নারী শিক্ষায় এগিয়ে কিন্তু কর্মে পিছিয়ে

গোলাম মোরশেদ:  বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেক নারী হলেও কর্মক্ষেত্রে নারীর উপস্থিতি পুরুষের তুলনায় অনেক কম। বাংলাদেশ ব্যুরো অব স্ট্যাটিস্টিপের (বিবিএস) লেবার ফোর্স সার্ভে ২০১৮ এর তথ্য অনুযায়ী বর্তমানে নারীর বেকারত্বের হার পুরুষের দ্বিগুণ। অথচ বর্তমানে নারী শিক্ষার হার ৬৩.৪ শতাংশ।

দেশের নারীরা ঐতিহ্যগতভাবে সেই ধরনের অর্থনৈতিক কাজের সঙ্গে বেশি জড়িত যা তারা গৃহস্থালি কাজের পাশাপাশি করতে পারে, যেমন- গবাদি পশু ও পাখি পালন, শাকসবজি চাষ ইত্যাদি। বর্তমানে কর্মক্ষেত্রে নারীর উপস্থিতি হার ৩৬.৩ শতাংশ যা ১৯৯৯ সালে ছিল ২৮ শতাংশ। সরকারি চাকরিতে কর্মকর্তা-কর্মচারীর মাত্র ২৭ শতাংশ নারী। আবার যারাও কর্মক্ষেত্রে রয়েছেন, তাদের গড় মজুরি পুরুষের তুলনায় কম।

দেশে নারীর কর্মসংস্থানের অন্যতম বেসরকারি খাত হলো তৈরি পোশাক শিল্প, যেখানে রয়েছেন প্রায় ৪০ লাখ নারী কর্মী। তবে এ খাতে শিক্ষিত নারীর তুলনায় অল্পশিক্ষিত কিংবা নিরক্ষর নারীর অংশগ্রহণ বেশি। যার অন্যতম কারণ তৈরি পোশাক শিল্পে গরিব-দুস্থ, অশিক্ষিত ও অদক্ষ নারীরা খুব সহজে চাকরি পান। তৈরি পোশাক শিল্প বাদে শ্রমবাজারের অন্যান্য খাতে নারীর অংশগ্রহণের হার ও কাজের ধরনের ওপর উচ্চশিক্ষার খুব জোরালো প্রভাব লক্ষ্য করা যায়। আবার এসব খাতে স্বল্পশিক্ষিত কিংবা অশিক্ষিত পুরুষের তুলনায় অশিক্ষিত নারীদের অংশগ্রহণের হার অনেক কম। শিক্ষার ডিগ্রি বিবেচনায় শ্রমবাজারে স্নাতক পাস নারীর উপস্থিতি সবচেয়ে বেশি দেখা যায়।

গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, কর্মক্ষেত্রে যদিও নারীর অংশগ্রহণ বৃদ্ধি পেয়েছে, তবে বাস্তবতা হলো দেশে নারী শিক্ষার অগ্রগতির সঙ্গে সমানুপাতিক হারে নারীর কর্মসংস্থান হয়নি। বিবিএস ২০১৮ তথ্য অনুযায়ী বর্তমানে শ্রমবাজারে নারীর সংখ্যা মাত্র এক কোটি ৮২ লাখ। আর যোগ্যতা সত্ত্বেও শ্রমবাজারের বাইরে রয়েছে প্রায় তিন কোটি ৬১ লাখ। তবে গত কয়েক দশকে উপার্জনশীল নারীর সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে। একই সঙ্গে নারীপ্রধান পরিবারের সংখ্যাও বৃদ্ধি পেয়েছে। জেন্ডার স্ট্যাটিস্পি অব বাংলাদেশ-২০১৮ তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে ১৪.২ শতাংশ পরিবার নারীপ্রধান।

