একচেটিপিয়াপনা বা একচ্ছত্রাবস্থার বিপরীতে বহুচেটিয়াপনা বা বহুচ্ছাত্রবস্থা সমর্থনযোগ্য নয়, শ্রমের সমবায়ই প্রকৃত পথ) বিদ্যমান থাকে।
সংশ্লিষ্ট উপাদানের শক্তি অনুযায়ী অর্থাৎ তার মাত্রানুযায়ী উৎপাদন না হওয়া…….অথবা উৎপাদন শূন্যের কোঠায় অবস্থান করা ইত্যাদি সকল কিছুই যা নির্ভর করে সমগ্র উৎপাদন পদ্বতির ক্রিয়া-পতিক্রিয়ার উপর। (ক্রিয়া অর্থাৎ কলকারখানায় কাজ চালু থাকা ও জমি চাষ স্বাভাবিক গতিতে চলতে থাকা এবং প্রতিক্রিয়ার অর্থ মিল-ফ্যাক্টরী মুনফার স্বার্থে/শ্রমিকগনকে শায়েস্থা করার জন্য সাক্ষাৎ কায়িক ও মানসিক শ্রমের সাথে বিযুক্ত মালিক কর্তৃক লে-অফ বা বন্ধ রাখা। প্রতিক্রিয়ার অর্থ জোতদার, বার্গাদাতা,ধনীকৃষক,অনুপস্থিতি মালিক কর্তৃক জমি অনুৎপাদনমূলক কারনে চাষ না করিয়ে পতিত বা ফেলে রাখা ইত্যাদি।) উৎপাদন ব্যবস্থার মাধ্যে ভুমীর মালিকানা-সম্পর্ক একটি বড় উপাদান।
ভুমীর মালিকানা সম্পর্কের উপর কর্তৃত্বকারী মালিক ভুমীর ব্যবহারে একচ্ছত্র/সিদ্ধান্তের অধিকারী বলে,ভুমীর মালিকানা সম্পর্কের উপর নির্ভর করে কৃষি উৎপাদন তথা ফসলের বৈচিত্র্য এবং পরিমান। সুতরাং ফসল যদি পরিমানে ও বৈচিত্র্যে সমৃদ্ধ এবং বন্টনে সুসমঞ্জস না হয়, হা হলে,য়াদের জীবিকার্জনে কেবলমাত্র শ্যমই সম্বল কিংবা শ্রমই মুখ্য, তাদের আয় তাদেরকে বর্দ্ধিত ও বিচিত্র ফসলের ভাগীদার করতে পারেনা।
সুতরাং ক্রয়-ক্ষমতার অধিকারী হওয়া বা করাটা বড় কথা নয়,বড় কতা হল—যে উৎপাদন ব্যবস্থা(বন্টন প্রক্রিয়াও নিয়ে আসে,সে উৎপাদন ব্যবস্থাকে নিজেদের অনুকুলে নিয়ে আসা অথবা বর্তমান ব্যবস্থাকে পরিবর্তন করে নতুন ব্যবস্থা সৃষ্টি করা।
অমর্ত্য সেন যথার্থই বলেছেন যে শ্রমজীবিদের ক্রয়ক্ষমতা না থাকাটা বেচে থাকার জন্য প্রয়োজনীয় বস্তুসামগ্রী ভোগের ক্ষেত্রে একমাত্র বাধা। সুতরাং ক্রয়ক্ষমতা সৃষ্টি হওয়া বা করা দরকার, তার কথা তিনি গুরুত্বসহকারে কখনো বলেননি। এটা তার বিষয় নয়।
বিষয়টি বাংলার পুরাতন(পাতিসামন্ততান্ত্রীক)ভুমীমালীকানা ও নতুন নাগরিক (বুর্জোয়া) সাংস্কৃতির সুবিধাভোগী(অর্থাৎ পেটিফিউডাল ব্যবসথা ও পেটিবুর্জোয়া সংস্কৃতিক যুগপৎ সুবিধাভোগী)দের জন্য কখনো গুরুত্বপুর্ন চিন্তার বিষয় ছিলনা।অমর্ত্য সেন সে চেষ্টা করেননি।তিনি সম্পুর্ন একাডেমিক দৃষ্টিকোন ও পদ্ধতিতে অর্থনৈতিক ও সামাজিক সমস্যাকে বুঝবর ও বুঝানোর চেষ্টা করেছিলেন,(খুব সম্ভবত)যাতে তা,রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি (কমিউনিষ্ট ও ধনতন্ত্রী?)নির্বিশেষে সকালের কাছে গ্রহনযোগ্য/বিবেচিত হয়।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালীন ১৯৪৩ এর দুর্ভিক্ষের কারনে লক্ষ লক্ষ লোক খাদ্যের অভাবে মরতে বাধ্য হয়। খাদ্যের অভাবে মৃত্যুবরনকারীদের অধিকাংশই ছিলেন প্রান্তিক চাষী এবং ভুমীহীন ক্ষেতমজুর অথবা ভুমীহীন অকৃষিজীবী। অন্যের জমি চাষ করে যে কৃষক ফসল উৎপাদন করে,সেই কৃষক মারা যায়। পরবর্তী পরিস্থিতিতে বাংলার কৃষকগোষ্ঠী উৎপাদিত ফসলের তিন ভাগের এক ভাগ পাওয়ার দাবীতে বাংলা অঞ্চলে তুমুল তেভাগা আন্দোলন গড়ে তোলেন। এই আন্দোলন গণসংগ্রামের রুপ নেৎয় এবঙ ১৯৪৩ থেকে ১৯৪৬ পর্যন্ত স্থায়ী হয়।পতি-সামন্তবাদী শ্রেণি থেকে আগত কৃষক সংগ্রামীরা এই আন্দোলনে নেতৃত্ব দেয়। আন্দামান ফেরত রাজবন্দী এবং অনুশীলন ও যুগান্তর ইত্যাদি সন্ত্রাসবাদী রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মীরা কমিউনিষ্ট আদর্শে দক্ষীত হয়ে কমিউনিষ্ট আন্দোলনের অংশ হিসাবে তে-ভাগার সাংগ্রামকে জোরদার করে তোলেন।পতি-সামন্তবাদী নেতৃত্বের দুর্বলতদার কারনে তে-ভাগার জন্য কৃষক সঃংগ্রাম কার্যত থেমে যায়।
১৯৪৭ সনে পাকিস্তান সৃষ্টির ফলে বাংলা ভাগ হয়। ১৯৫০ সনে সরকার স্টেট একুইজিশন এ্যাষ্ট জারী করে জমিদারী দখল করে। এর পরের দীর্ঘ দুই যুগ কোন বড় ধরনের দুর্ভীক্ষ বা খাদ্যাভাব হয়নি। চব্বিশ বছর পর ১৯৭৪-এ আর একটি যুদ্ধ এবং আর একটি দুর্ভিক্ষের ঘটনা ঘটে। মাঝখানের সময়কে দুটি ভাগে ভাগ করা যায়। ১৯৫০-৬২ এই বারো বছরে জমিদারী উচ্ছেদ আইন জারী করে সরকার কতৃক হিন্দুদের পরিত্যক্ত জায়গাজমি দখল, হিন্দু জমিদার ও তালুকদারদের দেশত্যাগ এবং মুসলমান জোতদারগণ কর্তৃক হিন্দুদের পিরিত্যক্ত জায়গাজমি দখল, ১৯৫৪ সনে মুসলিম জমিদার তালুকদার তথা পাতি-সামন্ততন্ত্রীদের বড় তরফের রাজনৈতিক দল মুসলিম লীগ, বাংলাদেশের পরিমন্ডলে সরাসরি-সাম্প্রদায়িক আদর্শের ভিত্তিতে (পুবর্তন হিন্দু মুসলমান দ্বিজাতি তত্বের ভিত্বিেিত) রাজনৈতিক দল হিসাবে সম্পূর্ন উচ্ছেদ হয়। উপরোক্ত ঘটনাসমূহের অন্তরালে/ভেতর দিয়ে তখনকার জোতদার, ধনীকৃষক ও কিছুপরিমানে মাঝারি কৃষকদের শক্তিবৃদ্ধি ঘটে। কেবল সামাজিকভাবে নয়, অর্থনৈতিক দিক দিয়েও তারা শক্তিশালী হয়। সম্পদের মালিক ও নিয়ন্ত্রনকারীদের পুরাতন অবস্থানের পরিবর্তন ঘটে।
