স্বপ্নে পাওয়া অষ্টধাতুর আংটি

নিউজ ডেস্ক:   ছেলেটির নাম সম্রাট। যেমন সুদর্শন তেমনই ফিটফাট। আসলেই সম্রাট। ছেলেটির সাথে দেখা হত মানিকের দোকানে। আসলে ব্যবসাটা মানিকের বাবার। মানিক সন্ধ্যার পর দোকানে বসে। বাবাকে একটু বিশ্রাম দেওয়ার উদ্দেশ্যে। হোল-সেল ব্যবসা, রাতে খুব একটা বেচাকেনা হয় না। সন্ধার পর মানিকের কলেজ পড়ুয়া বন্ধুদের সাথে আড্ডা চলে একেবারে দোকান বন্ধ হওয়া পর্যন্ত। মানিকের বন্ধুরা সবাই মেধাবী ছাত্র। উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা শেষ। এবার চুড়ান্ত ভর্তিযুদ্ধ। কে কোথায় ভর্তির সুযোগ পাবে, কে জানে? মানিকের মনটা খুব একটা ভালো নেই। তাকে হয়তো স্থানীয় কলেজেই গ্রাজুয়েশন করতে হবে। বাবার শরীর খুব একটা ভালো যাচ্ছে না। যেহেতু মানিককেই বাবার ব্যবসার কাজে সাহায্য করতে হয়, তাই হয়ত ব্যবসার হাল তাকেই ধরতে হবে।

সম্রাট স্থানীয় হাটে অষ্টধাতুর আংটি বিক্রি করে। স্বপ্নে পাওয়া অষ্টধাতুর আংটি। এই আংটি ব্যবহার করলে একাশি প্রকারের বাত দূর হয়ে যায়। সম্রাট আর মানিকের অবস্থা অনেকটা একই রকম। সম্রাট ক্লাস এইট পর্যন্ত পড়াশোনা করেছে। সে তাঁর বাবা মায়ের একমাত্র ছেলে। বাবার অসুস্থার কারণে একমাত্র ছেলে সম্রাটকেই ব্যবসার হাল ধরতে হয়েছে, পড়াশোনা আর হয়নি। সম্রাট ব্যবসার মারপ্যাচ বেশি বোঝে না। মানিকের দোকান থেকে ১৮০ টাকায় প্রতিদিন ১ গ্রোস (১৪৪ টা) অষ্টধাতুর আংটি কেনে, আংটির সাথে প্রচারপত্র সাপলিমেন্টারি পাওয়া যায়। প্রচারপত্রেই আংটি ব্যবহারের নিয়ম-কানুন লেখা থাকে। এই যেমন, ‘এই আংটি ব্যবহার করলে একাশি প্রকারের বাতের ব্যথা চিরতরে দূর হয়ে যাবে। তবে এই আংটি ব্যবহারের কিছু নিয়ম-কানুন আছে, যেমন এটা ব্যবহারের সময় গরুর গোসতো, বেগুন ইত্যাদি খাওয়া যাবে না। অনিয়ম হলে কার্যকারিতার নিশ্চয়তা নেই।’

হাটের একটা নির্দিষ্ট জায়গায় লাল কাপড়ের ঘিরা দিয়ে, বেশ ফিটফাট হয়ে বসে সম্রাট । চোখে সানগ্লাসটা পরতে ভোলেনা। তবে শুধু প্রচারপত্র দিয়ে কি আর ব্যবসা চলে? না, কাস্টোমার আকর্ষণের জন্য কিছু কথাবার্তা না বললেই নয়। আবার একটু ব্যস্ততাওতো দেখাতে হয়। আংটির সাথে প্রচারপত্র সাপলিমেন্টারি পাওয়া গেলেও, প্রচারের জন্য আংটির বর্ণানাসহ অডিও ক্যাসেট আলাদাভাবে কিনে নিতে হয়। এই ক্যাসেট নাকি ভারত থেকে রেকর্ড করে আনা হয়েছে। যেমন সুমধুর কন্ঠ তেমনই বর্ণনা, যা একবার শুনলে আপনি আংটি নিতে বাধ্য। বর্ণনার শুরুটা এরকম, ‘এটা অষ্টধাতুর আংটি, এই অষ্টধাতু স্বপ্নে পাওয়া। তামার সাথে অষ্টধাতুর মিশ্রণে তৈরি হয়েছে এই আংটি। আপনি জীবনে অনেক টাকার ঔষধ খেয়েছেন, অনেক ডাক্তার দেখিয়েছেন, উপকার হয় নি। আপনি মাত্র দশ (১০) টাকা দিয়ে একটি আংটি কিনে ভাগ্য পরিক্ষা করতে পারেন, ইত্যাদি।’ বি’ফলে (উপকার না হলে) মূল্য ফেরত দেওয়ার কথা খুব জোরে-সোরেই বলা হয়েছে বর্ননায়। সম্রাট ক্যাসেট চালিয়ে একটা স্পঞ্জের ওপর আংটি গুলো ঘষতে থাকে, তামার বৈশিষ্ট অনুযাই যত ঘষা, তত উজ্জল। তবে দেখে মনে হবে আংটিগুলো সবে মাত্র তৈরি করা হয়েছে।

