ভারতীয় গরু পাচারে খোদ বিএসএফেরই জড়িত

নিউজ ডেস্ক:    ভারত থেকে সারা বছরজুড়েই বিপুল পরিমাণ গরু পাচার হয়। বাংলাদেশ থেকে গরু পাচার করতে গিয়ে অনেকেই ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর গুলিতে নিহত হন। এবার ভারত থেকে গরু পাচারে খোদ বিএসএফেরই জড়িত থাকার চিত্র বেরিয়ে দেশটির কেন্দ্রীয় তদন্ত ব্যুরো বা সিবিআই-এর তদন্তে। ক্রমশ বিস্তৃত হচ্ছে। গরু পাচারে বিএসএফের বেশ কয়েকজন উচ্চপদস্থ সাবেক ও বর্তমান কর্মকর্তা,দেশটির রাজনৈতিক নেতা, কাস্টমস ও পুলিশের একাংশের জড়িত থাকার অভিযোগ উঠেছে।

বিবিসি বাংলার খবরে বলা হয়, সিবিআইয়ের তদন্তে উঠে এসছে- গোটা পাচার চক্রটি পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদ-মালদা দিয়ে চালানো হলেও কলকাতায় বিএসএফের কয়েকজন সাবেক কর্মকর্তাও জড়িত ছিলেন। আর গরু পাচার চক্রের মূলহোতা হিসেবে পরিচিত এনামুল শেখের বিপুল সম্পত্তির হদিশ পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছেন তদন্তকারীরা। অন্যদিকে বিএসএফের যে কমান্ডান্টের বেশ কয়েকটি বাড়িতে তল্লাশি চালানো হয়েছে, তারও বিপুল সম্পত্তির হদিশ পাওয়া গেছে।

২০১৮ সালে কেরালায় বিএসএফের একজন কমান্ডান্ট নগদ প্রায় ৪৭ লক্ষ টাকাসহ ধরা পড়ার পরই ওই চক্রটির কথা সামনে আসে। তখন গ্রেপ্তার হয়েছিলেন এনামুল শেখও। যদিও এখন তিনি জামিনে রয়েছেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিএসএফেঢর কয়েকজন কর্মকর্তা বলেছেন,এরা চুনোপুটি। এই গরু পাচার চক্রের পিছনে বিএসএসফের আরও কয়েকজন সিনিয়র অফিসার জড়িত ছিলেন।এদের কেউ চাকরি ছেড়ে দিয়ে বিদেশে চলে গেছেন, কেউ অন্য নিরাপত্তা বাহিনীতে রয়েছেন। তদন্তকারীরা বলছেন শুধু বিএসএফ নয়, পাচার চক্রে জড়িয়ে ছিলেন কাস্টমস, পুলিশ এবং রাজনৈতিক নেতারাও।

দিল্লির প্রবীণ সাংবাদিক চন্দন নন্দী কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং নিরাপত্তাবাহিনীগুলির খবরাখবরের ওপর নজর রাখেন।তিনি বলেন, ‘অত্যন্ত সুসংগঠিত একটি চক্র চলছিল। এর পেছনে রাজনৈতিক হাতও ছিল। শুধু যে পশ্চিমবঙ্গের কিছু নেতা জড়িত ছিলেন তা নয়। কেন্দ্রের নেতাদের পরিবারও এর সঙ্গে জড়িত ছিলেন। অনেকদূর পর্যন্ত জাল বিস্তৃত ছিল এই চক্রটির।কিন্তু প্রশ্নটা হচ্ছে তদন্তে কি এদের নাম নিয়ে আসার মতো ক্ষমতা কেন্দ্রীয় তদন্ত এজেন্সিগুলোর আছে? নাকি তাদের সেই রাজনৈতিক সদিচ্ছা আছে?’

বিএসএফ কর্মকর্তারা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, এই পাচার চক্রটা কাজ শুরু করেছিল ২০১৫ সালে। আর ২০১৮ সালে কেরালায় বাহিনীর এক কমান্ডান্ট ধরা পড়ার পরে চক্রটির ব্যাপারে জানা যায়।তবে বিবিসি বাংলা জানতে পেরেছে যে, ২০১৬ সালেই বাহিনীটির এক কর্মকর্তারা বিএসএফের মহাপরিচালককে চিঠি লিখে এই পাচার চক্র সম্বন্ধে সতর্ক করেছিলেন।তিনি জানিয়েছিলেন বিএসএফের দক্ষিণবঙ্গ সীমান্ত অঞ্চলের কয়েকজন পদস্থ কর্মকর্তা এই চক্রের সঙ্গে জড়িত রয়েছেন।

ওই চিঠিটিতে লেখা হয়েছিল, ‘ফারাক্কায় অবস্থিত ২০ নম্বর ব্যাটালিয়নের অফিসারদের কলকাতায় দক্ষিণবঙ্গ সীমান্তের সদর দপ্তর থেকে নির্দেশ পাঠানো হচ্ছে, যাতে পাচারকারীদের কথা শুনে চলা হয়। চোরাচালান করতে দিতে নির্দেশ আসছে। আবার বাহিনী সরিয়ে নিয়ে পাচারের কাজে সুবিধা করিয়ে দেওয়া হচ্ছে।’ সিবিআইয়ের তদন্তকারীদের নজরে সাবেক ডিআইজি, কমান্ডান্ট, সেকেন্ড-ইন-কমান্ডমহ নানা পদমর্যাদার অফিসাররাই রয়েছেন বলে তারা জানিয়েছেন।

