বিভ্রান্তির চোরাবালিতে যেন হারিয়ে না যায় মহৎ লক্ষ্য

প্রভাষ আমিন:   মানুষ কখনও কখনও নিজের ধারণা ভুল প্রমাণিত হলে খুশি হয়। আমি বারবার এমন খুশি হয়েছি। একটা সময় আমাদের অনেকের মধ্যেই একটা সম্মিলিত হতাশা কাজ করছিল। আমাদের নতুন প্রজন্ম বুঝি উচ্ছন্নে গেছে। তারা সারা দিন স্মার্ট ডিভাইসে মুখ বুজে থাকে। তারা প্রতিবাদ করতে জানে না, স্লোগান দিতে জানে না, উত্তাল রাজপথ চেনে না। বড় জোর ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়ে দায় সারে। কেউ কেউ এমনও বলেন, একাত্তরে ফেসবুক থাকলে দেশ স্বাধীন হতো না। সবাই ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়ে ঘুমিয়ে থাকতো। কেউ যুদ্ধে যেতো না। আমার আফসোস ছিল, আমরা বুঝি আর কখনও ৫২, ৬৯, ৭১, ৯০, ৯২-এর মতো মহৎ আন্দোলন দেখতে পাবো না। রাজপথ বুঝি আর কখনও উত্তাল হবে না প্রতিবাদী স্লোগানে। তবে নতুন প্রজন্মের এই ‘করে নাকো ফোঁসফাঁস‌, মারে নাকো ঢুঁশঢাঁশ’ মার্কা হয়ে যাওয়ার জন্য আমি বরাবরই আমাদের দায়ী করেছি। আমরা তাদের সামনে কখনও মহৎ লক্ষ্য দিতে পারিনি। কিন্তু ১৮ থেকে ২৫- এই বয়সটা তো চুপচাপ বসে থাকার নয়। এই সময়টায় তারুণ্য চারপাশের সবকিছু বদলে দিতে চায়। সঠিক লক্ষ্য না পেয়ে কেউ জঙ্গি হয়, কেউ মাদকাসক্ত হয়। আর আমরা শিশু বয়সেই তাদের হাতে বইয়ের বদলে স্মার্ট ডিভাইস দিয়ে দায় সারি।

কিন্তু তরুণ প্রজন্ম বারবার আমাদের ধারণাকে ভুল প্রমাণ করেছে, বারবার আমাদের আনন্দিত করেছে। তাদের প্রথম চমক ছিল ২০১৩ সালে শাহবাগের গণজাগরণ। যুদ্ধাপরাধী কাদের মোল্লার যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে যখন আমাদের সবার মন খারাপ, তখন তরুণ প্রজন্ম মন খারাপ করে বসে থাকেনি। প্রতিবাদ নিয়ে রাস্তায় নামে। স্ফুলিঙ্গ থেকে সৃষ্টি হয় দাবানল। দেশ থেকে দেশান্তরে ছড়িয়ে পড়ে যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসির দাবি। আমার দৃষ্টিতে শাহবাগের সেই স্বতঃস্ফূর্ত গণআন্দোলন শুধু বাংলাদেশ নয়, বিশ্বের ইতিহাসে অন্যতম সেরা। তবে সৃষ্টিশীলতায় এগিয়ে থাকবে বছর দুই আগে নিরাপদ সড়কের দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন। দিন দশেকের সে আন্দোলনে গোটা দেশ অচল হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু কোনও বিশৃঙ্খলা ছিল না। বরং ঢাকার রাস্তা ছিল সবচেয়ে নিরাপদ ও সুশৃঙ্খল। কোনও গাড়ি ভাঙচুর হয়নি, কোনও অ্যাম্বুলেন্স আটকে থাকেনি।

