সঞ্চয়পত্রে কিস্তি তুলতে শেষ চেকবই, ক্ষুদেবার্তায় বিভ্রান্তি

সুমন দত্ত: পাবলিকের ভোগান্তি কমাতে ও ক্রয় সীমা মনিটরিং করতে সরকার সঞ্চয়পত্র ক্রয়ে নতুন নিয়ম চালু করেছে। লাইনে দাঁড়িয়ে মুনাফা নেওয়ার ভোগান্তি দূর হয়েছে ঠিকই। কিন্তু তাতে সমস্যা মিটেনি। এবার সঞ্চয়পত্রের ক্রেতারা পড়ছেন এক নতুন হয়রানিতে।

আগে নগদে ও চেকের মাধ্যমে সরকারি ব্যাংক, ডাকঘর ও বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে সঞ্চয়পত্র কিনতে পারত ক্রেতারা।

নতুন নিয়মে তা বাতিল করা হয়েছে। এখন এসব প্রতিষ্ঠান হয়েছে সঞ্চয়পত্র ইস্যুকারী অফিস। কোনো আর্থিক লেনদেনে যাবে না এসব প্রতিষ্ঠান।

ইস্যুকারী অফিসের নির্ধরাতি ফরম পুরন করে চেকের মাধ্যমেই সঞ্চয়পত্র কিনতে হবে, সঙ্গে জমা দিতে হবে ক্রেতার টিন নম্বর (যদি এক লাখের বেশি হয়) ও ব্যাংকের অ্যাকাউন্ট নম্বর(হিসাব নম্বর)।

আগে এসবের বালাই ছিল না। যার ফলে এতদিন যারা ব্যাংকে কোনো হিসাব খোলেননি তাদের এক প্রকার বাধ্য হয়েই হিসাব খুলতে হলো।

আর যাদের অ্যাকাউন্ট নাম্বার ছিল তাদের কোনো সমস্যা হয়নি এতে। তারা শুধু নতুন করে টিন নাম্বারই খুলছে।এই যা।

আগে সঞ্চয়পত্রের মুনাফা দেয়া হতো হাতে হাতে। এখন সঞ্চয়পত্রের মুনাফা চলে যাবে গ্রাহকের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে (হিসাব নম্বরে)

ব্যাংকের ঘাড়ে এই দায়িত্ব নতুন। তবে ব্যাংক চলছে, সেই পুরাতন নিয়মে। সঞ্চয়পত্রের মালিকদের জন্য ব্যাংক আলাদা কোনো নিয়ম তৈরি করেনি। যেমন সরকারি ব্যাংকগুলি আগের মতোই ১০ পাতার এমআইসিআর চেক বই গ্রাহকদের সরবরাহ করছে।

এদিকে একজন পরিবার সঞ্চয়পত্রের মালিক ৬০ কিস্তিতে মুনাফা উত্তোলন করার সুযোগ পান। যার জন্য প্রয়োজন ৬০  পাতার চেক বই। উপরুন্ত এই ১০ পাতার চেক বইয়ের জন্য ১১০ টাকা গ্রাহকের হিসাব থেকে কেটে নেয় ব্যাংক (অগ্রণী ব্যাংক লিমিটেড)। আগে সঞ্চয়পত্রের মুনাফা তুলতে এই টাকা খরচ হতো না। এছাড়া নতুন এই চেকবই পেতে একজন গ্রাহককে ১৫ থেকে ১ মাস অপেক্ষা করতে হয়।

বর্তমানে ব্যাংকের যাবতীয় লেনদেন হিসাবধারীর মোবাইলে ক্ষুদে বার্তা দিয়ে জানানো হয়। তেমনি সঞ্চয়পত্রের মুনাফার খবরও ব্যাংক থেকে গ্রাহকের মোবাইলে আসে। তবে তার আগে সঞ্চয় ব্যুরো সঞ্চয়পত্রের মালিককে আগাম ক্ষুদে বার্তা দিয়ে জানায়। এক খবর দুই কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে জানাতে গিয়ে সঞ্চয়পত্রের মালিকরা পড়ছেন বিভ্রান্তিতে। কারণ দুই কর্তৃপক্ষের মধ্যে কাজের সমন্বয় নেই।

