বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে ব্যবহারের সিদ্ধান্ত বিনিয়োগবান্ধব

নিউজ ডেস্ক :  সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বা মজুদের পরিমাণ উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। বেশ কিছু ঘটনা এখানে প্রধান ভূমিকা পালন করেছে। প্রথমত সরকারের ২ শতাংশ প্রণোদনার কল্যাণে বেড়েছে প্রবাসী আয়ের প্রবাহ। এর সঙ্গে ছিল বৈদেশিক বাণিজ্যে দেশে মুদ্রা সঞ্চয়ের পক্ষে যায় এমন পরিবেশ। এ ছাড়া কভিড সংক্রমণের পরপরই রপ্তানি কমে আসার পরিপ্রেক্ষিতে সরকারি ও বেসরকারিভাবে আমদানিও কমে যায়। বৈদেশিক ঋণ ও অনুদান আসা স্বল্পমাত্রায় নেমে আসে। তবে কিছুদিন পর কভিড-১৯ মহামারি মোকাবিলায় বৈদেশিক সাহায্যের অতিরিক্ত একটি উৎস তৈরি হয়। বৈদেশিক মুদ্রার মজুদ বৃদ্ধিতে যা প্রভাব ফেলে।
গত আগস্টে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার মজুদ তিন হাজার ৯০০ কোটি মার্কিন ডলার সমমূল্যের ছিল। এর আগে চলতি বছরের মে পর্যন্ত পুরো সময় রিজার্ভের অঙ্ক তিন হাজার ২০০ থেকে তিন হাজার ৩০০ কোটি ডলারের ঘরে ওঠানামা করে। তারপর থেকেই রিজার্ভ বাড়তে থাকে এবং আগস্টে ৬০০ কোটি মার্কিন ডলার বেড়ে তিন হাজার ৯০০ কোটি ডলারে উন্নীত হয়। সম্প্রতি তা চার হাজার কোটি ডলার ছাড়িয়ে গেছে। ক্রমবর্ধমান রিজার্ভ থেকে এবার উন্নয়নমূলক খাতে খরচ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। সম্প্রতি সরকারের শীর্ষ নীতিনির্ধারক পর্যায়ের এক বৈঠকে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় বলে জানা গেছে।
দেশের সম্পদ উন্নয়নে বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত যুগান্তকারী এবং বিনিয়োগবান্ধব মনে করেন বিশেষজ্ঞ অনেকেই। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রিজার্ভ অলস ফেলে রেখে কোনো লাভ হয় না। তাই এটি কাজে লাগানোই ভালো উপায়। তবে এ অর্থ সতর্কভাবে বিনিয়োগ করতে হবে।
বাংলাদেশে উন্নয়ন খাতে দেশের রিজার্ভের অর্থ ব্যবহারের উদ্যোগ এটাই প্রথম। তবে অনেক দেশেই এ ধরনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই)। উন্নয়ন খাতে দীর্ঘদিন ধরেই বৈদেশিক মুদ্রা মজুদের ব্যবহার করছে দেশটি। সহযোগী স্থাপনা এবং বিলাসবহুল আবাসন প্রকল্প গড়ে তোলার ফলে ব্যাপক সাফল্য পায় আবুধাবির পর্যটন অর্থনীতির উদ্যোগ। ফলে বিশ্বের শীর্ষ বৈদেশিক মজুদগুলোর মধ্যে একটির মালিক এখন আরব আমিরাত। অন্য কয়েকটি দেশও এই সাফল্য থেকে উৎসাহী হয়ে রিজার্ভ থেকে উন্নয়ন খাতে বিনিয়োগ করছে। সঞ্চিত বৈদেশিক মুদ্রা খরচ করলে দেশের ব্যবসায়িক খাতও বাড়তি উদ্দীপনা পাবে। তবে বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ, কোন কোন খাতে বিনিয়োগ করা হবে তা নির্ধারণে সরকারকে সতর্ক এবং কৌশলী পদক্ষেপ নিতে হবে। খরচেও থাকতে হবে কঠোর জবাবদিহি।
জাতীয়ভাবে গুরুত্বপূর্ণ এবং বাছাই করা কিছু উন্নয়ন খাতে এ বিনিয়োগ করার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। বর্তমান সরকারের আমলে বিদ্যুৎ উৎপাদন খাতে অবকাঠামো নির্মাণে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। তবে দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন খাতের সিংহভাগ প্রকল্প বিদেশি ঋণ সহায়তায় বাস্তবায়িত হয়। সরকার এসব ঋণ যথাসময়ে পরিশোধ করে আসছে। ঋণ পরিশোধে কখনও ব্যর্থ হয়নি। কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র ট্যারিফের দিক থেকে সবচেয়ে সস্তা। এগুলো বেজলোড প্লান্ট নামে পরিচিত। উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে দ্রুত এবং ধারাবাহিক উন্নয়নের জন্য বাংলাদেশের জন্য দরকার কয়লা থেকে বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা। দেশের বিদ্যুৎশক্তি উন্নয়ন মহাপরিকল্পনা বিশ্বব্যাপী সমাদৃত। এ পরিকল্পনার আওতায় শক্তি উৎপাদনে কয়লার পাশাপাশি এলএনজি, তরল জ্বালানি এবং গ্যাস মিশ্রণ ব্যবহারের কথা বলা হয়েছে। এ ছাড়া নানা শিল্পাঞ্চলে পরিকল্পিত কয়লাভিত্তিক কেন্দ্র নির্মাণে দরকার জাপান, চীন এবং বিশ্বব্যাংকের ঋণ সহায়তা। কম খরচে উৎপাদন ছাড়া সস্তা বিদ্যুতের প্রত্যাশিত লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করা যাবে না এবং একমাত্র কয়লা এই সক্ষমতা দিতে পারে। ফলে বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে বাংলাদেশ সরকার যে বৈদেশিক রিজার্ভ ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নিয়েছে তা ব্যবসায়ীদের নিঃসন্দেহে উৎসাহিত করবে বলে মনে করা হচ্ছে। স্থানীয় ব্যবসায়ী ও ঋণদাতারা এ উদ্যোগকে সাধুবাদ জানালেও বিনিয়োগের নীতিমালা কঠোরভাবে অনুসরণের ওপর জোর দিয়েছেন।