নিউজ ডেস্ক : টানটান উত্তেজনার মধ্য দিয়ে আজ শেষ হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রচার। আগামীকাল আনুষ্ঠানিক ভোট গ্রহণের জন্য সব প্রস্তুতি সম্পন্ন। অবশ্য এরই মধ্যে দেশটিতে রেকর্ড সাড়ে ৯ কোটি আগাম ভোট পড়ে গেছে। তবে কেন্দ্রেও এবার দেখা যাবে অন্যরকম ভোটযুদ্ধ। দ্বিতীয় মেয়াদে প্রেসিডেন্ট পদে লড়াই করা প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ডেমোক্র্যাট প্রার্থী জো বাইডেন শেষ মুহূর্তের ঝটিকা প্রচারাভিযানে ছুটে বেড়াচ্ছেন এক রাজ্য থেকে অন্য রাজ্যে।

এবার এমন সময় যুক্তরাষ্ট্রে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন হচ্ছে, যখন দেশটি করোনা মহামারিতে ধুঁকছে। মহামারি নিয়ন্ত্রণে স্বাস্থ্যবিধি মেনে আজ পেনসিলভানিয়ার ফিলাডেলফিয়ায় ভোট চাইবেন বাইডেন। অন্যদিকে, ব্যাপক জনসমাগম ঘটিয়ে শেষ ৪৮ ঘণ্টায় পাঁচটি রাজ্যে ঝটিকা প্রচারাভিযান চালাবেন ট্রাম্প। রাজ্যগুলো হলো- আইওয়া, ফ্লোরিডা, নর্থ ক্যারোলাইনা, জর্জিয়া ও মিশিগান। এবারের নির্বাচনে এই রাজ্যগুলো সুইং স্টেট হিসেবে পরিচিত। জনমত জরিপে এসব রাজ্যে বাইডেন এগিয়ে থাকলেও ট্রাম্পের দাবি, জনগণ তাকেই ভোট দিচ্ছেন এবং আগামীকালও কেন্দ্রে তার পক্ষে জোয়ার উঠবে।

স্থানীয় সময় শনিবার মিশিগানে সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামাকে নিয়ে প্রচার চালান জো বাইডেন। সেখানে ট্রাম্পকে আক্রমণ করে ওবামা বলেন, ‘ট্রাম্প প্রশাসন যুক্তরাষ্ট্রকে বিবাদের মধ্য দিয়ে নিয়ে যাচ্ছে।’ অবশ্য ২০১৬ সালে মিশিগানে জয় পেয়েছিলেন ট্রাম্প। একই দিন পেনসিলভানিয়ার জনসভায় ট্রাম্প বলেন, ‘বিরাট লাল ঢেউয়ের মধ্য দিয়ে এবার রিপাবলিকানদের জয় হবে।’ লাল রং রিপাবলিকান পার্টির প্রতিনিধিত্ব করে। আর ডেমোক্র্যাটদের প্রতিনিধিত্বকারী রং নীল।

এবার যুক্তরাষ্ট্রে ৫৯ বারের মতো প্রেসিডেন্ট নির্বাচন হচ্ছে। মোট ৪৪ জন প্রেসিডেন্ট বিভিন্ন মেয়াদে দেশটি শাসন করেছেন। এর মধ্যে ট্রাম্প এমন একজন প্রেসিডেন্ট যাকে নিয়ে নিজ দল রিপাবলিকান পার্টির মধ্যে ব্যাপক বিভেদ সৃষ্টি হয়েছে। রিপাবলিকান পার্টির সাবেক প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী মিট রমনি আগাম ভোট দেওয়ার পর গণমাধ্যমকে জানান, তিনি ট্রাম্পকে ভোট দেননি। বিভিন্ন জরিপে উঠে এসেছে, ২০১৬ সালে ট্রাম্পকে ভোট দেওয়া অনেক শিক্ষিত শ্বেতাঙ্গ এবার তাকে ভোট দেবেন না। তবে তার কঠোর নীতির পক্ষে দাঁড়িয়েছেন অনেক তরুণ ভোটার। তারা ট্রাম্পকে আবার প্রেসিডেন্ট হিসেবে দেখতে চান।

জনমত জরিপেও শেষ মুহূর্তে ট্রাম্পের সমর্থন বৃদ্ধির বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। গতকাল ওয়াশিংটন পোস্টের খবরে বলা হয়, সামান্য ব্যবধানে পেনসিলভানিয়ায় বাইডেন এগিয়ে থাকলেও ভোটের মাঠে তা উল্টে যেতে পারে। সুইং স্টেটের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ইলেক্টোরাল ভোট থাকা ফ্লোরিডায় দু’দিন আগেও বাইডেন এগিয়ে থাকলেও গতকাল সেই ব্যবধান কমে এখন ট্রাম্পের সমান হয়ে গেছে। নির্বাচনী বৈতরণী পার হওয়ার জন্য ফ্লোরিডা দু’জনের জন্যই অপরিহার্য বলা যায়। কারণ, এই রাজ্যে ৩৮টি ইলেক্টোরাল ভোট আছে। অন্যদিকে, পেনসিলভানিয়ায় জয়ের ব্যাপারে আশাবাদী বাইডেন। তবে শেষ মুহূর্তে ভোটের জোয়ার ট্রাম্পের দিকে যেতে পারে বলে ইঙ্গিত দিয়েছে ওয়াশিংটন পোস্ট।