মানিকের বন্ধু সালেহিন, মেডিকেলে পড়ার ইচ্ছা, পরীক্ষাও ভালোই দিয়েছে। আশা করছে টিকে যাবে। সালেহিন প্রায়ই হাটে যায়। না, ব্যবসা বানিজ্যের জন্য নয়, কয়েক বন্ধু মিলে যায় গুড়ের জিলাপি খেতে। মাঝেমধ্যে সম্রাটের দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে থাকে। কিছুটা লজ্জা পায় সম্রাট।

সন্ধায় আবার মানিকের দোকানে সালেহিনের সাথে দেখা হয় সম্রাটের। ইতোমধ্যে মানিকের বন্ধুদের সাথে ভালোই সখ্যতা হয়েছে সম্রাটের। প্রায়ই মানিকের বন্ধুরা বিভিন্ন প্রশ্নে জর্জরিত করে সম্রাটকে। ভালোই লাগে সম্রাটের। এত শিক্ষিত বড় ভাইয়ারা তার সাথে কথা বলে, ভালো-মন্দ জানতে চায়, এটা সম্রাটের জন্য একটা চরম ভালো লাগার অনুভুতি।

একদিন সন্ধায় মানিক একটা জরুরি কাজে কিছুক্ষনের জন্য তমালের সাথে দোকানের বাইরে গিয়েছিল, সালেহিন ও সামিউল দোকানেই ছিল, এরই মধ্যে সম্রাটের আগমন। সম্রাটকে, মানিক না আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। সালেহিন ও সামিউল এর প্রশ্নে জর্জরিত সম্রাট। সালেহিন জানতে চাইল, ‘আংটিতে কাজ না হলে টাকা ফেরত,’ এই বিষয়টাতো বোঝা গেল না, সম্রাট। কেউ যদি বলে আপনার আংটিতে কাজ হয়নি, আমার টাকা ফেরত দিন। তাহলে কিভাবে প্রমাণ হবে কাজ হয়েছে কি না? সম্রাট বলে এটাতো খুবই সহজ, যদি কেই আংটি ফেরত দিয়ে বলে কাজ হয়নি, তাহলে তাকে ১০ টাকা ফেরত দিয়ে, ঐ আংটি স্পঞ্জে ঘষলেই তো আবার নুতন। আবার বিক্রি। তবে, যদি কেউ আংটি ফেরত না দিয়ে বলে কাজ হয়নি, সেক্ষেত্রে, তাকে সাথে সাথে ১০ টাকা ফেরত দিয়ে বলা হয়, হয়তো ব্যবহারে কোন অনিয়ম করেছিলেন, তবে আমরা যেহেতু প্রতিজ্ঞাবদ্ধ, সেজন্য আপনার টাকা ফেরত দেয়া হল। এই ক্ষেত্রে একটি আংটির ক্রয়মূল্য, এক টাকা পচিশ পয়সা ক্ষতি হয়, কিন্তু ওই ১০ টাকা ফেরত দেওয়ার কারণে দর্শকদের মাঝে আংটির চাহিদা আরও বেড়ে যায়। এতে ক্ষতির চেয়ে লাভই বেশি। সালেহিন অবাক, এত জটিল সমস্যার, কত সহজ সমাধান!

ভর্তি পরীক্ষার রেজাল্ট বের হওয়া শুরু হয়েছে। সালেহিন ঢাকা মেডিকেলে চান্স পেয়েছে। তমাল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও সামিউল রাজশাহি বিশ্ববিদ্যলয়।

মানিকের দোকানের আড্ডা আর নেই। মফস্বল শহর, শুধু মানিক আর সম্রাট। সম্রাট যথারিতি সন্ধায় আসে, অষ্টধাতুর আংটি নিতে, না এখন আর কেউ সম্রাটকে বিরক্ত করে না। মানিকের সাথে সম্রাটের সম্পর্ক একেবারেই মহাজন আর খরিদ্দার, গুরুগম্ভির পরিবেশ। মানিক আর সম্রাট দুজনই কি যেন খোজ করে, তাদের চোখ স্পষ্ট কথা বলে। দুজনেরই কিছু কষ্ট, অজানা প্রাপ্তিহিনতার কষ্ট।

সম্রাটের বাবা জমশের আলী, দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থ। তবে নিজের রোগ সমন্ধে বিস্তারিত কিছু জানেন না তিনি। খুবই দুর্বলতা অনুভব করেন, কোন কাজ করতে পারেন না। একবার এক্সরে এবং রক্তের কিছু পরীক্ষা করিয়েছিলেন, তবে অর্থের অভাবে চিকিৎসা নিয়ে বেশি দূর এগুতে পারেন নি। জমশের আলীর এক বন্ধু সোলেমান মিঞা, ঢাকায় থাকেন, তবে দীর্ঘদিন তাদের মধ্যে কোন যোগাযোগ নেই। গত ঈদে এসেছিলেন সোলেমান মিঞা, জমশের অলীকে খুজে বের করেছেন। দুই বন্ধুর জমে থাকা কত যে কথা। কথার মাঝে জমশেরের অসুস্থতার কথা জানতে পারেন সোলেমান মিঞা, ঢাকা মেডিকেলে চাকরি করেন তিনি। অনেক ভালো ভালো ডাক্তারের সাথে তার জানা-শোনা, সম্রাটকে ডেকে বললেন, ‘তোমার বাবার এক্সরে এবং অন্যান্য রিপোর্টগুলো নিয়ে ঢাকায় এসো। আমার বাসাতেই উঠবা। কোন রকম ইতস্তত করার প্রয়োজন নেই। আমার কোন ছেলে নেই, তুমি আমার ছেলের মতই বাবা। আমি তোমার বাবার চিকিতৎসাটা আবার শুরু করতে চাই। আজকাল সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা করতে বেশি টাকা লাগে না, শুধু প্রয়োজন একটু সচেতনতা।’

সম্রাট খুব সাহস সঞ্চয় করে মানিকের সাথে বিষয়টা শেয়ার করে। ভেবেছিল মানিক খুবই গুরুগম্ভির ছেলে, হয়তো পাত্তা দেবেনা, কিংবা রেগে যাবে। না তেমন কিছুই ঘটেনি। মানিক কথাটা শোনার পর যেন স্মৃতির পাতায় হারিয়ে যায়। মনে পড়ে তার নিজের বাবার কথা। কত ডাক্তার, কত চিকিৎসা, না কোন লাভ হয় নি। পক্ষাগাতগ্রস্থ হয়ে মাস ছয়েক ধরে বিছানায় পড়ে আছেন বাবা। মনে পড়ে নিজের পড়াশোনার কথা, মায়ের কষ্টের কথা, ছোট ভাইবোনের পড়াশোনার কথা, আরও কত কি। সম্রাট আবার জিজ্ঞেস করে, ‘তাহলে কি করব মহাজন। ঢাকায় যাওয়া কি ঠিক হবে? না, মানে আমি কোনদিন ঢাকায় যাইনিতো, তাই, একটু ভয় ভয় লাগছে।’ এবার বাস্তবে ফেরে মানিক, সম্রাটকে আস্বস্ত করে, ‘তুমি অবশ্যই ঢাকা যাবে। মনে রাখবে ভালো-খারাপ মিলেই আমাদের সমাজ। কাজেই ভয়ের কিছুই নেই। তুমি খুবই ইন্টেলিজেন্ট ছেলে। তোমার কোন অসুবিধা হবে না। শুধু একটু চোখ কান খোলা রাখবে, এই আর কি।’ সম্রাট ভরসা পায়। মানিকের প্রতি তার শ্রদ্ধা অরও বেড়ে যায়। মহাজন তো নয় যেন, নিজের বড় ভাই।

