দান বাক্সের তালা – হোসেইন মুস্তাফা

দান বাক্সের তালা – হোসেইন মুস্তাফা
হাওলাদার সাহেব এই পয়সার হাটে ‘আগমন’ করবেন মূহুর্তের মধ্যেই এ কান হতে সে কান, এ গ্রাম হতে সে গ্রাম খবরটা ছড়িয়ে পড়ল।
এ খবর বুরহান মাওলানা ও পেয়েছিলেন। হাওলাদার এর আমার উদ্দেশ্যে অজানা থাকেনি কারো। বুরহান মাওলানার ও নয়। নবীউল্লার পাটের গদিতে শুয়ে শুয়ে এ সকল কথাই টিন্তা করছিলেন মওলানা।
দাদার কবর পাকা করার ইচ্ছা হাওলাদার এর বাপের বহুদিন কার। কিন্ত সময়ে আর সুযোগ এর অভাবে তা আর হয়ে উঠেনি। বৃটিশের রাজত্ব শেষ হলো। পাকিস্তান ভেংগে গেলো। বাংলাদেশ বানানোর পর শেখের রাজত্বের অবসান হলো। রাজধানীর বাংলো বাড়ীর নির্জনতায় বসে আশা আকাংখার দোলায় দোলায়ীত মনে ফিরে তাকালেন পিছনের দিকে হাওলাদার সাহেব। প্রতিষ্ঠার নিশ্চয়তাকে পাকাপোক্ত করার কামনায় বৃক্ষের প্রসারীত শিকরের দৃড়তাকে আরও দৃঢ়মূল করার বাসনায় দাদার কবরটাকেও পাকা করার জন্য উৎসাহী হয়ে উঠলেন। কবর পাকা করা ইসলামী বিরোধী হলেও এর অন্যরকম সে আর একটা ফজিলত আছে তা সবিস্তারে বয়ান করলেন মওলানা খন্দাকর বুরহান উদ্দিন সাথে সাথে একটা কিন্তুর জিজ্ঞাসা চিহ্ন দিয়ে তাকিয়ে রইলেন হাওলাদার এর দিকে। হাওলাদার সাহেবের প্রশস্ত লক্ষে মেঘও রৌদ্রের ছায়া খেলে গেল। আশা ও আনন্দের এক উজ্জ্বল আভা ছড়িয়ে পড়ল বিলিতি বেøড ছিয়ে সেভ করার সারা মুখ মন্ডলে। সমর্থন ও প্রশ্রয়ের ভংগীতে দামী বিদেশী চুরুটের শেষ ছাইটুকু ছাইদানিতে ঝেড়ে ফেলে আড়মোরা ভেংগে বসলেন ইজি চেয়ারে।
কিন্তু কবর এরকম বহুতই পাকা হয়। সিমেন্টের প্রলেপ পুরনো হয়। শেওলা জমে আগাছ জন্মে। এক কোনার একটি ইট খসে পড়ে। তারপর বেরমে বেইমান আলোচকদের দের হামলায় ভেঙেঁচূরে পাশের পথের ধুলার সাথে গড়াগড়ি খায়। পাকা কবর থেকে খসে পড়ে ইটগুলো। গাছের নিচে পথচারীরা ইটের উপর বসে বিশ্রাম নেয়। না এরকম পাকা করার কোন মানে হয়না। বরং সাথে যদি একটি মসজিদ থাকে। গেরামের মুসুল্লিরা, সড়কি দিয়ে আনা গোনা করা নামাজিরা এখানে নামাজ পড়বে। একটু বসে জিরোরে আল্লাহ রসূলের নাম নেবে। কবরটা দেখে একটু দোয়া দরুদও পড়বে। কবর টাও অটুট থাকবে! মানুষের দোয়াকালামের বরকতে কবরে শায়ীত মানুষটার রুহও কবরের আজাব থেকে একটুখানি আসান পাবে। হায় রে আজাব! কি দারুন আজাব! আল্লার বান্দা যদি কবর থেকে উঠে আসতে পারতো, তাহলে হয়তো বলতে পারতো কবরের আজাব কি ভীষন। কোন মাপ নেই, কোন ক্ষমা নাই। আমীর থেকে ফকির হোক কারেন কোন রেহাই নেই। শুয়ে মাটির সাথে মিশে থাকে। এই মাটির বিছানায় শুয়ে মাটির সাথে মিশে যেতে হবে। ইন্নালিলাøহে ওয়া ইন্না ইলাই হে রাজেউন। মাটির ধুলায় তৈরী মানুষ, ফিরেও যাবে সেই মাটিতেই। বিন্দুমাত্র গুনাহ থাকলে এই কবরের মাটিতে শুয়ে তাকে আজাব পেতেই হবে।
আবুল হাসনাত হাওলাদার এর দাদা মকিম হাওলাদার তার থেকে রেহাই পাবার নন। গ্রামের লোকজন এখনও বলে মকিম হাওলাদারের নাম সাতবার আওড়িয়ে গরুর গা-য়ের ঘায়ে ফুঁ দিলে ঘা এর পোকা ঝরঝর করে যায়। সাতদিনেই ঘা ভালো হয়ে উঠে। বিষে বিষক্ষয়। গরুর শরীরের রক্ত-রস- চোষা পোকা মানুষের রক্ত – চোষা রস-নিংরানো সুদখোর ‘মকি’ মহাজানের কাছে হার মানে। জায়গায় ছেড়ে দেয়, সেই সুদখোর মকি মহাজন জীবনে নিশ্চয়ই কোন সওয়াব কামিয়েছিলেন। যার জন্য তারই মাটির কবরের উপর পাকা কবর তৈরী হয়। তারই কবরের পাশে মসজিদ তৈরী করার চিন্তা ভাবনা করে মানুষ।