একজন সঞ্চয়পত্রের মালিক বলেন, তার মোবাইলে এক মাস আগে টাকা ছাড়ের ম্যাসেজ (ক্ষুদে বার্তা) এসে পড়েছে। আরেক ব্যাংক কর্মকর্তা বলেন, তিনি টাকা পাবার ২৪ দিন পর ম্যাসেজ পেয়েছেন টাকা ছাড়ের। তাছাড়া ম্যাসেজ নিয়ে আছে গ্রাহকদের কিছু অভিযোগ।  

একজন সঞ্চয়পত্রের মালিক ম্যাসেজ দেখে তাৎক্ষণিকভাবে জানতে পারেন না তিনি কোন সঞ্চয়পত্রের কততম কিস্তির মুনাফা পেলেন। এতে একাধিক সঞ্চয়পত্রের মালিক পড়েন বিভ্রান্তিতে। তাকে সঞ্চয়পত্রের নথি নিয়ে হিসাব কষতে হয়।  অথবা ব্যাংকে গিয়ে হিসাব শাখা থেকে জেনে নিতে হয়।

অথচ আগে সঞ্চয়পত্রের কুপনে লেখা থাকতো এর মালিক কততম কুপন ভাঙাচ্ছেন এবং কোন সঞ্চয়পত্রের মুনাফা তুলছেন। কারণ আগে প্রত্যেক সঞ্চয়পত্রে কুপনে কিস্তির সংখ্যা উল্লেখ থাকতো। তাতে  সঞ্চয়পত্রের মালিকরা রেজিস্ট্রেশন নাম্বার ও কত টাকা মুনাফা পাচ্ছেন তা লিখে দিতেন। এখন সঞ্চয়পত্রের মুনাফা প্রাপ্তির ম্যাসেজে এসব থাকে না।

বর্তমানে পাঠানো কয়েকটি বার্তা এমন

Dear clients, your bank account will be credited by tk ……… for the interest/principal of 3 years Bangladesh Sanchoy . এই বার্তাটি তারাই পাবেন যারা ৩ মাস অন্তর মুনাফা ভিত্তিক সঞ্চয়পত্র কিনেছেন।

আর যারা পরিবার কিনেছেন তারা পান এই বার্তাটি

   Dear clients, your bank account will be credited by tk ……… for the interest/principal of Family Sanchoypattra.

এখন কারো নামে সঞ্চয়পত্র ইস্যু হলে এর মালিককে একটি কম্পিউটার প্রিন্টেড  প্রত্যয়ন পত্র দেয়া হয়। তাতে সঞ্চয়পত্রের মালিকের নাম, ইস্যুকারী অফিসের নাম, টাকার অংক, রেজিস্ট্রেশন নম্বর, ইস্যু তারিখ ও মেয়াদ উত্তীর্ণ তারিখ লেখা থাকে। অথচ ম্যাসেজ পাঠানোর সময় এসব তথ্য গ্রাহককে দেয়া হয় না। ম্যাসেজে পাঠানোর সময় শুধু বলা হয় আপনার হিসাবে সঞ্চয়পত্রের মুনাফা যোগ হবে। তাও আবার ইংরেজিতে। যা ইংরেজি জানা লোকই শুধু পড়তে পারবে। অথচ সঞ্চয়পত্রের মূল দলিল লেখা থাকে বাংলায়।

সঞ্চয়পত্রের সমস্যা নিয়ে ইস্যুকারী অফিসগুলোতে যোগাযোগ করা হলে তারা কোনো দায় নিতে চাচ্ছে না। তাদের যুক্তি এসব আমাদের হাতে নেই। আমরা এখন কোনো লেনদেনে নাই, তাই আমরা এ সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ শুনবো না। এমনটাই জানিয়েছে ঢাকা সদর পোস্ট অফিস থেকে সঞ্চয়পত্র কেনা এক মালিক।

চেক দিয়ে সঞ্চয়পত্র ক্রয়ে রয়েছে আরেক সমস্যা। অথচ এটা হওয়ার কথা ছিল না। অনেকে একক নামে সঞ্চয়পত্র কিনতে গিয়ে যৌথ নামের চেক দিচ্ছেন, আর তা ফেরত দিয়ে দিচ্ছে ইস্যুকারী অফিস।