শুক্রবার, শুভদিন। সম্রাট রওয়ানা দেয়। ট্রেনে যাওয়ার পরিকল্পনা করেছে সম্রাট। পার্বতিপুর গিয়ে ট্রেন ধরতে হবে। সকাল আটটার ট্রেন। উত্তরবঙ্গ এক্সপ্রেস। যথাসময়ে সম্রাট স্টেশনে হাজির। টিকেট কেটে আসন খুঁজতে থাকে, ‘গ’-৫৩, পেয়ে যায় দ্রুত। দেখে এক ছেলে ঠেলাঠেলি করে তার ব্যাগ বাংকারে রাখছে এবং পাশের জনকে তার ব্যাগটা একটু সরানোর জন্য অনুরোধ করছে। কন্ঠটা বেশ চেনা চেনা মনে হল সম্রাটের। ছেলেটি ঘুরে দাড়াতেই অবাক সম্রাট, এতো সালেহিন ভাইয়া। সালেহিন বলে, ‘আরে সম্রাট, কোথায় যাচ্ছো?’ সম্রাট উত্তর দেয়, ‘ঢাকায়। আপনি?’ ‘আমিতো ঢাকাতেই যাচ্ছি, আমিতো ঢাকা মেডিকেলে পড়ি, কেন মানিক কিছু বলেনি?’ সম্রাট একটু ইতস্তত করে বলে, ‘আসলে মহাজনের সাথেতো বেশি কথা হয় না, তাই।’ এবার কথা না বাড়িয়ে সালেহিন বলে, আমার ব্যাগ’টা একটু খেয়াল রাখবা, আমি ট্রেন ছাড়ার আগেই কিছু ফল নিয়ে আসি।

ট্রেন ছাড়বে ছাড়বে মনে হচ্ছে। সালেহিন ফেরে। হুইসেল দিয়েছে, এখনই হয়ত ট্রেন ছেড়ে যাবে। যাত্রীরা সব নিজ নিজ আসনে বসা। ট্রেন ছাড়ার ঘোষনাও দেওয়া হয়েছে। ধীর গতিতে চলা শুরু করে ট্রেন, আর সাথে সাথে চলা শুরু করে সম্রাটের স্বপ্ন, হ্যা বাবাকে সুস্থ করার স্বপ্ন, সালেহিনের ডাক্তার হওয়ার স্বপ্ন।

সালেহিনের কৌতুহলি মন সম্রাটের কাছে, ঢাকা যাওয়ার উদ্দেশ্য জানতে চায়। এবার সম্রাট আরও একটু সাহস পায়, সোলেমান মিঞার বিষয়টা জানায়। সালেহিন বলে, ‘কিন্তু তুমি ওনাকে খুঁজে পাবে কীভাবে?’ সম্রাট বলে, ‘চাচা মোবাইল নাম্বার দিয়েছেন, বলেছেন ট্রেন থেকে নেমে একটা সিএনজি নিয়ে সোজা ঢাকা মেডিকেলে চলে যাবা, তারপর আমাকে একটা ফোন দিও। অনেক সময় নেটওয়ার্ক সমস্যা থাকে, তাই কানেকশন না পেলে, একটু পরে আবার দিও।’ সালেহিন বলে, ‘উনি হয়তো ভেবেছেন তুমি রাতের ট্রেনে উঠে দিনের বেলা পৌছবা তাই একথা বলেছেন, কিন্তু তুমিতো দিনের ট্রেনে যাচ্ছো। রাত দশটার আগে পৌছাবা না। রাত দশটায়তো তোমার চাচা অফিসে থাকার কথা না। আর ওনার বাসা কত দূরে তাও তুমি জানো না। ঢাকা শহরে মানুষ অফিস থেকে অনেক সময় ১০ কিলোমিটার পর্যন্ত দূরেও থাকে।’

সালেহিন লক্ষ করে, সম্রাট ঘামছে। মনে হয় খুব দুশ্চিন্তায় পড়ে গেছে। সালেহিন আস্বস্ত করে, দুশ্চিন্তার কোন কারণ নেই, ‘তুমি আমার সাথে, আমার হোস্টেলে যাবা, তারপর ফ্রেস হয়ে তোমার চাচাকে ফোন দিও। উনার বাসা যদি কাছেই হয়, তাহলে হয়তো রাতেই দেখা করবেন, আর দূরে হলে পরদিন সকালে তোমার সাথে দেখা হবে। তুমি রাতে আমার সাথেই থাকতে পারবা। আর ডাক্তার দেখানোর বিষয়ও আমি তোমাকে সহযোগিতা করতে পারবো, তবে আগে তোমার চাচার সাথে দেখা কর। আমার মোবাইল নাম্বারটা সেভ করে রাখো এবং একটা মিসকল দাও, তোমার টাও পেয়ে যাবো।’