নতুন সামাজিক গোষ্ঠী সামাজিক-রাজনৈতিক নেতৃত্বের কাছাকাছি চলে আসে। এসব কিছুই প্রধানত: কৃষি সম্পদ বৃদ্ধিতে কিছুটা সহায়ক হয়।
সুনির্দিষ্ট পরিসংখ্যান পেলে সঠিকভাবে হিসাব করে দেখানো যেতো যে ১৯৫০সনে জমিদারী উচ্ছদের পর রায়ত ও কৃষকের ঘাড় থেকে জমিদারী-তালুকদারির জোয়াল সরে যাওয়ার ফলে প্রকৃতপক্ষে ফসল উৎপাদনের হুমকি-ধামকি, রক্তচক্ষু শাসানী, জোর-জবরদস্তি, সন্ত্রাস, চক্রান্ত এবং রক্ত-বংশগত মাতব্বরী ও কর্তোগিরির শাসানী, পসল উৎপাদনে মনোযোগ দিতে(কেবল মনোযোগ নয়,দেহযোগ অর্থাৎ ভয়হীন অবস্থায় অতিরিক্ত শ্রম ও বস্তু বিনিয়োগ করতে) পেরেছিল। খাদ্যাভাব কিছুটা দুরীভুত হয়েছেল।
বস্তুুত: ১৯৪৯ সন থেকে ১৯৬২ সন পর্যন্ত পুর্ববাংলা গ্রামঞ্চেেল যত হাইস্কুল মাইন স্কুল প্রতিষ্ঠিত হয়েছে তা আর কখনোই হয়নি।(১৯৫০-এ কোরিয়া যুদ্ধের ফলশ্রæতিতে পাটের দাম বৃদ্ধিরবিষয়টি-ওস্মরনীয় ওবিবেচ্য)।অবশ্য হন্দিু শিক্ষকদের ব্যাপক দেশত্যাগের ফলে শিক্ষাক্ষেত্রে যে বিরাট শুন্যতার সৃষ্টি হয়েছিল সে বিষয়টিকে অস্বীকার করার উপায় নেই। কিন্তু সামগ্রীকভাবে নতুন জীবন নির্মানের জন্য যে একটা সাড়া পড়ে গিয়েছিল এ বিষয়ে সন্দেহ নেই। হিন্দু ধর্মালম্বী জমিদার-তালুকদার ও জোতদারগণ ভু-সম্পত্তি ত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছিল,তার ভ্যাকুয়াম পুরন করে মুসলমান-ধর্মাবলম্বী জোতদার ও সাম্প্রদায়ীক সন্ত্রাসীরা।
নতুন জীবন নির্মানের অনুপ্রেরনার বাহ্যিক রুপের রং-টা হিন্দু-বিরোধী বা সাম্প্রদায়ীক মনে হলে-ও তার অন্তর্নিহিত রুপটা ছিল সম্পুর্ন পাতি-সমন্ততন্ত্রবিরোধী বা জমিদারবিরোধী। এগুলো সদ্য জোয়ালমুক্ত জোতদার ও রায়ত কৃষকের শক্তিবৃদ্ধির অনৎ্যতম সুজক। ১৯৪৩ তথা ১৩৫০ এর দুর্ভিক্ষের খাদ্যাভাবের স্মৃতিকে মুছে ফেলে এতদঞ্চলের মানুষ নতুন করে ঘর কাধতে চায়। খাদ্যের পরিমান বাড়ে। পুষ্টির পরিমানও বাড়ে। তাই এখথা বলা অসংগতহবেনা যে খাদ্য ও পুষ্টি বৃদ্ধির পেছনে,উৎপাদন ব্যবস্থায় উৎপাদন সম্পর্ক তথা মালীকানা সম্পর্ক পরিবর্তনের প্রভাব পরিলক্ষিত হয় এবং তা নিশ্চিতভাবেই সুদুরপ্রসারীপ্রভাব বিস্তারকারী ঘটনার মতই কাজ করে। ১৭৯৩ সনে এদের উচ্ছেদ কেবলমাত্র রাষ্ট্রীয় সরকার ও প্রজাদের মধ্যেকার স্তরে অবস্থানরত রাজস্ব আদায়কারীদের উচ্ছেদই ছিলনা,একটা প্রচন্ড শক্তিধর অত্যাচারী গ্রামীন শাসকগোষ্টীরও উচ্ছেদ ছিল তা। ইউরোপীয় সমাজ অর্থনীতির মানদন্ডে যারা না ছিল ফিউডাল না ছিল পেটিবুর্জোয়া। সারা বাংলা অঞ্চলে এদের সংখ্যা অনেক হওে প্রকৃত ফিউডাল গোষ্ঠীর বা বংশের সংখ্যা ছিল মাত্র কয়েকটি।
যদি-ও জাঁ দ্রেজ এবং অমর্ত্য সেন তাদের ক্ষুদা ও গণকর্মকান্ড গ্রন্থে (১৯৯০) বলেন, দুর্ভিক্ষ সবসময়ই বিভেদাত্মক ঘটনা। সমাজের নিচু স্তরের লোকেরাই সাধারনত মৃত্যুর শিকার হয়। প্রচলিত বক্তব্যের বিপরীতে বলতে হয় যে, সমাজের সকল স্তরের মানুষ দুর্ভিক্ষের শিকার হয়না। কোন কোন সময় স্বল্পকালের সীমার মধ্যে একটি নির্দিষ্ট পরিমান খাদ্য সরবরাহের (মোট পরিমানের-লেখক) বৃহত্তর অংশ পাওয়ার জন ্য সমাজের বিভিন্ন শ্রেনী ও পেশাজীবি গোষ্ঠী ব্যাপক প্রতিযোগীতা ও সংঘাতে লিপ্ত হয়। উদাহরণস্বরুপ, ১৯৪৩ সনের বাংলার দুর্ভিক্ষে গ্রামীন কৃষি শ্রমিক, যাদেরকে তাদের মজুরি দিয়ে খাদ্য কিনতে হয়, খাদ্য-মূল্য বৃদ্ধি পাওয়ার ব্যাপারটি তাদেরকে আঘাত হানে। অন্ততপক্ষে, অংশত, বাংলার যুদ্ধ-অথ্যব্যবস্থায় শহুরে জনসংখ্যার ক্রয় ক্ষমতা বৃদ্ধির সাথে তা সম্পর্কিত। যখন খাদ্যের পরিমান সীমিত থাকে, তখন বাজার ব্যবস্থা জনসংখ্যার বিভিন্ন অংশের মধ্যে তাদের ক্রয়ক্ষমতা এবং মার্কেট-পুল অনুসারে খাদ্য বিভাজন করে। অর্থ উপার্জনের মানদন্ডে কোন কোন গোষ্ঠীর আপেক্ষিক অবস্থান দুর্বলতর হলে, তাদের খাদ্য প্রাপ্তী নিয়ন্ত্রনের সামর্থ্যকে নিশ্চিত পতনের দিকে নিয়ে যায়। খাদ্যের লড়াইয়ে শয়তান দুরতম বা নিরাপদতম আশ্রয়ে অবস্থান গ্রহণ করে। উপরের কথাগুলোর মাধ্যমে অমর্ত্য সেন-দ্রেজ মার্কেট অর্থব্যবস্থায় খাদ্যের চাহীদা, সরবরাহ ও প্রাপ্তীর প্রক্রিয়ার আভ্যন্তরীন ও সুক্ষ মারপ্যাপগুলো বিশ্লেষন করেছেন। বিশ্লেষণটা আমার কাছে মনে হয় যান্ত্রীক। বিশ্লেষণ পদ্ধতিতে গণিত-শাস্ত্রকে অনুসরন করা হয়েছে বেশী, সামাজিক মনস্তত্তকে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে কম। কোন বিশেষ পরিস্থিতিতে(যুদ্ধ, প্রাকৃতিক দুর্যোগ ইত্যাদির কারনে) সমাজে খাদ্যের অভাব ঘটলে বিভিন্ন শ্রেনী ও সামাজিকগুষ্ঠি গুলো খাদ্যের জন্য তাদের আকুতি ও আকাংখা ব্যক্ত করে। চলমান স্বাভাবিক ক্রিয়ার বিপরীতে প্রতিক্রিয়া দেখায়। প্রতিক্রিয়ার ধরনটা অধিকাংশ সময় নিরব ক্ষোভ যে ক্ষোভ চাপা থাকে, বিক্ষেভ নয়, হিংসাত্মাক নয়। এ বিশেষ পরিস্থিতির সবগুলোই অনাভ্যন্তরীন ব্যাপার। ১৯৪৩ এর দুর্ভিক্ষের কারন খুঁজতে গিয়ে তারা একথা বলেননি যে পুর্ব থেকে চলে আসা সমাজের মধ্যেকার আভ্রন্তরীন দ্বন্দ-সংঘাতের কারনেই সমাজে কোন কোন গোষ্ঠীর কাছে খাদ্যে মওজুদ থাকা সত্বেও দুর্ভিক্ষের সৃষ্টি হয়। যদিও মার্কেট ব্যবস্থার চাহীদা ও যোগানের সাধারন নিয়মগুলো এখানে মওজুদ রেখে-ও দুর্ভিক্ষবস্থা সৃষ্টি করতে পারে। এটা হল সমাজের অভ্যন্তরীন ব্যাপার। এখানে এ বিষয়ে তিনি আলোচনা করেননি। যাদের অবস্থান সবলতর াথবা যাদের অবস্থান দুর্বলতর তাদের তাদের সবলতা ও দুর্বলতার কারন তারা অনুসন্ধান করেননি। (মার্কস তা করতে চেষ্টা করেছেন)।
তারা আরো উল্লেখ করেছেন যে, ১৯৪৩ এর দুর্ভিক্ষে ক্ষেতমজুরেরা/কৃষিশ্রমিকেরা তাদের দ্বারা উপর্জিত টাকা(?) পয়সার স্বল্পতার কারনে খাদ্যে কিনতে পারেনি। শহুরে সামাজিক গোষ্ঠীগুলোর কাছে যুদ্ধ অর্থব্যবস্থার দ্বারা উৎসারিত যথেষ্ট মুদ্রা ছিল বলে তারাই খাদ্যের বৃহত্তর অংশ দখল করে নিয়েছিল ইত্যাদি।
এখানে বলা দরকার যে আজ থেকে ৫৬ বছর পূর্বে গ্রামীন কৃষি শ্রমিকের কাছে রাজা ষষ্ঠ জর্জের ছাপ মারা টাকা নয়, পয়সা নামক মুদ্র জাতীয় বস্তু কয়টি ছিল অথবা অদৌ ছিল কি না তা প্রশ্নসাপেক্ষে এবং অনুসন্ধানের বিষয়। আমার জানামতে কোন দিকামলা, দিনমজুর,ক্ষেতমজুর অথবা বর্গাদাস বর্গচাষীর হাতে কোন মুদ্রা সচরাচর চালু ছিলনা। বর্গাচাষীর হাতে মাঝে মাঝে দুএকটি কানা পয়সা আসত কিন্তু কামলা-মজুরের হাতে একেবারেই নয়। দিনকামলা, দিনমজুর, ক্ষেতমজুর বাড়ীতে কাজ করে দুই বেলা পেট পুরে খেত মজুরী হিসাবে ধান কিংবা চাউল পেত।
মুদির দোকানে গিয়ে ধান অথবা চাউলের বদলে (অসম বিনিময়?) কেরসিন ও লবন নিত বা কিনত (?)। জোতদারের বাড়ীর বান্ধা মুনিষ/কামলা/মজুর, বেগার-খাটা জন/মুনিষ দুই বেলা পেট পুরে খেত এবং বছর শেষে দুএকটি পরনের কাপড় পেত। যুদ্ধের সময়ে খাধ্যাভাবের আশংকায় এবং বাস্তবতায় জোতাদার-মহাজনের তাদের গোলায় খাদ্যশস্য আটকে রাখল। তারা নির্দয় ও বেরহম হল। ভ‚মীহীন কৃষকশ্রমিক, গরীক কৃষক, ভাগচাষী, যাযাবর ফেরিওয়ালা(বেদে?) না খেতে পেয়ে মারা গেল। শহুরে দুস্থ, শহরতলীর গরীব-ও যুদ্ধ অর্থ ব্যবস্থার মাধ্যমে সঞ্চালিত কাগজ বা ধাতব মুদ্রার নি¤œতার অংশও পেলনা। ক্রয়ক্ষমতা মুদ্রা না পেয়ে খাদ্য কিনতে না পেরে না খেতে পেয়ে মারা গেল।
গ্রামাঞ্চেলে কিছু পরিমান খাদ্য থাকা সত্বে-ও শুধুমাত্র জমিদারী-জোতদারী-মহাজনী ব্রবস্থার কারনে চাষের জমি থেকে ফসল তথা খাদ্য-শস্য–জমি, অর্থ ও ঋণ-ব্যবস্থার মালিকদের গোলায় চলে যায় এবং সেখানে আটকে থাকে, অ-মালিক সামাজিক গোষ্ঠীর কাছে খাদ্য পৌছায়না এবং পৌছায়নি। গ্রামীন কৃষি মজুর, বর্গচাষী বা বর্গাদাস, গরীব কৃষক, জলমহারের জলদাস তাদের খাওয়াপরা ও জীবন ধরনের জন্য……জমিদার, জোতদার ও মহোজনদের উপর সম্পূর্নভাবেনির্ভরশীল ছিল। সুতরাং এরা যখন হাত গুটিয়ে নিল অর্থাৎ সাহায্যের জন্য বাড়ানো হাত গায়ের দামী চাদরের নিচে লুকিয়ে ফেলল তখন এই সর্বহারাদের মৃত্যুবরন করা ছাড়া আর উপায় ছিলনা। এটা সামগ্রীক উৎপাদন ব্যবস্থার ক্রুটি, পাতি-সামন্ততান্ত্রীক উৎপাদন ব্যবস্থার ক্রুটি। অমর্ত্য সেন কৈশারে ঢাকায় বসে দুর্ভিক্ষের সময় যে লোকটিকে বমি করে আবার বমি খেতে দেখেছেন, সেই ভুখা সর্বহারা লোকটি হয়তোবা গ্রাম থেকেই এসেছিল। গ্রামে খাদ্য না পেয়ে চলে আসে শহরে। শহরেও খাদ্য পায়না, মরে যায়। গ্রামে খাদ্য থাকা সত্বেও খাদ্য পায়না, চলে আসতে হয় শহরে……কেন চলে আসতে হয়… এর কারনটি অনুধাবনের জন্য দিল্লী, কলকাতা লন্ডন ও ওয়াশিংটনের বড় বড় লাইব্রেরীতে বইপত্র ঘেঁটে রিসার্চ না করে তার জমিদার-জোতদার বাপ-ঠাকুর্দা অথবা ঘনিষ্ঠ আত্মীয়-স্বজনকে জিজ্ঞেস করলেই পারতেন…যে, (তাদের ভাষায়) কী কুট-কৌশলী ও শক্তিপ্রায়োগিক (আর্থসামাজিক) আচরন তারা কামল-মুনিষ-বর্গাদাসদের প্রতি করেছিলেন, তা হলে আরো সহজে বুঝতে পারতেন যে, প্রত্যক্ষ কী কারনে দুর্ভিক্ষ হয়, জমিদারী-জোতদারী-মহাজনী অর্থাৎ পাতি-সামন্ততান্ত্রীক ব্যবস্থা কী বস্তু এবং গ্রামাঞ্চলে খাদ্যভাবের পরোক্ষ কারনটাই বা কি। এই দুর্ভিক্ষের সামাজিক চিত্র এঁকেছেন বিজন ভট্রাচার্য তার নবান্ন, ছেড়াতার নাটকে। নাট্যকার ১৯৪৩ এর দুর্ভিক্ষের পটভূমীতে বাংলার ভুখা গরীব চাষীর অসহনীয় বিয়োগস্ত পরিনতির ঘটনা অংকে আর দৃশ্যে রুপায়িত করেছেন। অবশ্য গ্রন্থের মধ্যে মুদ্রিত তথ্যে চাইতে জীবৎকালের পরিসীমায় ব্যাক্তিগত যোগাযোগ ও সাক্ষাৎ এর মাধ্যমে প্রাপ্ত তথ্য অধিকতর অথেনেটিক। নাট্যকার বিজন জনগনের কাছাকাছি ছিলেন।
