অবহেলায় খুশী কোভিড ও গলাফুলো পায়রারা

প্রফেসর ড. মো: ফখরুল ইসলাম: মানুষ দিন দিন যতবেশী অনিয়ম ও অবহেলা প্রদর্শন করছেন কোভিড সাহেব ততবেশী খুশী হচ্ছেন। কারণ এতে তার অবাধে বংশ বিস্তার করার ক্ষেত্র তৈরী হয়ে যাচ্ছে। অনেককে নিয়মের কথা বললে কিছুই শুনতে চান না, বলতে চান না। অনেকে আবার শুনেই দ্রুত ক্ষেপে উঠেন অথবা পকেট থেকে মাস্ক বের করে সরি বলে মুখে দেন। এব্যাপারে অনেকের অনেক কিছু বলতে মানা আছে বলে মুচকি হেসে পাশ কাটিয়ে চলে যান।

পৃথিবীব্যাপী কোটি কোটি মানুষ কোভিডের আক্রমণে অসহায় হয়ে পড়েছেন। আতঙ্কগ্রস্থ হয়ে অনেকে জীবনের প্রতি বীতশ্রদ্ধ হয়ে কোনরকমে দিনপার করে চলেছেন। আবার অনেকেই উইপোকার মত আচরণ করছেন-যাদের মুখটা শক্ত কিন্তু দেহটা তুলতুলে নরম। একটু আঁচড় লাগলেই ফুটো দেহ থেকে তরল গড়িয়ে সর্বনাশ হয়ে যেতে পারে। তাদের অবহেলা বড় বিপজ্জনক।

কি মৌখিক, কি দৈহিক, কি আর্থিক সবসময় তারা শুধু নিজের জন্য তৎপর, ব্যক্তিগত কাজে ব্যস্ত। অবহেলা করে করে যখন আর নিজেকে টানতে পারছেন না, তখন সবাই তাকে নিয়ে ছুটোছুটি শুরু করে দিচ্ছেন। কারো কারো হাসপাতালে যাবার সৌভাগ্য হয় না। আইসিইউ-তে নিয়ে যেতে যেতে মহাবিপদ ঘনিয়ে আসছে কারো কারো জীবনে। দেখতে দেখতে এভাবেই আমাদের দেশেও কোভিড-১৯ দ্বিতীয় ঢেউ নিয়ে হাজির হয়ে পড়েছে।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সারা বিশ্বের অনেকের কাছে নানা কারণে মডেল। কিন্তু তাদের করোনার মডেল সারা বিশ্বর মানুষের কাছে বিরক্তি সৃষ্টি করেছে যা বর্তমানে ঘৃণাও তৈরী করে ফেলেছে। কোভিডের প্রতি চরম অবহেলায় তাদের সর্বোচ্চ সংক্রমণ ও মৃত্যু আজ এ পর্যন্তের ইতিহাসকে উপরে রেখেছে। পাশাপাশি পুলিশ কর্তৃক কৃষ্ণাঙ্গ হত্যার বিরুদ্ধে আন্দোলন, কোভিডাক্রান্তদের মৃত্যু ও আহাজারি উপেক্ষা করে নির্বাচন, নির্বাচন পরবর্তী একগুঁয়েমী কথাবার্তা তাঁদের গণতন্ত্রের ঐতিহ্য ও আভিজাত্যকে ম্লান করে দিয়েছে- সেটাও তাঁরা বুঝতে চাচ্ছেন না। এজন্য কেউ আমাদের কাছ থেকে তাদেরকে ভোট গণনা শেখার জন্যও বলেছেন।

তবে কে শোনে কার কথা। তোষামোদ ও দোষারোপের দিক দিয়ে কেউ কম যান না। সারা পৃথিবীতেই চোরের মায়ের বড় গলা- প্রবাদটি উপেক্ষা করার মত নয়। চুরি করতে না পারলে ডাকাতি, সেটা না পারলে প্রতারণা, সেটাও না হলে কাদা ছোঁড়াছুড়ি, পারস্পরিক দোষারোপ, এটাই তো তালগাছটা শুধুই আমার সদৃশ কিছু স্বার্থপর মানুষের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য ও অলিখিত নিয়ম। অনেকে এটাকে অনিয়মও বলেন। তবে তারা বোধহয় পায়রার কথা অস্বীকার করতে পারবেন না।

পায়রা বড় হলে গলা ফুলানোই তার স্বভাব। সেজন্য ভোর হবার আগেও সে ডাকে, গভীর রাতেও হঠাৎ বাক্বাকুম করে ডাকতে শোনা যায়। অসময়ে তার ডাক শুনে ওঁৎ পেতে থাকা বনবিড়াল আসল কর্মটি করার জন্য দেরী করে না। অনেক সময় বাড়ির পোষা বিড়ালটিও বার বার ডাক শুনে বিরক্ত হয়ে গলাফুলো পায়রার গলা ছিঁড়ে নেয়।

পৃথিবীতে ভালকে ভাল ও মন্দকে মন্দ বলা লোকের অভাব বহুদিন আগেই শুরু হয়েছিল। করোনার দু:সময়ে বহু মানুষের ভাল-মন্দ বিচার করার ক্ষমতা লোপ পেয়েছে। আজ ১৯ নভেম্বর ঢাকা থেকে জয়পুরহাটগামী বাস থেকে এক মায়ের সাথে ভ্রমণরত ছেলের হঠাৎ মৃত্যু হলে মা এবং ছেলের লাশকে রাস্তায় নামিয়ে দিয়ে বাসটি চলে গেছে। এ মায়ের চোখের পানির বন্যা মুছবে কে?