মকি মহাজন তার আপন ফরজদন্দের মানুষ করে ছিলেন। তার জন্য যথাসাধ্য করে গিয়েছিলেন, যথেষ্ট রেখেও গিয়েছিলেন। দুই তিন পুরুষ হিসাব কিতাব করে আজীবন ভোগ করে খেয়ে গেলেই কিছুতেই এ ধন দৌলত ফুরাতে পারবেনা। মহাজনের দিলের খায়েশ পুরা করেই তৈরী হয়েছে ফেরেশতার মতো এই ফরজন্দেরা। মহাজন ইন্তেকাল হয়েছেন কতকাল আগে। আম লোকের পক্ষে ভূলে যাওয়ারই কথা । তারই বিস্মৃত প্রায় কবরের উপরে চির স্থায়ীত্বের আচ্ছাদন দেয়ার জন্যে গ্রামের দিকে দৌরে এসেছেন খুবসুরত ফেরেশতার মতো মানুষেরা, তারই পরপুরুষ তারই ফরজন্দের ফরজন্দ আবুল হাসনাত হাওলাদার সাহেব। এ আচ্ছাদান বেয়াদব। বেইমানদের মুখের বানানো মিসাল আর অপবাদ-কে ঢেকে ফেলবার শক্তি রাখে। শক্তি রাখে তাদের মূর্খতাকে দমিয়ে রাখতে। আল্লাহ আলিমুল গায়েব। তিনি সবই জানলে ওয়ালা। কার মধ্যে কুফুরি আছে, কার মধ্যে নেই, তা তিনি সবাই জানেন। মকি মহাজন তার শেষ জীবনে আগে দাড়ি রেখে, পারে নামাজ পড়েছিলেন। না আগে নামাজ পড়ে, পরে দাড়ি রেখেছিলেন এখন সাক্ষি নেই, হাসনাত হাওলাদারের মনে নেই।
আল্লার তরফ থেকে রহমত নাজেল হয়। মাওলানা সাহেবের মনের খায়েশ ও আল্লার দরবারে কবুল হয়। আপাতত চেচিলের টিনের একটি ঘর দিয়েই শুরু হবে মসজিদ। প্রায় পনের ষোল বছর তিনি চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু পারেন নি। একাত্তর সনে গন্ডগোলের বছর আল্লার রহমতে মসজিদটি কয়েকদিইে পাকা হয়েছিলো। কিন্তু মুক্তি শয়তানদের হামলায় সে মসজিদটি এখন অকোজো হয়ে পড়ে রয়েছে। একাত্তর সনে দুষ্কৃতিকারীদের গন্ডগোলের সময় পাকিস্তানী সিপাহীরা মাগরিবের ওয়াক্তের পরই আল্লার ঘরে এসে আশ্রয় নিতো। নারায়ে তক্বির আল্লাহ আকবার আওয়াজে অন্ধকার রাত্রি মাঝে মাঝে আলোকিত হয়ে উঠতো। কাফেরের আত্মার বিট্কাল আর্তনাদ মাঝে মাঝে শোনা যেতো। মাঝে মাঝে কেবল-ঠি-ই-ই-ঝা। ঠি-ই-ঝা। তারপর সারা নেই, শব্দ নেই।
কত দুষ্কৃতিকারী কত মুক্তির রক্তে পিছনের গর্ত ভরে উঠেছে তার আর ইয়ত্তা নেই। মাওলানা সাহবে সাক্ষী, আর সাক্ষী আল্লাহ আলেমুল গায়েব। মনের একান্ত সংগোপনে এগুলো ভাবেন মাওলানা সাহবে আর ভয়ে অন্তরাত্মা তার শুকিয়ে উঠে। শিউরে উঠে সমস্ত শীরর। পাঞ্জাবীর নীচের শরীরে বুকে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমে যায়। গলা খাকায়ী দিয়ে উঠেন। গলার সরু পথ দিয়ে নেমে আসা অস্বাস্তিটাকে সরগর করে ঝেড়ে ফলতে চেষ্ঠা করেন। স্বগতোক্তির মতো বলে উঠেন, আল্লাহ তুমি পানাহ দেও” রহমানেুর রহিম পরম করুনাময়, দিন দুনিয়ার মালিক অবুঝ প্রাণীকুলের আশ্রায়দাতা আল্লাহতালা পরওয়ার দেগার অবশ্য তাকে আশ্রয় দিয়েছিলেন।
যেমন আশ্রয় দিয়েছিলেন আরও অনেককে। গোকুল দাস এবং বউটাকে পাকিস্তানি সিপাহীরা যখন ধরে নিয়ে এলা গোকুল দাস এর সতের বছরের ছেলেটা কে না পেয়ে। মাওলানা এগিয়ে এসেছিলেন। কলমা পরিয়ে নাম রাখলেন ফাতেমা খাতুন। সিপাহীরা বেশী দিন জেরা করেনি। মসজিদের পিছনকার কুচুরির গোপন কয়েদখানায় কদিন রেখেই ছেড়ে দিল। গাঁয়ে ফিরে যাওয়ার উপায় ছিল না। অগত্যা মাওলানাই তাকে আশ্রয় দিলেন। পানি আনতো, রান্না করে দিতো। মাওলানার খাট মেরামত করতো। পরিবার তখন দেশের বাড়ীতে। শ^শুড় হাতেম খাঁ চেয়ারম্যানের নিরাপদ আশ্রয়ে। আত্মায় ভেতরেও আত্মা থাকে। তার ভেতরেও থাকে আর একটি কুঠুরি । সেই কুটুরির ভেতরে চোখ বন্ধ করে থাকে যে আত্মা। তার খবর আল্লাহ আলেমুল গায়েব এ অনেক সময় রাখেন না। সেই আত্মা মাঝে মাঝে ভাবেন। ফাতেম খাতুন যে আদব করতেন, আর ফাতেমা খাতুন অঝোর ধারায় কাঁদতে থাকেন। হালকা পাতলা তুলার মতো পরোম পাখিটা পোষ মানেনি। একদিন খাঁচা ভেংঙ্গে পালিয়ে গেল।