এখন দেশজুড়ে যে ধর্ষণ ও নারী নির্যাতনবিরোধী আন্দোলন চলছে, তাও স্বতঃস্ফূর্ত। এই আন্দোলনে কোনও নেতা নেই, কিন্তু আছে দাবির তীব্রতা। উগ্রতা নেই; আছে দৃঢ়তা আর দায়িত্বশীলতা। প্রবল জনমতের চাপে সরকার দাবি মেনে নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। আইনমন্ত্রী জানিয়েছেন, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড রেখে আইন সংশোধনের কাজ চলছে। আগামী সোমবারই সংশোধনীটি মন্ত্রিসভার বৈঠকে উত্থাপিত হবে।

এই সরকারের বিরুদ্ধে হাজারটা অভিযোগ আনা যাবে। নির্বাচনি ব্যবস্থা ভেঙে দেওয়া, গণতন্ত্রহীনতা, মত প্রকাশের স্বাধীনতার ‘টুঁটি চেপে’ ধরা, দুর্নীতি ইত্যাদি। কিন্তু সরকার কখনোই জনমতের বিরুদ্ধে দাঁড়ায়নি। গায়ের জোর নয়, দাবি মেনেই তারা মানুষের ক্ষোভ প্রশমিত করেছে। এমনকি সরকারি চাকরিতে কোটা বাতিলের অন্যায় এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধী দাবিও প্রধানমন্ত্রী অনিচ্ছায় হলেও মেনে নিয়েছেন। কিন্তু বারবার দেখি একটি মহল ঘোলা পানিতে মাছ শিকার করতে চেয়ে আন্দোলনের বারোটা বাজিয়ে দিয়েছে। যেমন, শাহবাগের গণজাগরণের দাবি ছিল সরকারের কাছে, কিন্তু বিব্রত হয়েছে বিরোধী দল। অথচ বিএনপি বুদ্ধিমান হলে গণজাগরণের পাশে দাঁড়িয়ে সরকারকে বেকায়দায় ফেলতে পারতো। কিন্তু সেটা করার মতো নৈতিক অবস্থান তাদের ছিল না। বিএনপি-জামায়াত ছিল যুদ্ধাপরাধীদের পক্ষে। তাই জনগণের আবেগ ধারণ করার মতো নৈতিক জোর তাদের ছিল না। বরং সরকার জন-আবেগ ধারণ করে আইন সংশোধন করে কাদের মোল্লার ফাঁসি নিশ্চিত করেছিল। আর বিএনপি, জামায়াত, মাহমুদুর রহমান, আমার দেশ, হেফাজতে ইসলাম মিলে বাংলাদেশের সবচেয়ে মহৎ আন্দোলনকে ইসলামবিরোধী নাস্তিকদের আন্দোলন হিসেবে চিত্রিত করার অপপ্রয়াস চালায়। এমনকি হেফাজতকে সামনে রেখে লাখো মানুষের জমায়েতের মাধ্যমে সরকার উৎখাতের ষড়যন্ত্র হয়েছিল। যদিও সরকারের দৃঢ়তায় সে চেষ্টা সফল হয়নি। তবে সরকার বিরোধী কোনও আন্দোলন, বিরোধী দল ষড়যন্ত্র করে নস্যাৎ করেছে, এমন ঘটনা বিশ্বের ইতিহাসে বিরল।

নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের সঙ্গেও সরকারের নীতিগত কোনও বিরোধ ছিল না। তারা বরং শিক্ষার্থীদের দাবি মেনে দ্রুতই কঠোর আইন প্রণয়ন হয়, যদিও পরিবহন শ্রমিকদের হুমকিতে সে আইন এখনও কার্যকর করা যায়নি। সুশৃঙ্খল, শান্তিপূর্ণ ও সৃষ্টিশীল সে আন্দোলনকেও বিভ্রান্ত ও সহিংস করতে পেরেছিল বিএনপিপন্থী বুদ্ধিজীবী ও সাংবাদিকরা। ধানমন্ডির আওয়ামী লীগ কার্যালয়ে শিক্ষার্থীদের খুন করে লাশ লুকিয়ে রাখা হয়েছে, নারীদের ধর্ষণ করা হচ্ছে; এমন গুজব ছড়িয়ে সে আন্দোলনকে বিতর্কিত করার চেষ্টা করা হয়।

