আগে জানি না পরে জানি কেন?

প্রফেসর ড. মো: ফখরুল ইসলাম: গল্পটা আমার ধীমান বন্ধুবর বলেই ফেলেছেন। তা হলো- সবাই জানে আগুন পুড়ে। হ্যাঁ, আগুনে হাত দিলে হাত ঝলসে যায় অথবা পুড়ে। সবাই এটাও জানে পানি আগুনকে নিভাতে পারে। পানি ছাড়া প্রাণির প্রাণ বাঁচে না। সাঁতার না জানলে পানিতে নামলে বিপদ ঘটতে পারে। যেমন বিপদ ঘটে প্রতিদিন পানিতে ডুবে বত্রিশ শিশুর অকাল মৃত্যুর সংবাদে কষ্ট পাওয়া, আহাজারি করা পরিবারগুলোর মাঝে। সবাই আরো জানে, বায়ুতে অক্সিজেন আছে তাই নাক-মুখ দিয়ে সেটা গ্রহণ করতে হয়। আবার বায়ুতে করোনার জীবাণু আছে, তাই মাস্ক দিয়ে ছেঁকে না নিলে সংক্রমণে মৃত্যু হতে পারে। ঘরের বাইরে বের হলে তাই নাক-মুখ ঢেকে সাবধানে বের হতে হবে সেটা আগে জেনে ফেলেছি।

সবকিছুই জানা বা না-জানার মধ্যেকার বিষয়। অথবা আগে জানা বা পরে জানার বিষয়। আগেভাগে জানা থাকলে সেটা জ্ঞান। কোন কিছু আগে জানা ছিল না কিন্তু শিক্ষা বা ক্তুক্তভোগী হয়ে হয়তো অভিজ্ঞতা তৈরী হয়েছে আমার বা আপনার। অথবা কেউ আমাকে বা আপনাকে সেসব জানিয়ে দেবার জন্য নিয়োজিত হয়ে নিবেদিত হয়েছেন। এই নিবেদনের মাত্রাগত তারতম্যের ফলে আমাদের দেশে প্রচলিত সামাজিক সেবায় যেসব ব্যত্যয় ঘটে চলেছে সেসম্পর্কে কিছু কথা লেখার জন্য আজকের এই ক্ষুদ্র প্রয়াস। কারণ, আগে জানতাম না বলার অবকাশ থাকলেও করুণা পাবার কোন ফুরসৎ নেই এসব জায়গায়। সেসব জায়গা ও বিষয়ের কথা এখন ওপেন সিক্রেট হওয়ায় সবাই আগেভাগে অনেক কিছুই আঁচ করতে পারে। যদিও তাঁরা গণক বা জ্যোতিষি নন।
ধীমান বন্ধুবর তার একটি লেখায় বলেছেন, “ চুক্তির পর জানা যায় হাসপাতালে লাইসেন্স নাই। রোগীর মৃত্যুর পর জানা যায় ডাক্তার ভুয়া। আগুন লাগার পর জানা যায় ভবনের নকশায় ত্রু টি ছিল। দুর্ঘটনার পর জানা যায় গাড়ি বা লঞ্চের ফিটনেস নেই। শেয়ারবাজার বা ব্যাংক লুট হওয়ার পর জানা যায় কোম্পানি ভুয়া। খাল বিল ভরাট করে প্লট বিক্রির পর জানা যায় অনুমোদন ছিল না । ফ্লাইওভার-ব্রিজ তৈরির পর জানা যায় নকশায় ভুল ছিল । সাজা ভোগের পর জানা যায় আসামি আসল ছিল না। কোটি মানুষ খাওয়ার পর জানা যায় পণ্যে ভেজাল ছিল। লুটেপুটে বিদেশ পালানোর পর জানা যায় কোম্পানি হায় হায় ছিল……চলছে চলুক..”