মুরগী খাঁচায় ঢোকাতে ডেঁকরিগুলো কঁক-কঁক-কঁক করতে থাকে। জোরে জোরে আওয়াজ তারপর লুটপুটানি আওয়াজ বন্ধ হয়। মাওলানা টের পান। এ পাশের ঘর থেকে সব শোনা যায়। দেখাও যায়। বেশী বয়সের যেগুলো। সেগুলোর আওয়াজ এক রকম। কম বয়সের গুলো আর এক রকম। বুড়ীগুলো গালমন্দ করে। বদদোয়া দেয়। ওরা বিশ^াস ই করতে পারে না। ওদের লাশ এর মতো শরীর নিয়ে পাগলা কুত্তাগুলো টেনে-হিঁচড়ে একাকার করবে।
কিন্তু হারামজাদী কমিন কমজাতের বাচ্ছাদের তেজ কমেনা। নটি মাগীরা ছাড়া পায়। কিন্তু ফিরে আসেনা। তত্তবা তাগীদ করে নয়া জিন্দেগী শুরু করার কথাও তাদের মনে থাকে না। আল্লাহ এদের রুহে ফোহর মেরে দিয়েছেন। নসিমুত শুনেনা। বানেছা বেওয়ার দুই দিনের সেবা-সোহাবত মনে আছে। কিন্তু মেয়ে মানুষ শয়তাদের দোসর। আদমের বেহেশত ছেরে দুনিয়াতে আমার জন্যে এরাই দায়ী। বেরহমে দীল কান্দো রেওয়া সেই যে গেল আর এলোনা।
আল্লাহ তাআলা পরওয়ার দেগার অযশ্য তাকে আশ্রয়ও দিয়েছিলেন। তা না হলে বেরহম বেদীল বেইমান আবু জেহেলদের হাতে অবশ্যই তাকে তার জান বিনা হাদীয়ায় দিয়ে দিতে হতো। আরও কিছু দ্বীনি আলেমদের সাথে কয়েক মাসের জন্যে রয়ে গেলেন। চলে গেলেন পার্বত্য চট্টগ্রামে। ঘুরে বেড়ালেন পাহাড়ের জংগলে বনে বাদারে। আল্লার কি অসীম করুনা। নয়ন ভরে দেখলেন আশরাফুল মাখলুকাতের অপর মহিমা। বারে বারে আওড়ালেন আয়াতুল কুরসী। আল্লার দীলে রহম পয়দা হলো। বাড়ীর জমি বিক্রি করার পয়সায় হুলিয়া উঠে গেলো। কিন্তু ভয় কি তখনো যায়। শয়তানগুলি তখনো তখতে তাউসে প্রবল প্রতাপে সমাসীন। গনিমতের মালগুলো কাড়াকাড়ি করে নিয়ে গেলো, মজুতদাররা ঘরের চালের এক ফালি টিন ও অবশিষ্ট রইলোনা। অতএব আরও বছরখানেক ঘুরে বেড়ালেন তাবলীগ জামাতের সাথে।
যখন ফিরলেন, আল্লাহর ঘর মসজিদ তখন স্তব্ধ হয়ে গেছে। মসজিদের সুউচ্চ মিনার থেকে আল্লার মহান নাম আর আকাশে বাতাসে ধ্বনিতে হয়না। কারিগর আর হাইল্লাপাড়ার জোলা চাষরা ছনের আর একটি ছাপড়া তৈরি করে। তাতে কেবল শুক্রবারের জুম-আর নামাজ আদায়ের ব্যবস্থা করে ছিল। খারেজী মাদ্রাসায় গু-অম পড়া খালেক মুন্সী নামাজ পড়ায় সেই জুম্মাঘরে। উনি কী রকম নামাজ পড়ান। তাতে বেশ ভালো করেই জানেন খন্দকার মওলানা বুরহানউদ্দীন। আল হামদুর সুরাটাই যার ভালো করে ইয়াদ করে পড়তে পারে না। তারা মসজিদ তৈরী করে পাঁচ পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়বে। আবু জাহেল আর কাকে বলে। আসলে এটি মসজিদ নয়। আড্ডাখানা। জহর, আছর, বাদ মাগরেব মসজিদের নিকটের আমতলাটায় আড্ডা জমে উঠে। আর যতো দুনিয়াবি বিষয় আশয়ের গুলজারে ভরে উঠে। দু-একজন অবশ্য নামাজ আদায়েরর চেষ্টকরে, সেটা তো আর নামাজ নয়। নামাজের নামে রিয়াকারী।
হাইল্যা জোলাদের এই বাসায় একিদন ঝগড়া যায়। ব্যাপরটা দ্বীনের নয়, দুনিয়ার। মসজিদের কোন ব্যাপার নয়। নিতান্তই পার্থীব স্বার্থের ব্যাপারে জমি নেিয় দরবার আর তার থেকে ঝগরাঝাটি মারামারি। শেষ পর্যন্ত মাথা ফাটাফাটি।