বরাবরের মতো এবারও ধর্ষণবিরোধী আন্দোলনকে সামনে রেখে একটা মহল ঘোলা পানিতে মাছ শিকারের চেষ্টায় মাঠে নেমেছে। তারা চেষ্টা করছে ধর্ষণবিরোধী আন্দোলনটিকে সরকারবিরোধী আন্দোলনে বদলে দিতে। এমনিতে সরকারবিরোধী আন্দোলন করা যাবে না, এমন কোনও কথা নেই। সরকারের নানা অনিয়মের বিরুদ্ধে বিরোধী দল মাঠে আন্দোলন গড়ে তুলতে পারে, জনগণকে সঙ্গে নিয়ে সরকারের ওপর প্রবল চাপ সৃষ্টি করতে পারে। শাহবাগের গণজাগরণ, নিরাপদ সড়ক বা ধর্ষণবিরোধী আন্দোলনে যদি স্বতঃস্ফূর্তভাবে লাখো মানুষ রাস্তায় নামতে পারে, বিএনপির ডাকে আসে না কেন? নিজেরা কিছু করতে না পেরে কোথাও আন্দোলন দেখলেই বিএনপি-জামাতের লোকজন ছোক ছোক করে সেখানে ঢুকে পড়ে। তারা সব আন্দোলনেই সরকার পতনের স্বপ্ন দেখে।

দেশজুড়ে এখন যে আন্দোলন চলছে, তা ধর্ষকের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড করা এবং নারীদের জন্য একটি নিরাপদ বাংলাদেশের গণআকাঙ্ক্ষার তীব্র প্রতিফলন। এটি সরকারবিরোধী, কিন্তু সরকার পতনের আন্দোলন নয়। আর ধর্ষকদের সাজার ব্যাপারে কারও কোনও দ্বিমত নেই। এখন পর্যন্ত সরকারের কোনও মন্ত্রী বা সরকারি দলের কোনও নেতা এই আন্দোলনের আবেগের বিপরীতে দাঁড়াননি। বরং আন্দোলন শুরুর পর মন্ত্রিসভার প্রথম বৈঠকেই আইনের সংশোধনী আসছে। তারপরও রাজপথে সরকারবিরোধী স্লোগান হয়েছে, শেখ হাসিনার ছবি পোড়ানো হয়েছে। তাৎক্ষণিক ক্ষোভে এটা হতেই পারে। কিন্তু যখন দেখি, ধর্ষণের বিচারের আগে শেখ হাসিনার পদত্যাগের দাবি, তখন বুঝি আন্দোলনে পোকা ঢুকেছে। যখন দেখি ফেসবুকে আন্দোলনের ছবি এডিট করে সৃষ্টিশীল স্লোগানের বদলে অশ্লীল স্লোগান জুড়ে দেওয়া হয়, তখন বুঝি আন্দোলনকে বিভ্রান্ত করার সব অপচেষ্টা চলছে।

আসলে যাদের নিজেদের সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন করার মুরোদ নেই তারা কখনও নুরের ভরসায়, কখনও শিক্ষার্থীদের বিপদে ফেলে, কখনও ধর্ষণবিরোধী আন্দোলনের কাঁধে বন্দুক রেখে সরকারের পতন ঘটাতে চায়। আগেই বলেছি, সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন করার অনেক যৌক্তিক কারণ আছে। বিরোধী দল গণতান্ত্রিক উপায়ে আন্দোলন নিয়ে মাঠে নামুক, আমরা তাদের সমর্থন করবো। কিন্তু সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যের কোনও আন্দোলনকে বিভ্রান্ত করতে হবে কেন?
লেখক: হেড অব নিউজ, এটিএন নিউজ