আবার যৌথ নামে সঞ্চয়পত্র কিনতে গিয়ে একক নামে চেক দিলে সেটাও ফেরত দিয়ে দেয়া হচ্ছে। এতে সাধারণ লোকজন সঞ্চয়পত্র কিনতে গিয়ে পড়ছেন আরেক বিড়ম্বনায়। নিয়মটা পরিষ্কার করে জানতে পারছেন না, বুঝতেও পারছেন না।

যিনি সঞ্চয়পত্র কিনবেন তার ব্যাংক হিসাব আছে কিনা, তিনি চেক ইস্যু করতে পারেন কিনা এটাই হতে পারতো দেখার বিষয়। অথচ সঞ্চয়পত্র কর্তৃপক্ষ তা না দেখে নিজেরাই একটা নিয়ম দাড় করিয়ে রেখেছে যা এখনো তৈরি হয়নি। সঞ্চয়পত্রের মালিক কোনো হিসাবে তার মুনাফা গ্রহণ করবেন সেটা তার স্বাধীনতা। সঞ্চয়পত্র কর্তৃপক্ষ ঠিক করে দিতে পারে না সঞ্চয়পত্রের হিসাব নম্বর ও হিসাবের ধরন।

গ্রাহকের হিসাব থেকে মুনাফা যদি অন্য কেউ নিয়ে নেয় তার দায় সঞ্চয়পত্র কর্তৃপক্ষের না। তার দায় গ্রাহকের। যেমনটা নমিনির ক্ষেত্রে অনুসরণ করে সঞ্চয়পত্র কর্তৃপক্ষ। নমিনি কে হবে তা নির্ধারণ করে দেয় সঞ্চয়পত্রের মালিক। এ নিয়ে পরবর্তীতে সমস্যা হলে মালিক দায়ী, সঞ্চয়পত্র কর্তৃপক্ষ দায়ী না। তাই চেকের মাধ্যমে যারা সঞ্চয়পত্র কিনছেন তারা ক্রয়ের অর্থ তাদের হিসাব থেকে পরিশোধ করতে পারছেন কিনা সেটা দেখলেই চলত।

সঞ্চয়পত্রের মালিকের কোন ধরনের হিসাব (যৌথ না সিংগেল) থেকে তা পরিশোধ হচ্ছে তার প্রয়োজন আছে কি? একক নামে কিনতে গেলে একক হিসাব নম্বর, আর যৌথ নামে কিনতে গেলে যৌথ হিসাব নম্বর থাকার বিধান অপ্রয়োজনীয়। কারণ একজন সঞ্চয়পত্রের মালিক নির্দিষ্ট ফরম পুরনের দ্বারা ঘোষণা করে দেন তিনি কার নামে তার কোন হিসাবে সঞ্চয়পত্রের মুনাফা রাখতে চান।     

সঞ্চয়পত্র সংক্রান্ত সমস্যাগুলো নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। করোনার কারণে জাতীয় সঞ্চয় অধিদপ্তরের ডিজি সরাসরি সাক্ষাতে রাজি হোননি। তার অধীনস্থ কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দেন। তাদের তথ্য মতে জানা যায় সঞ্চয়পত্রের বিধি এখনো তৈরি হয়নি। মৌখিকভাবেই সঞ্চয়পত্রের কার্যক্রম চলমান। আর আইসিটি সংক্রান্ত সমস্যাগুলো নিয়ে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জানান তাদের সফটওয়ারের কাজ এখনো চলছে। ভবিষ্যতে আরো আপডেট করা হবে। সঞ্চয়পত্রের মালিকরা ঠিকমত ম্যাসেজ পাচ্ছে না। এর জবাবে তিনি বলেন, আমরা টাকা ছাড়ের ম্যাসেজ না পাঠালে বাংলাদেশ ব্যাংক গ্রাহকের ব্যাংক হিসাবে টাকা পাঠাবে না। ম্যাসেজে তথ্য ঠিক মত থাকছে না। গ্রাহক কোনো সঞ্চয়পত্রের কততম কিস্তি পাচ্ছেন তা জানতে পারছে না। এর জবাবে তিনি বলেন, আমরা বিষয়টি সম্পর্কে নোট নিলাম। চেকের পাতা বিষয়ে ব্যাংক ও অর্থমন্ত্রনালয় সিদ্ধান্ত নেবে। এখানে অধিদপ্তরের কিছু করার নেই।  

ঢাকানিউজ২৪ডটকম