দ্রেজ ও সেন তাদের গ্রন্থের ৪৮নং পৃষ্ঠার ফুটনোটে মর্যাদাসম্পন্ন এনসাইক্লেপিডিয়া ব্রিটানিকা-র একটি তথ্য-বিভ্রাটের কথা উল্লেখ করেছেন–সেটি হল, ব্রিটানিকায়, ১৩৪৪-৪৫ খৃষ্টাব্দে রাজত্বকারী ভারতের স¤্রাটকে মুঘল বংশীয় হিসাবে উল্লেখ করা হয়, অথচ প্রকৃত ঘটনা হল তখনকার স¤্রাট ছিলেন তুঘলক বংশীয়। তাছাড়া উক্ত সময়ে রাজত্বকারী স¤্রাট নিজে ভিক্ষায় বের হওয়া তো দূরের কথা, বরং বিপরীতে তিনি দিল্লী ও অন্যান্য শহরে তখনকার দিনেই একটি শাক্তিশালী খাদ্য রেশনিং ব্যবস্থা গড়ে তুলেছিলেন। সময়িক ও স্থনিক দুরত্বের ব্যবধানে তথা সংগ্রহ করতে গিয়ে গ্রন্থনির্ভর হলে এরকম ভুল হতে পারে। বিবিসি যেমন উল্টাপাল্টা খবর পরিবেশন করে। বিশেষ উদ্দেশ্য তথ্যবিকৃতি তো করেই, সুনিপুণ প্রচার কৌশলের মাধ্যমে গরীব ও অশিক্ষিত মানুষের মধ্যে আন্তর্জাতিক ধনপতিদের স্বার্থে তাদের মতামত চাপিয়ে দেয়ার চেষ্টা করে। কিন্তু যেখানে সরাসরি ও প্রত্যক্ষ যোগাযোগের সুবিধা থাকে, সেখানে এরকম ভুল করার কোন কারন নেই।
তাই, দ্রেজ ও সেন এর বক্তব্যে “গ্রামীন কৃষি শ্রমিক, গরীব চাষী ও ভাগচাষেিদর আয়ত্তে, অন্য সামাজিক গোষ্ঠীর সাথে সংঘাতে টিকে থাকার খাদ্য যুদ্ধে জিতে যাওয়ার মত ক্রয়াক্ষমতাবান মুদ্রা অধিকতর পরিমানে না থাকার কারনে খাদ্য প্রাপ্তীতেও তাদের অবস্থান হীনতার হয়ে যায়“–ধনতান্ত্রীক অর্থনীতির বাজার ব্যবস্থার এই ফর্মুলা- ধনতান্ত্রীক অর্থনীতিতে সঠিক হতে পারে। কিন্তু সকল সময়ে সকল সমাজব্যবস্থার এই ফর্মুলা প্রযোজ্য নয়। মুদ্রা অধিকতর পরিমানে না থাকার কারনটা খোঁজার জন্য সরজমিন উপাত্ত সংগ্রহ করাই সমীচিন। ১৯৪৩ সনের দুর্ভিক্ষের সময়ে গ্রামীন কৃষি শ্রসিকের (টার্মটাই প্রযোজ্য নয়, কারন আধুনিক কৃষিশ্রমিক বলতে যা বুঝায় তখনও এখানে তা গড়ে উঠেনি—-যা গ্রামাঞ্চলের কৃষিতে কমপক্ষে উঠতি ধনতন্ত্রের সুচক, অবশ্য তারা যদি শহুরে শিল্প ও গ্রামীন কৃষি অর্থ ব্যবস্থা নির্বিশেষ একই ধরনের টার্ম ব্যবহার করেন তা হলে অন্য কথা) হাতে দুএকটি পিত্তলেরকানা পয়সা ও দেখা যায়নি।
অন্যদিকে যুদ্ধ অর্থব্যবস্থার কারনে বৃটিশ সা¤্রাজ্যের স¤্রাটের মাথঅর ছাপ মারা মুদ্রার প্রচুর সঞ্চালন ঘটেছিল ঠিকই কিন্তু তখনো বাজার অর্থ ব্যবস্থার তেমন বিকাশ ঘটেনি, যেমনটার ভিত্তিতে দ্রেজ ও সেন তাদের, বিভিন্ন শ্রেনীর বা সামাজিক গোষ্ঠীর কাছে ক্রয়-ক্ষমতা বৃদ্ধিকারী মুদ্রার কম বা বেশী সরবরাহের প্রতিপাদ্য বিশ্লেষন করেছেন। খন মার্কেট মেকানিজম তেমন বিকাশ লাভ না করলেও তখনকার পরিস্থিতির গতি নিয়ন্ত্রনে ধনতান্ত্রীক মার্কেট মেকানিজমই যে একমাত্র দায়ী ফ্যাক্টর, পয়তাল্লিশ বছর পরে (১৯৮৮) তারা তা প্রমান করার চেষ্টা করেছেন।
জমিদারী জোতদারী মহাজনী ব্যবস্থার কারনটাকে অনুল্লেখ্য রাখাই প্রয়োজন মনে করেছেন। যদিও ১৯৩৮ সনে বাংলার ফজলুল হক মন্ত্রসভা বৃটিশ আমলা মি: ফ্লাউডকে প্রধান করে কৃষিসংস্কার সংক্রান্ত একটি কমিশন নিয়োগ করেছিলেন, যে কমিটি বাংলায় দুর্ভিক্ষসহ সকল অঘটনের কারন জমিদারী প্রথসহ সকল মধ্রস্বত্বব্যবস্থা বিলোপের সুপারিশ করেন। (বর্তমানে সারা দুনিয়াতে একাডেমিক বুদ্ধি জীবির মার্কস ও এঙ্গেলসের চিন্তাধারার উল্ল্যেখকে বা তাদের চিন্তাধারার রেফারেন্স দেয়াকে আধুনিক জ্ঞান চর্চায় অনিরপেক্ষতার দোষে দুষ্টু বলে বিবেচনা করেন। অথচ নিজেরা কিন্তু তাদের বিবেচনায় নিরেপেক্ষ অথবা মার্কসবাদ-বিরোধী ইত্যাকার সকল লেখকদের রচনা থেকে নির্দ্বিধায় রেফারেন্স দিয়ে থাকেন। মার্কসের উল্লেখ তারা করেন শুধু মার্কসবাদকে খন্ডন করার জন্য। এগুলো করতে গিয়ে তারা একটা বস্তু অস্বীকার এলোমেলো অর্থব্যবস্থা। শহরাঞ্চলে স¤্রাজ্যবাদী অর্থব্যবস্থার সংঘাতে সৃষ্ট যুদ্ধ অর্থ ব্যবস্থা তার প্রভাবের মধ্র দিয়ে বজার অর্থনীতির বিক্রিয়া ঘটেছিল। অন্যদিকে, পাতিসামন্ততন্ত্রের অবশেষে ধুঁকে ধুঁকে মরতে গিয়েও তার শোষনের নখ দস্ত বিস্তার করে শোষীতের অর্ধমেতদেহের রক্ত শুষে নিয়ে আরো কিছুকাল আরামে বেঁচে থাকার চেষ্টা করে। এরকম পরিস্থিতে দুর্ভিক্ষের কারন খুজতে গিয়ে বিশ্লেষন পদ্ধতি সরলীকরনের নামে উৎপাদন ব্যবস্থার মূল বৈশিষ্ট্যর উল্লেখ (সামন্তবাদের অবশেষে অথবা প্রাক পুজিঁবাদী ইত্যাদি) এড়িয়ে চলার চেষ্টা করা হয়। এরকম প্রয়াস অমর্ত্য সেন বাংলাদেশের ১৯৭৪ এর দুর্ভিক্ষ সম্পর্কেও করেন। কিন্তু ১৯৪৩ থেকে ১৯৭৪। মাঝখানে একত্রিশ বছরের ব্যবধান। এ সময়ে উপমহাদেশে যুগান্তকারী তথা নাটকীয় সব ঘটনা ঘটে যায়। উপমহাদেশ দুভাগ হয়ে ভারত ও পাকিস্তন নামে স্বাধীনতা লাভ করে। তেভাগা আন্দোলন, তারপর ১৯৫০এর শেষ দিকে জমিদারী উচ্ছেদ হয়। পূর্ব বাংলার কৃষকশ্রমিকের স্বার্থ সংবলিত কর্মসূচী নিয়ে সশস্ত্র স্বাধীনতা সংগ্রামকারী সিরাজ সিকদারকে ১৯৭৫ সনে হত্য করা হয়। ১৯৭৭ সনে পশ্চিম বাংলার বর্গাস্বত্ব আইন কায়েম হয়। উল্লেখ্য যে ১৯৬৭ সনের পর আজ পর্যন্ত পশ্চিম বাংলার কোন বড় ধরনের খাদ্যাভাব হয়নি।