নিতীশ দাস এর জমি জাল দলিলের জোরে দখল করছিল কেরামত খাঁ। কেরামত খাঁ আপন এবং পেয়ারের লোক হলো তার বর্গাচাষীরা। নিতীশ দাস ইন্ডিয়া থেকে ফিরে এসেই জমি বিক্রি করে দিল আফজল চেয়ারম্যান এর কাছে। আফজল চেয়ারম্যান আমলীগের লোক। কবজীর জোর তার অনেক বেশী। পুরনো বর্গাচাষীর আবার ভীর জমালো চেয়ারম্যানের বাইর বাড়ীর উঠানে। চাষীরা আগুন-দিয়ে খেদানো বাঘের মতো। জমির আশায় দিওয়ানা হয়ে উঠলো। হায়রে জমির নেশা, হায়রে দুনিয়াদারি লোভ। এদুনিয়া কয় দিনের। এই জমিই কয় দিনের। সারে তিন হাত মাটিই তো মানুষের সম্বল। আর এই জমির লাগি কত মারামারি কত কাটাকাটি কত ঝগরা ঝাটি। দুনিয়া ফানি হ্যায় । নিতান্তই অস্থায়ী এই ইহ জগত। মওলানা সাহেবের মন হুহু করে উঠে। আল্লাহর বান্দা বেইমান, বেরহম। আল্লাহ রহমানুর রহীম। আল্লাহ পানাহ্ দেও এই জেহেলদের।
পানির কল একটা জিনিস। আর তাই নিয়েই ঝগরা। আল্লা রসুলের নাম নাই। রোজা নাই নামাজ নাই। কালেমা কি জিনিসি তাও ভালো করে জানে না এই দেশের মানুষ। আদতে মানুষ না, সুরতে মানুষ। আসলে শয়তান। কামে আবু লাহাব, আবু জেহেল। নাসারাদের নাগাল। পানির কল লয়ে টানাটানি। বেইমানদের দেশে আল্লা আর বৃষ্টি দিবে না। মনে হয়, না।
মওলানা গিয়েছিলে পাওয়ার পাম্প ৩য় জল্লাদের কাছে। ফসল উঠার পর প্রত্যেক পাওয়ার কল থেকে একশ টাকা কের চাঁদা দিতে হবে মসিজদের নামে। তাতে করেই পাকা ভিত্তি পাকা ছাদ গরে উঠবে আল্লার ঘরের। প্রস্তাবটি রাখলেন রহমান কেরানি। কথা মাটিতে পড়ার আগেই তর্ক শুরু হলো তর্ক তো নয়। কুতর্ক। কু-আলাপ। হৈ চৈ এর মধ্যে মতামতই ঠিক করে উঠতে পারলোনা। উপস্থিত লোকজন।
সকলের মধ্যেই ইদ্রিস আলীর কন্ঠই খুব উচ্চকিত হয়ে উঠলো। হায় আল্লা। পানাহ দেও আল্লা। এই ইদ্রিশ আলীই সেই ইদ্রিশ আলি, যে নাকি একাত্তরের গন্ডগোলের সময় এক ছেলেকে দিল মুক্তি ওয়ালাদের সাথে ডাকাতি শয়তানি করতে, যার কারণে আর এক ছেলেকে ধরে নিয়ে গেল পাকিস্তানি সিপাহী – রা, সে আর ফিরে আসিনি। (না আসারই কথা-কওমের সাথে দুশমনির করার ইনাম)। নিজে আর এক ছেলেকে নিয়ে জান-পরান বাজী ধরে কয়েক টুকরা জমি চাষ করেছিল। আল্লার কি কুদরত। ফসল ফলেছিল ভালো। কিন্তু হলে কি হবে গুহানগার আদমীরে আল্লা কখনো কোন দিনে কসুর করেন না। পাকিস্তানি বাহিনী সরে যাওয়ার আগে আগে ট্রেঞ্চ খুঁরেছিল তার ধানি জমিতেই।
চাষী ইদ্রিশ আলি হুংকারে মাঠঘাট প্রকম্পিত করে তুললো।
সুরুত আলি মেম্বার রাজি না হইলেও যত টাকা লাগে আমরা দিমু। দরকার হইলে দশ-বার জনে মিইলা, পারা দিগালি গেরস্ত একজোট কইরা হইলেও কল আনন লাগবো। টাকা তোলন লাগাবো। পানির সিচনের বিহিত করন লাগাবো
বাগরা দিলেন রহমান কেরানি।, হ কইছেন কথা ঠিকই মিয়া। বেং ও এক পাল্লায় উঠতোনা। দশ জন গেরছ ও এক মিল হইত না। রহমান কেরানির নিজের আলাদা মেশিন আছে। ইদ্রিস ও গোঁখার। হইবনা মানে । হইতেই হইবো। কেন্রে বাজান। ভাত খাওন লাগবো। ভাত জোগান লাগবো ন। রান্না হালুয়ার মতোন আপনি আপনি আইসা মুখে পড়বো। ভাত যদি পেটে দেওন লাগে। তাহলে এক ২জন লাগাবোই। মওলানা আর থাকতে পারলেন না, বলে উঠলেন।
তুমরা ক্যাবল ভাত ভাত কইরা মরলা, নামাজ রোজা করবা না। খোদা রসূলের নাম নিবানা। ভাত হইবো তুমগর আপনা-আপনি? আজ কয় বছর হয়ে গেল। এই গেরামে একটা ভালো মসজিদ নাই। ভাত তো খাইলা বহু বছর ধইরাই। আখেরাতের কাম তো করলানা কেউ। আখেরাতের লাগি কোন খাওন ডা যোগায়া রাখছো কেডা ?