আরো কিছু জানাতে বললে সে উত্তর দিল-সব কিছু লেখার মত সাহস পাই না দোস্ত। ওর সব কথার সংগে সমসাময়িক বাস্তবতা জড়িত রয়েছে। কেউ প্রতিবাদ করতে গা করে না। কারণ, সমাধান আশা করাটা বৃথা মনে করে। তাই বিষয়গুলো আমাদের কাছে এখন স্বাভাবিক মনে হয়। আরেকজন ওর কথার সমর্থন করে বলল- স্বাধীন বাংলার কোন দোষ নেই, সে তো জন্মভূমি। সেই জন্মভূমিতে যে পশুগুলো জন্মেছে তারাই এসব করছে। এরা আগেও করেছে, এখনও করাচ্ছে, ভবিষ্যতে কি হবে…..।

আলুর দাম আকাশ ছোঁয়ার পর জানা যায় করোনার ত্রাণ হিসাবে স্টকের আলু সব বিতরণ করা হয়েছিলো, পেঁয়াজ, কাঁচা মরিচ সেঞ্চুরি, ডাবল সেঞ্চুরি করার পর জানা যায় ওগুলো পাশের দেশ থেকে সময়মতো আসার কথা ছিলো। ধর্ষণের অভিযোগ দায়েবের পর জানা যায় কর্ম সম্পাদনের আগে বিয়ের প্রলোভন ছিলো । খেলারাম তুই খেলে যা। এক বড়ভাই আক্ষেপ করে বলেছেন, “লেখাটা দুবার পড়লাম। শুধু হতাশই-না অত্যন্ত ক্ষুব্ধ। প্রতিদিন আমরা যা নোটিশ করছি ঠিক সেগুলোই এখানে বলা হয়েছে। আমার মাথা গরম হইয়া যায় এসব ঘটনা প্রতিদিন যখন দেখি। শরীরের পশমগুলো দাঁড়িয়ে যায়। মাঝেমধ্যে এমনও মনে হয় আমার শক্তি ও সাহস কি শেষ হয়ে গেলো? আমি একজন মুক্তিযোদ্ধা। প্রতিমাসে হাজার হাজার টাকা ভাতা পাওয়া যায়। নেই না আমি। গতবার আমাদের বিভাগের বার্ষিক পুনর্মিলনীতে মুক্তিযোদ্ধা এলামনাইদের সম্মাননা দেয়া হলো। স্যার ও বড়ভাইরা আমাকে অনেক বললো, তবুও আমি সম্মাননা নিতে সম্মত হই নাই। আমার বিশ্বাসটা হলো, কোন সুবিধা পাওয়া বা নেয়ার জন্য আমি যুদ্ধ করিনাই। তবে যারা ন্যয়সঙ্গত সুবিধা নেয় তাদের আমি অসম্মান করিনা। থাক সেসব কথা।”

প্রশ্ন হলো এটাই কি স্বাধীনতার স্বরুপ? এইরকম দেশই কি আমরা চেয়েছিলাম? চোখের সামনে সব শেষ হয়ে যাচ্ছে, তবুও সংঘবদ্ধ প্রতিবাদ করার কেউ নাই। তরুণ ও যুবারা কি নিস্তেজ হয়ে গেছে? এভাবে আর কতদিন? রেল ক্রসিংয়ে গতকাল অভয়নগরে ট্রেনের সাথে নতুন গাড়ীর সংঘর্ষ হয়ে চারজন মারা গেল। আজ ময়মনসিংহে তিনজন… কেউ দেখে না? রেলগেট নেই কেন? সতর্কঘন্টা লাগানো হয়নি কেন? তাহলে আমাদের দেশে একটি শান্তিপূর্ণ সমাজ বিনির্মাণের দায়িত্বটা কার কার? আগাম বন্যা, খরা, মহামারী, অভাব, বেকারত্ব, দারিদ্র্য ইত্যাদি অনুমান করার দায়িত্বটা কার? প্রাকৃতিক দুর্যোগের পূর্বাভাষ দেয়ার চাকুরী ও দায়িত্ব-কর্তব্যটা কার? কোটি কোটি শিশু, কিশোর, যুবকদের হাতে হাতে মোবাইল ফোনের মধ্যে অবাধে নীলছবির ব্যবসা কার সহায়তায় কে করে যাচ্ছে? এর ফলে ধর্ষণকে উস্কে দিয়ে আমাদের নৈতিক অধ:পতন দেখে কে বাইরে বসে হাসাহাসি করছে? ফলত: সমাজে বীভৎস ধর্ষণের এসব কান্ড দেখেও কি ওদের মনে ঘৃণা জন্মে না?