বাংলা অঞ্চলে ক্ষুদার বিরুদ্ধে পাবলিক এ্যাকশন এই হল রুপ এবং ক্রিয়া ও প্রতিক্রিয়া। এই ক্রিয়া ও প্রতিক্রিয়ায় পেটি-ফিউডাল ও পেটি-বুর্জোয়া মালিকশ্রমিক সবসময় চেষ্টা করে তাদের মালিকানা স্বার্থ বজায় রেখে কৃষকশ্রমিকের সাথে সংঘাতের প্রশ্নটা সাইডট্র্যাক করে বিদ্যমান উৎপাদন ব্যবস্থা ও তার সামঞ্জস্যহীন স্বার্থ বজায় রেখে কৃষকশ্রমিকের সাথে সংঘাতের প্রশ্নটা সাইডট্র্যাক করে বিদ্যমান উৎপাদন ব্যবস্থা ও তার সামঞ্জস্যহীন অনপনেয় ক্রটিটাকে আড়াল করে রাখতে। বিদ্যামান ার্থব্যবস্থাকে বদল করতে নয়,তাকে অন্ততপক্ষে আরো কিছুকাল টিকিয়ে রাখতে। সর্বশেষ বিশ্লেষনে দ্রেজ-সেন উভয়ই মালিকশ্রেনীর স্বার্থব্যবস্থা রক্ষা করার দর্শনে অংশীদার। সারা গরীব দুনিয়ায় ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র মানুষদের কছে ইউরোপ-আমরিকার ধনীকদের ছাড়িয়ে দেয় ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ঋণ লগ্নী-ব্যবসার তত্তাবধানকারী অসরকারী সংস্থাগুলো তাদের ঋনকর্মসুচীর ট্যাবলেট, সুগার-কোটেড কুইনাইন রুপে নয় দেশীয় কলার ভেতরে পুরে(পরিবার পরিকল্পনা,প্রথমিক স্বাস্থ্য পরিজর্য্যা গণস্বাক্ষরতা ইত্যাদি দেশীয় কলা) দেশী গরীব মানুষদেরকে গেলায়। তাদের ক্রয়ক্ষমতা বাড়ানোর চেষ্ট করে। তাতে অবশ্য জ্বরসারেনা। ধিকি ধিকি জ্বর বাড়তেই থাকে। অমর্ত্য সেনদের নিরব দুর্ভিক্ষ বজায় থাকে। এখানেই পুরাতন পাতি-সমন্তবাদী এবং নতুন পাতি-ধনিক উৎপাদন ব্যবস্থা উচ্ছেদের প্রশ্নকে পাশ কাটিয়ে গিয়ে ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধির আর্থীক দর্শণের তাৎপয্য নিহিত।
পাতি-সামন্তবাদী ও পাতি-ধনিকরা াামলাতন্ত্রকে তথাকথিত দক্ষ জনশক্তি সরবরাহ করে। এদের উপরের স্তরের অধিকাংশই সা¤্রাজ্যবাদী নীতি ও কর্মধারার সাথে হাত মিলিয়। অমর্ত্য সেনের ক্রয়ক্ষমতা এবং এন,জি,ও দের ঋণ বিতরন কর্মসুচী সা¤্রাজ্যকাদী নীতি ও কর্তধারার পরিপুরক। জোতদার ও ধনী কৃষক শ্রেনী থেকে আগত তথাকথিত দক্ষ (কিন্তু ইউরোপীয় ইকনমিক কমিশনের সদস্য দল কর্তৃ ব্যবস্থাপনায় অদক্ষ বলে অভিহিত) জনশক্তি তার বাহক।
৩. বিশ্বব্যাংকের ঋন সাহায্য কর্মসুচী বিজিত্র। তারা শুধু গরু মোটাতাজাকরন প্রকল্পেই সাহয্য দেয়না, তারা মানুষ মোটাতাজাকরন প্রকল্পে ও সাহায্য দিয়ে থাকে। তেমন একটি প্রকল্প হল গরীব মা ও শিশুর পুষ্টি উন্নয়ন প্রকল্প।
অপুষ্টি পেছনের কারন সমুহের মধ্যে সাধারন খাদ্যের দুস্প্রাপ্যতদা অর্থাৎ দরিদ্র শ্রমজীবিদের নিত্যকার সাধারন আদ্যের অবাব এবং তদার কারনে না খেয়ে থাকা বা উপবাস/অনাহার। অনাহারের কারন খাদ্য ক্রয়ে অক্ষমতা। অর্থাৎ শ্রমজীবিদের ক্রয়ক্ষমতার অভাব। ক্রয়ক্ষমতার অভাবের অর্থ হল শ্রমজীবিদের হাতে প্রয়োজনীয় প্রচলিত মুদ্রা না থাকা।হাতে টাকা/মুদ্রা না থাকা মানে না খেয়ে থাকা। গ্রামাঞ্চলের গরীব কৃষক ও প্রান্তিক চাষী এবং ক্ষেতমজুরের, কলকারখানার শ্রমিকের একদিন বা দেড় দিন এক বেলা খাওয়া। ক্ষেতমজুরের গতরাখাটানো ছাড়া কোন উপায় থাকেনা। অফসিজনে সে প্রায়-দন উপবানে থাকে হাড়-মাংস একসাথে টিকিয়ে রেখে বুকের ভেতরে ধুকপুকানি বজায় রাখার জন্য একটুখানি ঠাই দিলে সে গ্রামেই থেধকে যায়। সে বর্গাদাস হয়। উল্লেখ করা আবশ্যক যে, মজুরের সংখ্যা বিশালাকারে বেড়ে যাওয়া মানে পুঁজিতন্ত্রের প্রাধান্য নয়.. মুক্ত বাজার ব্যবস্থা ক্রমসস্প্রসারন নয়, গতরখাটানো মানেই নগদ অর্থ প্রাপ্তীর নিশ্চয়তা নয় এবং তার ক্রয়ক্ষমতার বৃদ্ধি নয়। গ্রাম ও শহরাঞ্চলে (গ্রামের লোকই শহরে আসে,অফসিজনে-কর্তিকমাসে,আবার ফিরে যায় অঘ্রান-পোষ মাসে) শ্রমজীবিদের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ার বিপরীত দেকের অর্থ এ-ও যে ক্ষেতমজুর,বর্গাদাস,প্রান্তিক চাষী কর্তৃক দর্যোগের সামনে নিশ্চিহ্ন হওয়ার আশংকা নিয়ে দিন গুনতে থাক। সাধারন খাদ্য সংগ্যহের জন্য ক্রয়ক্ষমতা মনেই পুষ্টি প্রাপ্তীর প্রাথমিক নিশ্চয়তা,ক্রমবর্ধমান ক্রয়ক্ষমতা মানে,পুষ্টি পরিপোষনের ক্রমবর্ধমান ক্ষমত। অতএব সাধারন শ্রমজীবিদের ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য অমর্ত্য সেন গুরুত্বারোপ করেন।শ্রমজীবিদের ইনসেনটিভ প্রদান এবং আসাড় অর্থব্যবস্থাতে ইনজেকশান পুশ করে শ্রমজীবি তথা শ্রমদাতাকে বাচিঁয়ে রাখার পরোক্ষ সুপারিশ করেন। মার্কসবাদীদের দ্বারা ব্যাখ্যায়িত প্রাক-ধনতন্ত্রের বিভিন্ন রুপসমুহ যথা পাতি-সামন্ততন্ত্র আধা- সামন্ততœ কিংবা সামন্তবাদের অবশেষসমুহ অথবা ধনতদন্ত্রকে উৎখাতের পক্ষে যুক্তি জোরদার না করে কিংবা তাকেকোনক্রমেই আঘাত না হেনে তিনি তার অথনৈতিক দর্শনকে দাঁড় করান। পুবোক্ত দৃষ্টিভঙ্গিতেই তিনি দারিদ্রোর বারনসমুহ(?) উদঘাটনের চেষ্ট করেন। তিনি নোবেল পুরস্করে ভ‚ষিত হন।