জমির শেখ সহসা বলে উঠলো, আরে রাখেন হুজুর। আপনের মসিজদের লাগি চিন্তা করন যাইবো পরে, পানির মেশিনের বেবস্তা কইরা লই। ধান না হইলে টাকা মিলব না। আর টাকা না হইলে মসজিদের চান্দা জুটব না।
হুজুরের মুখটা কালো হয়ে গেলা। জমি জিরাত তারো আছো কিন্তু তার ষষ্টিতে জমি চাষ করে না কেউ। জমি চাষ না করলে ও আল্লা কপালে ভাত জোটায়। শুনছেন মিয়ারা, হায়াত, মওত রিজিক দওলত সবই আল্লার হাতে। আল্লায় না জুটাইলে হৈ, চৈ কইরা ভাত জুটবোনা। জমি জিরাত আরো আছে- কিন্তু জমি জিরাতের জন্য তিনি দিওয়ানা নন।
কিন্তু রক্ত খেকো বাঘেরা নিজেদের মধ্যেই গর গর করতে থাকে।- মওলানার নসিহতের প্রতি কারো কান নেই। সমুর আলী পাওয়ার পাম্পের চালকের আসনের এবং পাওয়ার মেশিনের রক্ষনাবেক্ষনের দরকারে চালা ঘর তৈরীর প্রস্ত^াবটা সামনে নিয়ে এলো। অন্তরের কথা মেশিন ঘরে তাসের আড্ডার মতো সুবিধা আর কোথও নেই\ শোনার সাথে সাথে ইদ্রিস আলী ফের চিৎকার করে উঠলো। মানুষ ভাইয়ার বেডা থামুক। টাকা যোগানোর বাওি নাই। ভাইডারের দালান বান্ধনের যোগাল। কথা এলামেলো হয়ে আরও পরছিল। রহমান কেরানী সমাপ্তী টানতে চাইলেন। তিনিই ঠিক করে দিলেন। হুজুর আমরা এখন আর বেশি দিতে পারোনা। মসজিদ হাওলাদার সাহেব বানায় দিয়া গেছেন। বাকি কাজের জন্য আমরা একটা ব্যবস্থা কইরা দিতাছি। সাথে সাথে পয়সা আলোচনার একটা সহজ উপায়ও বাতলে দিলেন। তিনটি দান বাকসের একটি থাকবে খেয়া ঘাটে, একটি থাকবে খোদ মসজিদের সামনে আর একটি রাখা হবে যোগেন স্রা চায়ের দোকানের পাশে মজিবরের চায়ের দোকানের খুঁটিতে ঝুলিয়ে ।
মওলানা মনে মনে আল্লার কাছে পানাহ চাইলেন।
ব্যথাও পেলেন কিছুটা। ভেতরে ভেতরে আয়াতুল কুরসী তেলাওয়াত করতে লাগলেন। দিলের আরশীতে উদয় হলো আর এক চিন্তা। বিবিজানের পড়নের কাপড়টা পুরানো হয়ে গেছে। ঘরে ধান আছে মাত্র মন দেড়েক। বিকেলে হাটে আসতে হবে। অতএব আর দেরী করা চলে না।
কিন্তু শরীর শ্লথ হয়ে আসছিল। জোরে জোরে টেনেও পা চল্ছিল না।
দুই
অনেকদিন পর আল্লার ঘর মসজিদ তৈরীর একিট হিল্লে হলো। দান বাকসটি রাখা হলো রাস্তার কিানরে পয়সাার হাটে ঢোকার মুখে জগৎ কুন্ডুর চায়ের দোকান আর মজিবর এর সারের দোকনের মাঝামাঝি বাঁশের খুঁটিতে ঝুলিয়ে। বাকসটি ঝোলানো থাকে। নেয়না কেউ। চা – পিপাসুরা চার দোকানে ঢোকে। অজান্তেই নজরে পড়ে দানবাক্সে। দোকান থেকে বেরিয়ে যায় মনে হয় ইচ্ছে করে ভূলে থাকে। কুন্ডুর চায়ের দোকান অনেক দিনের । এর হিস্টোরি কইতে পারে আছির উদ্দিন মেম্বার। পয়ত্রিশ বছর ধরে মেম্বারি করা আছিরউদ্দি ঠাকুর। বৃটিশ আমল থেকেই একটানা ইউনিয়য়ন বোর্ডের মেম্বারি করে আসছেন আছিরউদ্দিন ঠাকুর। ছোট কালে যখন দাঁড়ি মোছ উঠে উঠে অবস্থা তখন পালিয়ে পালিয়ে এখানে এসে নতুন নতুন সিগারেট খেতো। খেতো বলা যায় না। শিখতো। সিগারেট টানতো আর খুক খুক করে কাশতো। দু এক পেয়ালা চাও খেতো। আর জগৎ কুন্ডু চিৎকার করে শ্যামলাকে