ট্রেন রংপুরের কাছাকাছি পৌছে গেছে। রংপুর যারা নামবেন তাদের প্রস্তুত থাকার জন্য ঘোষনাও দেওয়া হয়েছে। থেমে গেছে ট্রেন। বাড়তি কোলাহল। অনেকে ওঠা-নামা করছে, কেউবা দোকান থেকে জরুরি কিছু কেনা-কাটার জন্যও নেমেছে। হুইসেল বেজে উঠল, ইতোমধ্যে ট্রেন ছাড়ার ঘোষনাও দেয়া হয়েছে। আবার ধীর গতিতে চলা শুরু করলো ট্রেন।

কোলাহল একটু থামতেই দেখা গেল এক যুবক হাতে একটা ব্যাগপ্যাক নিয়ে দাড়িয়ে আছে। সবার দিকে লক্ষ্য করছে। যারা এখনও দাঁড়িয়ে আছে, তাদেরকে বসার আহবান জানাচ্ছে। এবার ব্যাগপ্যাকটা বাংকারে রেখে একটা লোহার ছোট রড দিয়ে বাংকারের রডে ২/৩বার বাড়ি দেয়, টং টং বেজে ওঠে রডটি। অনেকটা স্কুলের ঘন্টার মত। এটা হয়তো সকলের দৃষ্টি আকর্ষণের কৌশল। এবার বলে, ‘সম্মানিত যাত্রী ভাই-বোনেরা, আমি বাবর কবিরাজ আপনাদের যাত্রা পথে আমি একটু উপকার করার উদ্দেশ্যে এখানে হাজির হয়েছি। আমার গুরু স্বপ্নে বাত-বেদনার জন্য একটি ফর্মূলা পেয়েছেন, যার নাম অষ্টধাতু, আর এই অষ্টধাতু তামার সাথে মিশিয়ে একটা আংটি তৈরি করা হয়েছে। এই আংটি ব্যবহার করলে ৮১ প্রকারের বাত চিরতরে নির্মূল হবে। আংটির সাথে একটা ব্যবহারবিধিও আপনাদের দেওয়া হবে। এই আংটির মূল্য মাত্র ১০ টাকা। কোম্পানি থেকে ২টি আংটির একটা করে প্যাকেট তৈরি করা হয়েছে। প্রতি প্যাকেটের মূল্য ২০ টাকা, তবে আমি আপনাদের সেবা এবং কম্পানির প্রচারের জন্য প্রতিটি প্যাকেট মাত্র ১০ টাকা করে নিয়ে থাকি, আর ট্রেনের প্রতিটি বগিতে মাত্র ১০ প্যাকেট দিয়ে থাকি। অর্থাৎ আপনাদের মাঝে মাত্র ১০ জন সৌভাগ্যবান ব্যাক্তি এটা পেতে পারেন। আর একটা বিষয় আপনাদের বলে দিতে চাই, প্রমাণ ছাড়া আমি এটা বিক্রি করি না। যাদের বাতের ব্যথা আছে, এরকম ৩ জন যাত্রী হাত তোলেন, আমি এখনই এই আংটির কার্যকারিতা প্রমাণ করে দেখাই। সবাই অতি আগ্রহ নিয়ে শেষের কথাগুলো শুনছে। আর একটু একটু আশ্চর্যও হচ্ছে। হাতে হাতে প্রমাণ! এতো ম্যাজিক!