গণতান্ত্রিক যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে শান্তিপূর্ণ ক্ষমতা হস্তান্তর। এবার বিষয়টি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। এখন পর্যন্ত নির্বাচনকেন্দ্রিক সহিংসতা হয়নি। তবে আগামীকাল মঙ্গলবার ভোটকেন্দ্রে সহিংসতার আশঙ্কা করা হচ্ছে। কারণ, উগ্র শ্বেতাঙ্গ ও কৃষ্ণাঙ্গদের মধ্যে সংঘাত বেধে যেতে পারে যে কোনো সময়। তা নির্বাচনে হারলে ক্ষমতা হস্তান্তর না করার যে ইঙ্গিত দিয়েছেন ট্রাম্প, তাতে তার সমর্থকরাও যে কোনো পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রস্তুত রয়েছে।

গতকাল রোববার সিএনএনের খবরে বলা হয়, জনপ্রিয় ভোটারদের ওপর পরিচালিত জনমত জরিপে ট্রাম্পের চেয়ে স্পষ্ট ব্যবধানে এগিয়ে আছেন বাইডেন। ২০১৬ সালেও জরিপে ট্রাম্পের চেয়ে বড় ব্যবধানে এগিয়ে ছিলেন হিলারি ক্লিনটন। ফলে জরিপের তথ্যে নিশ্চিত হতে পারছেন বাইডেন। শেষ সময়ের নির্বাচনী প্রচারে তিনি বিষয়টি ডেমোক্র্যাট ভোটারদের মনে করিয়ে দিয়ে সবাইকে ভোটকেন্দ্রে যাওয়ার আহ্বান জানান। সব জনমত জরিপের গড় করে গতকাল বিবিসি জানিয়েছে, এবার বাইডেনের পক্ষে জনমত ৫২ শতাংশ এবং ট্রাম্পের পক্ষে ৪৩ শতাংশ। ভোটপূর্ব জরিপে এত বড় ব্যবধান গত ৮৪ বছরে যুক্তরাষ্ট্রের কোনো প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে দেখা যায়নি।

জনপ্রিয় ভোটে জেতার পর রাজ্যভিত্তিক ইলেক্টোরাল ভোটে জয়ী হতে হয় প্রেসিডেন্ট প্রার্থীদের। শেষ মুহূর্তের জরিপের তথ্য দিয়ে সিএনএন গতকাল জানায়, বাইডেন স্পষ্টভাবে ২০৩ ইলেক্টোরাল ভোট এবং ট্রাম্প ১৫৩ ইলেক্টোরাল ভোট পাবেন। জয়ের জন্য প্রয়োজন ২৭০ ভোট। সুইং স্টেটে জয়ের ওপর নির্ভর করছে শেষ হাসি কে হাসবেন।

নির্বাচনে রাশিয়ার ভুয়া তথ্য নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তাদের হুঁশিয়ারি: ব্লমবার্গের খবরে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা সতর্ক করে বলেছেন, প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে যে প্রার্থীই জয়ী হোন না কেন, যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ করতে ভুয়া তথ্য ব্যবহার অব্যাহত রাখবে রাশিয়া। আর তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা হলে মস্কোর প্রচেষ্টা আরও বেশি জোরালো হবে বলেও হুঁশিয়ার করেছেন তারা। যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা বলছেন, নির্বাচনে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হলে ভুয়া তথ্য ছড়িয়ে নির্বাচনী প্রক্রিয়ার মর্যাদাহানির চেষ্টা করতে পারে রাশিয়া। দেশটির গোয়েন্দাদের ধারণা, ডেমোক্র্যাট প্রার্থী জো বাইডেনের প্রচার শিবিরকে অবমূল্যায়নের চেষ্টা করছে মস্কো।

নির্বাচনের আগে অস্ত্র কেনার ধুম: প্রেসিডেন্ট নির্বাচনকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে ছোট-বড় অপরাধ প্রবণতা বৃদ্ধি পেয়েছে। শঙ্কা ও উদ্বেগ থেকে দেশটির সাধারণ মানুষ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর আস্থা না রেখ নিজেদের ব্যক্তিগত নিরাপত্তার কথা নিজেরাই ভাবছেন। ফলে দেখা গেছে, এ বছর দেশটির প্রায় ৫০ লাখ মানুষ আগ্নেয়াস্ত্র কিনেছে। গত মার্চেই বিক্রি হয়েছে অন্তত ২০ লাখ অস্ত্র।

গত সপ্তাহে আর্মড কনফ্লিক্ট লোকেশন ও ইভেন্ট ডেটা প্রজেক্ট এবং মিলিশিয়া ওয়াচের যৌথভাবে প্রকাশিত গবেষণায় বলা হয়েছে, নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ব্যাটেল গ্রাউন্ড রাজ্যখ্যাত পেনসিলভানিয়া, জর্জিয়া, মিশিগান ও উইসকনসিনে সশস্ত্র সংঘাতের ঝুঁকি রয়েছে। প্রাউড বয়েজ, প্যাট্রিয়ট প্রেয়ার, ওথ কিপার, লাইট ফুট মিলিশিয়া, সিভিলিয়ান ডিফেন্স ফোর্স, আমেরিকান কনটিনগেন্সি, বোগালো বয়েসের মতো সশস্ত্র ডানপন্থি সংগঠনগুলো নির্বাচনের আগে-পরে দাঙ্গা ও সহিংসতা বাধাতে পারে। ইতোমধ্যে এসব গোষ্ঠী প্রকাশ্যে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে সমর্থনের কথা জানিয়েছে।