ডাকতো। শ্যামলা অ শ্যামলা শালার পুত। এইহানে খারায়া থাকায় কি তামাশা দেহস। তোরে না কইলাম, ক্যাচরা পোলাপাইন গো লগে বেশী মস্করা করবিনা। এ ছিল পরোক্ষে ক্যাচরা পোলাপান দেরকে লগে বেশি মস্করা বেরবিনা’ এ ছিল পরোক্ষে ক্যাচরা পোলা পানদেরকে সাবধান করার শামিল । সেই ক্যাচরারা আজ বুইড়া হইয়া গেছে। কিন্তু কুন্ডু টি ষ্টল। যেখানে মোটা টিনের সাদা প্লেটে নীল রং এ হিন্দী ও বাংলায় লেখা গরম চা পান করুন। সেই কুন্ডু টি ষ্টলের জগত কুন্ডু আর নেই। সাইন বোর্ডের উপরে লাল রং-এ আঁকা চা এর কাপ থেকে যে ভাবে গরম ধোয়া উঠে। সে রকম ধোয়া এখনও চায়ের কাপের গরম চা-থেকে উঠে। কিন্তু তাতে সে রকম গন্ধ পাই। সে রকম কড়া মিষ্টি স্বাদ পাই। যে স্বাদের আমেেেজ ভোর থাকতেই মাইল খানেক দূর থেকে আসতে সকাল ও সন্ধ্যা, রোদ ও মিষ্টি কোন বাধা মানতোনা। চা বানাতো শ্যামলা আর লুকিয়ে লুকিয়ে সিগারেট সাপ্লাই দিতো। অতএব বয়সের সমতা সকল প্রার্থীকে সামাজিক কায়দায় কে ঘুচিয়ে দিতো। শ্যামলা জাতে ছিল বামুন। শ্যামলা চক্রবর্তী। সেভেনে ফেল করা শ্যামলাকে বন্ধুরা ক্ষ্যাপাত শ্যামলা চায়না বলে। শ্যামলার সাথে হর কিউলিসের গল্পে স্বাদেও গন্ধে মোহনীর হয়ে উঠতো কুন্ড ুটি ষ্টলের চা। হঠাৎ সম্বিত ফিরে আসে নগেনের ডাকে, মেম্বর কাহা, বাড়ীতে যাইবেন না। না চা দিমু আর এক কাপ।
একটা প্রবল দীর্ঘশ^াস বেরিয়ে আসে। বুকটা ও যেমন, মনটাও নরম হয়ে যায় তেমনি। না আর একটু বহি। রশীদ মেকানিক আইবো। তারে লয়া যামু আমাগোরে মেশীনটা দেখানির লাগি।
আছিরদ্দি মেম্বার বসে গায়ের চাদর মুড়ি দিয়ে গুটি শুটি হয়ে আরও ভালো হয়ে বসে।
যোগেনের পোলা নগেন ম্যাট্রিক পাশ করে চাকুরী না পেয়ে চায়ের দোকান চালায়। আছিরদ্দি মেম্বার নগেনের দিকে তাকায় আর চেয়ে চেয়ে দেখে। দেখে চালের দিকে, ঘরের দিকে, বেড়ার দিকে। চোখ পড়ে সাইন বোর্ডটার দিকে যেখানে হিন্দী ও বাংলায় লেখা ‘গরম চা পান করুন’ সব দেখা যখন শেষ হয়ে যায় তখন আপনা আপনি দোকানের বেড়া থেকে চোখ ফিরিয়ে নিয়ে দিগন্তের দিকে তাকিয়ে থাকে।
ভীর হয় সকালে আর সন্ধা হলে। এ গাঁয়ের মেম্বার, মাতবর, টাউট, বাটপার, ভদ্র, অভদ্র, জোলা, চাষী সকলেই এসে জড়ো হন ঠিক এ সময়টায়, আর সারাদিন থাকে ফাঁকা। রূপা গলে পড়া ঝিঁ ঝিঁ ধরা রোদে নীল আকাশের গায়ে চীলেরা যখন চিল্লী চিল্লী করে আওয়াজ তোলে তখন উদাস উদাস মন নিয়ে মাঝে মাঝে এসে বসেন আছিরদ্দি মেম্বার, আর হাঁ করা চোখ নিয়ে তাকিয়ে থাকেন দিগন্তের দিকে- যেখানে ভাসা আমনের হলুদাভ তরঙ্গঁ নাচতে নাচতে গিয়ে শেষ হয়েছে, এ নাচনের স্বপ্ন যখন শেষ হয়, নোনাজলের ভয়ে তখন আঁতকে উঠে মন। মন হিসাব করে আর শংকিত হয়। আজ তিন বছর ধরে নোনা পানির দানব চাষীর ধানে হামলা চালায় আর নিঃশেষে শুসে নিয়ে যায় মানুষের মুখের গ্রাস, পেটের ভাত টের পাওয়া যায় না। ধান ঘরে আসে প্রাণ আসেনা। কেবল কতদিন চোঁচা ছাড়া আর কিছুইনা। চাষী তবুও ভরকে যায়না, লড়াই করে, যেমন লড়াই করেছিল, একটুও ভয় না পেয়ে, ধান বুনেছিল পাক-বাহিনীর হামলার সময়েও।
