কিংবদন্তী ক্রীড়া সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব শিক্ষাগুরু অধ্যক্ষ আমির আহমেদ চৌধুরী রতন আর নেই

মো. নজরুল ইসলাম, ময়মনসিংহ :  দেশের খ্যাতনামা স্কুল মুকুল নিকতনের প্রতিষ্ঠাতা, জেলা নাগরিক আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক, জেলা ক্রীড়া সংস্থার সাবেক সাধারণ সম্পাদক, ক্রীড়া, সাংস্কৃতিক জগতের মহারাজা, সুদক্ষ সংগঠক, মানুষ গড়ার সুনিপুন কারিগর, বীর মুক্তিযোদ্ধা ও জেলা আওয়ামীলীগের উপদেষ্টা, বর্ণাঢ্য জীবনের অধিকারী শিক্ষাগুরু বীর মুক্তিযোদ্ধা অধ্যক্ষ আমির আহমেদ চৌধুরী রতন (৮০) ১৫ অক্টোবর রাত সোয়া ১১টায় মিনিটে শ্যামলী স্পেশালাইজড হাসপাতালে শেষ নি:শ্বাস ত্যাগ করেন। ( ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাহি রাজিউন)। তিনি স্ত্রী এক ছেলে, এক মেয়েসহ অসংখ্য গুণগ্রাহী রেকে গেছেন।
রতন চৌধুরীর নামাজে জানাজ শুক্রবার বাদ জুম্মা ময়মনসিংহ আঞ্জুমান ঈদগাহ মাঠে অনুষ্ঠিত হয় । জানাজায় ময়মনসিংহ সিটি কর্পোরেশনের মেয়র ইকরামুল হক টিটুসহ সরকারী বেসরকারি পর্যায়ের কর্মকর্তা, বিভিন্ন রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক, ক্রীড়াঙ্গণ, সামাজিক সংগঠনের নেতাকর্মীরা অংশ নেন।

ফেনীতে শুক্রবার রাত ৮টায় দ্বিতীয় নামাজে জানাজা শেষে ফুলগাজীর আনন্দপুর ইউনিয়নের হাসানপুর চৌধুরী বাড়িতে পারিবারিক গোরস্থানে আমির আহমেদ চৌধুরী রতনের লাশ দাফন করা হয়। তার বড়ভাই ফেনী জেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান প্রয়াত আজিজ আহমেদ চৌধুরী এবং ছোট ভোটভাই সাবেক রাষ্ট্রদূত বিগ্রেডিয়ার জেনারেল আমিন আহমেদ চৌধুরী ।

আমির আহমেদ চৌধুরী রতনের মৃত্যুতে ময়মনসিংহের সাবেক জেলা প্রশাসক ও বর্তমান অতিরিক্ত সচিব মোস্তাকীম বিল্লাহ ফারুকী তার প্রতিক্রিয়ায় জানান, আমির আহমেদ চৌধুরী রতন চলে গেলেন। ময়মনসিংহ এবার আরো এক সত্িযকারের খাটি রতন হারালো। ময়মনসিংহকে যদি মহাকাশ কল্পনা করা হয় এবং সেই মহাকাশে যে সব জ্যোতিষ্মান নক্ষত্র সদা দিপ্তিমান ছিলো সে গুলোর মধ্যে রতন “এক অনন্য বৈশিষ্ট্য মন্ডিত নক্ষত্র ছিলেন। কিছু দিন যাবৎ ই ময়মনসিংহের মহাকাশ থেকে নক্ষত্র ঝরে পড়া শুরু হয়েছে। কিছুদিন আগেই ঝরে পড়েছেন অ্যাডভোকেট আনিসুর রহমান আর এখন আমিন আহমেদ চৌধরী রতন।
চাকরীর সুবাদে ময়মনসিংহে বেশ কয়টি বছর কাটিয়েছি। দেখার সুযোগ হয়েছে অনেক কিছু। চেনা জানার সুযোগ হয়েছে অনেকের সাথে। ঐতিহ্যবাহী ময়মনসিংহের রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক, সামাজিক বিবর্তন ও ধাবমান পরিবর্তনের একটা স্পষ্ট ধারা অবলোকন ও অনুধাবনের সুযোগ হয়েছে। এই উপলব্ধির সৃষ্টা শিল্পী ছিলেন আমির আহমেদ চৌধুরী রতন। শিক্ষার সাথে সাংস্কৃতিক চর্চার মাধ্যমে সুস্থ্য সমাজ নির্মানে তার ও তাদের প্রচেষ্ঠার স্মারক প্রতিষ্ঠান মুকুল নিকেতন ও মুকুল ফৌজ। মূল্যবোধের ধারাবাহিক নষ্টের আবশ্িযক নিষ্ঠুর বাস্তবতার কারণে নিজস্ব বৈশিষ্ট্য টিকিয়ে রাখা অসম্ভব হয়ে পড়লেও এগুলো টিকিয়ে রাখার কি প্রানান্ত চেষ্টাই না তিনি শেষ পর্যন্ত করেগেছেন। যৌবনে অন্যতম শ্রেষ্ঠ এ্যাথলেট্স – পূর্নবয়সে আদর্শ শিক্ষক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব। শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক পরিমন্ডলে নিজস্ব ছাপ রাখেছিলেন তিনি। সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের নেতা হিসেবে নন বরং তার মধ্েয যে শিল্প মানসটা বাস করতো সেই ব্যক্তিত্বের প্রভাব ছিলো ময়মনসিংহের শিল্পাকাশে।