প্রাতিষ্ঠানিক পুরস্কার মেধাবিচারের মাপকাঠি হতে পারেনা। জ্ঞান ও বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে সকল মেধা,মনন ও অনুশীলনের ফলশুতি যে উৎপাদ তার অবিনাশী মুল্য রয়েছে, এটা সহে হারিয়ে যাবার নয়। এক এবং এক এর মধ্যে অথবা এক এবং বহু-র মধ্যে তুলনামুলক বিচার সর্বজন স্বীকৃত মানববৈশিষ্ট্য। মেধা,মনন ও অনুশীলন কে প্রশংসা করা ও পুরষ্কৃত করা ও সাধারন মানক বৈশিষ্ট্যের একটি। কিন্তু মেধা ও মননের ফলশ্রæতি উৎপাদ-কে পুরষ্ক্রিত করা বেদনাদায়ক মনে হয় তখনই যখন তা সামঞ্জস্যহীন প্রতীয়ম;ান হয়। ক্ষুধা, বঞ্চনা, দুর্ভিক্ষ ও দারিদ্রোর বিরুদ্ধে সারা পৃথিবীর মানুষ বিগত একশ বছরের তুলনায় আরও সওচতন হয়ে উঠেছে। এগুলো সামাজিকভাবে প্রতিরোধের জন্য সামাজিক দায়িত্ববোধ বিয়ে এগিয়ে আসার দাবী আর ও জোরদর হচ্ছে। সকল প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষমতাই জবাবদিহিতার সম্মুখীন হচ্ছে। যেখানে স্বাত্বাধিকারের পেছনের ভিত্তিটি অথাৎ সম্পত্তির মারিকানা নিয়েই কথাবার্তা বলছে/প্রশ্ন তুলছে মানুষ,সেখানে জীবনের সমন্যার সামগ্রীক দিক বিশ্লেষন বিবেচনায় না এরন খন্ড খন্ড ভাবে সমন্যার কার্যকারন বিশ্লেষনকে উপস্থাপন ও পুরুষ্কুতকরন সামঞ্জস্যপুর্ন নয়। এই সামঞ্জস্যহীনতার কারনে পৃথিবীর কোটি কোটি শ্রমজীবি মানূষ অসহায়ত্ব বোধ করে আর যারা একটু খোঁজ খবর রাখে তারা মনে করেন সম্পত্তির মালিকানা সমম্পর্কে প্রশ্ন তোলা হয়েছিল সম্পত্তিই চুরি (প্রæধো) এই কথা বলে। দেড় শত বছর পুর্বে কমিউনিস্ট পাটির ইশতেহারে মার্কস ও এঙ্গেলস বলেন “ কোন সমাজে একটি মানুয়ের কিছু অধিকার আছে,তার সামনে কিছু সুযোগ আছে। এই সব অধিকার ও সুযোগ কাজে লাগেয়ে সে পণ্য উপভোগ করতে পারে বিভিন্ন পণ্যগুচ্ছ থেকে নিজের পছন্দ মত একটি গুচ্ছকে বেছে নিতে পারে। এই গুচ্ছগুলিকেই স্বত্বাধিকার হিসাবে ভাবা যায়। যেখানে অর্থনীতি পুরোপুরি বাজারভিত্তিক,সেখানে স্বত্বাধিকারের স্বরুপ বোঝানো খুব সহজ। মনে করা যাক, কোনও ব্যাক্তি তার শ্রম এবং অন্যান্য বিক্রয়যোগ্য পণ্য বিক্রয় করে ২০০ ডলার অর্জন করতে পারে। সেক্ষেত্রে ওই ২০০ ডলার বা তার চেয়ে কম দামী কোন পণ্যগুচ্ছই তদার স্বত্বাধিকারের মধ্যে পড়বে। এ ধরনের যে কোন গুচ্ছই সে কিনতে পার বিন্তু তার বেশী দামী কোনও গুচ্ছ কিনতে পারে না। এই সীমাটি নির্ধারিত হবে দুটি ভিত্তিতে…তার মালিকানা এবং তার বিনিময়ের সুযোগ (বিনিময় স্বত্বাধিকার)।
এই দুই এর ভিত্তিতেই তার সামগ্রিক স্বত্বাধিকার নির্ধারিত হবে। এই স্বত্বের ভিত্বিতে ব্যক্তি কয়েকটি সক্ষমতা অর্জন করতে পারে,অর্থাৎ কোন কিছু করার সক্ষমতা(যেমন পুষ্টি বিধানের সামর্থ্য), আবার অন্য কয়েকটি সক্ষমতা অর্জনে ব্যর্থ হতে পারে।”(দ্রষ্টব্য: জীবনযাত্রা ও অর্থনীতি গ্রন্থের পৃষ্ঠা ৯৪।স্বত্বাধিকার ও সাক্ষমতা।)বাংলাদেশ এবং তদৃতীয় দুনিয়ার দেশগুলিতে যেখানে শতকরা আশি জন লোকেরই সম্পত্তি এবং ক্রমক্ষীয়মান শ্রমক্ষমতা ছাড়া কোন কিছুরই মালিকানা নেই সেখানে তাদের কী হবে তার কথা কিছু বলা হয়নি।
পাতি-সামন্তন্ত্রের পুঁতিদুর্গন্ধময় আধমরা লাশকে বাঁচিয়ে রাখে ক্ষয়ে ক্ষয়ে যাওয়া পাঁচ অঙ্গকে স্পর্শ না করে পুরাতন উৎপাদন কাঠামোর অবশেষকে টিকিয়ে রেখে বিশ্বব্যাংকের নিকট থেকে টাকা কর্জ করে (১) ক্ষুধা থেকে মুক্তি ও অপুষ্টি দুরীকরনের জন্য গবেষনা প্রকল্প/কর্মসুচী বাস্তাবায়ন নামক ব্যবসা-বাণিজ্য অর্থাৎ মালকাড় কামাইয়ের ব্যস্ততা(বিজিনেস)পেটি-ফিউডাল-পেটি-বুর্জোয়া (মধ্যবিত্ত?) দের একটি নতুন ধান্ধ। বিদেশে চাকুরীখোঁজা ও আদম ব্যবসার পর এটি তাদের নবতর ধান্দাবাজি। কৈৗতুককর মনে হলেও এ কথা সত্যি যে আজ থেকে পঞ্চাশ ষাট বছর পুর্বে ট্রেনে,লঞ্চে, স্টীমারে হকার/ফেরিওয়ালার স্বাস্থ্য ভাল করার পোষ্টাই াড়ি বা ভিটামিন টেবলেট ফেরি করে বেড়াতো। এখন হাতুরে অপচিকিৎসার মিথ্যা প্রচারনা আর নেই।
বিশ্বব্যাংক কর্তৃক প্রদত্ত ঋণ ব্যবস্থার মাধ্যমে পুষ্টি কর্মসুচী বাস্তবায়ন করে মানুষকে পুষ্প করে তোলা আর শ্রম ক্ষমতা বাড়ানোকে অত্যন্তকল্পনাবিলাসী পরিকল্পনা বলে ধরা যায়। বিশ্ব ব্যাংক একটা মহাজনী ব্যবস্থা। ধুরন্ধর ও কুটকৌশলী অর্থনীতিবিদ ও রাষ্ট্রনায়কবৃন্দ ছাড়া কারো পক্ষে,ঋন করে ঘি খাওয়া বাদ দিয়ে,কস্ট একাউন্টিং পদ্ধতি/প্রক্রিয়ার মাধ্যমে প্রতটি মুদ্রার যথার্থ সম্ভব নয়। বাংলা অঞ্চলের উৎপাদনের সাথে সম্পর্কহীন শাসকগোষ্ঠী(রাজনীতিবিদ ও বড় আমলা) এর যথার্থ ব্যবহারের দিকে কখনো মনেনিবেশ করেননি।
শতকরা নব্বই জন প্রান্তিক চাষী ওবর্গাচাষীকে সরকারী কোন ব্যাংক ঋন দেওয়া হয়না। (ক) কারন,তাদের কোন বৈধ দলিলপত্র নেই (খ) জমির মালিক যে কোন সময়ে তাদেরকে বদলিয়ে অন্য চাষীকে জমি দিয়ে দিতে পারেন। (গ) ঋনের ব্যাপারে অথবা আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবারে অনুপস্থিত ভুস্বামীদের বিন্দুমাত্র গরজ নেই।