একাত্তরের এপ্রিলে গান বোটে করে পাকবাহিনী এসে পুড়িয়ে দিল পয়সার হাটের অধিকাংশ দোকান। যোগেনের টি স্টল ও রেহাই পেলোনা। যোগেনও না। পরের দিন ভোরের বেলায় তিন মোহনার ধারে পাওয়া গেলো ভাসমান যোগেন কুন্ডুর মৃতদেহ। তখন সৎকার করার প্রশ্নই উঠেনা। যোগেনের বউ পোলাপান তাবৎ গোষ্ঠীসহ তখন পাড়ি জমিয়েছে এক অনিশ্চিতির উদ্দেশ্যে। সেই মুহুর্তে যোগনের চা-এর দোকান এর পোড়া টিনগুলো আর ‘গরম চা’ এর লাল সাঈন বোর্ডটি পাখনার নিচে আগলে নিয়ে এসে চুপি চুপি রেখে দিল বাড়ীর রান্নাঘরের চালের নীচে।
নগেনরা ফিরে এলো, সেই পোড়া টিন দিয়েই একচালা উঠিয়ে ফের চা-এর দোকান সাজাল।
চা-এর দোকান এর পিছনটায় ছাই-ছুতরা পড়তে পড়তে মাটি কালো হয়ে উঠেছিল। খুব পছন্দ হয়েছিল আছিরদ্দি মেম্বারের। এখানে একটা লাউ গাছ লাগালে, যা লাউ ফলবেরে নগেন। খাবি তো খাবিই, বেইচ্যাও কুল পাবিনা। তা শেষ পর্যন্ত আছিরুদ্দি কাহাই লাউগাছ লাগালেন। ভাতিজা কয়েকটা গেন্দা ফুল ছাড়া আর কিছু করতে পারলোনা। ‘দেখতে হইবো তো কার কাজ কারে সাজে আর অন্য লোকে লাঠি বাজে’।
আস্তে আস্তে সবুজ লক লকে লাউগাছ এক হাত দুহাত ছুঁই ছুঁই করে উঠে গেলো পোড়া টিনের চালে। পোড়া টিনের মাঝে মাঝে দু এক জায়গায় জং ধরার রং সে ঝাঁঝরা হয়ে গেছিল। প্রানের উন্মাদনায় বেহায়া লাউগাছ সেই ঝাঝরা ছিদ্র গুলোতে শুর ঢুকিয়ে ঢুকিয়ে ছেয়ে ফেলল সারা চাল। পোড়া কাল-লালচে ঝাঁঝরা চাল ছেয়ে গেল। ঢাকা পড়ে গেল সবুজের সমারোহে। লাউ-লতার সবুজ পুষ্ঠ ডগা আনন্দে আলহাদে নাচতে নাচতে চাল থেকে লাফিয়ে পড়তে চায়। বড় ডগা আরেকটি দোকানের সামনে দিয়েই কচি হাত বাড়িয়ে বাড়িয়ে চা খেতে আসা মানুষগুলোর মাথা ছুঁয়ে ছুঁয়ে চকচকে নরোম চোখে তাকিয়ে থাকে। কেবল খিল খিল করে হাসছে আর বাড়ছে, খেলায় খেলায় বাড়ছে আর হাসছে।
কি মনে করে আছিরুদ্দি মেম্বার উঠে দাঁড়ালেন। এগিয়ে গেলেন সামনের দিকে। তারপর হাত উঠিয়ে লাউগাছের ঝোলানো লতাকে চালের উপরে উঠিয়ে দিতে চাইলেন। ছাব্বিশ বছর আগে এক খিলখিল কবি শিুশুকে যোগেন কুন্ডু যেমনি দু হাত দিয়ে বাড়িয়ে মেম্বারের বাড়ানো হাতে তুলে দিতে চেয়েছিলেন। যোগানের বউ রাধারানী পাগলিনী আগলানো মুরগীর মতোই চিৎকার করে হৈ চৈ করে এগিয়ে এসেছিল। এই বুঝি তার শাবক হাত থেকে ফসকে পরে যায়।
গগেন বলে, না চাচা উঠাবেন না”। হাসে। হাসতে হাসতে রসিকতা করে। আপনার মা আবার খদ্দের গো মাথায় হাত দিয়ে দিয়ে আশীর্বাদ করতে চায়” মেম্বারও । দুশ শালার পেতে আমার মা, না তোর মা।
কিন্তু কথা মেম্বার শেষ হয় না।
সহসাই মওলানা বুরহান হাজীর হন। আচ্ছালামু আলায়কুম।
