ট্রাম্পের ব্যর্থতায় চীনের রাজনৈতিক উত্থান

নিউজ ডেস্ক:    রিজিওনাল কমপ্রিহেনসিভ ইকোনমিক পার্টনারশিপ (আরসিইপি) নামে বিশ্বের বৃহত্তম যে মুক্তবাণিজ্য জোট হয়েছে, তার নেতৃত্বে রয়েছে চীন। স্মরণকালের ইতিহাসে এটিই প্রথম মুক্তবাণিজ্য চুক্তি, যাতে যুক্তরাষ্ট্র নেই। এমনকি এই জোটে অংশ নিতে যুক্তরাষ্ট্রকে আমন্ত্রণও জানানো হয়নি। বিদায়ী প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প চার বছরে যুক্তরাষ্ট্রকে যখন একঘরে করেছেন, তখন চীনের রাজনৈতিক উত্থান হয়েছে। এখন এ বিষয়টিই নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দেখা দিয়েছে।

চীনসহ প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের ১৫টি দেশ আরসিইপি চুক্তিতে সই করেছে। আসিয়ান জোটের ১০ দেশ ছাড়াও অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার মতো যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র দেশও এ জোটে রয়েছে। মূলত নিজেদের বাণিজ্যিক স্বার্থেই তারা চুক্তিতে সই করেছে। এশিয়া প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্র এতদিন চীনবিরোধী একটি জোট তৈরির চেষ্টা চালাচ্ছিল। এবার তারা পাল্টা ব্লক তৈরি করে দেখাল চীন। অন্য দেশের জন্য যা অর্থনৈতিক লাভ, চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের জন্য তা রাজনৈতিক বিজয়।

পৃথিবীর এক-তৃতীয়াংশ ভূখণ্ডের ২২০ কোটি মানুষ আরসিইপি জোটে যুক্ত হয়েছে। বাণিজ্য এবং মানবাধিকার ইস্যুতে জিনপিংয়ের সরকারকে চেপে ধরতে চেয়েছিলেন বাইডেন। উল্টো আরসিইপি দিয়ে বাইডেনকেই চেপে ধরলেন জিনপিং। চীনসহ চুক্তিতে থাকা দেশগুলোর বিশাল বাজারে শুল্ক্কমুক্ত প্রবেশাধিকারের লোভনীয় প্রস্তাব রয়েছে। ফলে অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়াকে বেইজিংবিরোধী জোটে আনতে বেগ পেতে হবে বাইডেনকে।

সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার আমলে প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে প্রভাব বজায় রাখতে ট্রান্স-প্যাসিফিক পার্টনারশিপ (টিপিপি) চুক্তি হয়েছিল যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে। টিপিপি থেকে চীনকে বাদ রাখা হয়েছিল। প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েই ২০১৭ সালের জানুয়ারিতে টিপিপি থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে প্রত্যাহার করে নেন ট্রাম্প। ফের টিপিপিতে যোগ দেওয়া বাইডেনের জন্য কঠিনই হবে। এরপর চার বছরে একে একে বিভিন্ন বৈশ্বিক জোট থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে বের করে আনেন ট্রাম্প। আর সে সুযোগে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা কিংবা জলবায়ু সংক্রান্ত জোটগুলোতে প্রভাব বাড়াতে থাকেন চীনের প্রেসিডেন্ট জিনপিং। যদিও ট্রাম্প প্রশাসন শুধু ২০২০ সালেই চীনের বিরুদ্ধে ছোট-বড় ১৫৯টি নীতিগত পদক্ষেপ নিয়েছে।

বাণিজ্য থেকে মানবাধিকার, সর্বত্র চীনকে চাপে রাখতে হলে বড় ধরনের বহুপাক্ষিক জোট গঠন বাইডেনের জন্য প্রধান চ্যালেঞ্জ হতে যাচ্ছে। আগামী জানুয়ারিতে ক্ষমতা গ্রহণ করেই বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং জলবায়ু সংক্রান্ত জোটগুলোতে যোগ দেওয়ার উপায় খুঁজতে হবে বাইডেনকে। বেইজিংয়ে রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্রে (সিডিসি) যুক্তরাষ্ট্রের জনবল নিয়োগ দিতে হবে। করোনা মহামারির মধ্যে ট্রাম্প তাদের প্রত্যাহার করে নিয়েছিলেন।

চীনের মানবাধিকার হরণ নিয়ে কথা বলতে হলে জাতিসংঘের মানবাধিকার কাউন্সিলে ফিরতে হবে যুক্তরাষ্ট্রকে। এই কাউন্সিলকে ইসরায়েলবিরোধী আখ্যা দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রকে প্রত্যাহার করে নিয়েছিলেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। তিনি যুক্তরাষ্ট্র থেকে যেসব চীনা সাংবাদিককে বের করে দিয়েছিলেন, তাদেরও ফেরাতে হবে বাইডেনকে।

বেইজিংয়ের সঙ্গে টক্কর দিতে হলে ট্রাম্প আমলের চীনবিরোধী সব নীতি বাতিল করতে হবে বাইডেনকে। ট্রাম্পের আমলে সরাসরি ও ব্যাক চ্যানেলে বেইজিংয়ের সঙ্গে ওয়াশিংটনের কূটনৈতিক যোগাযোগ প্রায় বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। যোগাযোগের অভাবে চীন সম্পর্কে অনেক ভুল সিদ্ধান্ত নিয়েছে ট্রাম্প প্রশাসন। যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব বাড়াতে বাইডেনকে দায়িত্ব নিয়ে তা ঠিক করতে হবে। সূত্র: ডয়চে ভেলে ও অ্যাক্সিওস।