গত দশকে গ্রাম এলাকায় নারীপ্রধান পরিবারের সংখ্যা বৃদ্ধি পেলেও নগরে এর পরিমাণ কমেছে। আবার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো নারীপ্রধান পরিবারের উপার্জন তুলনামূলক কম। অথচ পুরুষপ্রধান পরিবারের তুলনায় নারীপ্রধান পরিবারের দরিদ্রতার হার কম। যার সম্ভাব্য কারণ হতে পারে নারীপ্রধান পরিবারগুলোতে সদস্য সংখ্যা তুলনামূলক কম। অর্থনৈতিক কার্যকলাপে সপ্তাহে পুরুষরা যেখানে ৫২ ঘণ্টা ব্যয় করেন, সেখানে নারীরা গড় ৩৮ ঘণ্টা ব্যয় করেন। অথচ সাংসারিক কাজে নারীরা পুরুষের চেয়ে তিনগুণ বেশি সময় ব্যয় করেন। সংসারের কাজে নারীদের এত বেশি সময় পরিশ্রম করতে হয় যে, সারাদিন সাংসারিক কাজের ব্যস্ততার পর তারা পর্যাপ্ত বিশ্রামের সময় পান না। আর চাকরিজীবী নারীর ক্ষেত্রে সারাদিনের ব্যস্ততা শেষে আবারও গৃহস্থালি কাজ করতে হয়। ফলে তাদের বিশ্রামের সুযোগ আরও কম।

পরিবারে শিশু সন্তানের উপস্থিতি নারীদের শ্রমবাজারে অংশগ্রহণে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। ছয় বছরের নিচে সন্তান আছে এমন মায়েদের ক্ষেত্রে শ্রমবাজারে নারীর উপস্থিতি হার ৩.৬ শতাংশ কমে যায়। কারণ বেশিরভাগ পরিবারে নারীরা সাংসারিক কাজে বিশেষত বাচ্চা লালন পালনের ক্ষেত্রে অন্যদের সহযোগিতা কম পাচ্ছে। যার অন্যতম কারণ বর্তমানে যৌথ পরিবারগুলো ভেঙে একক পরিবার বেড়ে যাচ্ছে। যেহেতু নগরে বসবাসকারী পরিবারের বেশিরভাগেরই বাবা-মা বা আত্মীয়স্বজন গ্রামে বসবাস করেন; এজন্য ইচ্ছা থাকলেও পরিবারের সদস্যরা প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করতে পারেন না। যেসব পরিবারে সন্তানের সংখ্যা বেশি, তাদের পরিবারে নারীদের অংশগ্রহণের হার বেশি। অর্থনৈতিক প্রয়োজনীয়তা পরিবারে নারীদের শ্রমবাজারে অংশগ্রহণ হারকে বাড়িয়ে দেয়। পরিবার প্রধানের অনুমতি পায় না বলে অনেক নারী শ্রমবাজারে অংশগ্রহণ করতে পারেন না। তবে বেশিরভাগ নারী সরকারি চাকরিতে অধিক আগ্রহী, অনেকে সরকারি চাকরি ব্যতীত অন্য চাকরি করতে ইচ্ছুক নন।

তা ছাড়া দেশের বাইরে অনেক নারী কর্মে নিয়োজিত আছেন। জেন্ডার স্ট্যাটিস্পি অব বাংলাদেশ-২০১৮ অনুযায়ী অভিবাসনে পুরুষের চেয়ে নারীর প্রবৃদ্ধি হার বেশি। তবে সম্প্রতি এর পরিমাণ হ্রাস পেয়েছে। শ্রমবাজারে নারীর অংশগ্রহণকে নিরুৎসাহিত করতে যৌন নির্যাতনের প্রভাব রয়েছে। প্রবাসে নারী নির্যাতন ও হয়রানির ঘটনা দেশের বাইরে যেতে তাদের অনাগ্রহী করছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

উদ্যোক্তা হিসেবেও নারীদের উপস্থিতি আশানুরূপ বৃদ্ধি পাচ্ছে না। জাতিসংঘের নারী বিষয়ক সংস্থার তথ্য অনুযায়ী দেশে উদ্যোক্তার মাত্র ১০ শতাংশ নারী। সম্প্রতি অনলাইন ব্যবসায় নারীর উপস্থিতি বৃদ্ধি পেয়েছে। যার অন্যতম কারণ এ খাতে বিনিয়োগের হার তুলনামূলক অনেক কম এবং ঘরে বসে নিয়ন্ত্রণ করা যায়। উদ্যোক্তা হিসেবেও নারীর উপস্থিতি কম হওয়ার অন্যতম কারণ একজন পুরুষকে উদ্যোক্তা হওয়ার জন্য পরিবার ও সমাজ থেকে যতটুকু সহযোগিতা করা হয়, একজন নারী তা পান না।