আলাইকুম আসসালাম। মেম্বার ফিরে এসে বসেন। “হুজুর ভালো আছেন তো” তুবরানো গালের ভেতর থেকে লটখটা দাঁতের ফাঁক দিয়ে কথাগুলো বের করে মেম্বার ঝিমোতে থাকেন। চা এর দোকানের খদ্দেরদের আলাপসালাপ মুহুর্তখানেক স্তব্ধ হয়ে থাকে। ভাংগা রেডিও যেমন আওয়াজের উচ্চকিত কাঁপুনিতে হঠাৎ করে মুহুর্তের জন্য বন্ধ হয়ে আবার শব্দের প্রবল তরঙ্গ প্রবাহে হঠাৎ করে ফোয়ারা খুলে যায়। তেমনি কথার কলকলানিতে মুখর হয়ে উঠে। চা-এর আসরের কথাবার্তা ও সহসাই প্রাণচঞ্চলতা ফিরে ফিরে পেয়ে হৈ চৈ এ ভরে যায়। সেই একই আলাপ, তার মাঝে আবার নতুন আলাপ। ইলেকশানের তোর জোর চলেছে। হাওলাদার সাহেব দাঁড়াবেন। দাঁড়াবে আমলীগ, জাসদ, কুঁড়েঘর, জামানত বাজেয়াপ্ত হওয়া কিন্তু হাজার বছর বুক টান করা কমুনিষ্ট পার্টি। গঞ্জর আলীর মন্তব্যে সকলেই হো হো করে হেসে উঠে। এইসব বেইনতেহা ফাজিল কুতর্কে মওলানা সাহেব গমগীন হন। আর আল্লাহ তা আলার কাছে পানাহ মাঙ্গেঁন। এ্যায় আল্লাহ এদের সুমতি দেও। ইসলামী আকীদা কায়েমের তওফীক দাও।
মওলানা মালাউনের দোকানে কিছু খান না। শেরেকীদের হাতের তৈরি বীজ মকরুহ বলে তিনি এগুলো ছোন না। তবে মাঝে মাঝে বসেন, বিশ্রাম নেন।
কালো চিট্চিটে বেঞ্চিটার উপরে বসলেন। মিনিট কয়েক তারপর আস্তে আস্তে উঠে গিয়ে খুঁটির সাথে ঝোলানো দান বাক্সটি, যার উপরে লেখা আছে প্রথমে আরবী সংখ্যায় সাত শত ছিয়াশি। নিচে আল্লার ওয়াস্তে মুক্ত হস্তে দান করুন। লম্বা টেবিলের উপর বাকসটি রেখে টিপ তালাটি চাবি দিয়ে খুললেন। বাকসটি উপুর করে এক টাকা দুই টাকা আধুলি সিকি বের করে গুনতে থাকেন। এক এক করে সবগুলো টাকা আধুলি মিলিয়ে হিসাব করেন। ভূরু কুঁচকে যায় উনার। ব্যথিত ও বিরক্ত হন। আর নিজের অজান্তেই ভেতরে ভেতরে স্বগতোক্তি করেন। ইয়া আল্লাহ একটা তালার দাম ও হবেনা। আশ্চর্য্য ও নির্বাক হয়ে বসে থাকেন।
এইভাবে কতক্ষণ বসেছিলেন মনে নেই। হৈ চৈ গল্প গুজবে আবার তার মন ফিরে এলো জাহেরী দুনিয়ায়। কলজের বোঁটায় চিন চিন ব্যাথা মালুম হলো। অনেক চিন্তারই উদয় হলো মগজে, রসুলুুল্লাহ এরশাদ করে গেছেন- বান্দা তুমি হুশিয়াঁর। সহজে গমগীন হয়োনা। আল্লার উপরে তাওয়াক্কাল করো। আখেরী জামানায়, রোজা থাকবেনা, নামাজ থাকবেনা ধর্ম অধর্ম হবে। মানুষ মানুষ থাকবেনা। এতো আল্লাহ রসুলের পবিত্র হাদিসের বয়ান।
মাগরেবের নামাজ শেষ করে ফের বসেছিলেন। এশার নামাজের ওয়াক্ত হয়ে এলো প্রায়। চারদিকে কালো অন্ধকারে ছেয়ে গেছে। চার দোকান খেকে বের হয়ে এলেন। তাড়াতাড়ি যেতে হবে। কিন্তু আমাবস্যার অন্ধকার এমন হয়ে উঠেছে যে দুপাশের ঝোপ জংগল আগাছা কিন্তু মালুম হয়না। দুপায়া পথে একটি পাও ঠিকমতো ফেলা যায়না। তবুও মওলানা সাহেব হোঁচট খেতে খেতে হাঁটতে লাগলেন। আল্লা ভরসা। কালো অন্ধকারের পর্দা ভেদ করে কুন্ডু টি ষ্টলের কুপপির টিম টিমে আলো। আর কানের পর্দা বিদীর্ন করে যাত্রা নাটকের মহরা ভেসে আসছিলো। কানে আঙ্গুঁল দিয়ে নিঃসীম অনিশ্চিত অন্ধকারের দিকে অতি দ্রæত পা চালালেন মওলানা সাহেব।

সাইফ শোভন, চিফ রিপোর্টার,ঢাকা নিউজ২৪.কম