বিএসএফের পূর্বাঞ্চলীয় সীমান্তের অবসরপ্রাপ্ত ডেপুটি ইন্সপেক্টর জেনারেল (ডিআইজি) সমীর কুমার মিত্র বলেন, ‘রক্ষক যখন ভক্ষক হয়ে ওঠে তখন আর সুরক্ষা বলে কিছু থাকে না। যে বাহিনী জন্মলগ্ন থেকে দেশের জন্য লড়াই করেছে,বিশ্বের বৃহত্তম সীমান্ত রক্ষী বাহিনী, তার কিছু অফিসার পাচারের সঙ্গে জড়িয়ে পড়বেন, এটা অকল্পনীয়। বিএসএফের জন্য কলঙ্কজনক একটা ঘটনা।’

তিনি বলেন, ‘যেভাবে গরু পাচারের গোটা প্রক্রিয়াটা প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেয়েছে, এটাই বেশি চিন্তার। কিন্তু আমি বলব বিএসএফ তো শুধু সীমান্তে বলবৎ থাকে। পশ্চিম ভারত থেকে বেশ কয়েকটি রাজ্য পেরিয়ে যে গরুগুলো আসছে, সেটা সেখানকার পুলিশ বা শুল্ক বিভাগ কেন আটকাচ্ছে না? তাদেরও তো দায়িত্ব ছিল। যদিও এই কথার অর্থ এটা যেন না করা হয়- যেসব বিএসএফ অফিসারের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে, আমি তাদের পক্ষ নিয়ে কথা বলছি।’

সিবিআইয়ের তদন্তকারীরা জানিয়েছেন. পাচার চক্রটি যে তিন বছর কাজ করেছে তার মধ্যেই বিএসএফের কোনো সিনিয়র অফিসার প্রায় ২০০ কোটি টাকা, কেউ ৩০০ কোটি টাকার মালিক হয়েছেন। তারা কোথায় জমি-বাড়ি বা সম্পত্তি কিনেছেন, সেই তথ্যও যোগাড় করেছেন তদন্তকারীরা।এ ছাড়াও পাচারের ভাগ নিয়মিত কাস্টমস, পুলিশের একাংশ আর রাজনৈতিক নেতাদের কাছে গেছে।মূলত মুর্শিদাবাদ আর কলকাতা থেকেই চক্রটি কাজ চালাত বলে বিএসএফের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কর্মকর্তা জানিয়েছেন।

বিবিসি বাংলার কাছে থাকা তথ্যে দেখা গেছে, পাচারকারীর গরু প্রতি প্রায় ৪০ হাজার টাকা পেতো। তদন্তকারীরা যে প্রাথমিক হিসাব করেছেন, তাতে শুধু দক্ষিণবঙ্গ সীমান্ত অঞ্চল দিয়েই গত তিন বছরে প্রতিরাতে ১৩-১৪ কোটি টাকা মূল্যের গরু পাচার হয়েছে।

২০১৮ সালে কেরালায় বিএসএফের একজন কমান্ডান্ট এবং পাচার চক্রের অন্যতম মূলহোতা এনামুল শেখ ধরা পড়ার পর বিএসএফের কয়েকজন অফিসারকে সরিয়ে দেওয়া হয়। এরপর সীমান্তে গরু পাচার অনেকটা কমে যায়।

সমীর কুমার মিত্র বলেন, ‘সরকারি কর্মচারী বলে বিএসএফের অফিসারদের নাম উঠে এসেছে প্রথমে। কিন্তু যদি নিরপেক্ষভাবে এবং যথার্থ তদন্ত হয়, তাহলে এমন ব্যক্তিদের নামও বেরিয়ে আসতে পারে, যারা সরকারি কর্মী নন।’

পাচার চক্রটি কিভাবে কাজ চালাতো তার আভাসও পেয়েছে তদন্তকারীরা। উত্তর বা পশ্চিম ভারত থেকে গরু এনে প্রথমে পশ্চিমবঙ্গের বীরভূমের একটি জায়গায় রাখা হতো। সেখান থেকে গরুগুলোকে মুর্শিদাবাদ সীমান্তে নিয়ে যাওয়া হতো। বিএসএফের কর্মকর্তাদের সঙ্গে আগে থেকেই ঠিক করা থাকত যে কোনো জায়গা দিয়ে কত গরু পাচার হবে।প্রতিটি গরুর নিখুঁত হিসাব রাখা হতো।

আবার পাচারের সময়ে যেসব গরু ধরা পড়ত, সেগুলোকে কখনও বাছুর বলে দেখিয়ে বা কখনও পশ্চিমবঙ্গের গরু বলে দেখানো হতো। যার দাম পশ্চিম ভারতের গরুর থেকে বহুগুণ কম। ধরা পড়া গরু আবার কাস্টমসের মাধ্যমে নিলাম করা হতো। সেগুলো পাচারকারীরাই কম দামে কিনে নিয়ে পাচার করত।