করোনার প্রথম ঢেউয়ের শুরুতে এ ধরনের কয়েকটি ঘটনা ঘটেছিল। লাশ দাফন করতে নিজের গ্রামের মাটিতে ঠাঁই দেয়া হয়নি অনেক হতভাগ্যকে। স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা ঘুষ নিয়ে চুপ করে ছিলেন। আটমাস পর আবার অমানবিকতা জেগে উঠলো কেন?

এদিকে ভ্যাকসিনের কোন কার্যকর সমাধান এখনও নেই। স্পুৎনিক, অক্সফোর্ড, মর্ডানা, রচে, ফাইজার, সানোফি, আরো কত কিছুর নাম বহুদিন আগেই শুনলেও দুনিয়ায় সাড়ে তের লক্ষ প্রাণ সংহার ও কোটি কোটি মানুষ সংক্রমিত হয়ে নাস্তানাবুদ হয়ে গেলেও মানুষের বৈজ্ঞানিক জ্ঞান ও প্রযুক্তি যেন রাজনীতির ডামাডোলের মধ্যে নিপতিত হয়ে শুধু গভীর কান্নার আওয়াজ ছড়িয়েই চলেছে। কয়লা থেকে যেমন ময়লা ঘষে তোলা যায় না, এ ব্যাপারে গলাফুলো পায়রাদের অব্যবস্থাপনা যেন মানবতাকে উপহাস করতে মোটেও কুন্ঠিত হচ্ছে না। আমাদের স্বাস্থ্য খাতের অব্যবস্থাপনা যেন হাজার কোটি টাকা খরচ করে কেনা টিকা ব্যবস্থাপনার মধ্যে কোন নেতিবাচক প্রভাব বয়ে আনতে না পারে এবং একটি সুষম টিকা বন্টন ও প্রদান ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে সুশৃংখলভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যায় সেদিকে নজর বাড়াতে হবে।

আমেরিকা, ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য সব জায়গাতেই আমাদের প্রবাসীগণ কাজ করেন। প্রায় সব প্রবাসীদের মাঝেই কোভিড ভীতি রয়েছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের বদৌলতে অনেক পরিচিতজনের সাথে প্রায়ই কথা হয়। একজন সেদিন বললেন- আমি বিদেশে এখন একা থাকি। তাই নিরাপত্তাহীনতার কারণে আমার গচ্ছিত সব অর্থ দেশে পরিবারের কাছে পাঠিয়ে দিয়েছি। আমার সহকর্মীরাও সেটা করছেন। সবাই গচ্ছিত অর্থ দেশে পাঠানোর কারণে দেশে গত বার দিনে এক বিলিয়ন ডলারের বেশী রেমিটেন্স এসেছে। এটা আমাদের প্রবাসী রেমিটেন্স যোদ্ধাদের আপদকালীন নিরাপত্তার ব্যাপার। আমরা কষ্ট করে মাথার ঘাম পায়ে ফেলে শ্রম বিকিয়ে দেশে কয়টা টাকা পাঠিয়েছি আর ওরা সেটা প্রচার করে ক্রেডিট নেবার মধ্যে কি বাহাদুরী আছে? হয়তো এতে দেশের বড় উপকার হবে। তা নিয়ে দেশে অনেকে গলা ফুলিয়ে বিবৃতি দিচ্ছেন, সংবাদের শিরোনাম হচ্ছেন, এবং সেটা বড় হাস্যকর। যদিও এটা তেমন কোন গোপনীয় বিষয় নয় তথাপি আজকাল এটা জানলে তো ঘরে বসে থাকা আন্তর্জাতিক অনলাইন হ্যাকাররা আবারও ব্যাংক চুরিতে নেমে পড়তে পারে। কারণ সবকিছু প্রচারে শুধু প্রসার হয় না, খারাপ পরিণতিও হতে পারে।

দেশে করোনায় দ্বিতীয় ঢেউ মোকাবেলায় যেমন প্রচার বাড়ানো দরকার তেমনি গলাফুলো পায়রাদের অতি কথন নিয়ন্ত্রণ করা দরকার। যারা মানবতাবাদের কথা বলে নিজেরা এধরনের গোপণীয়তা লঙ্ঘণ করে মিডিয়ায় বাহাদুরী করে অথবা বাক্সন্ত্রাস করে সেটাকে লঙ্ঘণ করে বেড়ায় তাদেরকেও সংযত হতে হবে। সবার জন্য আইনের শাসন জরুরী।

সুতরাং অনেক অবহেলা হয়েছে। আর কোন বাগাড়ম্বর নয়। সবাই অচ্ছুৎ, আমি ভাল-এই নীতি পরিহার করতে হবে। রাত বিরেতে অযথা বাকবাকুম করা বিরক্তিকর গলাফুলো পায়রাদেরকে এড়িয়ে চলার অভ্যাস করতে হবে। কোভিড সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে সবাইকে বেশী বেশী সচেতন হবার সময় ঘনিয়ে এসেছে। কোভিডাক্রান্তদের যত দ্রুত নিতে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি অবলম্বন করতে হবে। আমাদের দেশ থেকে কোভিড সাহেব শীঘ্র পাততাড়ি গুটিয়ে নিরুদ্দেশে যাক সেই কামনা করি। এজন্য একটি সুব্যবস্থাপনার মাধ্যমে সুষম টিকা ক্রয়, বন্টন ও প্রদান নিশ্চিত করে কোভিড-১৯ নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে জনজীবনে দ্রুত স্বস্তি ফিরে আনা যায় সেদিকে নজর বাড়াতে হবে।

*লেখক রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডীন, সমাজকর্ম বিভাগের প্রফেসর ও সাবেক চেয়ারম্যান।E-mail: fakrul@ru.ac.bd

জেড,আই/ঢাকানিউজ২৪ডটকম।