একটি বাস্তব উদাহরন দেয়া যাক।
চাঁদপুর জেলা বিভিন্ন গবেষনা প্রকল্পে লালন ক্ষেত্র। চাঁদপুর জেলার একটি গ্যাম সুয়াগ্রাম। এখানে বিশ্ব ব্যাংকের সাহায্যপুষ্ট একটি পুষ্টি প্রকল্প পরিচালিত হয়। দুই বছরের কম বয়সী বাচ্চাদের চাউল,ডাইল,ধনে ভেজে গুঁড়া করে সয়াবিন তেল মিশিয়ে খাওয়ানো হয়। গর্ভবতী ও প্রসুতীরাও খান।
পোষ্টাই কর্মীর কাহিনী দিয়ে বক্তব্য াারও পরিষ্কর করা যায়।
নুরজাহরন একজন বিধবা। তার দুটি বাচ্চা। একটির বযস দুই বছরের নিচে আর একটি প্রায় দশ বছরের প্রাইমারীতে পড়ে। ১৯৮৮ এর বন্য পরবর্তী সংক্রামক ব্যাধিতে স্বামী মারা যায়।
জমি নাই। স্বামী বাড়ী বাড়ী থেকে ধান কিনে নিজ বাড়ীতে ঢেকিতে চাউল বনিয়ে হাটে বিক্রী করতো। স্বামীর মৃত্যুর পর নুরজাহানও কিছুদিন ব্যবসা চালিয়েছিল,কিন্তু বেশীদিন ব্যবসা চলেনি। পুষ্টির পরিচালকেরা বলেন,নুরজাহানের চাউল ডাইলের পুষ্টি-গুঁড়া বিক্রি করে সংসার টিকিয়ে রাখে। নুরজাহান চাউল-ডাইলের গুঁড়ার প্রস্তুত প্রণালী সকলকে দেখাতে গিয়ে মাটির চুলার উপরে চ্যাপটা পাতিলে টাউল ভাজেন। মরা আগাছার শুকনা খড়কুটা খড় খড় করে পুড়ে। নুরজাহানের দীর্ঘশ্বাসের সাথে মিশে যায়। এ দিয়ে তার সংসার চলেনা।
প্রতি বাড়ীর ভিটির পিছনে জংগলে মুক্তা বা মোস্তাক গাছের সারি।নিকানো উঠানে নতুন বোনা মাদুর। নুরজাহান মাদুর বোনে বিক্রি করে সংসারের খুঁটি ধরলেও অন্য আর-ও নয়টি ভুমীহীন মায়ের সাথে। মাদুর বিক্রী করে সংসারের খরচ উঠে আসে। পুষ্টি গুঁড়া বিক্রীটা করাটা উপরি পাওনা। মাসে একশ দেড়শ টাকা আসে। পুষ্টি কর্তাদের অভিমত …তদার চেয়ে বড় পাওনা হল যে…. নুরজাহন সরকারী কর্মসুচীর একজন কর্মী,সরকারী কাজের সাথ যুক্ত।এটা নাকি তহার একটা তৃপ্তি। সে আর্থ..সামাজিক ক্ষমতার অংশদিার। পুষ্টি গুঁড়া বিক্রীতে পয়সা না থাকলেও এমনকি সরকারি কাজ না হলেও এন-জি-ওদের সাথে চলাফেরা। গ্রামীন সমাজ বহির্ভুত শক্তির সাথে যোগাযোগ নুন-আনতে -পানতা ফুরায় জীবনে কিংবা দারেদ্রোর সমুদ্রে খড়কৃটা ধারে ভাসমান থাকার চেষ্টামঅলাক ক্ষমতায়নের স্বপ্নবিলাস।
মুস্তদাক গাছ যে জমিতে জস্ম নেসই জমির মালিক বাড়ীতে থকেন না,মোকামে থাকেন। মুক্তার পাটি উৎপাদনে খুব একটা স্বার্থ অথবা মনোযোগ তার নেই।তিনি জমি বিক্রী করে দিতে চান ঢাকা শহরে পুলিশ ডিপার্টমেন্টে চুকরি করে এমন এক সার্জেন্টের কাছে। তখন মাদুর বোনা তো দুরের কথা এক চিলতা মাটির উপরে একখানা ঘরে টিকে থাকাই মুশকিল হয়ে যাবে। তখন যে কি হবে… সেই কথা ভেবে নুরজাহন উদ্বীগ্ন হন।
উদ্বীগ্ন আমরা-ও।
শুকনা চাউল ঢেঁকিতে গুঁড়া করে অথবা চাউল ভিজিয়ে পানি ঝেড়ে ফেলে তারপর গুঁড়া করে পিঠা বানানো বাংলা অঞ্চলের মানুষের অভ্যাস। শুকনা চাল তপ্ত কড়াইয়ে ভেজে তারপর গুঁড়া করে নারিকেল ও গুর দিয়ে অথবা নুন মরিচ পেয়াজ/রসুন ও সরিষার তেল দিয়ে মেখে বিংবা চাল-সীমবিচি (ডালের ব্যবহার অনেক পরে হয়েছে) ধনে একসাথে ভেজে সরিষার তেল দিয়ে মেখে এক ধরনের তৃপ্তীকর জলখাবার/নাস্তা/পিঠাজাতীয় খারার তৈরী করা হয়। এগুলো বাংলঅর কৃষকের ঐতিহ্যবাহী খাবার। বাংলার কৃষকের ঐতিহ্যকে অনুসরন করে তাদেরকে পুষ্টি বিষঃয়ক ধারনায় সংস্কৃত করে তোলাই প্রকল্পের উদ্দেশ্য।
প্রকল্পের আদিতে সংশ্লিষ্ট জনৈক আদুনিক (ইউরোপীয়)- চিকিৎসা-শাস্ত্রজ্ঞ মিডিসিন ও সার্জারীর কৃমার চিকিৎসাবিদ (এম বি বি ্স ডাক্তার) হাঠাৎ আবিস্কার করেন যে চালের গুঁড়ার সাথে তেল-গুড় ডাল ও ধানের সংমিশ্রন একটি উপাদেয় পুষ্টিকর খাদ্য তৈরী করা যায়।নিজেদের কাছে তো টাকা পয়সা নেই। তাই বিদেশীদের কাছ থেবে ধার-কর্জ করে ভুমীহীন কৃষকদেরকে পুষ্টিবান করে তোলার চেষ্টা চালানো হয়। এতে গ্রামীণ নেতৃবৃন্দ তথা পেটিফিউডালরাও খুশী,অনুপস্থিত ভুস্বামীরাও খুশী। তাদের জাতের লোকেরাই তো মানুষ মোআতাজাকরনের মহান প্রকল্পে নিয়োজিত। যা শক্র পরেপরে।
বাংলঅর হাজার বছরের সাংস্কৃতিরত খাদ্য হিসবে চালের বিভিন্ন ধরনের ব্যবহার প্রচলিত। চতুর্থ থেকে দশমশতক পর্যন্ত সময়ে যে খাদ্য সংস্কৃতি গড়ে উঠে, বাইরের বিভিন্ন প্রভাব সত্বেও কৃষকদের নানা অভাব অনটান সত্বে ও সে সংস্কৃতি আজো টিকে আছে। উনবিংশ শতান্দীতে সারা বিশ্বে ইউরোপীয় সংস্কৃতির প্রবল প্রতাপেও বাংলার খাদ্য চিকিৎসা ও পুষ্টি সংক্রান্ত সংস্কৃতি টিকে ছিল। তারপরে কালক্রমে আজ তা ক্ষীয়মান। ঋতুবৈচিত্র তিন ক্ষন বিবেচনায় খাদ্যের গুনাগুন বাছবিচার,পুষ্টি অপুষ্টি যাচাই, বাঙালীর জীবন-ধারানার একটি অংশ। কিন্ত যে উৎপাদন পদ্ধতি সেই জীবন-চর্চাকে ধারন করে রাখতো নেই (সামন্ততন্ত্র বা পাতি-সমন্ততন্ত্র) উৎপাদন পদ্ধতির অবশেষ টিকে থাকলেও উৎপাদন সম্পর্কে গুনে ক্ষমতাবান ও কর্তৃত্বশালীয়া উৎপাদনের সাথে বিচ্ছিন্ন হওয়ার কারনে পরজীবি হতে বাধ্য হয় বা পরনির্ভরশীল হয়ে যায়।