এবার বাবর বলল, ‘যিনি স্টার সিগারেট খান, তিনি হাত তোলেন।’ কেউ হাত তোলে না। …’ও বুঝেছি, লজ্জা পাচ্ছেন। আচ্ছা আমাকে কি কেউ একটা স্টার সিগারেট দিতে পারবেন?’ একজন, পকেট থেকে সিগারেটের প্যাকেট বের করলেন। আর সাথে সাথে বাবর বলে উঠলো, ‘আমি সিগারেট খাই না, আপনাকে অনেক ধন্যবাদ। তবে আপনার প্যাকেটটা একটু দিতে হবে।’ ভদ্রলোক প্যাকেটটা দিলেন। না দিয়ে আর কোন উপায়ও নেই। এতক্ষনে সবার দৃষ্টি ম্যাজিক দেখার অপেক্ষায়। হাঁ, বাতের ব্যাথা সারানোর ম্যাজিক। এবার বাবর কবিরাজ সিগারেটের ভেতরের রুপালি কাগজটা একটু ছিড়ে নিলেন এবং ৩ জন বাত রুগির জন্য তিনটা আংটিতে পেচিয়ে দিলেন। পেপারের সিলভার দিকটা আংটির সঙ্গে লেগে থাকলো। এবার চূড়ান্ত ম্যাজিক। নির্দিষ্ট ৩ জন বাত রুগির হাতে পরিয়ে দেওয়া হলো আংটি। মূহুর্তেই চিৎকার দিয়ে উঠলেন তিনজনই।

বাবর কবিরাজ সাথে সাথে অংটিগুলো খুলে নিলেন এবং সবার দৃষ্টি আকর্ষন করে একটা সুখের হাসি দিয়ে বললেন। আপনারা দেখলেন তো আংটির কার্যকারিতা। ট্রেন, কাউনিয়া স্টেশনে পৌছে গিয়েছে। আমরা এক্ষনই প্লাটফরমে ঢুকতে যাচ্ছি। ১০ জন হাতে হাতে টাকা বের করেন, আংটি দিয়েই আমি নেমে পড়বো। প্রায় ৬ থেকে ৭জন ১০ টাকা বের করে দ্রুত আংটি নিয়ে ফেলল।… ‘ট্রেন কাউনিয়ায় ঢুকে পড়েছে এক্ষনই থামবে। আমি নেমে গেলাম,’ বললেন বাবর। বাকি ৩ টা আংটি পরের বগির সৌভাগ্যবানরা পাবেন।

এরই মধ্যে ২ জন ১০ টাকা বের করে ফেলেছেন। ৯ টা আংটি বিক্রি শেষ। এবার ট্রেন থেমে গেছে। বাবর বললেন, অনেকেরই বাত ভালো হয়ে যাচ্ছে। দেখেন আংটির চাহিদা কত দ্রুত কমে আসছে। একটি বগিতে ১০ জন বাতের রুগিও নেই। অথচ কদিন আগেও একটি বগিতে ২০ প্যাকেট আংটির চাহিদা থাকলেও আমি ১০ টার বেশি দিতে পারি নাই। অনেকেই আংটি না পেয়ে হতাশও হয়েছিলেন। ট্রেন থেকে বাবর নামার আগে শেষ প্যাকেটটিও একজন কিনে ফেললেন।

কাউনিয়ায় ট্রেন থামলো। আবার কোলাহোল, আবার ওঠা-নামা। আবার চলা শুরু করলো ট্রেন।
ইতোমধ্যে আংটির কাহিনি ভুলে গেছে যাত্রীরা। না, সম্রাট আর সালেহিন ভোলেনি। তারা চোখে চোখে খুজছে। ঐ তিনজন যাত্রীকে খুজছে যারা আংটি পরে কার্যকারিতা নিশ্চিত করেছিলেন। না, তাদেরকে দেখা যাচ্ছে না। সম্ভবত কাউনিয়াতে নেমে পড়েছেন। হঠাৎ একজনকে দেখা গেল। সম্রাট ও সালেহিন এগিয়ে গেল তার কাছে। বললো, ‘ভাই আপনি আংটি পরে কি অনুভব করেছিলেন এবং কেনইবা চিৎকার দিলেন?’ ভদ্রলোক বললেন, ‘আংটি পরা মাত্রই আমার আঙুল পুড়ে যাচ্ছিলো। তাই চিৎকার দিয়েছি।’ সালেহিন ভাবতে থাকে সিলভার কোটিনের সাথে তামার বিক্রিয়ার কারণে হয়ত তাপ উৎপন্ন হয়েছে, তাই আঙুল পুড়ে যাচ্ছিল।

সম্রাট-সালেহিন, দুজনেই চুপ। সম্ভবত দুজনই ভাবছে একই কথা। আঙুল পুড়ে যাওয়ার সাথে, বাত ভালো হওয়ার সর্ম্পক কি? না, কোন সর্ম্পক নেই। এটাই ম্যাজিক, এটাই রহস্য, এটাই ব্যবসার কৌশল!

-শাকিল আহমেদ