শ্রমবাজারে নারীর অংশগ্রহণ নিরুৎসাহিত ও সংকুচিত করে এমন অনেক বিষয় রয়েছে। যেমন- অনেক সময় একই পদে চাকরি করা সত্ত্বেও নারীরা পুরুষের তুলনায় কম বেতন পান। প্রযুক্তিগত উন্নয়নের কারণে অনেক পদ মানুষের হাত থেকে যন্ত্রের অধীনে চলে যাচ্ছে। ফলে অনেকে চাকুরিচ্যুত হচ্ছেন। অনেক কর্ম-পরিবেশে নারীদের জন্য আলাদ শৌচাগার নেই, নেই তাদের জন্য যথেষ্ট নিরাপত্তা ব্যবস্থা। কর্মস্থলে ভালো স্যানিটেশন ব্যবস্থা না থাকায় কিডনিসহ বিভিন্ন দুরারোগ্য ব্যধিতে আক্রান্ত হচ্ছেন নারী কর্মীরা।

কর্মক্ষেত্রে শিশু দিবাযত্ন কেন্দ্র না থাকায় অনেক নারীকে চাকরি ছাড়তে হয়। সুযোগ পাওয়া সত্ত্বেও দূরত্ব এবং ভালো যাতায়াত ব্যবস্থার অভাবে অনেকে শ্রমবাজারে প্রবেশ করতে পারছেন না। অনেকে সন্তান জন্মদানের জন্য লম্বা ছুটি কাটাতে বাধ্য হন। ফলে ওই নারী যখন আবার ক্যারিয়ারে ফিরে আসেন তখন আর সেই উপযুক্ত পদ-পদবি পান না। আবার অনেকেই এই দীর্ঘ বিরতির পর আর ভালো কিংবা সাধারণ কোনো চাকরি পান না। এখনও কোনো কোনো প্রতিষ্ঠানে বাংলাদেশের শ্রম আইন অনুসরণ না করে সন্তান-সম্ভবা নারী কর্মীকে ছুটি না দিয়ে বরং চাকুরিচ্যুত করা হয়। আবার কিছু প্রতিষ্ঠানে মাতৃত্বকালীন ছুটির সময় বেতন-ভাতা- বোনাস ইত্যাদির সুযোগ থেকে বঞ্চিত করা হয়। পারিবারিক দায়দায়িত্ব এবং সামাজিক মূল্যবোধের কারণে অনেক নারীই শ্রমবাজারে যুক্ত হতে পারছেন না বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।

অবস্থার আরও ইতিবাচক পরিবর্তন আনার জন্য শিক্ষিত নারীদের বেশি করে শ্রমবাজারে আনতে হবে; ‘নারী উদ্যোক্তা’ ঋণ সহজলভ্য করতে হবে, বাজারের চাহিদার সঙ্গে সংগতি রেখে বিভিন্ন বিষয়ে প্রশিক্ষণ দিতে হবে। যেমন- হস্তশিল্প, মাশরুম চাষ, কম্পিউটার চালনা, নার্সিং, হাউস মেকিং, বেকারি শিল্প ইত্যাদি; থাকার জন্য কর্মজীবী নারী হোস্টেল তৈরি, নারীবান্ধব যাতায়াত ব্যবস্থা ও কর্মক্ষেত্র তৈরি করতে হবে এবং গৃহস্থালি কাজে পুরুষের অংশগ্রহণ বৃদ্ধি করা প্রয়োজন। কর্মক্ষেত্রে নারীদের আরও বেশি উৎসাহিত করতে কোটা ব্যবস্থা এবং শিক্ষাগত যোগ্যতা শিথিলতার বিষয়টিও বিবেচনায় রাখা উচিত।