তারা নিজেদের শ্রেণীর ক্ষমতাকে টিকিয়ে রাখার স্বর্থে পুরাতন উৎপাদন সম্পর্কজাত বস্তুগত অবস্থা থেকে রস সঞ্চয় করেন, সুবিধা আদায় করেনা। অন্যদিকে বহির্দেশীয় সুযোগসুবিধা ও রস হতেও নিজেদের বঞ্চিত করতে গররাজী থাকেন।তারা বাহির্দেশীয় সাংস্কৃতিরও অনুরাগী।
এমতাবস্থায় বইরে থেকে আমদানীকৃত কর্নফøাউয়ার ও কৌটাজাত দুধ মাঝারী ও ধনী কৃষকর মা ও শিথুর ভোগ্যপন্য হিসাবে সমাদুত হয়। কারন,পাতি-সামন্ততান্ত্রীক শাসকগোষ্ঠীর কালচারকে চর্চা এস্তেমাল করাটা পাতি-সামন্ততন্ত্রী পাতি-বুর্জোয়া সংস্কৃতির প্রভাবধীন মালিক সমাজিক গোষ্ঠীর জাতে উঠার প্রমান বা স্ট্যাটাস সিম্বল।
এদেশে ইংরেজদের আগমনের পুর্বে(মুঘল আমলে কিছুটা এবং তৎপুর্বে আরো বেশী)বস্ত্রশিল্পের অসাধারন উন্নতি হয়েছিল,দেশীয় ঔষধশিল্পের বিকাশলাভ ঘটেছিল,দৈনন্দিন জীবনে জনগনের খাদ্যবস্তু প্রস্তুতে বৈচিত্র সৃষ্টি হয়েছিল। রুশ ঐতিহাসিক- সমাজবিজ্ঞানী গাবচেনবোর মতামত অনুুসরন করে (সার্বীকভাবে) বলা যায় এদশে মার্কেন্টাইল ক্যাপিট্যালিজমের সৃষ্টি হয়েছিল। ইংরেজ াামলে এসে তার গতি রুদ্ধ হয়ে যায়। বস্ত্র ও ভেষজ যেমন কুটিরশিল্পের চৌহদ্দী থেকে বেরোতে পারেনি,খাদ্যবস্তু ও ওতমনি পান্থশালার পথ অতিক্রম করে তাকে ছাড়িয়ে যেতে পারেনি। ইংরেজরা নিয়ে আসে আধুনিক কারখানা বস্ত্র, ইউরোপীয়েরা নিয়ে আনে খাদ্য,রুচি ও পোষাক-পরিচ্ছদ। বিপণনার্থে,সামাজিক শ্রমে(সমপরিমান সময় ও শ্রম) বিপুল পরিমানে প্রস্তুত বাদ্যাসামগ্রীক আমাদের শহর ও নগরের বাজারগুলোতে আসে। তখনো আমাদের বুড়োবুড়িরা নাতিনাতনিদের টুনটুনি পাখীর পিঠাতৈরীর গল্প শুনিয়ে যান।
চাষী ও কৃষকশ্রেনী এবং উৎপাদন সম্পর্কের প্রত্যেক্ষ ও কর্তুত্ববান সম্প্রদায় তৈরী করে খাদ্যসামগ্রী। কিন্তু সেটা ব্যক্তিগত পর্যায়ে ও উদ্যোগে। কোয়ের্সিভ অথরিটির সাথে উৎপাদন এর ক্ষীনসুত্র যখন ছিন্ন হতে থাকে তভন কৃষকের বৈচিত্রময় উৎপাদন মালিকশ্রেনীর একটি অংশের (উপরতলায়)সমর্থন হারায়। পরগাছারা ঝুঁকে পড়ে বাহিদেশীয় শাসকের সংস্কৃতির প্রতি। বহির্দেশীয় সংস্কৃতি অনুপ্রবেশের পথ খোঁজে পায়। বাঙালী বৌ-ঝিদের তৈরী ধান-মাছ-সবজীজাত পিঠাপুলী মার খায়।কৃষকরমনীর হতের কুশলতা যন্ত্রের কাছে হার মেনে যায়। আবহমানকালের পরিচিত ভাদ্য ও পুষ্টির ধারনা পরাজিত হয় এবং কালক্রমে বাঙালীর মন থেকে মুছে যেতে থাকে। দেশীয় পদ্ধতিতে খাদ্য ও অখাদ্য বিচার,রোগ প্রতিরোধক খাদ্য ও অখাদ্যের বিধিনিষেধ ক্রমান্বয়ে অবলুপ্তির পর্যায়ে চলে যেতে থাকে।
উৎপাদন ব্যবস্থায় ক্ষুদ্র ধনিকাদের দ্বারা নবসৃষ্ট কলকারখানাভিত্তিক সামাজীকৃত শ্রমের সাথে ব্যক্তিগত শ্রমের পরাজয়ের সুচনা হয়। কিন্তু তবুও পুরোপুরি পরাজয় মানেনা। গ্রামাঞ্চলে কৃষকের মাধ্যে প্রত্যক্ষ,সংকীর্ন কিনতু সৃস্পষ্ট ধারায় ব্যক্তিগত শ্রম টিকে থাকে। কৃষক সমাজের এক অংশ উভয়বিধ অবস্থাকে ধারন করে। কিন্তু ধনতান্ত্রীক বাজার-ব্যবস্থার যে নিয়ম বা শর্তগুলো নুতন একটি উৎপাদিত সামগ্রীক বাজারজাত হওয়ার জন্য সহায়তা করে, সে রকম শর্তাবলী শক্তিশালী না হওয়ার কারনে উপর থেকে চাপিয়ে দেয়া কোন আকাংখা বা প্রকল্পই বাস্তাবায়িত হয়না। কোন ব্যক্তি তার টাকাপয়সা বিনা লাভে খাটায়না। কিংবা অনিশ্চিত কোন লাভের জন্য টাকা খাটাতে সাহস পায়না। কোন দ্রব্যসামগ্রী উৎপাদনের পর মার্কেটিং একটি বিরাট সমস্যা। সুতরাং দ্রব্য উৎপাদন হলেই যে তা বেচাবিক্রি হতে থাকবে এমত আশা করা যায়না। এরকম পরিস্থিতিতে কান ব্যক্তিই বিশ্বব্যাংকের ঋন গ্রহন ব্যবস্থাকারীদের (!) পরিকল্পিত পুষ্টিগুঁড়া বানিজ্যিক ভিত্তিতে উৎপাদন কার্যক্রমে স্বতস্ফুর্তভাবে এগিয়ে আসেনা।যদিও পুঁজিবাদীদের (সা¤্রাজ্যবাদীদের) স্বার্থের বাস্তাবায়নকারী,বিশ্বব্যাংকের খাতাকদেশে বিযুক্ত ুপদেষ্টাদের,পরামর্শ ও সুপারিশ অনুযায়ী ব্যক্তিগত উদ্যোগে এবং স্বতাস্ফুর্ততার ভিত্তিতেই অর্থেনৈতিক কর্মকান্ড পরিচালিত হওয়া এবং শিল্প গড়ে উঠা প্রয়োজন। কিন্তু এ ক্ষেত্রে ঘটে তার উল্টোটা। বিশ্বব্যাংকের ঋণের টাকায় সরকারী উদ্যেগে পোষ্টাই উৎপাদনের ব্যবস্থা নেয়া হয়। সুতরাং বিশ্বব্যাংকের পুষ্টিগুঁড়া বানিজ্যিক ভিত্তিতে উৎপাদিত হয়ে মা ও শিশুদের চাহীদা পুরনে সমর্থ হবে এমন সম্ভাবনা খুবই বিরল।
এই হল বিশ্বব্যাংকের পোষ্টাই প্রকল্পের সারমর্ম।
ভুমির জন্য সঙগ্রাম সম্পর্কে একটা জরুরী কথা বলতে হয় যে ১৯৫০ সনে সরকার কর্তৃক জমিদারি ব্যবস্তা অধিগ্রহনের পর থেকে ভুমি মালিক শ্রেণী থেকে আগত রাজনীতিবিদরা আজ পর্যন্ত এ নিয়ে কোন আন্দোলন গড়ে তোলেননি।

সাইফ শোভন, চিফ রিপোর্টার,ঢাকা নিউজ২৪.কম