প্রশাসনের অনেক আয়োজনের জন্য তিনি ছিলেন অপরিহার্য ব্যক্তিত্ব। বিশেষ করে জাতি ধর্ম বর্ন নির্বিশেষে সকল মানুষের প্রানের উৎসব পহেলা বৈশাখের আয়োজনে তার একক নির্দেশনা ও নেতৃত্ব মনে চির জাগুরুক থাকবে।
ত্রিশালের দরিরামপুরে কবি নজরুলের জন্ম বার্ষিকী উপলক্ষে তিনব্যাপী আয়োজিত অনুষ্ঠানটির সাংস্কৃতিক পর্বটি তাঁর নির্দেশনায় প্রতিবছর পরিচালিত হতো। শত শত শিল্পীর অংশগ্রহনে তিনদিন দিবারাত্রী সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান মান বজায় রেখে আয়োজন শুধু মানগত বিচারেই অনন্য ছিলো না এটি অত্যন্ত পরিশ্রম সাধ্য বিষয় ছিলো। এই প্রিয় অনুষ্ঠানটির দায়িত্ব পালনে তাঁর যে একনিষ্ঠতা, পরিশ্রম, সততা আমি দেখেছি তা বাংলাদেশে বিরল ঘটনা বলেই মনে করি। নিজের নির্দেশনায় পরিচালিত নাটক কবি নজরুল এখনো বুকের মধ্যে চেতনার স্ফুলিংগ হয়ে আছে। এটাকে উনি অপসংস্কৃতির হাত থেকে বাংলাদেশের সুস্থ সংস্কৃতি রক্ষা ও চর্চার হাতিয়ার হিসেবে নিয়েছিলেন বলেই মনে করি। অদ্ভুত দরদ দিয়ে অসম্ভব দৃঢ়তায় তিনি লড়ে গেলেন আমৃত্যু। ময়মনসিংহের গেজেট প্রকাশনার দায়িত্ব জেলা প্রশাসনের উপর বর্তালে খেলাধূলা ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য লেখার দায়িত্বটিও উনি হাসি মুখেই নিয়েছিলেন। অনেকটা কাজ শেষ করেছিলাম এটা এখন কোন পর্যায়ে আছে জানিনা। তবে রতন সাহেবের হাতের ছুঁয়া সেখানেও জ্বল জ্বল করবে বলেই আমার বিশ্বাস। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান টিকিয়ে রাখতে তার প্রানান্ত চেষ্টা ও তার বুকের রক্তক্ষরণ আমি দেখেছি। মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিতকরণ ও সাংস্কৃতিক মান রক্ষায় তার প্রচেষ্টা ও একই সাথে কষ্টবোধ আমার প্রানকেও নাড়া দিতো। অনেক কিছু করতে না পারা বা বাস্তবতার কাছে আতœসমর্পনের তাঁর অসহায়ত্বের হাসি আমার বুকেও কষ্টের প্রবাহ বইয়ে দিতো। আমি তার সমব্যাথি ছিলাম সহমর্মী ছিলাম কিন্তু বাস্তবতার কারণে সহযোদ্ধা হতে পারিনি। সেই কষ্টবোধ আজো বুকে ধারন করি। একই ভাবে ময়মনসিংহ বিভাগ আন্দোলনের নেতা অ্যাডভোকেট আনিসুর রহমানের সব ঠিক করে ফেলতে না পারার কষ্ট বোধ ও আমাকে আজো নাড়া দেয়। এই দুইজনই ময়মনসিংহের একই রকম কষ্ট বোধে তাড়িত আজীবন সংগ্রামী জ্যোতিষ্ক ছিলেন। দুজনের প্রতিই আমার শ্রদ্ধা।

কাজকে ভালবাসেন এমন এক মানুষের জীবনাবসান ময়মনসিংহবাসী নিশ্চয়ই মনে রাখবেন। তাঁর মতো নক্ষত্রের আলোক বর্তিকা জ্বালিয়ে রাখার মতো যদি কেউ থাকে, এক জনও যদি আলোকিত হয় তবেই তার সারাজীবনের কাজ স্বার্থক হবে।