দেশের বিপদের সতর্কবার্তা কে দেয়? সীমান্তে মাদক ঢুকে কীভাবে? পাহারাদার ঘুমানোর পরও বেতন পায় কেন? তবুও তারা চাকুরীতে বহাল থাকে কোন খুঁটির জোরে? কোথাও আগুন লাগলে ফায়ার ব্রিগেডের ইউনিট যেমন সাইরেন বাজিয়ে ছুটে আসে সীমান্তে ওরা চোরাচালানী দেখলে সাইরেন না বাজিয়ে চুপ করে থাকে কেন? ধর্ষনের শাস্তির মত মাদক চোরাচালানী ও অবৈধ মাদক ব্যবসায়ীদের ফাঁসির ব্যবস্থা হয় না কেন? সমস্যা হলো প্রতিনিয়ত এত খারাপ ঘটনাবলি চারদিকে ঘটেই চলেছে। তবু কিছু লোক বলতেই থাকেন সবকিছু ভালো, এসব তাঁরা গৌণ বিষয় মনে করেন, নেতিবাচক কিছু শুনতে রাজি নন, কেউ বললে ঝগড়া বাঁধিয়ে দেন। আত্মসমালোচনা না করতে শিখলে উন্নতির আর কোন আশাই যে থাকে না, সেটা তারা বুঝতে চায় না। মনে হয় সবসময় তারা কিছু একটা হারানোর ভয়ে তটস্থ থাকে। সবকিছুকে তারা সন্দেহের চোখে দেখে। তাই তাদের দ্বারা এর চেয়ে ভাল কিছু আশা করাটা বোকামী।

শুধু মনে হয় এত ঘটনা, এত দুর্ঘটনা এর প্রতিকার আগেভাগেই করার ক্ষেত্রে আমরা গড়িমসি করছি কেন? আমাদের কার্যকরী পূর্বপরিকল্পনা নেই কেন? আমরা আগেভাগেই এসব কুকর্ম প্রতিরোধের জন্য ব্যবস্থা নিতে পারি না কেন? এসব বিষয় দেশের সেবাদানকারীগণ আগেভাগে জানেন না তা বলা যাবে না। জেনেও তারা চুপ করে সময় ক্ষেপণ করেন কোন কারণে, কার আশায়, কিসের নেশায়? তাই বলতে হয়, দায়িত্ববানরা সহজে প্রতিরোধযোগ্য আর্থ-পরি-সামাজিক সমস্যাগুলো অবহেলা করে মহীরূহ করে ফেলার সুযোগ দেন। তারপর সেগুলো জটিল আকার ধারণ করলে তাদের বোধোদয় ঘটে। তখন উপায়ান্তর না দেখে দিগ্বিদিক দৌড়াদৌড়ি শুরু করেন কেন? এসব জটিল প্রশ্নের দ্রুত সমাধান হওয়াটা খুব জরুরী।

*লেখক রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডীন, সমাজকর্ম বিভাগের প্রফেসর ও সাবেক চেয়ারম্যান।E-mail: fakrul@ru.ac.bd

জেড,আই/ঢাকানিউজ২৪ডটকম।